১১:৫৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
সন্তান জন্মের পর মায়ের মনেও ঝড়: কখন স্বাভাবিক, কখন বিপদের সংকেত? গ্রিনল্যান্ডে জোরপূর্বক জন্মনিয়ন্ত্রণে মানবাধিকার লঙ্ঘন, তবে গণহত্যা নয় ওজন কমানোর পর চেহারা ও শরীর ঠিকঠাক করতে পুরুষদের ঝোঁক প্রসাধনী চিকিৎসায় শাওমির নতুন ভাঁজযোগ্য ফোনে চীনের সিএক্সএমটির অত্যাধুনিক স্মৃতি চিপ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাজারে নতুন সংঘাত, কার্সারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করছে ওপেনএআই পশ্চিমা প্রভাবের পাল্টা শক্তি গড়তে কিরগিজস্তানে পুতিন-শি-মাসুদের সম্মেলন চেরকির অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সে মুগ্ধ মারেসকা, নতুন যুগের বার্তা ম্যানচেস্টার সিটির চীনা হ্যাকারদের হামলা নিয়ে দাবি সংশোধন করল যুক্তরাষ্ট্র, আক্রান্ত নয়—টার্গেট ছিল সরকারি সংস্থাগুলো শত বছরের ব্যর্থতার পর ক্যানসার টিকায় ঐতিহাসিক সাফল্য, বদলে যেতে পারে চিকিৎসার ভবিষ্যৎ মস্কোর বৈঠক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য পেয়েছে কিয়েভ, রাশিয়াকে ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ

নিকেতু ইরালু: শান্তির এক সাহসী সেতু

নিকেতু ইরালুর চলে যাওয়া উত্তর-পূর্ব ভারতের শান্তি ও পুনর্মিলনের ইতিহাসে এমন এক শূন্যতা তৈরি করেছে, যা কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যুর শোক দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তিনি ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি নাগা সমাজের দীর্ঘ, রক্তাক্ত ও জটিল সংঘাতের মধ্যে সংলাপের সম্ভাবনাকে জীবিত রেখেছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল কোনো রাজনৈতিক পদ বা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা নয়; ছিল মানুষের কথা শোনার ক্ষমতা এবং এমন সময়ে কথা বলার সাহস, যখন কথা বলাটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের ব্যক্তিগত পরিচয় থেকে আমি জানি, নিকেতু শুধু একজন শান্তিকর্মী ছিলেন না। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যার কাছে ব্যক্তিগত আস্থা রাখা যেত। তাঁর পরামর্শে রাজনৈতিক হিসাবের চেয়ে মানবিক বিবেচনা বেশি জায়গা পেত। নাগা সমাজকে বোঝার ক্ষেত্রেও তাঁর কাছ থেকে আমি শিখেছি—এই সমাজকে শুধু বিদ্রোহ, জাতীয়তাবাদ বা সশস্ত্র রাজনীতির চোখে দেখলে তার প্রকৃত জটিলতা ধরা পড়ে না।

নাগাদের ইতিহাসে বীরত্ব যেমন আছে, তেমনি আছে গভীর বিভাজন, পারস্পরিক সন্দেহ, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিশ্বাসভঙ্গের দীর্ঘ স্মৃতি। বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাত এবং উপজাতীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা বহু বছর ধরে সমাজের ভেতরের ক্ষতকে আরও গভীর করেছে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে তার মধ্যেই শান্তির জায়গা তৈরি করাই ছিল নিকেতুর বিশেষত্ব।

শান্তির প্রথম শর্ত ছিল কথা বলা

১৯৯০-এর দশকে নাগা সমাজের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোর সদস্যদের মরদেহ রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখা যেত। এমন পরিস্থিতিতে শান্তির কথা বলা সহজ নৈতিক অবস্থান ছিল না। নিকেতু এবং তাঁর অল্প কয়েকজন সহযাত্রী তখন যে কাজ শুরু করেছিলেন, তা ছিল ধীর, ব্যক্তিগত এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

প্রথমে তাঁরা নেতাদের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেছেন। পরে গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে পৃথক আলোচনা হয়েছে। সবচেয়ে কঠিন ধাপ ছিল তাদের প্রতিনিধিদের একই জায়গায় বসানো। বহু বছরের শত্রুতা, সন্দেহ ও রক্তপাতের পর মুখোমুখি বসা রাজনৈতিক কৌশলের চেয়ে বেশি কিছু ছিল—এটি ছিল মানুষের মধ্যে ন্যূনতম আস্থা পুনর্গঠনের চেষ্টা।

Veteran Naga peacebuilder and reconciliation advocate Niketu Iralu passed  away in New Delhi on August 18, bringing an end to more than six decades of  work for peace and reconciliation in Nagaland

রেভারেন্ড ওয়াতি আইয়ার এবং ফোরাম ফর নাগা রিকনসিলিয়েশনসহ তাঁর সহযোগীদের ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে স্মরণীয়। এই উদ্যোগ কোনো রাতারাতি সাফল্য আনেনি। কিন্তু দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর নাগা সমাজের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে যে সংলাপের পরিসর তৈরি হয়, তার মূল্য আজকের প্রজন্ম সবচেয়ে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারে।

যে তরুণ নাগারা তুলনামূলক শান্ত পরিবেশে বড় হয়েছে, তাদের অনেকেই হয়তো জানে না তাদের বাবা-মায়ের প্রজন্ম কতটা সহিংসতার মধ্য দিয়ে গেছে। শান্তি যখন দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে ওঠে, তখন তার পেছনে থাকা সংগ্রাম সহজেই অদৃশ্য হয়ে যায়। নিকেতুর অবদানকে স্মরণ করার অর্থ সেই অদৃশ্য সংগ্রামকেও স্মরণ করা।

রাষ্ট্রের উদ্যোগ ও সমাজের উদ্যোগ—দুটিই প্রয়োজন

তবে নাগা শান্তির ইতিহাসকে শুধু নিকেতু ইরালুর ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার কাহিনি হিসেবে দেখলে তা অসম্পূর্ণ হবে। ভারত সরকার ও প্রধান সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে পৃথক যুদ্ধবিরতি চুক্তিগুলোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এগুলো সহিংসতা কমানোর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ শান্তি-আলোচনার জন্য একটি রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করেছিল।

এখানেই নাগা অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় চুক্তি সংঘাত থামানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু সমাজের ভেতরের ক্ষত সারাতে পারে না। সেই কাজের জন্য প্রয়োজন স্থানীয় উদ্যোগ, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং এমন মানুষের উপস্থিতি, যাদের ওপর উভয় পক্ষ কিছুটা হলেও আস্থা রাখতে পারে।

খোনোমা সেই শিক্ষার একটি শক্তিশালী উদাহরণ।

খোনোমা: বড় শান্তির ছোট প্রতিচ্ছবি

নিকেতুর পূর্বপুরুষের গ্রাম খোনোমা নাগা প্রতিরোধের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। কিন্তু এই ঐতিহাসিক গর্বের গ্রামের মধ্যেও পরবর্তী সময়ে গোষ্ঠীগত সংঘাতে ২২ জনের মতো মানুষ নিহত হন। অর্থাৎ রাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষত শুধু রাষ্ট্র ও বিদ্রোহীর সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের নিজস্ব সমাজ ও প্রতিবেশের ভেতরেও পৌঁছে গিয়েছিল।

এই ক্ষত সারানোর জন্য খোনোমা পাবলিক কমিশনের সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ঘরে ঘরে যান। নিকেতুও সেই উদ্যোগের অংশ ছিলেন। প্রতিপক্ষের কাছে ক্ষমা চাওয়া, অন্যের কষ্ট স্বীকার করা এবং দীর্ঘ সময় ধরে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা—এসব ছিল সেই প্রক্রিয়ার ভিত্তি।

বহু বছর লেগেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত খোনোমা আবার ঐক্যের দিকে ফিরতে সক্ষম হয়েছে।

Remembering Niketu Iralu: The peace messenger who helped hea

এই অভিজ্ঞতার সবচেয়ে বড় তাৎপর্য এখানেই: পুনর্মিলন কোনো বিমূর্ত রাজনৈতিক শব্দ নয়। এর বাস্তব অর্থ আছে। তা হলো নিহত মানুষের পরিবারে যাওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কথা শোনা, নিজের পক্ষের ভুল স্বীকার করা এবং ক্ষমা চাওয়ার মতো নৈতিক সাহস দেখানো।

যে কোনো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ক্ষেত্রে খোনোমার অভিজ্ঞতা তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে—রাজনৈতিক সমাধানের পাশাপাশি কি স্থানীয় পর্যায়ে এমন পুনর্মিলনের প্রক্রিয়া তৈরি করা যায় না?

ফিজোর পথ থেকে আলাদা এক পথ

নিকেতুর জীবনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তাঁর পারিবারিক ও ঐতিহাসিক পটভূমি। খোনোমা ছিলেন এ জেড ফিজোর সঙ্গে যুক্ত নাগা রাজনৈতিক সংগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান। ১৯৫০-এর দশকে ফিজো ভারতীয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সশস্ত্র আন্দোলনে নাগাদের সংগঠিত করেছিলেন।

নিকেতু সেই ইতিহাস থেকে দূরে ছিলেন না। তাঁর বাবা ছিলেন নাগাদের প্রথম দিককার চিকিৎসকদের একজন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি অঞ্চল ছাড়িয়ে মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজে যান। কিন্তু পরবর্তী জীবনে তিনি ফিজোর সশস্ত্র সংগ্রামের পথ অনুসরণ করেননি। তিনি বেছে নিয়েছিলেন অহিংসা, সংলাপ এবং সম্পৃক্ততার পথ।

এই সিদ্ধান্তকে কেবল রাজনৈতিক পছন্দ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ছিল একটি নৈতিক অবস্থান। তাঁর বিশ্বাস ছিল, কোনো সমাজের গভীর সংকটকে কেবল শক্তি দিয়ে সমাধান করা যায় না। মানুষের সঙ্গে কথা বলার সক্ষমতা তৈরি না হলে অস্ত্রবিরতিও স্থায়ী শান্তিতে রূপ নেয় না।

ইনিশিয়েটিভস অব চেঞ্জের সঙ্গে কাজ করার সময় অর্জিত সংলাপের দক্ষতা পরে তাঁর শান্তি-প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নাগাল্যান্ডে মাদকাসক্তদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তাঁর সামাজিক কাজ শুরু হলেও পরবর্তীতে তাঁর জীবনের কেন্দ্রীয় দায়িত্ব হয়ে ওঠে বিভিন্ন নাগা গোষ্ঠীর মধ্যে পুনর্মিলনের চেষ্টা।

একটি বাড়ি, যেখানে মানুষ কথা বলতে পারত

সেচু-জুবজার কেরুন্যু কি—‘লিসেনিং হাউস’—নিকেতুর দর্শনের বাস্তব প্রতীক হয়ে উঠেছিল। সেটি কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না। কিন্তু মণিপুর, মেঘালয়, আসাম, বোড়ো অঞ্চল এবং নাগাল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ সেখানে আসতেন।

নিকেতু ও তাঁর স্ত্রী ক্রিস্টিনের আতিথেয়তায় সেই বাড়ি হয়ে উঠেছিল কথোপকথনের জায়গা। সেখানে মানুষ শুধু রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে কথা বলত না; তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা, ভয়, হতাশা এবং আশার কথাও ভাগ করে নিতে পারত।

Mourning the loss of the man Nagaland called Uncle Niketu

এই ধরনের জায়গার গুরুত্ব সংঘাতের সময় আরও বেশি। কারণ রাজনৈতিক আলোচনায় মানুষ প্রায়ই নিজের পরিচয়কে প্রতিপক্ষের পরিচয়ের বিপরীতে দাঁড় করায়। ব্যক্তিগত সম্পর্ক সেই দেয়াল ভাঙার সুযোগ তৈরি করে।

নিকেতু এই মানবিক যোগাযোগের শক্তিতে গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন। জীবনের শেষ দিকেও তিনি তরুণ নাগা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছেন, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন এবং ফোরাম ফর নাগা রিকনসিলিয়েশনসহ বিভিন্ন মহলের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করেছেন। এমনকি সত্তরের দশকেও তিনি দুর্গম অঞ্চল পেরিয়ে মিয়ানমারের নাগা এলাকায় গিয়ে বিদ্রোহী নেতাদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন।

এটি ছিল তাঁর শান্তির ধারণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য: মানুষকে দূর থেকে বোঝানোর চেষ্টা নয়, বরং মানুষের কাছে গিয়ে শোনা।

আসামের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও ছিল আন্তরিক। আসামের সংস্কৃতি, সাহিত্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইতিহাসের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি মনে করতেন, নাগাদের আসামের ইতিহাস ও সমাজ থেকে শেখার অনেক কিছু আছে। প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চালিহা ও তাঁর পরিবারের প্রতিও তাঁর বিশেষ শ্রদ্ধা ছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গি দেখায়, নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেও প্রতিবেশী সমাজের সঙ্গে সম্মানজনক সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।

শান্তির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার

নিকেতু ইরালুর মৃত্যুর পর তাঁকে ‘শান্তির দূত’ বলা সহজ। কিন্তু তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকারকে শুধু এই পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়।

তিনি আমাদের মনে করিয়ে দিয়ে গেছেন যে শান্তি কোনো একবারের রাজনৈতিক ঘটনা নয়। এটি একটি সামাজিক প্রক্রিয়া। যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষর করা যায় একটি দিনে, কিন্তু মানুষের মনে জমে থাকা অবিশ্বাস দূর করতে লাগে বহু বছর। একটি চুক্তি সংঘর্ষ থামাতে পারে, কিন্তু ক্ষমা, আস্থা এবং পারস্পরিক মর্যাদা ছাড়া সেই শান্তি টেকসই হয় না।

নিকেতুর জীবনের শিক্ষা তাই নাগা সমাজের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। উত্তর-পূর্ব ভারতের যেসব অঞ্চলে পরিচয়, ইতিহাস, রাজনৈতিক অধিকার ও রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন রয়েছে, সেখানে তাঁর পদ্ধতির প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। যেখানে রাজনৈতিক ভাষা কঠিন হয়ে যায়, সেখানে মানবিক সংলাপের জায়গা তৈরি করা জরুরি।

NLA Speaker, organisations mourn passing of peace activist N

নিকেতু ছিলেন না কোনো সর্বশক্তিমান সমাধানদাতা। তিনি সব প্রশ্নের উত্তর রেখে যাননি। কিন্তু তিনি এমন একটি পদ্ধতি দেখিয়ে গেছেন, যা আজও প্রয়োজনীয়—প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার আগে তাকে শোনা, নিজের পক্ষের ভুল স্বীকার করা এবং রাজনৈতিক মতভেদের মধ্যেও মানুষের মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রাখা।

তাঁর শেষ দিনগুলোর একটি ছবি আমার মনে থাকবে—বন্ধুরা তাঁর বাড়িতে জড়ো হয়েছেন, দীর্ঘদিনের স্মৃতি নিয়ে কথা বলেছেন, গান গেয়েছেন, খেয়েছেন, হেসেছেন। পরে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় সেন্ট ফ্রান্সিস অব আসিসির শান্তির প্রার্থনা গাওয়া হয়েছে।

নিকেতু ইরালুর জীবনকে হয়তো এর চেয়ে ভালোভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, শান্তি শুধু একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য নয়; এটি মানুষের চরিত্র, সম্পর্ক এবং প্রতিদিনের আচরণের মধ্যেও নির্মিত হয়।

একটি বিভক্ত সমাজে সেই কাজ কখনো শেষ হয় না। কিন্তু কেউ যদি সাহস করে প্রথম দরজায় কড়া নাড়ে, প্রথম কথাটি বলে এবং প্রথম ক্ষমার হাত বাড়িয়ে দেয়, তবে ইতিহাসের গতিপথ বদলানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়।

নিকেতু ইরালু সেই প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া মানুষদের একজন ছিলেন। তাঁর চলে যাওয়ার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই তাঁর শূন্যতা কীভাবে পূরণ হবে, তা নয়। বরং তাঁর দেখানো পথ ধরে আর কতজন সেই কাজটি এগিয়ে নেবেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

সন্তান জন্মের পর মায়ের মনেও ঝড়: কখন স্বাভাবিক, কখন বিপদের সংকেত?

নিকেতু ইরালু: শান্তির এক সাহসী সেতু

১০:৩০:৪৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬

নিকেতু ইরালুর চলে যাওয়া উত্তর-পূর্ব ভারতের শান্তি ও পুনর্মিলনের ইতিহাসে এমন এক শূন্যতা তৈরি করেছে, যা কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যুর শোক দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তিনি ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি নাগা সমাজের দীর্ঘ, রক্তাক্ত ও জটিল সংঘাতের মধ্যে সংলাপের সম্ভাবনাকে জীবিত রেখেছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল কোনো রাজনৈতিক পদ বা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা নয়; ছিল মানুষের কথা শোনার ক্ষমতা এবং এমন সময়ে কথা বলার সাহস, যখন কথা বলাটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের ব্যক্তিগত পরিচয় থেকে আমি জানি, নিকেতু শুধু একজন শান্তিকর্মী ছিলেন না। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যার কাছে ব্যক্তিগত আস্থা রাখা যেত। তাঁর পরামর্শে রাজনৈতিক হিসাবের চেয়ে মানবিক বিবেচনা বেশি জায়গা পেত। নাগা সমাজকে বোঝার ক্ষেত্রেও তাঁর কাছ থেকে আমি শিখেছি—এই সমাজকে শুধু বিদ্রোহ, জাতীয়তাবাদ বা সশস্ত্র রাজনীতির চোখে দেখলে তার প্রকৃত জটিলতা ধরা পড়ে না।

নাগাদের ইতিহাসে বীরত্ব যেমন আছে, তেমনি আছে গভীর বিভাজন, পারস্পরিক সন্দেহ, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিশ্বাসভঙ্গের দীর্ঘ স্মৃতি। বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাত এবং উপজাতীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা বহু বছর ধরে সমাজের ভেতরের ক্ষতকে আরও গভীর করেছে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে তার মধ্যেই শান্তির জায়গা তৈরি করাই ছিল নিকেতুর বিশেষত্ব।

শান্তির প্রথম শর্ত ছিল কথা বলা

১৯৯০-এর দশকে নাগা সমাজের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোর সদস্যদের মরদেহ রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখা যেত। এমন পরিস্থিতিতে শান্তির কথা বলা সহজ নৈতিক অবস্থান ছিল না। নিকেতু এবং তাঁর অল্প কয়েকজন সহযাত্রী তখন যে কাজ শুরু করেছিলেন, তা ছিল ধীর, ব্যক্তিগত এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

প্রথমে তাঁরা নেতাদের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেছেন। পরে গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে পৃথক আলোচনা হয়েছে। সবচেয়ে কঠিন ধাপ ছিল তাদের প্রতিনিধিদের একই জায়গায় বসানো। বহু বছরের শত্রুতা, সন্দেহ ও রক্তপাতের পর মুখোমুখি বসা রাজনৈতিক কৌশলের চেয়ে বেশি কিছু ছিল—এটি ছিল মানুষের মধ্যে ন্যূনতম আস্থা পুনর্গঠনের চেষ্টা।

Veteran Naga peacebuilder and reconciliation advocate Niketu Iralu passed  away in New Delhi on August 18, bringing an end to more than six decades of  work for peace and reconciliation in Nagaland

রেভারেন্ড ওয়াতি আইয়ার এবং ফোরাম ফর নাগা রিকনসিলিয়েশনসহ তাঁর সহযোগীদের ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে স্মরণীয়। এই উদ্যোগ কোনো রাতারাতি সাফল্য আনেনি। কিন্তু দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর নাগা সমাজের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে যে সংলাপের পরিসর তৈরি হয়, তার মূল্য আজকের প্রজন্ম সবচেয়ে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারে।

যে তরুণ নাগারা তুলনামূলক শান্ত পরিবেশে বড় হয়েছে, তাদের অনেকেই হয়তো জানে না তাদের বাবা-মায়ের প্রজন্ম কতটা সহিংসতার মধ্য দিয়ে গেছে। শান্তি যখন দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে ওঠে, তখন তার পেছনে থাকা সংগ্রাম সহজেই অদৃশ্য হয়ে যায়। নিকেতুর অবদানকে স্মরণ করার অর্থ সেই অদৃশ্য সংগ্রামকেও স্মরণ করা।

রাষ্ট্রের উদ্যোগ ও সমাজের উদ্যোগ—দুটিই প্রয়োজন

তবে নাগা শান্তির ইতিহাসকে শুধু নিকেতু ইরালুর ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার কাহিনি হিসেবে দেখলে তা অসম্পূর্ণ হবে। ভারত সরকার ও প্রধান সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে পৃথক যুদ্ধবিরতি চুক্তিগুলোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এগুলো সহিংসতা কমানোর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ শান্তি-আলোচনার জন্য একটি রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করেছিল।

এখানেই নাগা অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় চুক্তি সংঘাত থামানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু সমাজের ভেতরের ক্ষত সারাতে পারে না। সেই কাজের জন্য প্রয়োজন স্থানীয় উদ্যোগ, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং এমন মানুষের উপস্থিতি, যাদের ওপর উভয় পক্ষ কিছুটা হলেও আস্থা রাখতে পারে।

খোনোমা সেই শিক্ষার একটি শক্তিশালী উদাহরণ।

খোনোমা: বড় শান্তির ছোট প্রতিচ্ছবি

নিকেতুর পূর্বপুরুষের গ্রাম খোনোমা নাগা প্রতিরোধের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। কিন্তু এই ঐতিহাসিক গর্বের গ্রামের মধ্যেও পরবর্তী সময়ে গোষ্ঠীগত সংঘাতে ২২ জনের মতো মানুষ নিহত হন। অর্থাৎ রাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষত শুধু রাষ্ট্র ও বিদ্রোহীর সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের নিজস্ব সমাজ ও প্রতিবেশের ভেতরেও পৌঁছে গিয়েছিল।

এই ক্ষত সারানোর জন্য খোনোমা পাবলিক কমিশনের সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ঘরে ঘরে যান। নিকেতুও সেই উদ্যোগের অংশ ছিলেন। প্রতিপক্ষের কাছে ক্ষমা চাওয়া, অন্যের কষ্ট স্বীকার করা এবং দীর্ঘ সময় ধরে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা—এসব ছিল সেই প্রক্রিয়ার ভিত্তি।

বহু বছর লেগেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত খোনোমা আবার ঐক্যের দিকে ফিরতে সক্ষম হয়েছে।

Remembering Niketu Iralu: The peace messenger who helped hea

এই অভিজ্ঞতার সবচেয়ে বড় তাৎপর্য এখানেই: পুনর্মিলন কোনো বিমূর্ত রাজনৈতিক শব্দ নয়। এর বাস্তব অর্থ আছে। তা হলো নিহত মানুষের পরিবারে যাওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কথা শোনা, নিজের পক্ষের ভুল স্বীকার করা এবং ক্ষমা চাওয়ার মতো নৈতিক সাহস দেখানো।

যে কোনো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ক্ষেত্রে খোনোমার অভিজ্ঞতা তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে—রাজনৈতিক সমাধানের পাশাপাশি কি স্থানীয় পর্যায়ে এমন পুনর্মিলনের প্রক্রিয়া তৈরি করা যায় না?

ফিজোর পথ থেকে আলাদা এক পথ

নিকেতুর জীবনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তাঁর পারিবারিক ও ঐতিহাসিক পটভূমি। খোনোমা ছিলেন এ জেড ফিজোর সঙ্গে যুক্ত নাগা রাজনৈতিক সংগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান। ১৯৫০-এর দশকে ফিজো ভারতীয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সশস্ত্র আন্দোলনে নাগাদের সংগঠিত করেছিলেন।

নিকেতু সেই ইতিহাস থেকে দূরে ছিলেন না। তাঁর বাবা ছিলেন নাগাদের প্রথম দিককার চিকিৎসকদের একজন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি অঞ্চল ছাড়িয়ে মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজে যান। কিন্তু পরবর্তী জীবনে তিনি ফিজোর সশস্ত্র সংগ্রামের পথ অনুসরণ করেননি। তিনি বেছে নিয়েছিলেন অহিংসা, সংলাপ এবং সম্পৃক্ততার পথ।

এই সিদ্ধান্তকে কেবল রাজনৈতিক পছন্দ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ছিল একটি নৈতিক অবস্থান। তাঁর বিশ্বাস ছিল, কোনো সমাজের গভীর সংকটকে কেবল শক্তি দিয়ে সমাধান করা যায় না। মানুষের সঙ্গে কথা বলার সক্ষমতা তৈরি না হলে অস্ত্রবিরতিও স্থায়ী শান্তিতে রূপ নেয় না।

ইনিশিয়েটিভস অব চেঞ্জের সঙ্গে কাজ করার সময় অর্জিত সংলাপের দক্ষতা পরে তাঁর শান্তি-প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নাগাল্যান্ডে মাদকাসক্তদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তাঁর সামাজিক কাজ শুরু হলেও পরবর্তীতে তাঁর জীবনের কেন্দ্রীয় দায়িত্ব হয়ে ওঠে বিভিন্ন নাগা গোষ্ঠীর মধ্যে পুনর্মিলনের চেষ্টা।

একটি বাড়ি, যেখানে মানুষ কথা বলতে পারত

সেচু-জুবজার কেরুন্যু কি—‘লিসেনিং হাউস’—নিকেতুর দর্শনের বাস্তব প্রতীক হয়ে উঠেছিল। সেটি কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না। কিন্তু মণিপুর, মেঘালয়, আসাম, বোড়ো অঞ্চল এবং নাগাল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ সেখানে আসতেন।

নিকেতু ও তাঁর স্ত্রী ক্রিস্টিনের আতিথেয়তায় সেই বাড়ি হয়ে উঠেছিল কথোপকথনের জায়গা। সেখানে মানুষ শুধু রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে কথা বলত না; তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা, ভয়, হতাশা এবং আশার কথাও ভাগ করে নিতে পারত।

Mourning the loss of the man Nagaland called Uncle Niketu

এই ধরনের জায়গার গুরুত্ব সংঘাতের সময় আরও বেশি। কারণ রাজনৈতিক আলোচনায় মানুষ প্রায়ই নিজের পরিচয়কে প্রতিপক্ষের পরিচয়ের বিপরীতে দাঁড় করায়। ব্যক্তিগত সম্পর্ক সেই দেয়াল ভাঙার সুযোগ তৈরি করে।

নিকেতু এই মানবিক যোগাযোগের শক্তিতে গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন। জীবনের শেষ দিকেও তিনি তরুণ নাগা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছেন, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন এবং ফোরাম ফর নাগা রিকনসিলিয়েশনসহ বিভিন্ন মহলের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করেছেন। এমনকি সত্তরের দশকেও তিনি দুর্গম অঞ্চল পেরিয়ে মিয়ানমারের নাগা এলাকায় গিয়ে বিদ্রোহী নেতাদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন।

এটি ছিল তাঁর শান্তির ধারণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য: মানুষকে দূর থেকে বোঝানোর চেষ্টা নয়, বরং মানুষের কাছে গিয়ে শোনা।

আসামের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও ছিল আন্তরিক। আসামের সংস্কৃতি, সাহিত্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইতিহাসের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি মনে করতেন, নাগাদের আসামের ইতিহাস ও সমাজ থেকে শেখার অনেক কিছু আছে। প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চালিহা ও তাঁর পরিবারের প্রতিও তাঁর বিশেষ শ্রদ্ধা ছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গি দেখায়, নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেও প্রতিবেশী সমাজের সঙ্গে সম্মানজনক সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।

শান্তির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার

নিকেতু ইরালুর মৃত্যুর পর তাঁকে ‘শান্তির দূত’ বলা সহজ। কিন্তু তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকারকে শুধু এই পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়।

তিনি আমাদের মনে করিয়ে দিয়ে গেছেন যে শান্তি কোনো একবারের রাজনৈতিক ঘটনা নয়। এটি একটি সামাজিক প্রক্রিয়া। যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষর করা যায় একটি দিনে, কিন্তু মানুষের মনে জমে থাকা অবিশ্বাস দূর করতে লাগে বহু বছর। একটি চুক্তি সংঘর্ষ থামাতে পারে, কিন্তু ক্ষমা, আস্থা এবং পারস্পরিক মর্যাদা ছাড়া সেই শান্তি টেকসই হয় না।

নিকেতুর জীবনের শিক্ষা তাই নাগা সমাজের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। উত্তর-পূর্ব ভারতের যেসব অঞ্চলে পরিচয়, ইতিহাস, রাজনৈতিক অধিকার ও রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন রয়েছে, সেখানে তাঁর পদ্ধতির প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। যেখানে রাজনৈতিক ভাষা কঠিন হয়ে যায়, সেখানে মানবিক সংলাপের জায়গা তৈরি করা জরুরি।

NLA Speaker, organisations mourn passing of peace activist N

নিকেতু ছিলেন না কোনো সর্বশক্তিমান সমাধানদাতা। তিনি সব প্রশ্নের উত্তর রেখে যাননি। কিন্তু তিনি এমন একটি পদ্ধতি দেখিয়ে গেছেন, যা আজও প্রয়োজনীয়—প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার আগে তাকে শোনা, নিজের পক্ষের ভুল স্বীকার করা এবং রাজনৈতিক মতভেদের মধ্যেও মানুষের মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রাখা।

তাঁর শেষ দিনগুলোর একটি ছবি আমার মনে থাকবে—বন্ধুরা তাঁর বাড়িতে জড়ো হয়েছেন, দীর্ঘদিনের স্মৃতি নিয়ে কথা বলেছেন, গান গেয়েছেন, খেয়েছেন, হেসেছেন। পরে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় সেন্ট ফ্রান্সিস অব আসিসির শান্তির প্রার্থনা গাওয়া হয়েছে।

নিকেতু ইরালুর জীবনকে হয়তো এর চেয়ে ভালোভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, শান্তি শুধু একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য নয়; এটি মানুষের চরিত্র, সম্পর্ক এবং প্রতিদিনের আচরণের মধ্যেও নির্মিত হয়।

একটি বিভক্ত সমাজে সেই কাজ কখনো শেষ হয় না। কিন্তু কেউ যদি সাহস করে প্রথম দরজায় কড়া নাড়ে, প্রথম কথাটি বলে এবং প্রথম ক্ষমার হাত বাড়িয়ে দেয়, তবে ইতিহাসের গতিপথ বদলানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়।

নিকেতু ইরালু সেই প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া মানুষদের একজন ছিলেন। তাঁর চলে যাওয়ার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই তাঁর শূন্যতা কীভাবে পূরণ হবে, তা নয়। বরং তাঁর দেখানো পথ ধরে আর কতজন সেই কাজটি এগিয়ে নেবেন।