০৯:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
সেমিফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ চূড়ান্ত, লড়াই হবে ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের বন্যায় নিখোঁজ বন্ধু, ভেসে গেল গ্ল্যান্সির পরিচিত গ্রাম ভারতে খ্রিস্টানদের উদ্বেগ, ধর্মান্তরবিরোধী কঠোর আইনে বাড়ছে হয়রানির আশঙ্কা গঙ্গা পানি চুক্তি কি ডিসেম্বরে নবায়ন না হওয়ার টানেলে ঢুকে যাচ্ছে? ওয়েলসের লিঙ্গ পরিবর্তন-সংক্রান্ত অস্ত্রোপচারে নতুন ও পুরোনো রেফারেল সাময়িক বন্ধ বিদেশে থাকা মানেই কি আপনজন থেকে দূরে থাকা? বৃদ্ধ বাবার কাছে ফিরতে গিয়ে যে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি এক মেয়ে ‘মেয়েদের হাত টানাটানি করেন নিতাই রায়’: অভিযোগ যুবদল নেতা নয়নের টেলর সুইফটের অনুপ্রেরণায় ক্যাটলিন ক্লার্কের নতুন জুতা, ভক্তদের জন্য যেন স্বপ্নপূরণ পাকিস্তানে জনপ্রিয় হচ্ছে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল, তবে বাধা এখনো অনেক পাকিস্তানের খনিজ সম্পদ: সম্ভাবনার আড়ালে বড় চ্যালেঞ্জ

অভিজাত স্বার্থের কাছে আদালতের ন্যায়বিচার কি নতজানু?

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আদালতের প্রতি আস্থা রাখা শুধু নাগরিকের অধিকার নয়, রাষ্ট্রব্যবস্থার স্থিতিশীলতারও অন্যতম শর্ত। আইন ও সামাজিক শৃঙ্খলা নিয়ে শেষ কথা বলার মতো কোনো প্রতিষ্ঠান যদি না থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোই দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই আদালতের রায় পছন্দ না হলেও তার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো জরুরি। কিন্তু সেই শ্রদ্ধার অর্থ এই নয় যে আদালতের কোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা যাবে না। বরং যখন কোনো রায়ের প্রভাব সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিপরীতে গিয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয় বলে মনে হয়, তখন প্রশ্ন তোলা আরও বেশি জরুরি।

ফিলিপাইনের সিকুইজর প্রদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে। একটি বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত এবং আদালতের হস্তক্ষেপ—সব মিলিয়ে ঘটনাটি কেবল একটি বিদ্যুৎ কোম্পানির ব্যবসায়িক বিরোধ নয়। এর মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার কার্যকারিতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সীমা এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ।

সিকুইজরে বিদ্যুৎ সংকটের সূত্রপাত

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের জুনে। সিকুইজরের বাসিন্দা এবং প্রদেশটির বিদ্যুৎ সমবায় প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করে, ভিলার পরিবারের মালিকানাধীন এসআই পাওয়ার করপোরেশন চুক্তি অনুযায়ী পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছিল দ্বীপটির মানুষকে।

সিকুইজর জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত নয়। ফলে সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিলে অন্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ কেনার সুযোগও সীমিত। বিশেষ করে পাইকারি বিদ্যুৎ স্পট বাজারে প্রবেশের সুযোগ না থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসে। বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি তাই নিছক একটি ব্যবসায়িক ব্যর্থতা ছিল না; তা পরিণত হয় জনজীবনের সংকটে।

বিষয়টি জ্বালানি নিয়ন্ত্রক কমিশন, জ্বালানি বিভাগ এবং প্রেসিডেন্টের দপ্তর পর্যন্ত গড়ায়। প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র নিজে সিকুইজর সফর করে পরিস্থিতি দেখেন এবং ছয় মাসের মধ্যে সংকট সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেন। ২০২৫ সালের জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণেও বিষয়টি উঠে আসে।

এরপর প্রদেশের বিদ্যুৎ সমবায় চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগে এসআই পাওয়ার করপোরেশনের সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ চুক্তি বাতিল করে। জ্বালানি নিয়ন্ত্রক কমিশন প্রতিষ্ঠানটির একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অস্থায়ী পরিচালন অনুমোদন বাতিল করে। একই সময়ে জ্বালানি বিভাগ বিদ্যুৎ সরবরাহকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন বা সমর্থন প্রত্যাহার করে।

বিকল্প ব্যবস্থা সংকট অনেকটাই সামাল দেয়

সরকারি হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব হয়। জাতীয় বিদ্যুতায়ন প্রশাসন, প্রাদেশিক বিদ্যুৎ সমবায় এবং সেবু অঞ্চলের দুটি বিদ্যুৎ সমবায়ের সহায়তায় তিনটি নতুন জেনারেটর স্থাপন করা হয়। এগুলো থেকে মোট ১৭ দশমিক ৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। এসআই পাওয়ারের অক্ষমতার কারণে তৈরি হওয়া ২২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ঘাটতির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এতে পূরণ হয়।

অর্থাৎ, সংকটের সময় রাষ্ট্র এবং বিদ্যুৎ সমবায় বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করতে পেরেছিল। কিন্তু এরপর বিষয়টি চলে যায় আদালতে।

আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি

ভিলার পরিবারের নেতৃত্বাধীন এসআই পাওয়ার করপোরেশন দাবি করে, জ্বালানি নিয়ন্ত্রক কমিশন তার অস্থায়ী পরিচালন অনুমোদন বাতিল করার আগে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি। প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ ছিল, তাকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দেওয়া হয়নি, যথাযথ নোটিশ ও শুনানি করা হয়নি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তে ব্যবহৃত তথ্যের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখার সুযোগও দেওয়া হয়নি।

আপিল আদালত এই যুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ গ্রহণ করে। আদালতের মতে, নিয়ন্ত্রক কমিশনের সিদ্ধান্তে বিদ্যুৎ শিল্প সংস্কার আইন অনুযায়ী নির্ধারিত যথাযথ নোটিশ ও শুনানির শর্ত পূরণ হয়নি। একই সঙ্গে আদালত তাৎক্ষণিকভাবে পরিচালন অনুমোদন বাতিলের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

কারণ, নিয়ন্ত্রক কমিশনের নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ও আপিল-অযোগ্য হওয়ার আগে ১৫ দিনের একটি সময়সীমা থাকার কথা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটিকে সিদ্ধান্ত জানানো এবং কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ একই দিনে দেওয়া হয়েছিল।

তবে এখানেই মূল বিতর্ক।

আইনের প্রক্রিয়া বনাম বাস্তব অবস্থান

আদালতের যুক্তির একটি অংশ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা যত শক্তিশালীই হোক, তার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা আবশ্যক। প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে নোটিশ, শুনানি এবং আপিলের সুযোগ অপরিহার্য।

কিন্তু পুরো ঘটনার সময়রেখা বিবেচনায় নিলে আদালতের সিদ্ধান্তের অন্য একটি দিক নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

নিয়ন্ত্রক কমিশন যখন এসআই পাওয়ারের পরিচালন অনুমোদন বাতিল করে, তখন প্রদেশের বিদ্যুৎ সমবায়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যুৎ সরবরাহ চুক্তি আর কার্যকর ছিল না। চুক্তিটি আগেই বাতিল করা হয়েছিল। ফলে প্রতিষ্ঠানটি ঠিক কোন বিদ্যমান নিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়িক অবস্থান রক্ষার জন্য আদালতের হস্তক্ষেপ চাইছিল, সেটিই বড় প্রশ্ন।

এর সঙ্গে আরও একটি বিষয় যুক্ত হয়। এসআই পাওয়ারের অন্তত দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের আগের পরিচালন অনুমোদন তখন মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছিল বলে নথিপত্র থেকে ধারণা করা যায়। তিনটি কেন্দ্রের ক্ষেত্রেই একই অবস্থা ছিল কি না, তা অবশ্য পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

নতুন অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও সেটি কোম্পানির স্বয়ংক্রিয় অধিকার ছিল না। বরং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল নিয়ন্ত্রক কমিশনের।

এর ওপর জ্বালানি বিভাগও বিদ্যুৎ সরবরাহকারী হিসেবে এসআই পাওয়ারের অনুমোদন বা স্বীকৃতি প্রত্যাহার করেছিল। বিদ্যুৎ সমবায়ের সঙ্গে সরবরাহ চুক্তিও ছিল না। ফলে পুরো আইনি কাঠামো একত্রে দেখলে প্রশ্ন ওঠে—যে অবস্থানটি পুনরুদ্ধারের জন্য প্রতিষ্ঠানটি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল, সেই অবস্থানের বৈধ ভিত্তি তখন আদৌ কতটা ছিল?Bhupesh Baghel: Social justice champion or protector of caste elite  interests?

আদালতের ক্ষমতা ও জনস্বার্থ

এখানেই আপিল আদালতের রায় নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়। আদালত যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের নির্দেশ দেয়, সেটি আইনের শাসনের জন্য ইতিবাচক। কিন্তু আদালতের সিদ্ধান্ত যদি এমন একটি ব্যবসায়িক অবস্থান পুনরুদ্ধারের পথ খুলে দেয়, যার ভিত্তিগত অনুমোদন, সরবরাহ চুক্তি কিংবা সরকারি স্বীকৃতিই তখন আর কার্যকর ছিল না, তাহলে রায়টির বাস্তব প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

আদালতের সিদ্ধান্তে এসআই পাওয়ারের বিকল্প হিসেবে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচনের সময়সূচি নিয়েও মন্তব্য করা হয়েছে। এ ধরনের বিষয়ের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তের বৈধতার সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে আদালত যখন একটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক বিরোধের বিচার করছে, তখন তার এখতিয়ার ও প্রাসঙ্গিকতার সীমা নিয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

এখানে মূল প্রশ্ন কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানি বা রাজনৈতিক পরিবারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। প্রশ্নটি আরও মৌলিক। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি জনস্বার্থ রক্ষায় কোনো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে আদালত অবশ্যই সেই সিদ্ধান্ত পরীক্ষা করতে পারে। কিন্তু আদালতের বিচারিক ক্ষমতা কি এমন একটি অবস্থান পুনরুজ্জীবিত করতে পারে, যার প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক ভিত্তি ইতোমধ্যে ভেঙে পড়েছে?

জনস্বার্থই হওয়া উচিত চূড়ান্ত মানদণ্ড

সিকুইজরের ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত একটি বৃহত্তর শিক্ষা দেয়। বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন বা অন্য কোনো অপরিহার্য সেবা যখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে, তখন নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দুর্বলতা সরাসরি জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ উঠলে কিংবা সরবরাহ ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত নাগরিকের সেবা নিশ্চিত করা।

এসআই পাওয়ার চাইলে আবার সিকুইজরে ব্যবসা শুরু করার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। নিয়ন্ত্রক কমিশনের অবস্থান অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি নতুন করে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী হিসেবে আবেদন করতে পারে। সেক্ষেত্রে জ্বালানি বিভাগের অনুমোদন বা সমর্থন পুনরুদ্ধার এবং নতুন বিদ্যুৎ সরবরাহ চুক্তি সম্পাদনসহ পুরো প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

অর্থাৎ বৈধ ব্যবসায়িক প্রত্যাবর্তনের পথ রয়েছে। কিন্তু সেটি নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত।

এখন দেখার বিষয়, নিয়ন্ত্রক কমিশনের পক্ষে সরকারি কৌঁসুলি দপ্তরের মাধ্যমে করা আপিল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। আপিল আদালত তার অবস্থান সংশোধন করে কি না, কিংবা সর্বোচ্চ আদালত বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত যাই হোক, প্রদেশের বিদ্যুৎ সমবায়ের হাতে একটি বাস্তব পথ রয়ে গেছে—নতুন করে এসআই পাওয়ারের সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ চুক্তি না করা। কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক অধিকার নিয়ে বিতর্কের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো জনগণ নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ পাচ্ছে কি না।

আইনের শাসন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা শক্তিশালী পক্ষের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বার্থও সমানভাবে বিবেচনা করে। আদালত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকার—তিন পক্ষের কাছ থেকেই সেই ভারসাম্য প্রত্যাশিত।

আর যখন কোনো সিদ্ধান্ত সেই ভারসাম্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলে, তখন তা নিয়ে কঠোর ও যুক্তিনির্ভর জনআলোচনা হওয়া বিচারব্যবস্থার প্রতি অসম্মান নয়। বরং এটি গণতান্ত্রিক জবাবদিহিরই অপরিহার্য অংশ।

জনপ্রিয় সংবাদ

সেমিফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ চূড়ান্ত, লড়াই হবে ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে

অভিজাত স্বার্থের কাছে আদালতের ন্যায়বিচার কি নতজানু?

০৭:৪২:৩০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আদালতের প্রতি আস্থা রাখা শুধু নাগরিকের অধিকার নয়, রাষ্ট্রব্যবস্থার স্থিতিশীলতারও অন্যতম শর্ত। আইন ও সামাজিক শৃঙ্খলা নিয়ে শেষ কথা বলার মতো কোনো প্রতিষ্ঠান যদি না থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোই দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই আদালতের রায় পছন্দ না হলেও তার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো জরুরি। কিন্তু সেই শ্রদ্ধার অর্থ এই নয় যে আদালতের কোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা যাবে না। বরং যখন কোনো রায়ের প্রভাব সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিপরীতে গিয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয় বলে মনে হয়, তখন প্রশ্ন তোলা আরও বেশি জরুরি।

ফিলিপাইনের সিকুইজর প্রদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে। একটি বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত এবং আদালতের হস্তক্ষেপ—সব মিলিয়ে ঘটনাটি কেবল একটি বিদ্যুৎ কোম্পানির ব্যবসায়িক বিরোধ নয়। এর মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার কার্যকারিতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সীমা এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ।

সিকুইজরে বিদ্যুৎ সংকটের সূত্রপাত

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের জুনে। সিকুইজরের বাসিন্দা এবং প্রদেশটির বিদ্যুৎ সমবায় প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করে, ভিলার পরিবারের মালিকানাধীন এসআই পাওয়ার করপোরেশন চুক্তি অনুযায়ী পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছিল দ্বীপটির মানুষকে।

সিকুইজর জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত নয়। ফলে সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিলে অন্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ কেনার সুযোগও সীমিত। বিশেষ করে পাইকারি বিদ্যুৎ স্পট বাজারে প্রবেশের সুযোগ না থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসে। বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি তাই নিছক একটি ব্যবসায়িক ব্যর্থতা ছিল না; তা পরিণত হয় জনজীবনের সংকটে।

বিষয়টি জ্বালানি নিয়ন্ত্রক কমিশন, জ্বালানি বিভাগ এবং প্রেসিডেন্টের দপ্তর পর্যন্ত গড়ায়। প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র নিজে সিকুইজর সফর করে পরিস্থিতি দেখেন এবং ছয় মাসের মধ্যে সংকট সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেন। ২০২৫ সালের জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণেও বিষয়টি উঠে আসে।

এরপর প্রদেশের বিদ্যুৎ সমবায় চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগে এসআই পাওয়ার করপোরেশনের সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ চুক্তি বাতিল করে। জ্বালানি নিয়ন্ত্রক কমিশন প্রতিষ্ঠানটির একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অস্থায়ী পরিচালন অনুমোদন বাতিল করে। একই সময়ে জ্বালানি বিভাগ বিদ্যুৎ সরবরাহকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন বা সমর্থন প্রত্যাহার করে।

বিকল্প ব্যবস্থা সংকট অনেকটাই সামাল দেয়

সরকারি হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব হয়। জাতীয় বিদ্যুতায়ন প্রশাসন, প্রাদেশিক বিদ্যুৎ সমবায় এবং সেবু অঞ্চলের দুটি বিদ্যুৎ সমবায়ের সহায়তায় তিনটি নতুন জেনারেটর স্থাপন করা হয়। এগুলো থেকে মোট ১৭ দশমিক ৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। এসআই পাওয়ারের অক্ষমতার কারণে তৈরি হওয়া ২২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ঘাটতির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এতে পূরণ হয়।

অর্থাৎ, সংকটের সময় রাষ্ট্র এবং বিদ্যুৎ সমবায় বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করতে পেরেছিল। কিন্তু এরপর বিষয়টি চলে যায় আদালতে।

আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি

ভিলার পরিবারের নেতৃত্বাধীন এসআই পাওয়ার করপোরেশন দাবি করে, জ্বালানি নিয়ন্ত্রক কমিশন তার অস্থায়ী পরিচালন অনুমোদন বাতিল করার আগে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি। প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ ছিল, তাকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দেওয়া হয়নি, যথাযথ নোটিশ ও শুনানি করা হয়নি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তে ব্যবহৃত তথ্যের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখার সুযোগও দেওয়া হয়নি।

আপিল আদালত এই যুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ গ্রহণ করে। আদালতের মতে, নিয়ন্ত্রক কমিশনের সিদ্ধান্তে বিদ্যুৎ শিল্প সংস্কার আইন অনুযায়ী নির্ধারিত যথাযথ নোটিশ ও শুনানির শর্ত পূরণ হয়নি। একই সঙ্গে আদালত তাৎক্ষণিকভাবে পরিচালন অনুমোদন বাতিলের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

কারণ, নিয়ন্ত্রক কমিশনের নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ও আপিল-অযোগ্য হওয়ার আগে ১৫ দিনের একটি সময়সীমা থাকার কথা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটিকে সিদ্ধান্ত জানানো এবং কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ একই দিনে দেওয়া হয়েছিল।

তবে এখানেই মূল বিতর্ক।

আইনের প্রক্রিয়া বনাম বাস্তব অবস্থান

আদালতের যুক্তির একটি অংশ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা যত শক্তিশালীই হোক, তার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা আবশ্যক। প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে নোটিশ, শুনানি এবং আপিলের সুযোগ অপরিহার্য।

কিন্তু পুরো ঘটনার সময়রেখা বিবেচনায় নিলে আদালতের সিদ্ধান্তের অন্য একটি দিক নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

নিয়ন্ত্রক কমিশন যখন এসআই পাওয়ারের পরিচালন অনুমোদন বাতিল করে, তখন প্রদেশের বিদ্যুৎ সমবায়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যুৎ সরবরাহ চুক্তি আর কার্যকর ছিল না। চুক্তিটি আগেই বাতিল করা হয়েছিল। ফলে প্রতিষ্ঠানটি ঠিক কোন বিদ্যমান নিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়িক অবস্থান রক্ষার জন্য আদালতের হস্তক্ষেপ চাইছিল, সেটিই বড় প্রশ্ন।

এর সঙ্গে আরও একটি বিষয় যুক্ত হয়। এসআই পাওয়ারের অন্তত দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের আগের পরিচালন অনুমোদন তখন মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছিল বলে নথিপত্র থেকে ধারণা করা যায়। তিনটি কেন্দ্রের ক্ষেত্রেই একই অবস্থা ছিল কি না, তা অবশ্য পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

নতুন অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও সেটি কোম্পানির স্বয়ংক্রিয় অধিকার ছিল না। বরং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল নিয়ন্ত্রক কমিশনের।

এর ওপর জ্বালানি বিভাগও বিদ্যুৎ সরবরাহকারী হিসেবে এসআই পাওয়ারের অনুমোদন বা স্বীকৃতি প্রত্যাহার করেছিল। বিদ্যুৎ সমবায়ের সঙ্গে সরবরাহ চুক্তিও ছিল না। ফলে পুরো আইনি কাঠামো একত্রে দেখলে প্রশ্ন ওঠে—যে অবস্থানটি পুনরুদ্ধারের জন্য প্রতিষ্ঠানটি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল, সেই অবস্থানের বৈধ ভিত্তি তখন আদৌ কতটা ছিল?Bhupesh Baghel: Social justice champion or protector of caste elite  interests?

আদালতের ক্ষমতা ও জনস্বার্থ

এখানেই আপিল আদালতের রায় নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়। আদালত যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের নির্দেশ দেয়, সেটি আইনের শাসনের জন্য ইতিবাচক। কিন্তু আদালতের সিদ্ধান্ত যদি এমন একটি ব্যবসায়িক অবস্থান পুনরুদ্ধারের পথ খুলে দেয়, যার ভিত্তিগত অনুমোদন, সরবরাহ চুক্তি কিংবা সরকারি স্বীকৃতিই তখন আর কার্যকর ছিল না, তাহলে রায়টির বাস্তব প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

আদালতের সিদ্ধান্তে এসআই পাওয়ারের বিকল্প হিসেবে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচনের সময়সূচি নিয়েও মন্তব্য করা হয়েছে। এ ধরনের বিষয়ের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তের বৈধতার সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে আদালত যখন একটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক বিরোধের বিচার করছে, তখন তার এখতিয়ার ও প্রাসঙ্গিকতার সীমা নিয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

এখানে মূল প্রশ্ন কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানি বা রাজনৈতিক পরিবারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। প্রশ্নটি আরও মৌলিক। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি জনস্বার্থ রক্ষায় কোনো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে আদালত অবশ্যই সেই সিদ্ধান্ত পরীক্ষা করতে পারে। কিন্তু আদালতের বিচারিক ক্ষমতা কি এমন একটি অবস্থান পুনরুজ্জীবিত করতে পারে, যার প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক ভিত্তি ইতোমধ্যে ভেঙে পড়েছে?

জনস্বার্থই হওয়া উচিত চূড়ান্ত মানদণ্ড

সিকুইজরের ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত একটি বৃহত্তর শিক্ষা দেয়। বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন বা অন্য কোনো অপরিহার্য সেবা যখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে, তখন নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দুর্বলতা সরাসরি জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ উঠলে কিংবা সরবরাহ ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত নাগরিকের সেবা নিশ্চিত করা।

এসআই পাওয়ার চাইলে আবার সিকুইজরে ব্যবসা শুরু করার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। নিয়ন্ত্রক কমিশনের অবস্থান অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি নতুন করে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী হিসেবে আবেদন করতে পারে। সেক্ষেত্রে জ্বালানি বিভাগের অনুমোদন বা সমর্থন পুনরুদ্ধার এবং নতুন বিদ্যুৎ সরবরাহ চুক্তি সম্পাদনসহ পুরো প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

অর্থাৎ বৈধ ব্যবসায়িক প্রত্যাবর্তনের পথ রয়েছে। কিন্তু সেটি নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত।

এখন দেখার বিষয়, নিয়ন্ত্রক কমিশনের পক্ষে সরকারি কৌঁসুলি দপ্তরের মাধ্যমে করা আপিল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। আপিল আদালত তার অবস্থান সংশোধন করে কি না, কিংবা সর্বোচ্চ আদালত বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত যাই হোক, প্রদেশের বিদ্যুৎ সমবায়ের হাতে একটি বাস্তব পথ রয়ে গেছে—নতুন করে এসআই পাওয়ারের সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ চুক্তি না করা। কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক অধিকার নিয়ে বিতর্কের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো জনগণ নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ পাচ্ছে কি না।

আইনের শাসন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা শক্তিশালী পক্ষের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বার্থও সমানভাবে বিবেচনা করে। আদালত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকার—তিন পক্ষের কাছ থেকেই সেই ভারসাম্য প্রত্যাশিত।

আর যখন কোনো সিদ্ধান্ত সেই ভারসাম্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলে, তখন তা নিয়ে কঠোর ও যুক্তিনির্ভর জনআলোচনা হওয়া বিচারব্যবস্থার প্রতি অসম্মান নয়। বরং এটি গণতান্ত্রিক জবাবদিহিরই অপরিহার্য অংশ।