কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ক্ষতিকর প্রভাব এবং তাদের আসক্ত করে তোলার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে সর্বোচ্চ ১৮ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতায় পৌঁছেছে মেটা প্ল্যাটফর্মস। আদালতের অনুমোদন সাপেক্ষে এই চুক্তির মধ্য দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিটির বিরুদ্ধে রাজ্যগুলোর সমন্বিত সবচেয়ে বড় আইনি পদক্ষেপের অবসান হতে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে বুধবার সমঝোতার ঘোষণা আসে। এর মাত্র আট দিন আগে মামলাটির ঐতিহাসিক ফেডারেল বিচার শুরু হয়েছিল। ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, কেনটাকি ও নিউ জার্সির নেতৃত্বে রাজ্যগুলোর জোট ১৮ আগস্ট বিচার শুরুর সময় উদ্বোধনী বক্তব্য দিয়েছিল। ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরি সাক্ষ্য দেওয়ার পরদিনই সমঝোতার ঘোষণা আসে। মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গও সাক্ষ্য দেওয়ার তালিকায় ছিলেন, তবে সমঝোতার কারণে তাকে আর আদালতে হাজির হতে হচ্ছে না।
চুক্তিতে কী বদল আনছে মেটা
চুক্তি অনুযায়ী, মেটা ১০ বছরে প্রাথমিকভাবে ১২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার দেবে। নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হলে মোট অর্থের পরিমাণ সর্বোচ্চ ১৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এর প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার যাবে মামলাকারী ২৯ অঙ্গরাজ্যের জোটকে। ক্যালিফোর্নিয়া পাবে অন্তত ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, যা একক কোনো রাজ্যের সবচেয়ে বড় অংশ।
এই অর্থ রাজ্যগুলোর তরুণদের অনলাইন নিরাপত্তা কর্মসূচি, ডিজিটাল-সাক্ষরতা কার্যক্রম এবং স্কুল-পরবর্তী ও গ্রীষ্মকালীন কার্যক্রমে ব্যবহারের কথা রয়েছে।
মেটা যুক্তরাষ্ট্রে কিশোর ব্যবহারকারীদের জন্য প্ল্যাটফর্মের নকশাতেও পরিবর্তন আনবে। এর মধ্যে থাকবে দৈনিক ব্যবহারের সময়সীমা, অ্যালগরিদমিক সুপারিশ ছাড়া ঐচ্ছিক ব্যক্তিগতকরণহীন ফিড, বিউটিফিকেশন ফিল্টার সরানো, কিশোর অ্যাকাউন্টে লাইক সংখ্যা আড়াল এবং বয়স যাচাই ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা। তবে মেটা কোনো ধরনের অন্যায় স্বীকার করেনি।
টিকটক-ইউটিউবের ওপরও চাপ
সমঝোতার গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত প্রতিদ্বন্দ্বী প্ল্যাটফর্মগুলোকেও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। টিকটক ও ইউটিউব একই ধরনের কিশোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে মেটাকে সর্বোচ্চ ১৮ বিলিয়ন ডলারের মাত্র ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পরিশোধ করতে হবে।
ফলে মেটার জন্য টিকটক ও ইউটিউবকে একই ধরনের বিধিনিষেধ গ্রহণে উৎসাহিত করার আর্থিক কারণ তৈরি হয়েছে। দুটি কোম্পানিই কিশোরদের ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত পৃথক মামলার মুখোমুখি।
মেটার জন্য অর্থের চেয়ে বড় ঝুঁকি সুনাম
মেটার ২০২৫ সালের আয় ছিল ২০১ বিলিয়ন ডলার এবং সমঝোতা ঘোষণার দিন কোম্পানিটির বাজারমূল্য ছিল প্রায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে ১০ বছরে ১৮ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতার তুলনায় বড় বোঝা নয়।

তবে মামলার নথিপত্র মেটার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুনামগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অভ্যন্তরীণ নথি, বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদন ও আদালতে দেওয়া সাক্ষ্য এখন প্রকাশ্য নথির অংশ হয়ে গেছে। নিউ মেক্সিকোর একটি পৃথক মামলায় চলতি মাসেই মেটাকে ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার পাশাপাশি একই ধরনের নকশাগত পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মেটা ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে বলে জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও প্রভাব
নতুন পরিবর্তনগুলো আপাতত শুধু যুক্তরাষ্ট্রের কিশোর ব্যবহারকারীদের জন্য প্রযোজ্য। তবে এই সমঝোতা কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রকদের জন্য একটি আইনি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে অ্যালগরিদমিক স্বচ্ছতা, বয়স উপযোগী নকশা ও ক্ষতিকর নকশা নিয়ন্ত্রণে কঠোর নিয়ম করেছে। যুক্তরাজ্যে রয়েছে অনলাইন নিরাপত্তা আইন এবং অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে।
ভারতে ২০২৩ সালের ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনে শিশুদের আচরণগত নজরদারি ও লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপনে বিধিনিষেধ এবং ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য যাচাইযোগ্য অভিভাবকীয় সম্মতির বিধান রাখা হয়েছে। তবে এসব বিধান ধাপে ধাপে কার্যকর হওয়ার কথা। মেটার সমঝোতা দেশটিতে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বয়সভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলমান আলোচনাতেও নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
সমঝোতাটি এখন বিচারক ইয়ভোন গনজালেজ রজার্সের অনুমোদনের অপেক্ষায়। পাশাপাশি ফ্লোরিডার পৃথক বিচার এবং নিউ মেক্সিকো মামলায় মেটার আপিলও নজরে থাকবে। অন্যদিকে, কিশোর নিরাপত্তায় টিকটক ও ইউটিউবের ওপরও চাপ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















