পাকিস্তানের ইসলামাবাদে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগের আগুনে ১৪ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় কঠোর জবাবদিহির ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোস্তফা কামাল। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ঘটনার জন্য দায়ী কেউই ছাড় পাবে না—সে যতই প্রভাবশালী হোক।
শুক্রবার সিনেটে দেওয়া বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এই মর্মান্তিক ঘটনাকে কয়েক দিনের আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বরং এর মধ্য দিয়ে স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার যে চিত্র সামনে এসেছে, তা নিয়ে গভীরভাবে কাজ করতে হবে।
‘কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না’
মোস্তফা কামাল বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও পুরো সরকারের পক্ষ থেকে তিনি নিশ্চিত করে বলতে চান, একজনকেও দায়মুক্তি দেওয়া হবে না। ঘটনার প্রকৃত দায় নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, শিশুদের প্রাণহানির মতো ঘটনা চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তদন্ত শুধু একটি অগ্নিকাণ্ডের কারণ খুঁজে বের করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; এর সঙ্গে জড়িত ব্যবস্থাপনা, দায়িত্ব পালনের ঘাটতি এবং স্বাস্থ্য খাতের অন্যান্য দুর্বলতাও খতিয়ে দেখতে হবে।
মন্ত্রী নিজেকেও জবাবদিহির আওতায় রাখার কথা জানান। তিনি বলেন, এই ঘটনায় কোনো ব্যাখ্যাই যথেষ্ট নয় এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি নিজেকেও দায়বদ্ধ মনে করছেন।
‘এই মৃত্যু যেন আরেকটি শিশুর ভাগ্য না হয়’
মোস্তফা কামালের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ঠেকানোর বিষয়টি। তিনি বলেন, পিমসে মারা যাওয়া শিশুদের আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু এই ঘটনাকে শিক্ষা হিসেবে নিয়ে যদি পরবর্তী একটি শিশুর জীবনও রক্ষা করা যায়, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় অর্জন।
তিনি বলেন, শুধু বক্তৃতা দিয়ে কোনো লাভ নেই। এই ঘটনার পর ব্যবস্থা যদি না বদলায়, তাহলে তদন্ত ও আলোচনার কোনো অর্থ থাকবে না।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে এমন একটি পথনকশা তৈরির আহ্বান জানান, যার মাধ্যমে বিদ্যমান সম্পদ ব্যবহার করেই চিকিৎসা ব্যবস্থার অবহেলাজনিত মৃত্যু কমানো যায়।
স্বাস্থ্য খাতকে ‘পচে যাওয়া ব্যবস্থা’ বললেন মন্ত্রী
দেশটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার ভাষায়, স্বাস্থ্য খাত এখনো আদর্শ অবস্থায় পৌঁছাতে পারেনি এবং পুরো ব্যবস্থার ভেতরে দীর্ঘদিনের সমস্যা জমে আছে।
তিনি দাবি করেন, পাকিস্তানে প্রতিবছর এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী প্রায় চার লাখ শিশু মারা যায়। প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক হাজার ৩০০ শিশুর মৃত্যু ঘটে, যার একটি বড় অংশ প্রতিরোধযোগ্য।
মোস্তফা কামাল বলেন, অদক্ষ কাউকে সরিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না; কারণ এরপর তার জায়গায় যোগ্য মানুষ খুঁজে পাওয়ার নিশ্চয়তাও নেই। তাই ব্যক্তিবিশেষের পরিবর্তনের পাশাপাশি পুরো ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন।
তদন্তে সময়ের সীমা চান না
পিমসের অগ্নিকাণ্ডের তদন্তে গঠিত কমিটির প্রতিবেদন দ্রুত দেওয়ার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, তদন্ত যেন কেবল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার জন্য করা না হয়।
তার মতে, ঘটনাটি তদন্ত করতে গেলে স্বাস্থ্য খাতের আরও অনেক অনিয়ম ও দুর্বলতা সামনে আসতে পারে। তাই তদন্তের পরিধি প্রয়োজন অনুযায়ী বিস্তৃত হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর কারও আস্থা না থাকলে নতুন করে কমিটি গঠন করা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে সবাইকে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।
নিহত শিশুদের পরিবারকে ৫০ লাখ রুপি
এদিকে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে ৫০ লাখ পাকিস্তানি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী তারিক ফজল চৌধুরী পিমসে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, কারও অপরাধমূলক অবহেলার কারণে ১৪ নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার জন্য দায়ী অন-ডিউটি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।
তিনি বলেন, অর্থ দিয়ে সন্তান হারানোর শোক পূরণ করা সম্ভব নয়। মৃত শিশুদের ফিরিয়ে আনা যাবে না, পরিবারের কষ্টও কমানো যাবে না। তবু কিছুটা সহায়তার উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ৫০ লাখ রুপি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই অর্থ মৃত শিশুদের মায়েদের ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যু
মৃত শিশুদের পরিচয় শনাক্ত করা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তারিক ফজল চৌধুরী বলেন, অধিকাংশ নবজাতক আগুনে পুড়ে নয়, বরং ধোঁয়ার কারণে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছে।
তিনি জানান, শিশুদের শরীরে জন্মের পর থেকেই তাদের মায়ের নামসংবলিত পরিচয়পত্র বা ট্যাগ লাগানো ছিল। ফলে মৃত শিশুদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
‘ঘটনাটি বন্ধ হবে ভবিষ্যতের মৃত্যু ঠেকানোর পর’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ বা দায়ীদের শাস্তি দেওয়ার মধ্য দিয়েই বিষয়টি শেষ করা উচিত নয়। ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।
তিনি স্বাস্থ্য খাতে ‘আমূল সংস্কারের’ আহ্বান জানিয়ে বলেন, পিমসের এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডকে এমন একটি মোড় হিসেবে দেখতে হবে, যেখান থেকে পাকিস্তানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ শুরু হতে পারে।
তার বার্তা একটাই—একটি শিশুর মৃত্যুও যদি অবহেলার কারণে ঘটে, তাহলে সেই ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে হবে। আর পিমসের ১৪ নবজাতকের মৃত্যু যেন কেবল একটি মর্মান্তিক ঘটনা হয়ে ইতিহাসে হারিয়ে না যায়; বরং তা যেন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিবর্তনের সূচনা হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















