ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ ছয় মাসে গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে। এর ফলে চীনের মধ্যপ্রাচ্য নীতিও এখন গুরুত্বপূর্ণ এক মোড়ের মুখে পড়েছে।
নিরাপত্তায় আত্মনির্ভরতার পথে উপসাগরীয় দেশগুলো
দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা স্পষ্ট করেছে—ইরানের হামলা থেকে তাদের পুরোপুরি রক্ষা করার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের কারও নেই। ফলে সৌদি আরব, কুয়েতসহ উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি নতুন নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব দেশের মধ্যে এখন নিজস্ব প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রবণতা বাড়ছে। ভবিষ্যতে তারা একক কোনো পরাশক্তির নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভর না করে একাধিক দেশের সঙ্গে সামরিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে পারে।
ইরানের নতুন যুদ্ধের হুঁশিয়ারি
এই পরিস্থিতির মধ্যে ইরানের সেনাবাহিনী বুধবার সতর্ক করে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো যুদ্ধ শুরু হলে তা শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। সংঘাত পুরো অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি জ্বালানি ও যোগাযোগ অবকাঠামোও হামলার লক্ষ্য হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
এই হুঁশিয়ারি উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। কারণ, আঞ্চলিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেল ও গ্যাস স্থাপনা, বন্দর, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর হামলার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
পাকিস্তানের দিকে কুয়েতের নতুন পদক্ষেপ
নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতায় উপসাগরীয় দেশগুলো এরই মধ্যে বিকল্প প্রতিরক্ষা সহযোগিতার দিকে এগোচ্ছে। বৃহস্পতিবার কুয়েত পাকিস্তানের সঙ্গে একটি সামরিক সহযোগিতা চুক্তি করেছে।
চুক্তির আওতায় পাকিস্তান কুয়েতের সামরিক প্রশিক্ষণে সহায়তা করবে এবং দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে সহযোগিতা করবে। এই পদক্ষেপকে উপসাগরীয় দেশগুলোর বহুমুখী নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব তৈরির বৃহত্তর প্রবণতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীনের জন্য কঠিন সমীকরণ
মধ্যপ্রাচ্যে চীন দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ালেও সরাসরি সামরিক নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়া থেকে সতর্ক থেকেছে। বেইজিংয়ের এই নীতি অনেকটা ‘সম্পৃক্ততা থাকবে, কিন্তু সরাসরি দায় নেবে না’—এমন অবস্থানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু উপসাগরীয় দেশগুলো যদি নিজেদের প্রতিরক্ষা জোট ও নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী করতে শুরু করে, তাহলে চীনের এই কৌশল নতুন পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।
কারণ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক প্রভাব ধরে রাখার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে চীন কতটা সক্রিয় হবে—এই প্রশ্ন এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধ তাই শুধু ইরান ও তার প্রতিপক্ষদের জন্য নয়, চীনের মধ্যপ্রাচ্য কৌশলের জন্যও একটি বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
চীনের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো, মধ্যপ্রাচ্যে নিজের প্রভাব ধরে রেখেও সরাসরি সামরিক দায়বদ্ধতায় না জড়িয়ে কীভাবে পরিবর্তিত নিরাপত্তা বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা যায়।
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা কৌশল বদলাচ্ছে, আর সেই পরিবর্তন চীনের মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে নতুন সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















