নেপালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের মধ্যে গাছে উঠে প্রাণ বাঁচানো আট বছরের শিশু জোয়াল ঘালের সঙ্গে অবশেষে তার মায়ের দেখা হয়েছে। নিখোঁজ দুই সন্তানকে মৃত ভেবে কান্নায় ভেঙে পড়া মা মাত্তি মায়া তামাং শুক্রবার হাসপাতালে জীবিত ছেলেকে ফিরে পেয়ে যেন নতুন করে জীবন ফিরে পেলেন।
নিখোঁজ সন্তানদের খুঁজে ফিরছিলেন মা
বুধবার নেপালের উত্তরাঞ্চলের রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস আঘাত হানার সময় জোয়াল ও তার ছোট ভাই স্কুলে ছিল। দুর্যোগের পর স্কুল ও আশপাশের এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলে সন্তানদের কোনো খোঁজ পাচ্ছিলেন না ২৮ বছর বয়সী মাত্তি মায়া।
এক আশ্রয়কেন্দ্র থেকে আরেকটি আশ্রয়কেন্দ্র, এক সংগ্রহস্থল থেকে আরেকটি স্থানে ছুটে বেড়িয়েছেন তিনি। কোথাও সন্তানদের নামের তালিকা নেই, কোথাও তাদের সন্ধান নেই। একপর্যায়ে তিনি ধরে নিয়েছিলেন, দুই সন্তানই হয়তো আর বেঁচে নেই।
মাত্তি মায়া জানান, চতুর্থ স্থানেও যখন সন্তানদের নামের তালিকায় পেলেন না, তখন তার মনে হয়েছিল দুজনকেই তিনি হারিয়েছেন। কান্নায় নিজেকে সামলাতেও পারছিলেন না তিনি।
তবে এর মধ্যেই ভাগ্য তাকে একের পর এক সুখবর দেয়। প্রথমে তিনি ছোট ছেলেকে জীবিত অবস্থায় খুঁজে পান। পরে জানতে পারেন, বড় ছেলে জোয়ালও বেঁচে আছে।
গাছে উঠে বেঁচে ছিল ছোট্ট জোয়াল
বন্যার পানির তোড় ও ভূমিধস থেকে বাঁচতে জোয়াল স্কুল থেকে দৌড়ে একটি বনে ঢুকে পড়ে। এরপর এক বন্ধুর সঙ্গে গাছে উঠে আশ্রয় নেয় সে।
আট বছরের শিশুটিকে বৃহস্পতিবার রাসুয়া থেকে উদ্ধার করে আকাশপথে পাশের নুওয়াকোট জেলার একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তার ডান পা ভেঙে গিয়েছিল। মুখে ছিল একাধিক কাটা ও আঘাতের চিহ্ন।
উদ্ধারের সময় শিশুটির হাতে শক্ত করে ধরা ছিল ১০ রুপির দুটি নোট। উদ্ধারকারী পুলিশ সদস্যরা তাকে হাসপাতালে যেতে উৎসাহিত করার জন্য ওই টাকা দিয়েছিলেন বলে কর্মকর্তারা জানান।
বন্যার সময় কী ঘটেছিল, সে সম্পর্কে জোয়াল জানায়, সে স্কুলে পড়াশোনা করছিল। হঠাৎ চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়। এরপর সে বন্ধুর সঙ্গে দৌড়ে বনে চলে যায় এবং গাছে উঠে প্রাণ বাঁচায়।
অদ্ভুতভাবে, এত বড় বিপদের মধ্যেও শিশুটির মুখে আতঙ্কের ছাপ ছিল না। ভয় পেয়েছিল কি না জানতে চাইলে সে মাথা নেড়ে না বলেছিল।
একটি ফোনকলেই বদলে গেল মায়ের জীবন
জোয়ালকে হাসপাতালে নেওয়ার পরও কর্তৃপক্ষ তার পরিবারের সন্ধান পাচ্ছিল না। পরে তার সঙ্গে কথা বলা এক সাংবাদিকের ফোন নম্বর হাসপাতাল থেকে মাত্তি মায়ার হাতে পৌঁছায়।
বৃহস্পতিবার তিনি সেই নম্বরে ফোন করেন। তখন তাকে জানানো হয়, তার ছেলে জোয়াল জীবিত আছে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

খবরটি শুনে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না মাত্তি মায়া। এতক্ষণে তিনি ধরে নিয়েছিলেন, সন্তানদের আর কখনো দেখতে পাবেন না।
ছেলেকে খুঁজে পাওয়ার পর তার অনুভূতি ছিল, যেন জীবনটাই আবার ফিরে পেয়েছেন তিনি।
ধ্বংসস্তূপে বদলে গেছে পুরো জনপদ
জোয়াল ও তার ভাই স্কুলে যাওয়ার পর বাড়িতে বুননের কাজ করছিলেন তাদের মা। হঠাৎ তিনি এমন একটি শব্দ শুনতে পান, যা তার কাছে ভূমিকম্পের মতো মনে হয়েছিল।
পরে বুঝতে পারেন, চারদিকে ভয়াবহ ধ্বংস নেমে এসেছে। লাংটাং লিরুং পর্বতের কাছে হিমবাহের নিচের একটি অংশ ধসে পড়ে বরফ ও পাথরের বিশাল স্রোত উপত্যকায় নেমে আসে। এর ফলে সৃষ্টি হয় ব্যাপক ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যা।
মাত্তি মায়া সন্তানদের স্কুলের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সাধারণত যেখানে যেতে ১৫ থেকে ২০ মিনিট লাগে, সেই পথ তখন সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল। স্কুল ভবন ধ্বংস হয়ে যায়। বাজার, রাস্তা কিংবা পরিচিত কোনো স্থাপনা কোথায় ছিল—তা বোঝার উপায় ছিল না।
চারদিকে ছিল শুধু পানি, পাথর আর কাদা।
ভূমিধসের স্রোত উত্তর নেপাল পেরিয়ে তিব্বত পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বহু জনপদ কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

বিপর্যয়ে হাজারো শিশু
নেপালের রাসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলায় এই দুর্যোগে অন্তত ১৭ হাজার শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদের শনাক্ত করা, নিবন্ধন করা এবং তাদের পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের জন্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করছে শিশু কল্যাণ সংস্থাগুলো।
নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে এই দুর্যোগে অন্তত ৫৮০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৫০০ মানুষ।
এই বিপর্যয়ের মধ্যেও জোয়ালের গল্প যেন এক ব্যতিক্রমী আশার বার্তা হয়ে উঠেছে। কয়েক দিন ধরে সন্তানদের খুঁজে বেড়ানো এক মায়ের কাছে হাসপাতালের বিছানায় জীবিত ছেলেকে ফিরে পাওয়ার মুহূর্তটি হয়ে উঠেছে অবর্ণনীয় স্বস্তির।
ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে মাত্তি মায়া বলেন, জোয়াল সব সময়ই একটু দুষ্টু। এমনকি হাড় ভাঙার ঘটনাও তার জীবনে এই প্রথম নয়।
কিন্তু এবার সেই ভাঙা পা-ই যেন মায়ের কাছে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান প্রমাণ—তার ছেলে বেঁচে আছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















