ভারতের রাজধানী দিল্লিতে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-সমর্থিত একটি গুপ্তচরচক্রের সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছে দিল্লি পুলিশ। এ ঘটনায় ২০-এর কোঠায় থাকা এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের অভিযোগ, প্রায় দুই বছর ধরে তারা পাকিস্তানভিত্তিক ওই চক্রের হয়ে কাজ করছিলেন এবং ভারতীয় মুঠোফোনের সিম কার্ড সংগ্রহ করে দুবাইয়ের মাধ্যমে পাকিস্তানে পাঠাতেন।
গ্রেপ্তার হওয়া দম্পতি হলেন ২৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ সাহিল এবং তাঁর ২১ বছর বয়সী স্ত্রী সামিরা। দিল্লি পুলিশের বিশেষ শাখা ২৮ আগস্ট তাদের গ্রেপ্তারের কথা জানায়।
ভারতীয় সিম ব্যবহার করে পাকিস্তান থেকে হোয়াটসঅ্যাপ পরিচালনা
তদন্তকারীদের দাবি, দম্পতির সংগ্রহ করে পাঠানো ভারতীয় সিম কার্ড পাকিস্তানে সক্রিয় করে সেগুলো দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ চালাত পাকিস্তানি গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের সদস্যরা। এরপর ভারতীয় নম্বর ব্যবহার করে বিভিন্ন ভারতীয় হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রবেশ করা হতো।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব গ্রুপে ঢুকে ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সেনাসদস্য এবং অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি ভারতীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করে গোপন তথ্য আদায়েরও চেষ্টা করা হয়েছিল বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।
পুলিশ আরও বলেছে, সাহিলকে দিল্লিতে নতুন লোক নিয়োগ এবং সামরিক ছাউনি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের কাজে যুক্ত করা হয়েছিল। আদালতে সামরিক সদস্যদের বিরুদ্ধে চলা বিচারসংক্রান্ত তথ্যও সংগ্রহের দায়িত্ব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
কীভাবে পুলিশের নজরে আসে চক্রটি
দিল্লি পুলিশের বিশেষ শাখা সন্ত্রাসী সংগঠন, তাদের সহযোগী এবং গোপনভাবে সক্রিয় নেটওয়ার্কের ওপর নজরদারি করে। এই শাখার কাছেই দিল্লি ও জাতীয় রাজধানী অঞ্চলে সক্রিয় পাকিস্তান-সমর্থিত একটি গুপ্তচরচক্রের বিষয়ে তথ্য আসে।
তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, চক্রটি দিল্লিতে কয়েকজনকে নিয়োগ করেছিল। তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা নেওয়া এবং ভারতীয় সিম কার্ড সংগ্রহ করা হতো।
তদন্তকারীরা দেখতে পান, এসব ভারতীয় নম্বর পাকিস্তান থেকে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারের কাজে লাগানো হচ্ছে। পরে সাহিলের পরিচয় শনাক্ত করে তাকে দক্ষিণ দিল্লির সরাই কালে খান এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সাহিলের মুঠোফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা চালিয়ে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সদস্যদের সঙ্গে তার কথোপকথনের বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে বলে পুলিশের দাবি। দম্পতির কাছ থেকে দুটি মুঠোফোনও জব্দ করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়, এরপর গুপ্তচরচক্রে যুক্ত হওয়ার অভিযোগ
তদন্তকারীদের দাবি, সাহিলের সঙ্গে এক পাকিস্তানি এজেন্টের পরিচয় হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে। এ যোগাযোগে সাহিলের বন্ধু সামিরাও যুক্ত ছিলেন, যিনি পরবর্তীতে তাঁর স্ত্রী হন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ধীরে ধীরে ওই পাকিস্তানি গোয়েন্দা তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি করেন এবং অর্থের বিনিময়ে নেটওয়ার্কে কাজ করার জন্য রাজি করান।
এরপর সাহিল ও সামিরাকে দিল্লিতে নেটওয়ার্কের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার পাশাপাশি নতুন ব্যক্তিদের গুপ্তচরবৃত্তি ও মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছে পুলিশ।

আটটি সিম কার্ডের বিনিময়ে ৩০ হাজার রুপি
পুলিশের দাবি, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দম্পতিকে আটটি ভারতীয় সিম কার্ড পাকিস্তানে পাঠানোর জন্য মোট ৩০ হাজার রুপি দেওয়া হয়েছিল। সিম কার্ডগুলো দুবাই হয়ে পাকিস্তানে পাঠানো হয় বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।
পাকিস্তানে পৌঁছানোর পর এসব নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপ হিসাব সক্রিয় করা হয়। পরে ওই হিসাব ব্যবহার করে কয়েকটি ভারতীয় হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রবেশ করা সম্ভব হয় বলে পুলিশের দাবি।
তদন্তকারীদের মতে, ভারতীয় নম্বর ব্যবহার করায় পাকিস্তান থেকে পরিচালিত এসব হিসাবকে সাধারণ ভারতীয় ব্যবহারকারীদের হিসাব বলে মনে হতে পারত। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ।
জিজ্ঞাসাবাদে নেটওয়ার্কের কাঠামো সম্পর্কে তথ্য
দিল্লি পুলিশের বিশেষ শাখার উপকমিশনার নারা চৈতন্য জানিয়েছেন, দম্পতিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পাকিস্তানভিত্তিক এই নেটওয়ার্কের কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তকারীদের দাবি, পাকিস্তানে থাকা মূল নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে দিল্লির মাঠপর্যায়ের সহযোগী এবং গোপনে সক্রিয় সদস্যদের যোগাযোগ কীভাবে সমন্বয় করা হতো, সে সম্পর্কেও তথ্য মিলেছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা নিরাপদ ও সংকেতভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। দম্পতির গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ওই নেটওয়ার্কের গুপ্তচরবৃত্তিমূলক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করেছে দিল্লি পুলিশ।
দম্পতির শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবন
তদন্তে জানা গেছে, সাহিল ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেছিলেন। পরে একজন আইনজীবীর সঙ্গে কাজ করতেন এবং আইন বিষয়ে আরও পড়াশোনার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। ২০২২ সালের জুনে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর থেকে তিনি বেকার ছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
অন্যদিকে সামিরা ডাকযোগে স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করেন এবং একটি কল সেন্টারে কাজ করতেন। পুলিশের অভিযোগ, পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগের সূত্র ধরে দুজনই পাকিস্তানভিত্তিক গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন।
পাকিস্তানভিত্তিক গুপ্তচরচক্র, ভারতীয় সিম কার্ড এবং হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে অনুপ্রবেশ—দিল্লি পুলিশের এই তদন্তে দুই দেশের মধ্যে চলমান সাইবার ও গোয়েন্দা তৎপরতার একটি নতুন দিক সামনে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















