স্কটল্যান্ড বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়, বিশাল জলরাশি, হাইল্যান্ডের গরু আর শত শত বছরের পুরোনো দুর্গ। দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এসব দুর্গের কোনোটি ইতিহাস ও স্থাপত্যের জন্য অসাধারণ, আবার কোনোটি কেবল চোখ ধাঁধানো দৃশ্যের জন্যই পর্যটকদের টানে।
স্কটল্যান্ডে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এক স্থানীয় ভ্রমণকারীর অভিজ্ঞতায় দেশটির এক ডজনেরও বেশি জনপ্রিয় দুর্গ ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে। তাঁর মতে, কয়েকটি দুর্গ এমন আছে যেখানে বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। আবার একটি বিখ্যাত দুর্গে দ্বিতীয়বার যাওয়ার তেমন আগ্রহও তৈরি হয়নি।
স্টার্লিং দুর্গে ইতিহাসের সঙ্গে মিলবে অসাধারণ দৃশ্য
প্রথমবার স্কটল্যান্ড ভ্রমণকারীদের জন্য সবচেয়ে বেশি সুপারিশ করা হয়েছে স্টার্লিং দুর্গকে। রাজধানীর বিখ্যাত দুর্গের তুলনায় এখানে অনেক সময় ভিড় কম থাকে। টিকিটের সঙ্গে নির্দেশিত ভ্রমণের সুবিধাও রয়েছে, যা দুর্গটির ইতিহাস বুঝতে বাড়তি সহায়তা করে।
দুর্গটির ভেতরের অংশও বেশ আকর্ষণীয়। এর বিশাল ভোজকক্ষকে ১৫শ শতকের শেষভাগের মতো করে সাজানো হয়েছে। এটি স্কটল্যান্ডের সবচেয়ে বড় মধ্যযুগীয় ভোজকক্ষ হিসেবে পরিচিত।
এ ছাড়া রানির শয়নকক্ষ ও অভ্যন্তরীণ হলসহ বিভিন্ন অংশে পুনর্নির্মিত রেনেসাঁ যুগের সাজসজ্জা দেখা যায়। ঐতিহাসিক নকশার হাতে বোনা ট্যাপেস্ট্রির প্রতিরূপও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।
দুর্গের বাইরে রয়েছে সুন্দরভাবে পরিচর্যা করা রানির বাগান। সেখান থেকে আশপাশের শহর ও প্রাকৃতিক দৃশ্যও উপভোগ করা যায়।
ডুন দুর্গে যেন মধ্যযুগে ফিরে যাওয়ার অনুভূতি
স্টার্লিং থেকে মাত্র ২০ মিনিট উত্তরে অবস্থিত ডুন দুর্গ স্থানীয় ভ্রমণকারীর সবচেয়ে পছন্দের জায়গাগুলোর একটি।
দুর্গটি শুধু ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য নয়, চলচ্চিত্র ও ধারাবাহিকপ্রেমীদের কাছেও বিশেষ আকর্ষণীয়। জনপ্রিয় ‘আউটল্যান্ডার’, ‘গেম অব থ্রোনস’ এবং ‘মন্টি পাইথন অ্যান্ড দ্য হলি গ্রেইল’-এর দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে এখানে।
দুর্গের কিছু অংশ সময়ের সঙ্গে ক্ষয়ে গেছে এবং পাথরের দেয়ালের কোথাও কোথাও ধস নেমেছে। তবে অবশিষ্ট স্থাপনাগুলো বেশ যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করা হয়েছে। সেখানে প্রবেশ করলে মনে হয় যেন সরাসরি মধ্যযুগের কোনো দুর্গে চলে যাওয়া গেছে।
এখানকার শব্দনির্দেশিত ভ্রমণ ব্যবস্থাটিও বিশেষ প্রশংসার দাবিদার। সাধারণত এ ধরনের ব্যবস্থায় খুব একটা আগ্রহ না থাকলেও ডুন দুর্গের ব্যবস্থাটি বেশ উপভোগ্য। জনপ্রিয় ধারাবাহিক ও চলচ্চিত্রের অভিনেতারাও এতে কণ্ঠ দিয়েছেন।
লখ নেসের তীরে উরকহার্ট দুর্গ
স্কটল্যান্ডের হাইল্যান্ড অঞ্চলে গেলে উরকহার্ট দুর্গকে তালিকায় রাখা উচিত বলেই মনে করেন ওই স্থানীয় ভ্রমণকারী।
লখ নেসের তীরে অবস্থিত এই দুর্গ একসময় স্কটল্যান্ডের অন্যতম বৃহৎ দুর্গ ছিল। এখন এটি মূলত ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সেই ধ্বংসাবশেষই জায়গাটিকে দিয়েছে আলাদা এক রহস্যময় আবহ।
দুর্গের অবস্থানও এর অন্যতম বড় আকর্ষণ। এখান থেকে বিখ্যাত লখ নেসের বিস্তীর্ণ জলরাশি ও চারপাশের মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা যায়। ইতিহাস, প্রকৃতি ও কিংবদন্তি—তিনের সমন্বয়ে উরকহার্ট দুর্গ হাইল্যান্ড ভ্রমণের অন্যতম স্মরণীয় গন্তব্য হতে পারে।
আইলিয়ান ডোনান দুর্গে চোখ আটকে যাবে প্রকৃতিতে
উরকহার্ট দুর্গ থেকে গাড়িতে এক ঘণ্টার কিছু বেশি পথ পেরোলেই পৌঁছানো যায় আইলিয়ান ডোনান দুর্গে। স্কাই সেতু থেকেও এটি মাত্র ১৫ মিনিটের দূরত্বে।
চলচ্চিত্র ‘হাইল্যান্ডার’-এর দৃশ্য ধারণের কারণে দুর্গটি আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেয়েছে। তবে ইতিহাসের গভীরে যেতে চান এমন পর্যটকদের জন্য এটি হয়তো সেরা পছন্দ নয়। কারণ দুর্গটির ভেতরের বেশিরভাগ অংশই আধুনিকভাবে সাজানো।
তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে এটি অসাধারণ। ছোট একটি দ্বীপের ওপর নির্মিত দুর্গটি এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তিনটি জলরাশি মিলিত হয়েছে। চারদিকে পাহাড় আর জল—সব মিলিয়ে এর অবস্থানই যেন একটি ছবির মতো।
এডিনবরার দুর্গ কেন হতাশ করতে পারে
স্কটল্যান্ডের সবচেয়ে পরিচিত দুর্গগুলোর একটি এডিনবরা দুর্গ। শহরের কেন্দ্রস্থলে ক্যাসল রকের ওপর এর অবস্থান দূর থেকেই নজর কাড়ে। প্রিন্সেস স্ট্রিট গার্ডেন কিংবা ভেনেল থেকে দুর্গটির দৃশ্য বিশেষভাবে আকর্ষণীয়।
কিন্তু বাইরে থেকে যতটা চমকপ্রদ, ভেতরে গিয়ে ততটা মুগ্ধতা তৈরি হয়নি বলে মনে করেন ওই স্থানীয় পর্যটক।
এর অন্যতম কারণ অতিরিক্ত ভিড়। স্কটল্যান্ডের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটনস্থলগুলোর একটি হওয়ায় দুর্গের ভেতরে স্বস্তিতে ঘোরাফেরা করা কঠিন হতে পারে। মুকুটের অলংকার দেখতে প্রায় ২০ মিনিট অপেক্ষা করার পরও সেগুলো প্রত্যাশার তুলনায় তেমন আকর্ষণীয় মনে হয়নি।
আরেকটি হতাশার কারণ হলো ভাগ্যের পাথর। স্কটিশ রাজাদের অভিষেকের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত এই বেলেপাথরের খণ্ডটি ২০২৪ সালে পার্থ জাদুঘরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে এডিনবরা দুর্গে গিয়ে সেটি দেখার আশা করলে হতাশ হতে পারেন পর্যটকরা।
দুর্গের ইতিহাস সম্পর্কেও প্রদর্শনীফলকে প্রত্যাশার তুলনায় কম তথ্য পাওয়া গেছে বলে মনে হয়েছে। বিশেষ করে দুর্গের ভেতরে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন কেমন ছিল, সে বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানার সুযোগ থাকলে অভিজ্ঞতাটি আরও সমৃদ্ধ হতে পারত।
এর পরিবর্তে দুর্গের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে সামরিক ইতিহাসভিত্তিক জাদুঘর। ফলে ইতিহাসপ্রেমী পর্যটকদের কাছে জায়গাটি প্রত্যাশিত মাত্রায় আকর্ষণীয় নাও হতে পারে।
তাহলে স্কটল্যান্ডে কোন দুর্গ বেছে নেবেন?
স্কটল্যান্ডের দুর্গগুলোকে যদি ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী ভাগ করা হয়, তাহলে স্টার্লিং দুর্গ ইতিহাস, স্থাপত্য ও দৃশ্য—সবকিছুর ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় দেয়। ডুন দুর্গে মিলবে মধ্যযুগীয় পরিবেশের পাশাপাশি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ও ধারাবাহিকের স্মৃতি।
হাইল্যান্ডের প্রকৃতি উপভোগ করতে চাইলে উরকহার্ট দুর্গ বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। আর নিখাদ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ছবির মতো পরিবেশ চাইলে আইলিয়ান ডোনান দুর্গ হতে পারে অন্যতম সেরা পছন্দ।
অন্যদিকে এডিনবরা দুর্গ নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও অতিরিক্ত ভিড়, কিছু প্রত্যাশাভঙ্গ এবং গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শনের অনুপস্থিতির কারণে সবার কাছে সমান আকর্ষণীয় নাও হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















