পাকিস্তানে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের প্রতি মানুষের আগ্রহও বাড়ছে। কম খরচে চালানো যায় বলে এসব যানবাহন ভবিষ্যতে দেশটির দুই চাকার পরিবহনব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তবে বেশি দাম, চার্জ দেওয়ার সমস্যা, ব্যাটারির মান ও পুনর্বিক্রয়মূল্যসহ নানা কারণে এখনো সাধারণ মানুষের কাছে পেট্রোলচালিত মোটরসাইকেলের বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি বৈদ্যুতিক বাইক।
দুই চাকার বিশাল বাজার
পাকিস্তানে বছরে প্রায় ২০ লাখ মোটরসাইকেল বিক্রি হয়। দেশটিতে মোট মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৩ কোটিরও বেশি। পরিবার নিয়ে চলাচল, অফিসে যাতায়াত, সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া কিংবা পণ্য সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই মোটরসাইকেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
এই বিশাল বাজারে সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর একটি হলো হোন্ডা সিডি ৭০। একটি মোটরসাইকেলে একই পরিবারের কয়েকজন উঠে চলাচল করাও দেশটিতে খুব স্বাভাবিক বিষয়। ফলে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলকে শুধু কম খরচে চললেই হবে না, একই সঙ্গে বেশি ওজন বহন, খারাপ রাস্তায় চলাচল এবং দীর্ঘ সময় ব্যবহারের সক্ষমতাও দেখাতে হবে।
চালানোর খরচ অনেক কম
বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর পরিচালন ব্যয়। যুদ্ধ শুরুর আগে একটি বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল চালাতে প্রচলিত মোটরসাইকেলের তুলনায় প্রায় এক-চতুর্থাংশ খরচ হতো। বর্তমানে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় এই খরচের পার্থক্য আরও বেড়েছে।
তবে সমস্যা হলো শুরুতেই বেশি টাকা খরচ করতে হয়। একটি সিডি ৭০ মোটরসাইকেলের দাম প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার রুপি। অন্যদিকে ভালো মানের লিথিয়াম ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের দাম ৩ লাখ রুপিরও বেশি হতে পারে।
অর্থাৎ বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল কিনলে শুরুতে অতিরিক্ত টাকা দিতে হলেও পরে জ্বালানি খরচ কমে যাওয়ায় সেই বাড়তি বিনিয়োগ ধীরে ধীরে উঠে আসে। বেশি দূরত্ব যাতায়াত করা মানুষের ক্ষেত্রে এই সময় আরও কম হতে পারে।
বাজারে অনেক প্রতিষ্ঠান, নেই মানসম্মত ব্যবস্থা
পাকিস্তানে বর্তমানে প্রায় ৪০টি প্রতিষ্ঠান বৈদ্যুতিক দুই চাকার যান তৈরি বা সংযোজন করছে। কিন্তু বাজারে এত বেশি প্রতিষ্ঠান থাকলেও পণ্যের মান ও প্রযুক্তিতে এক ধরনের সামঞ্জস্য নেই।
ব্যাটারি বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের মোট দামের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। ফলে ব্যাটারির ক্ষমতা, স্থায়িত্ব এবং মান সরাসরি মোটরসাইকেলের কার্যক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে।
একই সঙ্গে বাজারে একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য ব্র্যান্ডের অভাবও ক্রেতাদের আস্থা তৈরিতে বাধা দিচ্ছে। মানসম্মত পণ্য, সহজে পাওয়া যন্ত্রাংশ এবং নির্ভরযোগ্য মেরামতব্যবস্থা না থাকলে মানুষ প্রচলিত মোটরসাইকেল ছেড়ে নতুন প্রযুক্তিতে যেতে চাইছে না।
পরিবার নিয়ে চলাচলেও প্রশ্ন
পাকিস্তানে মোটরসাইকেল শুধু একজনের যাতায়াতের বাহন নয়। বাবা-মায়ের সঙ্গে শিশু কিংবা একাধিক সদস্য একই মোটরসাইকেলে চলাচল করেন। তাই বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে মোটর শক্তি গুরুত্বপূর্ণ।
কম শক্তির বৈদ্যুতিক স্কুটার বেশি ওজন বহনে সমস্যায় পড়তে পারে। তবে সর্বোচ্চ প্রায় ২ হাজার ওয়াট শক্তির মোটরযুক্ত বাইক তুলনামূলক বেশি ওজন বহন করতে পারে। কিন্তু ওজন যত বাড়ে, ব্যাটারি তত দ্রুত শেষ হয় এবং চলার দূরত্বও কমে যায়।
পাকিস্তানের বড় শহরগুলোর রাস্তার অবস্থাও আরেকটি সমস্যা। অনেক বৈদ্যুতিক স্কুটারের মাটি থেকে উচ্চতা কম হওয়ায় খারাপ ও ভাঙাচোরা রাস্তায় এগুলো চালানো কঠিন। এ কারণে লাহোরের তুলনায় করাচিতে বৈদ্যুতিক স্কুটারের ব্যবহারও কম।
পুরোনো মোটরসাইকেলের সঙ্গে বড় প্রতিযোগিতা
সিডি ৭০-এর মতো প্রচলিত মোটরসাইকেলের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর নির্ভরযোগ্যতা। দেশের প্রায় সব জায়গায় এর যন্ত্রাংশ পাওয়া যায় এবং মেরামতের জন্য দক্ষ কারিগরও রয়েছে।
বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে পুনর্বিক্রয়মূল্যও বড় সমস্যা। নতুন বাইক কেনার পরই এর মূল্য প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এর সঙ্গে ব্যাটারির ক্ষমতা সময়ের সঙ্গে কমে যাওয়ায় পুরোনো বৈদ্যুতিক বাইক বিক্রি করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
ব্যাটারি বদলানোর ব্যবস্থা চালু হলে এই সমস্যা অনেকটাই কমতে পারে। এতে ক্রেতা শুধু মোটরসাইকেল কিনবে, আর ব্যাটারি ভাড়া নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী পুরোনো ব্যাটারি বদলে চার্জ দেওয়া ব্যাটারি নিতে পারবে।
চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা সবচেয়ে বড় বাধা
বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের ব্যবহার বাড়াতে সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলোর একটি হলো সহজে চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা। পাকিস্তানে এখনো পর্যাপ্ত চার্জিং কেন্দ্র নেই। বিশেষ করে করাচির মতো শহরে অনেক মানুষ অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন, ফলে বাড়িতে মোটরসাইকেল চার্জ দেওয়াও সহজ নয়।
অনেকে বারান্দা থেকে বিদ্যুতের সংযোগ নিচে নামিয়ে মোটরসাইকেল চার্জ করছেন। কেউ আবার আশপাশের দোকান বা নিচতলার বাড়ির সঙ্গে ব্যবস্থা করছেন। অনেকেই কর্মস্থলে বাইক চার্জ দিচ্ছেন।
দেশজুড়ে সরাসরি দ্রুত চার্জ দেওয়ার কেন্দ্রের সংখ্যাও খুব কম। আবার যেসব কেন্দ্র রয়েছে, সেগুলোর সবগুলো বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে বাড়ি বা অফিসে চার্জ দেওয়ার সুযোগ না থাকা মানুষের জন্য সমস্যা আরও বড়।
পণ্য সরবরাহের কাজেও বাধা
খাবার সরবরাহের মতো কাজে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল সবচেয়ে বেশি লাভজনক হতে পারে। কারণ একজন সরবরাহকর্মী প্রতিদিন দীর্ঘ সময় বাইক চালান। জ্বালানি খরচ কমে গেলে তার আয় থেকে সাশ্রয় হতে পারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ।
কিন্তু দীর্ঘ সময় চার্জ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা এখানে বড় সমস্যা। প্রায় ৩০ মিনিট চার্জ দেওয়ার সময় একজন সরবরাহকর্মী একটি পণ্য পৌঁছে দিয়ে আয় করতে পারেন। ফলে চার্জ দেওয়ার জন্য বাইক থামিয়ে রাখলে তার একটি সরবরাহের আয় হারানোর আশঙ্কা থাকে।
এই কারণে বড় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিশাল মোটরসাইকেল বহর থাকলেও বৈদ্যুতিক বাইকের ব্যবহার এখনো খুব কম।
সরবরাহ সংকটও বাড়ছে
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের চাহিদা বাড়লেও এখন উৎপাদন ও সরবরাহের দিকের সমস্যাই বড় হয়ে উঠছে।
পাকিস্তানের অনেক প্রতিষ্ঠান বৈদ্যুতিক বাইকের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও ব্যাটারির জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল। আমদানির জন্য বড় অঙ্কের অর্থ আগে থেকেই বিনিয়োগ করতে হয়। পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আনা যায় না, আর যন্ত্রাংশ না থাকলে বাইক উৎপাদন ও বিক্রি সম্ভব হয় না।
একটি প্রতিষ্ঠান মাসে প্রায় এক হাজার মোটরসাইকেল সংযোজন করতে চাইলে উৎপাদন শুরুর আগেই বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে রাখতে হয়। ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি বড় বাধা।
সামনে বড় সম্ভাবনা, তবে দরকার শক্তিশালী অবকাঠামো
পাকিস্তানে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের অর্থনৈতিক সুবিধা স্পষ্ট। জ্বালানি খরচ কম, রক্ষণাবেক্ষণ তুলনামূলক সহজ এবং বেশি দূরত্ব চলাচলকারীদের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের অর্থ দ্রুত উঠে আসতে পারে।
তবে শুধু কম খরচ যথেষ্ট নয়। পাকিস্তানের বাস্তবতায় একটি মোটরসাইকেলকে পরিবারের সদস্য বহন করতে হয়, খারাপ রাস্তায় চলতে হয়, দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয় এবং পরে ভালো দামে বিক্রিও হতে হয়।
তাই বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের জনপ্রিয়তা বাড়াতে মানসম্মত ব্যাটারি, শক্তিশালী মোটর, সহজ চার্জিং ব্যবস্থা, ব্যাটারি বদলের সুযোগ, যন্ত্রাংশের সহজলভ্যতা এবং নির্ভরযোগ্য পুনর্বিক্রয় বাজার গড়ে তোলা জরুরি। এসব ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে দেশটির বিশাল দুই চাকার বাজারে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















