যুক্তরাষ্ট্রে অবসরকালীন সরকারি সুবিধা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রশ্নটি কেবল সামাজিক নিরাপত্তা বা প্রবীণদের সুরক্ষার নয়; বরং রাষ্ট্রের অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কারা তার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী এবং এই ব্যয়ের ন্যায্যতা কতটা—সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ফেডারেল বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশ গ্রাস করছে, অথচ এক দশকও পেরোবে না—এর অর্থায়ন কাঠামো বড় সংকটে পড়তে পারে। একই সঙ্গে অবসর সঞ্চয়ের জন্য কর-ছাড়ের কারণে সরকার প্রতি বছর বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে।
কিন্তু এই বিপুল অর্থের বড় অংশ কি সত্যিই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন থাকা প্রবীণদের কাছে যাচ্ছে? চিত্রটি বরং উল্টো। ধনী পরিবারগুলোই সরকারি অবসর সুবিধা ও কর-সুবিধা থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি লাভবান হচ্ছে।
উচ্চ আয়ের মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় সুবিধা কতটা যুক্তিসঙ্গত
পরিসংখ্যানটি বৈষম্যের মাত্রা স্পষ্ট করে। সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবার সামাজিক নিরাপত্তা ও অবসর সঞ্চয়-সংক্রান্ত কর-সুবিধায় ব্যয় হওয়া করদাতাদের অর্থের প্রায় ৩৮ শতাংশ পায়। বিপরীতে, নিচের ৬০ শতাংশ পরিবার মিলে পায় তার চেয়েও কম।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উদ্দেশ্য মূলত প্রবীণ বয়সে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে বেশি আয় করা মানুষের জন্য এর সুবিধার পরিমাণও বেশি। ১৯৬০-এর দশকে জন্ম নেওয়া আমেরিকানদের মধ্যে সর্বোচ্চ আয়ের এক-পঞ্চমাংশ অবসরকালে বছরে গড়ে ৩৩ হাজার ডলার সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা করতে পারে। সর্বনিম্ন আয়ের এক-পঞ্চমাংশের ক্ষেত্রে এই অঙ্ক প্রায় ১৩ হাজার ডলার।
শুধু বার্ষিক সুবিধার পার্থক্যই নয়, ধনীরা দীর্ঘদিন সেই সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনাও রাখেন। ৬২ বছর বয়সী একজন সচ্ছল আমেরিকান গড়ে প্রায় ৮৮ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারেন, যেখানে একই বয়সে সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৮০ বছর। অর্থাৎ উচ্চ আয়ের মানুষ বেশি সুবিধা পান এবং দীর্ঘ সময় তা ভোগও করেন।
ফলে মোট সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার প্রায় ৩৩ শতাংশ চলে যায় সর্বোচ্চ আয়ের ২০ শতাংশ মানুষের কাছে। সবচেয়ে কম আয়ের এক-পঞ্চমাংশের ভাগ মাত্র ৮ শতাংশ।
অবসর সঞ্চয়ের কর-ছাড়েও একই চিত্র
বৈষম্য শুধু সামাজিক নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অবসরকালীন সঞ্চয়ের ওপর দেওয়া কর-সুবিধার কাঠামোও তুলনামূলকভাবে ধনীদের পক্ষেই কাজ করে।
অবসর সঞ্চয় পরিকল্পনায় রাখা অর্থের ওপর লভ্যাংশ ও মূলধনী মুনাফার কর অনেকাংশে এড়িয়ে যাওয়া যায়। এই কর-ছাড়ের কারণে সরকারের প্রতি বছর প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব হারানোর হিসাব রয়েছে। অথচ এর ৫৮ শতাংশ সুবিধা পায় সর্বোচ্চ আয়ের এক-পঞ্চমাংশ পরিবার। নিচের তিনটি আয়গোষ্ঠী মিলেও পায় মাত্র ১৭ শতাংশ।
এর পেছনে একটি সরল কারণ আছে—উচ্চ আয়ের পরিবার স্বাভাবিকভাবেই অবসরকালীন সঞ্চয়ে বেশি অর্থ রাখতে পারে। কিন্তু সমস্যাটি আরও গভীর। যেসব দম্পতির আয় ৯৮ হাজার ৯০০ ডলারের নিচে, তারা ইতোমধ্যেই লভ্যাংশ ও মূলধনী মুনাফার ওপর কোনো কর না-ও দিতে পারেন। ফলে অবসর সঞ্চয়ের জন্য বিশেষ কর-ছাড় তাদের এমন কর থেকে অব্যাহতি দেয়, যা তারা স্বাভাবিকভাবেই দিতেন না। বাস্তব সুবিধাটি তাই বেশি যায় উচ্চ আয়ের মানুষের কাছেই।
সরকারি সুবিধা কি সত্যিই সঞ্চয় বাড়ায়?
অবসরকালীন সরকারি সুবিধা দেওয়ার অন্যতম যুক্তি হলো মানুষকে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ে উৎসাহিত করা এবং বার্ধক্যে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু এখানেই নীতিটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
গবেষণাগুলো দেখিয়েছে, বিশেষ করে ধনী পরিবারগুলো সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা বাড়লে নিজেদের অবসর সঞ্চয় কমিয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ সরকার বেশি দেবে জেনে তারা ব্যক্তিগতভাবে কম সঞ্চয় করে। সরকারি সহায়তা না থাকলে এই পরিবারগুলোর অনেকেই নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বেশি অর্থ জমাত।

একইভাবে কর-ছাড়ও সবসময় নতুন সঞ্চয় তৈরি করে না। উচ্চ আয়ের মানুষ অনেক ক্ষেত্রে নতুন করে সঞ্চয় না করে তাদের আগে থেকেই থাকা অর্থকে সাধারণ করযোগ্য হিসাব থেকে কর-সুবিধাপ্রাপ্ত অবসর হিসাবের দিকে সরিয়ে নেন। ফলে রাষ্ট্র বিপুল রাজস্ব ছাড়লেও অর্থনীতিতে অতিরিক্ত সঞ্চয়ের পরিমাণ প্রত্যাশিত হারে বাড়ে না।
মধ্যবিত্তের সীমায় সুবিধা আটকে দেওয়ার প্রস্তাব
এই পরিস্থিতিতে একটি কঠিন কিন্তু বাস্তবসম্মত সংস্কার হতে পারে—অবসরকালীন সরকারি সুবিধার সর্বোচ্চ সীমা মধ্যম আয়ের মানুষের পর্যায়ে নির্ধারণ করা।
সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মাথাপিছু বছরে ২৪ হাজার ডলারের একটি সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে। এই অঙ্কটি মধ্যম আয়ের এক-পঞ্চমাংশ মানুষের গড় সুবিধার সমান। এমন পদক্ষেপ সামাজিক নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ঘাটতির প্রায় ৬০ শতাংশ পূরণ করতে পারে বলে হিসাব করা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এতে নিম্ন আয়ের মানুষের সুবিধা কমানোর প্রয়োজন হবে না। এমনকি অবসরপ্রাপ্ত একটি দম্পতি ফেডারেল দারিদ্র্যসীমার প্রায় আড়াই গুণ সমপরিমাণ সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পেতে পারে।
এ ধরনের সংস্কারের আরেকটি সম্ভাব্য প্রভাব হলো উচ্চ আয়ের মানুষের কর্মপ্রবণতা ও ব্যক্তিগত সঞ্চয় বাড়া। সরকারি সুবিধা কমে গেলে অবসরকালীন জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে তাদের আরও বেশি কাজ করতে এবং নিজেদের অর্থে বেশি সঞ্চয় করতে উৎসাহিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কর-সুবিধার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োগ করা সম্ভব। মধ্যবিত্ত পর্যায়ে অবসর সঞ্চয়ের কর-ছাড় সীমাবদ্ধ করা গেলে এসব ছাড়ের সরকারি ব্যয় প্রায় ৬২ শতাংশ কমতে পারে এবং বার্ষিক বাজেট ঘাটতি প্রায় ১৪ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে।

তবে এর একটি সম্ভাব্য ঝুঁকি রয়েছে। কর-সুবিধা কমিয়ে দিলে নিয়োগকর্তারা অবসর পরিকল্পনা দেওয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহ হারাতে পারেন। সে ক্ষেত্রে কর্মীদের জন্য স্বয়ংক্রিয় সরকারি অবসর সঞ্চয় পরিকল্পনা চালু করা যেতে পারে, বিশেষ করে যেসব কর্মী নিয়োগকর্তার মাধ্যমে কোনো পরিকল্পনার আওতায় নেই। যুক্তরাজ্যে এ ধরনের নীতির ফলে ২০১২ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বেসরকারি খাতে অবসর পরিকল্পনায় অংশগ্রহণের হার ৩৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৪ শতাংশে উঠেছিল।
ধনীদের বেশি কর দেওয়া কি তাদের বেশি সুবিধার যুক্তি হতে পারে?
অবশ্যই একটি পাল্টা যুক্তি রয়েছে। উচ্চ আয়ের মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য সরকারি কর্মসূচির অর্থায়নে অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি বেতনভিত্তিক ও আয়কর দেন। তাই তারা বেশি সুবিধা পেলে সেটিকে পুরোপুরি অন্যায্য বলা সহজ নয়।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সামনে যখন সামাজিক নিরাপত্তা ও সামগ্রিক ফেডারেল বাজেট—দুই ক্ষেত্রেই ট্রিলিয়ন ডলারের ঘাটতির চাপ, তখন প্রশ্নটি নতুনভাবে দেখা জরুরি। রাষ্ট্র কি এমন অবসরকালীন আয়কে করদাতার অর্থ দিয়ে আরও বাড়াবে, যা একজন সচ্ছল প্রবীণ ব্যক্তি নিজের সামর্থ্যেই নিশ্চিত করতে পারেন?
সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বার্ধক্যে দারিদ্র্য ঠেকানো এবং মানুষকে নিজের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ে উৎসাহিত করা। এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা উচিত নয়, যেখানে সরকারি অর্থ ব্যবহার করে ধনী মানুষের এমন জীবনযাত্রার অবসরকালীন ব্যয় বহন করা হবে, যা তারা নিজেরাই বহন করতে সক্ষম।
রাষ্ট্রের সম্পদ সীমাহীন নয়। তাই অবসরকালীন সুবিধার ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে শুধু কে কত কর দিয়েছেন তা নয়, কে সরকারি সহায়তা ছাড়া চলতে পারেন—সেই প্রশ্নটিও সমান গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। সরকারি অবসর কর্মসূচির ন্যায্যতার চূড়ান্ত পরীক্ষা হওয়া উচিত: এটি কি প্রয়োজনের সময় মানুষকে সুরক্ষা দিচ্ছে, নাকি সামর্থ্যবানদের অবসরজীবনকে আরও সমৃদ্ধ করতে জনসাধারণের অর্থ ব্যবহার করছে?



















