গুগল আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে সরাসরি এক মিডিয়া ইভেন্টে Googlebook-এর সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করবে। চলতি শরতেই Acer, Asus, Dell, HP ও Lenovo-এর তৈরি প্রথম Googlebook বাজারে আসার কথা। গুগল এটিকে প্রিমিয়াম ল্যাপটপ শ্রেণি হিসেবে তুলে ধরলেও এখনো দাম জানায়নি। খুচরা বিক্রেতাদের ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি মডেলের দাম ১ হাজার ডলারের বেশি হতে পারে।
Googlebook-এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হতে পারে কম্পিউটার ব্যবহারের ধরন বদলে দেওয়া। প্রচলিত পিসিতে ব্যবহারকারীকে আগে ঠিক করতে হয় কোন অ্যাপ খুলবেন, কোথায় ফাইল আছে এবং কাজটি কীভাবে ধাপে ধাপে সম্পন্ন করবেন। এজেন্টিক পিসির ধারণায় সেই দায়িত্বের একটি বড় অংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে চলে যায়। ব্যবহারকারী শুধু কী করতে চান এবং প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট জানাবেন; এরপর AI প্রয়োজনীয় তথ্য, অ্যাপ ও কার্যক্রম বেছে নিয়ে কাজ এগিয়ে নেবে।
গুগলের পুরোনো চ্যালেঞ্জ, নতুন পরীক্ষা

Googlebook মূলত ChromeOS-এর পরবর্তী প্রজন্ম, যা Android ভিত্তির ওপর তৈরি হচ্ছে এবং বিদ্যমান Android অ্যাপ চালাতে পারবে। Intel, Qualcomm ও MediaTek-এর প্রসেসরও এতে ব্যবহৃত হবে। তবে ল্যাপটপে Android অ্যাপ আনার চেষ্টা গুগলের জন্য নতুন নয়। প্রায় এক দশক আগে Chromebook-এ Android অ্যাপ চালু হলেও Windows ও Mac-এর সফটওয়্যার পরিবেশের সঙ্গে সেই অভিজ্ঞতা পাল্লা দিতে পারেনি।
এবার গুগল Android 17-এর মাধ্যমে বড় স্ক্রিনে অ্যাপের অভিজ্ঞতা বদলাতে চাইছে। ৬০০dp-এর বেশি বড় পর্দায় Android 17-এর জন্য তৈরি অ্যাপগুলোতে ডেভেলপাররা আর রিসাইজ বা স্ক্রিন-অরিয়েন্টেশনের সীমাবদ্ধতা ধরে রাখতে পারবেন না। গুগল এটিকে adaptive-first development হিসেবে তুলে ধরছে। লক্ষ্য হলো, ফোনের অ্যাপকে শুধু বড় না করে ল্যাপটপের জন্য কার্যকরভাবে পুনর্গঠন করা—যেখানে থাকবে একাধিক প্যানেল, কিবোর্ড শর্টকাট, মাউস, ড্র্যাগ-অ্যান্ড-ড্রপ এবং মাল্টি-উইন্ডো ব্যবহারের সুবিধা।
তবে এখানেও একটি সময়ের ব্যবধান রয়েছে। Googlebook-এর প্রথম ডিভাইসগুলো শরতে আসবে, কিন্তু Apps Experience Program-এর অংশগ্রহণকারী অ্যাপগুলোকে অভিযোজিত লেআউট সমর্থন করতে হবে ২০২৭ সালের ১ মার্চের মধ্যে। ফলে লঞ্চের সময় পর্যাপ্ত ল্যাপটপ-কেন্দ্রিক অ্যাপ পাওয়া যাবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
অ্যাপের সংখ্যা নয়, কাজের সক্ষমতাই বড় পরীক্ষা
Googlebook-এর জন্য Windows বা macOS-এর সঙ্গে প্রতিটি অ্যাপের সমতা অর্জন করা জরুরি নাও হতে পারে। বরং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে workflow parity—অর্থাৎ কম অ্যাপ ব্যবহার করেও একই কাজ সম্পন্ন করা।
ধরা যাক, দুপুর ২টার একটি ক্লায়েন্ট মিটিংয়ের প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রচলিত পদ্ধতিতে Calendar, Gmail, Drive, নোট ও অন্যান্য উৎস আলাদা করে খুলে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। ভবিষ্যতের Googlebook-এ ব্যবহারকারী শুধু বলতে পারেন, “আমার ২টার Acme মিটিংয়ের জন্য প্রস্তুত করো।” Gemini তখন সংশ্লিষ্ট ক্যালেন্ডার, ই-মেইল, ফাইল ও প্রকাশ্য তথ্য একত্র করে প্রয়োজনীয় ব্রিফিং তৈরি করতে পারে। গুগল এখনো এমন পূর্ণাঙ্গ ওয়ার্কফ্লো প্রদর্শন করেনি, কিন্তু এই সক্ষমতাই Googlebook-এর সাফল্যের অন্যতম মাপকাঠি হতে পারে।

এর সঙ্গে গোপনীয়তার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। ক্যালেন্ডার, মেইল ও ফাইল বিশ্লেষণ করতে হলে ব্যবহারকারীর অনুমতি প্রয়োজন হবে। কোন তথ্য ডিভাইসেই থাকবে, কোনটি গুগলের সার্ভারে যাবে এবং AI ভুল করলে সেটি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যাও প্রয়োজন।
মাইক্রোসফট ও অ্যাপলের সামনে নতুন প্রতিযোগিতা
Googlebook-এর পথে Windows-এর বিশাল অ্যাপ ও কম্প্যাটিবিলিটি ইকোসিস্টেম বড় বাধা। Microsoft ও Nvidia একই সময়ে Windows-এর জন্য স্থানীয় AI-ভিত্তিক agentic computing এগিয়ে নিচ্ছে, কিন্তু তারা বিদ্যমান অ্যাপ কাঠামো ধরে রেখেই পরিবর্তন আনছে। অন্যদিকে Google-এর ডেস্কটপ উত্তরাধিকার তুলনামূলক কম। তাই ব্যর্থ হলে ভরসা করার মতো বিশাল ডেস্কটপ সফটওয়্যারভান্ডার নেই, কিন্তু সফল হলে কম্পিউটারের সঙ্গে AI-এর সম্পর্ক নতুনভাবে সাজানোর সুযোগ বেশি।
Apple-এর ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার শক্তি আসে Mac-এর পরিণত অ্যাপ ইকোসিস্টেম এবং iPhone, iPad ও Apple Watch-এর সঙ্গে Continuity সমন্বয় থেকে। Googlebook-ও Android ফোনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংযোগ তৈরি করছে; ২৪ আগস্টের Play Services আপডেটে Googlebook থেকে ফোনের অ্যাপ ব্যবহারের সুবিধার কথাও জানানো হয়েছে।
সেপ্টেম্বরের ইভেন্টে তাই Googlebook-এর সাফল্য বিচার হবে শুধু AI ফিচার দিয়ে নয়। কোন অ্যাপগুলো সত্যিকারের ল্যাপটপ অভিজ্ঞতা দিচ্ছে, Gemini-এর কতটা স্থানীয়ভাবে কাজ করে, একাধিক অ্যাপের জটিল কাজ কত কম ধাপে করা যায়, ব্যবহারকারীর তথ্য কীভাবে সুরক্ষিত থাকে এবং প্রিমিয়াম দামের বিপরীতে পুরো অভিজ্ঞতা কতটা পরিপূর্ণ—এসব প্রশ্নের উত্তরই গুগলের নতুন প্ল্যাটফর্মের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।
গুগলবুক, এজেন্টিক পিসি, Gemini, Android 17 ও AI ল্যাপটপ
Googlebook-কে ঘিরে গুগলের নতুন পরিকল্পনা প্রচলিত অ্যাপ-কেন্দ্রিক কম্পিউটিং থেকে AI-নির্ভর কাজের দিকে যাওয়ার একটি বড় পরীক্ষা। সফল হলে ব্যবহারকারীকে অ্যাপ খোঁজার বদলে কাজের উদ্দেশ্য জানানোই হয়ে উঠতে পারে কম্পিউটার ব্যবহারের নতুন পদ্ধতি।
গুগলবুকের লক্ষ্য অ্যাপের সমতা নয়, কম ধাপে কাজের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















