১২:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
তারেক রহমানকে দিল্লিতে কেন চায় ভারত? মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যাওয়ার সুযোগ পেলে বাংলাদেশের কী লাভ কী ঝুঁকি? ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল নিয়ন্ত্রণ চুক্তির ঘোষণা ট্রাম্পের সন্তান জন্মের পর মায়ের মনেও ঝড়: কখন স্বাভাবিক, কখন বিপদের সংকেত? গ্রিনল্যান্ডে জোরপূর্বক জন্মনিয়ন্ত্রণে মানবাধিকার লঙ্ঘন, তবে গণহত্যা নয় ওজন কমানোর পর চেহারা ও শরীর ঠিকঠাক করতে পুরুষদের ঝোঁক প্রসাধনী চিকিৎসায় শাওমির নতুন ভাঁজযোগ্য ফোনে চীনের সিএক্সএমটির অত্যাধুনিক স্মৃতি চিপ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাজারে নতুন সংঘাত, কার্সারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করছে ওপেনএআই পশ্চিমা প্রভাবের পাল্টা শক্তি গড়তে কিরগিজস্তানে পুতিন-শি-মাসুদের সম্মেলন চেরকির অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সে মুগ্ধ মারেসকা, নতুন যুগের বার্তা ম্যানচেস্টার সিটির

ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলভাণ্ডারে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বড় নিয়ন্ত্রণ’, ট্রাম্পের নজর জ্বালানির দামে

যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে তেল নিয়ে একটি নজিরবিহীন সমঝোতার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্বের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত তেলভাণ্ডারের ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি অংশের ওপর যুক্তরাষ্ট্র সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছে। তবে চুক্তিটির কাঠামো, আইনি ভিত্তি এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতি এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

ভেনেজুয়েলা বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেলভাণ্ডারের অধিকারী। কিন্তু দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ঘাটতি, অব্যবস্থাপনা, দুর্বল অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির তেল উৎপাদন সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কমে গেছে। বর্তমানে দেশটি প্রতিদিন প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন করছে।

ভেনেজুয়েলার তেলে বাড়ছে মার্কিন প্রভাব

ট্রাম্পের ঘোষিত সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাবে। কয়েক সপ্তাহ ধরে দুই দেশের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা চলছিল। পরিকল্পনার আওতায় মার্কিন কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদে ভেনেজুয়েলার বেশ কয়েকটি তেলক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার পেতে পারে এবং উৎপাদিত অপরিশোধিত তেলের একটি নির্দিষ্ট সরবরাহ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নিশ্চিত হতে পারে।

ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তারা আগামী সপ্তাহে নতুন তেল অনুসন্ধান ও উৎপাদন অধিকার দেওয়ার জন্য কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এসব অধিকারের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে মার্কিন কোম্পানিগুলো।

Trump Live Updates: President Says U.S. to Take Control of Big Portion of Venezuelan  Oil - The New York Times

সম্ভাব্য ব্যবস্থার একটি হিসেবে তেলক্ষেত্র ইজারা দেওয়ার মডেল নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর আওতায় নির্দিষ্ট তেলক্ষেত্র মার্কিন উৎপাদকদের কাছে নিলামের মাধ্যমে দেওয়ার কথাও বিবেচনা করা হয়েছিল। তবে ভেনেজুয়েলার আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দেশটির তেলশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ফলে চুক্তিটি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের আশা

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই সমঝোতাকে দুই দেশের জন্যই লাভজনক বলে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলক কম দামে এবং স্থিতিশীলভাবে অপরিশোধিত তেল পেতে পারে, যা দেশটির জ্বালানি বাজারে চাপ কমাতে এবং ভবিষ্যতে পেট্রোলের দাম কমাতে সহায়তা করতে পারে।

অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার জন্য এই পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য সুবিধা হলো বিপুল নতুন বিনিয়োগ। রুবিওর দাবি, বেসরকারি খাতের মাধ্যমে দেশটিতে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আসতে পারে। এর ফলে হাজার হাজার উচ্চ বেতনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল হয়ে পড়া অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী নেতা ডেলসি রদ্রিগেজও চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, ১৭টি কৌশলগত তেলক্ষেত্রের উন্নয়নের মাধ্যমে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দেশটি কর ও অন্যান্য রাজস্ব হিসেবে প্রায় ২০৯ বিলিয়ন ডলার পেতে পারে।

রদ্রিগেজের ভাষায়, এই বিনিয়োগ শুধু তেলশিল্পের পুনরুদ্ধার ও আধুনিকায়নেই সহায়তা করবে না, বরং ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পুরো অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক তেলবাজারে ভারসাম্য তৈরিতেও ভূমিকা রাখবে।

চুক্তির আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন

তবে ট্রাম্পের ঘোষণার পরই চুক্তিটির বাস্তব কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোন কোন তেলক্ষেত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হবে, কোন কোম্পানিগুলো এতে যুক্ত থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

Trump says US enters deal with Venezuela to control of 65 billion barrels  of oil reserves

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরির জন্য চুক্তিটির আইনি ও আর্থিক কাঠামো পরিষ্কার হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভেনেজুয়েলার সংবিধান ও নতুন তেল-গ্যাস আইন অনুযায়ী মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো তেলক্ষেত্র ইজারা নেওয়ার আইনি ভিত্তি আছে কি না, সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়।

আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, এই সমঝোতা বাস্তবে কত দ্রুত ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়াতে পারবে।

অবকাঠামোর দুর্বলতা বড় বাধা

ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে শুধু তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ বা নতুন বিনিয়োগই যথেষ্ট নয়। দেশটির বিদ্যুৎব্যবস্থা দুর্বল, তেল পরিবহনের সক্ষমতা সীমিত এবং রপ্তানি অবকাঠামোও বহু বছর ধরে অবনতির মধ্যে রয়েছে।

এর পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল অত্যন্ত ভারী ধরনের। এটি উত্তোলন, পরিবহন ও পরিশোধনের জন্য বিশেষ অবকাঠামোর প্রয়োজন। এসব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে স্বল্পমেয়াদে জ্বালানির দাম কমানোর ক্ষেত্রে এই চুক্তির প্রভাব কতটা হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্বল বিদ্যুৎব্যবস্থা, সীমিত রপ্তানি সক্ষমতা এবং তেলশিল্পে সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা—এসব পুরোনো সমস্যা সমাধান না হলে বিপুল বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও কঠিন হতে পারে।

মাদুরো-পরবর্তী নতুন তেলনীতি

ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র জানুয়ারিতে আটক করার পর থেকেই ওয়াশিংটন দেশটির তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন নীতি গ্রহণের চেষ্টা করছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব পরিশোধনাগারগুলোর জন্য ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করতে চাইছে, অন্যদিকে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পে বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে।

US taking partial control of Venezuela oil: Trump

যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম নিয়ে ভোক্তাদের উদ্বেগও ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি করছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে পেট্রোলের দাম কমানোর মতো পদক্ষেপ রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভেনেজুয়েলা থেকে তুলনামূলক সস্তা অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বাড়াতে পারলে সেই চাপ কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত তেল মজুত পুনরায় পূরণ করার পথও খুঁজছে। দেশটির জাতীয় জরুরি তেলভাণ্ডারে নতুন করে অপরিশোধিত তেল যোগ করার জন্য বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে কাজ চলছে।

তেলশিল্পে রাষ্ট্রের দীর্ঘ নিয়ন্ত্রণ

ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নতুন কোনো বিষয় নয়। ১৯৭০-এর দশকে দেশটি তার তেলশিল্প জাতীয়করণ করে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিকে শিল্পটির কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

পরবর্তীতে হুগো চাভেজের শাসনামলে বিদেশি তেল কোম্পানিগুলোর ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা হয়। বিদেশি উৎপাদকদের রাষ্ট্রনেতৃত্বাধীন যৌথ উদ্যোগে যেতে বাধ্য করা হয় এবং কিছু ক্ষেত্রে তাদের সম্পদও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। এর মধ্যে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর পরিচালিত প্রকল্পও ছিল।

মাদুরোর শাসনামলে দেশটির তেল উৎপাদন আরও ব্যাপকভাবে কমে যায়। এখন ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন উদ্যোগ সেই দীর্ঘ অবনতির ধারা উল্টে দিয়ে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়াতে এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন অপরিশোধিত তেলের উৎস নিশ্চিত করতে চায়।

তবে ঘোষণার রাজনৈতিক গুরুত্ব যতই বড় হোক, এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে চুক্তিটির আইনি বৈধতা, বিনিয়োগের পরিমাণ, অবকাঠামো উন্নয়নের গতি এবং ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হয় তার ওপর।

 

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

তারেক রহমানকে দিল্লিতে কেন চায় ভারত?

ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলভাণ্ডারে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বড় নিয়ন্ত্রণ’, ট্রাম্পের নজর জ্বালানির দামে

১০:৫৩:১০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে তেল নিয়ে একটি নজিরবিহীন সমঝোতার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্বের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত তেলভাণ্ডারের ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি অংশের ওপর যুক্তরাষ্ট্র সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছে। তবে চুক্তিটির কাঠামো, আইনি ভিত্তি এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতি এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

ভেনেজুয়েলা বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেলভাণ্ডারের অধিকারী। কিন্তু দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ঘাটতি, অব্যবস্থাপনা, দুর্বল অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির তেল উৎপাদন সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কমে গেছে। বর্তমানে দেশটি প্রতিদিন প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন করছে।

ভেনেজুয়েলার তেলে বাড়ছে মার্কিন প্রভাব

ট্রাম্পের ঘোষিত সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাবে। কয়েক সপ্তাহ ধরে দুই দেশের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা চলছিল। পরিকল্পনার আওতায় মার্কিন কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদে ভেনেজুয়েলার বেশ কয়েকটি তেলক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার পেতে পারে এবং উৎপাদিত অপরিশোধিত তেলের একটি নির্দিষ্ট সরবরাহ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নিশ্চিত হতে পারে।

ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তারা আগামী সপ্তাহে নতুন তেল অনুসন্ধান ও উৎপাদন অধিকার দেওয়ার জন্য কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এসব অধিকারের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে মার্কিন কোম্পানিগুলো।

Trump Live Updates: President Says U.S. to Take Control of Big Portion of Venezuelan  Oil - The New York Times

সম্ভাব্য ব্যবস্থার একটি হিসেবে তেলক্ষেত্র ইজারা দেওয়ার মডেল নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর আওতায় নির্দিষ্ট তেলক্ষেত্র মার্কিন উৎপাদকদের কাছে নিলামের মাধ্যমে দেওয়ার কথাও বিবেচনা করা হয়েছিল। তবে ভেনেজুয়েলার আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দেশটির তেলশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ফলে চুক্তিটি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের আশা

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই সমঝোতাকে দুই দেশের জন্যই লাভজনক বলে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলক কম দামে এবং স্থিতিশীলভাবে অপরিশোধিত তেল পেতে পারে, যা দেশটির জ্বালানি বাজারে চাপ কমাতে এবং ভবিষ্যতে পেট্রোলের দাম কমাতে সহায়তা করতে পারে।

অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার জন্য এই পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য সুবিধা হলো বিপুল নতুন বিনিয়োগ। রুবিওর দাবি, বেসরকারি খাতের মাধ্যমে দেশটিতে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আসতে পারে। এর ফলে হাজার হাজার উচ্চ বেতনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল হয়ে পড়া অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী নেতা ডেলসি রদ্রিগেজও চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, ১৭টি কৌশলগত তেলক্ষেত্রের উন্নয়নের মাধ্যমে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দেশটি কর ও অন্যান্য রাজস্ব হিসেবে প্রায় ২০৯ বিলিয়ন ডলার পেতে পারে।

রদ্রিগেজের ভাষায়, এই বিনিয়োগ শুধু তেলশিল্পের পুনরুদ্ধার ও আধুনিকায়নেই সহায়তা করবে না, বরং ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পুরো অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক তেলবাজারে ভারসাম্য তৈরিতেও ভূমিকা রাখবে।

চুক্তির আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন

তবে ট্রাম্পের ঘোষণার পরই চুক্তিটির বাস্তব কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোন কোন তেলক্ষেত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হবে, কোন কোম্পানিগুলো এতে যুক্ত থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

Trump says US enters deal with Venezuela to control of 65 billion barrels  of oil reserves

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরির জন্য চুক্তিটির আইনি ও আর্থিক কাঠামো পরিষ্কার হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভেনেজুয়েলার সংবিধান ও নতুন তেল-গ্যাস আইন অনুযায়ী মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো তেলক্ষেত্র ইজারা নেওয়ার আইনি ভিত্তি আছে কি না, সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়।

আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, এই সমঝোতা বাস্তবে কত দ্রুত ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়াতে পারবে।

অবকাঠামোর দুর্বলতা বড় বাধা

ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে শুধু তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ বা নতুন বিনিয়োগই যথেষ্ট নয়। দেশটির বিদ্যুৎব্যবস্থা দুর্বল, তেল পরিবহনের সক্ষমতা সীমিত এবং রপ্তানি অবকাঠামোও বহু বছর ধরে অবনতির মধ্যে রয়েছে।

এর পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল অত্যন্ত ভারী ধরনের। এটি উত্তোলন, পরিবহন ও পরিশোধনের জন্য বিশেষ অবকাঠামোর প্রয়োজন। এসব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে স্বল্পমেয়াদে জ্বালানির দাম কমানোর ক্ষেত্রে এই চুক্তির প্রভাব কতটা হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্বল বিদ্যুৎব্যবস্থা, সীমিত রপ্তানি সক্ষমতা এবং তেলশিল্পে সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা—এসব পুরোনো সমস্যা সমাধান না হলে বিপুল বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও কঠিন হতে পারে।

মাদুরো-পরবর্তী নতুন তেলনীতি

ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র জানুয়ারিতে আটক করার পর থেকেই ওয়াশিংটন দেশটির তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন নীতি গ্রহণের চেষ্টা করছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব পরিশোধনাগারগুলোর জন্য ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করতে চাইছে, অন্যদিকে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পে বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে।

US taking partial control of Venezuela oil: Trump

যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম নিয়ে ভোক্তাদের উদ্বেগও ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি করছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে পেট্রোলের দাম কমানোর মতো পদক্ষেপ রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভেনেজুয়েলা থেকে তুলনামূলক সস্তা অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বাড়াতে পারলে সেই চাপ কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত তেল মজুত পুনরায় পূরণ করার পথও খুঁজছে। দেশটির জাতীয় জরুরি তেলভাণ্ডারে নতুন করে অপরিশোধিত তেল যোগ করার জন্য বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে কাজ চলছে।

তেলশিল্পে রাষ্ট্রের দীর্ঘ নিয়ন্ত্রণ

ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নতুন কোনো বিষয় নয়। ১৯৭০-এর দশকে দেশটি তার তেলশিল্প জাতীয়করণ করে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিকে শিল্পটির কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

পরবর্তীতে হুগো চাভেজের শাসনামলে বিদেশি তেল কোম্পানিগুলোর ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা হয়। বিদেশি উৎপাদকদের রাষ্ট্রনেতৃত্বাধীন যৌথ উদ্যোগে যেতে বাধ্য করা হয় এবং কিছু ক্ষেত্রে তাদের সম্পদও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। এর মধ্যে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর পরিচালিত প্রকল্পও ছিল।

মাদুরোর শাসনামলে দেশটির তেল উৎপাদন আরও ব্যাপকভাবে কমে যায়। এখন ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন উদ্যোগ সেই দীর্ঘ অবনতির ধারা উল্টে দিয়ে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়াতে এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন অপরিশোধিত তেলের উৎস নিশ্চিত করতে চায়।

তবে ঘোষণার রাজনৈতিক গুরুত্ব যতই বড় হোক, এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে চুক্তিটির আইনি বৈধতা, বিনিয়োগের পরিমাণ, অবকাঠামো উন্নয়নের গতি এবং ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হয় তার ওপর।