যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ ছয় মাসে গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের ময়দানের বাইরেও গভীর চাপ তৈরি হয়েছে। মার্কিন সেনাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রিয়জনের দীর্ঘ বিচ্ছেদ, বাড়তি দায়িত্ব, আয় কমে যাওয়া এবং প্রতিনিয়ত উদ্বেগ—সব মিলিয়ে জীবন হয়ে উঠেছে তীব্র মানসিক চাপের।
প্রতিদিনই নতুন দুশ্চিন্তা
কোর্টনি স্যান্ডার্স গত ছয় মাস ধরে সেনাসদস্যদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে নানা সমস্যায় সহযোগিতা করছেন। সন্তানদের স্কুল থেকে আনা-নেওয়া, পরিবারের আয় কমে যাওয়ার ঘাটতি পূরণ এবং স্বামী-সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ—সবকিছুই সামলাতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।
স্যান্ডার্স বলেন, পরিস্থিতি এমন যে সারাক্ষণ উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকতে হয়। এক মুহূর্ত মনে হয় পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে, পরক্ষণেই নতুন কোনো দুশ্চিন্তা এসে সেই স্বস্তি কেড়ে নেয়।
তিনি সামরিক পরিবারগুলোর সহায়তায় কাজ করা একটি বড় অলাভজনক সংগঠনের শিকাগো অঞ্চলের নেতৃত্ব দেন। তাঁর নিজের দুই মেয়েও নৌবাহিনীতে কর্মরত এবং গত ছয় মাসে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন বিদেশি এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন।
যুদ্ধের প্রভাব পরিবারেও
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন রয়েছে। যুদ্ধের সহায়তায় আরও কয়েক হাজার নৌসেনা ও মেরিন সেনাকে সেখানে পাঠানো হয়েছে। সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৭৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
যুদ্ধ কখনো তীব্র হয়েছে, কখনো সাময়িকভাবে থেমেছে। এর পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতা ও ব্যর্থ শান্তি আলোচনাও চলেছে। এই অনিশ্চিত পরিস্থিতি সেনাদের পরিবারের মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
মার্চের শুরুতে প্রায় ২০০টি সক্রিয় দায়িত্বে থাকা সেনা পরিবারের ওপর চালানো এক জরিপে ৮১ শতাংশ পরিবার জানিয়েছিল, ইরান যুদ্ধের কারণে তাদের মানসিক চাপ বেড়েছে।
বাড়ানো হচ্ছে পারিবারিক সহায়তা
পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনা পরিবারগুলোর সহায়তাকারী সংগঠনগুলো তাদের কার্যক্রম বাড়িয়েছে। অনলাইনে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তার ব্যবস্থা, বিভিন্ন আলোচনা সভা, সরাসরি সাক্ষাৎ এবং অভিজ্ঞ সামরিক পরিবারের সঙ্গে প্রথমবারের মতো দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্বে থাকা পরিবারের সদস্যদের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনেক সেনার দায়িত্বের মেয়াদও হঠাৎ করে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আব্রাহাম লিংকন নামের একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ২০০ দিনেরও বেশি সময় কোনো বন্দরে থামেনি। মার্কিন আইনপ্রণেতাদের একাংশ এটিকে আধুনিক সময়ের রেকর্ড বলে উল্লেখ করেছেন।
এদিকে ওই জাহাজে থাকা প্রায় পাঁচ হাজার নাবিক ও মেরিন সেনার মধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টা এবং মনোবল কমে যাওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এসব প্রতিবেদনের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, জাহাজের পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্য বাস্তব অবস্থাকে পুরোপুরি ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে।
আয় হারিয়ে বিপাকে পরিবার
যুদ্ধের মানসিক চাপের পাশাপাশি অনেক পরিবার আর্থিক সংকটেও পড়েছে। বিশেষ করে ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরা দায়িত্বে না থাকলে সাধারণ চাকরি করেন। হঠাৎ করে তাদের মোতায়েন করা হলে পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
স্যান্ডার্সের ভাষায়, সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ভুল ধারণা রয়েছে—সেনাবাহিনীতে কাজ করলে নাকি পরিবারের সব খরচ সরকার বহন করে। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, সেনা পরিবারগুলোর উদ্বেগ তারা দেখছে এবং শুনছে। কঠিন সময়ে পরিবারগুলোর প্রয়োজনীয় সহায়তা, সম্পদ ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সবকিছু করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে তারা।
সন্তানদের সামনেও লুকাতে হয় কষ্ট
উত্তর ক্যারোলিনার সেনা পরিবারের সদস্য শ্যানন তিন সন্তানের মা। নিরাপত্তার কারণে তাঁর শুধু প্রথম নাম প্রকাশ করা হয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে মাত্র পাঁচ দিনের নোটিশে তাঁর স্বামীকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়। দায়িত্ব পালনের প্রথম কয়েক মাসে স্বামীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগও ছিল খুবই সীমিত।
জুন থেকে প্রায় প্রতিদিন কথা বলতে পারলেও স্বামীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষ মারা যাওয়ার খবর যখন নিয়মিত আসছে, তখন আবেগ সামলে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
গ্রীষ্মে তাঁর সন্তানদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মানসিক সহায়তা নিতে হয়েছে। সন্তানদের সামনে শক্ত থাকার চেষ্টা করলেও তারা পাশে না থাকলে কখনো কখনো কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
স্বামী মোতায়েন হওয়ার পরপরই তিনি তাঁর ইউনিটের একটি পারিবারিক সহায়তা দলের সঙ্গে যুক্ত হন। সেখানে প্রয়োজনীয় পরিবারগুলোর জন্য খাবার সরবরাহসহ বিভিন্ন সহযোগিতার ব্যবস্থা করতে তিনি অংশ নেন।
তাঁর উপলব্ধি, প্রতিটি দিন ভালো যাবে না। তবু নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হবে এবং সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় স্বস্তি
ভার্জিনিয়ায় নৌবাহিনীর এক সেনার স্ত্রী প্যাটও একই ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। নিরাপত্তার কারণে তাঁরও শুধু প্রথম নাম প্রকাশ করা হয়েছে।
স্বামী প্রায় পাঁচ মাস আগে মোতায়েন হওয়ার পর থেকে তিনি সন্তানদের জীবন যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছেন। সন্তানরা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করছে।
স্বামীর অনুপস্থিতিতে সন্তানদের স্কুল থেকে আনা-নেওয়া এবং দৈনন্দিন নানা কাজে প্রতিবেশীরা অসাধারণ সহযোগিতা করছেন বলে জানান প্যাট।
মোতায়েন থাকা সেনাদের প্রতি সমর্থন জানাতে তাঁর পরিবার প্রতি শুক্রবার লাল পোশাক পরে। তাঁর সন্তানদের অনেক সহপাঠীও একইভাবে লাল পোশাক পরে, এমনকি তাদের পরিবারের সঙ্গে সেনাবাহিনীর কোনো সম্পর্ক না থাকলেও।
এর আগে স্বামী একাধিকবার দায়িত্বে মোতায়েন হয়েছেন। এবার তাঁর জাহাজে তারহীন ইন্টারনেট সুবিধা থাকায় যোগাযোগ তুলনামূলক সহজ হয়েছে—এটি প্যাটের জন্য ছিল স্বস্তির বিষয়।
তবু সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে—স্বামী কবে বাড়ি ফিরবেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















