০৯:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
নেপালের মরদেহ শনাক্ত সংকট: এখনো নিখোঁজ ২,৪২৬ জন; ৫১৭ বিদেশি নাগরিক রাজধানীতে গ্যাস সংকট তীব্র, ৪০-৫০ টাকার গ্যাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা রংপুরে অটোরিকশাচালককে গলা কেটে হত্যা, নিখোঁজ গাড়ি উদ্ধারে অভিযান ঢাকার যানজট কমাতে ৪ মাসের সময়সীমা, করওয়ান বাজারের কাঁচাবাজার যাবে গাবতলীতে ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে এখন থেকেই মানুন ৫টি সহজ অভ্যাস নিজ দলের কর্মীর সঙ্গে বিরোধ, মারধরের পর যুবদল নেতার মৃত্যু একই দিনে মনপুরার ৩ শিশু নিখোঁজ, উৎকণ্ঠায় পরিবার সেমিফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ চূড়ান্ত, লড়াই হবে ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের বন্যায় নিখোঁজ বন্ধু, ভেসে গেল গ্ল্যান্সির পরিচিত গ্রাম ভারতে খ্রিস্টানদের উদ্বেগ, ধর্মান্তরবিরোধী কঠোর আইনে বাড়ছে হয়রানির আশঙ্কা

গঙ্গা পানি চুক্তি কি ডিসেম্বরে নবায়ন না হওয়ার টানেলে ঢুকে যাচ্ছে?

“১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তিসংক্রান্ত বিষয়গুলো দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) কাঠামোর আওতায় আলোচনা করা হবে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের বলেন, ১৯৯৬ সালে ৩০ বছরের জন্য স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি চুক্তির আওতায় পানি ও নদীসংক্রান্ত বিষয়গুলো দ্বিপক্ষীয় যৌথ নদী কমিশনের আলোচ্যসূচির অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। চুক্তির যৌথ কমিটির বৈঠকগুলোও কারিগরি পর্যায়ে চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।”

ভারত-বাংলাদেশের গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ এই বছর ডিসেম্বরে শেষ হবে। ডিসেম্বর আসতে আর মাত্র তিন মাস বাকি। সে সময় ২৯ আগস্ট বিকেলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী রণধীর জয়সওয়াল ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন সম্পর্কে ভারতের এই অবস্থান জানিয়ে দিয়েছেন। এবং তিনি এ কথাও বলেছেন, তারা বাংলাদেশের উত্তরের অপেক্ষায় আছেন।

এদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মি. খলিলুর রহমান সংসদে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন বিষয়ে একটি খসড়া প্রস্তাব ভারতকে পাঠিয়েছে আগেই। মি. জয়সওয়ালের মুখ দিয়ে আসা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনেকখানি বাংলাদেশের প্রস্তাবের জবাব যদি ধরে নেওয়া হয়, তাহলে বলা যেতে পারে ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন একটি অনিশ্চয়তায় ঢুকে যাচ্ছে।

Ganga-Padma Water Sharing Agreement | River experts of Bangladesh supported India's claim on water distribution of Padma River from Farakka Barrage dgtld - Anandabazar
ফারাক্কা ব্যারেজ

এরশাদ আমলে কয়েকটি যৌথ নদী কমিশনের মিটিং কভার করার সৌভাগ্য হয়েছিল। তার থেকে বড় সৌভাগ্য হয়েছিল, জেআরসি মিটিং নিয়ে সাংবাদিক আতাউস সামাদের বিশাল ফাইলটি দেখার। তাছাড়া ওই সময়ে পানি বিশেষজ্ঞ মি. আব্বাসের কাছ থেকে কমেন্ট নিতে গিয়ে কিছু কিছু বিষয় জানার সুযোগ হয়। সেই সব অভিজ্ঞতা মিলিয়ে বলা যায়, গঙ্গার পানি চুক্তি জেআরসি মিটিংয়ের আওতায় ঢুকে যাওয়ার অর্থ কোনো একটি বিষয়ে তদন্ত কমিটি করে দেওয়ার মতো। সাধারণত দেখা যায়, সরকার যখন কোনো একটি সেনসেটিভ বিষয় ঝুলিয়ে রাখতে চায়—তখন তার জন্য একটি তদন্ত কমিটি করে দেয়। আর তদন্ত কমিটি করে দেওয়ার অর্থই হলো বিষয়টি কবে নিষ্পত্তি হবে তা কেউ জানে না।

নিম্ন অববাহিকায় কৃষিভিত্তিক অঞ্চল শুধু নয়, সাম্প্রতিক নেপালের প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে বোঝা যায়, পানি চুক্তিগুলো বা নদীসংক্রান্ত বিষয়গুলোর সঙ্গে শুধুমাত্র পানি সরবরাহের বিষয়টি জড়িত থাকে না। এর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িত থাকে পারস্পরিক তথ্য বিনিময়। বিশেষ করে নদীর উপরের অংশের অধিকারীর কাছ থেকে নিম্ন অববাহিকা অঞ্চলের প্রয়োজনীয় তথ্যের।

এই তথ্যের কতটা প্রয়োজন তা ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পরে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার সিন্ধু অববাহিকার নদীগুলোর চুক্তি ভারতের পক্ষ থেকে অকার্যকর বলে ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে পাকিস্তানের মিডিয়ায় পানি বিশেষজ্ঞ ও কূটনীতিকদের দায়িত্বশীল লেখাগুলো পড়লে বোঝা যায়। সেখানে দায়িত্বশীল এই বিশেষজ্ঞরা প্রত্যেকেই লিখছেন বা বলছেন, দুই দেশকে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করে অবিলম্বে পাকিস্তানের স্বার্থে এই সিন্ধু অববাহিকার নদীগুলোর পানি সমস্যার সমাধান করা উচিত। তারা যখন এ কথা বলছেন, এ সময়ে বাস্তবে ভারত ওই অর্থে পানি বন্ধ করেনি। তথ্য শেয়ার বন্ধ করেছে ঠিকই। তাতেই পাকিস্তানকে বন্যা ও খরা—এই দুইয়ে ভুগতে হচ্ছে।

Record Flooding: $40 Billion Of Damage In Pakistan As Monsoons Devastate South Asia
পাকিস্তানের বন্যা

উচ্চ অববাহিকা থেকে তথ্য শেয়ার যে কতটা প্রয়োজনীয়, তা এই সপ্তাহে নেপালের ভোতাকেশির বন্যা বা ঢল—যাই বলা হোক না কেন—সেই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে বোঝা গেল। নেপালে সতর্কতার তথ্য জনগণকে শেয়ার করা হয়েছিল মাত্র ১৫ মিনিট আগে। বিপর্যয়ের পনেরো মিনিট আগে তথ্য শেয়ার করা আর না করার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য থাকে না।

ভারত ও পাকিস্তানের সিন্ধু অববাহিকার নদীগুলোর পানি চুক্তি করা হয়েছিল বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায়। কিন্তু পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞদের লেখা পড়ে ও তাদের বক্তব্য শুনে যা বোঝা যাচ্ছে—এখন আর বিশ্বব্যাংকের এ নিয়ে কিছুই করার নেই। এর একমাত্র উপায় হচ্ছে, দুই দেশের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা। সম্প্রতি জিও টিভি, দ্য পাকিস্তান নিউজ ও পাকিস্তান টাইমসের কয়েকজন কলামিস্টের বক্তব্যে প্রায় একই সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে। তারা বলতে চাচ্ছেন, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মধ্যস্থতা করার থেকেও পাকিস্তানি নেতাদের তাদের কৃষকের কথা ও ভবিষ্যৎ মরুকরণ ও বন্যা ঠেকানোর বিষয়টি চিন্তা করা অনেক বেশি জরুরি। কারণ এর সঙ্গে জড়িত পাকিস্তানের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জীবনযাপন। আর সেজন্য প্রয়োজন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রকৃত উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু করা ও তা কার্যকর করা।

Fight against desertification
পাকিস্তানের মরুকরণ

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার একই গঙ্গার পানিসহ ৫৪টি নদীর পানি সমস্যার সমাধানও একই বিষয়। এর সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা শুধু নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকার ভূমির ওপর জলবায়ুর প্রভাব এবং সেই প্রভাবে ভূমির ও প্রকৃতির পরিবর্তনের বিষয়টিও। তাছাড়া সারা পৃথিবী এ মুহূর্তে ভয়াবহ এল নিনোর ধাক্কার সামনে দাঁড়িয়ে। এশিয়া-প্যাসিফিকের ইন্দোনেশিয়া থেকে শুরু করে সাউথ এশিয়ার পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ মরুকরণ ও বন্যা—দুই বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে। বন্যার সাইকেলও বদলে গেছে। এখন আর দশ বছর তো দূরের কথা, বন্যা যে কোনো মুহূর্তের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আর এই গঙ্গা পানি চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশ গত ৫৬ বছরে অনেক কিছুই দেখেছে ও শুনেছে। ফারাক্কা লং মার্চ থেকে শুরু করে জাতিসংঘে বিষয়টি উত্থাপন করা—এসবই এখন পরিচিত বিষয়। এবং তার ফলও যে কতটুকু হয়, তাও সকলের জানা।

বরং অতীতের ইতিহাস বলে, ফারাক্কা চালু হওয়ার আগেই ইনট্রিম ছাড়াও স্থায়ী চুক্তি করার বিষয়টি সে সময়ের সরকার প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালেই একটা ফ্রেমে এনেছিলেন। কিন্তু সে চুক্তি হওয়ার আগেই তাকে হত্যা করা হয়। তার পরে ১৯৭৭ সালে মোরারজি দেশাই ও জিয়াউর রহমানের আলোচনার ফলে একটা চুক্তি হয়েছিল পাঁচ বছরের জন্য। তবে বাস্তবতা হলো, সেখানে যথেষ্ট তথ্যের ত্রুটি ছিল। তারপরেও বেশিদিন যেমন সে চুক্তি কার্যকর ছিল না, তেমনি তার পর থেকে অন্তর্বর্তীকালীন নবায়নের মধ্য দিয়েই চলে ১৯৯৬ সাল অবধি। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ অবধি বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সরকার থাকলেও কোনো মতেই গঙ্গা পানি চুক্তি ও ৫৪টি নদীর তথ্য সরবরাহের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে দিল্লিতে গঙ্গা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সময় দুই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও এইচ ডি দেবেগৌড়া
১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে দিল্লিতে গঙ্গা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সময় সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও এইচ ডি দেবেগৌড়া

আজ পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞরা তাদের সিন্ধু অববাহিকার নদীগুলো নিয়ে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ নেতাদের যে পথ দেখাচ্ছেন, ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের নেতা ও সরকার প্রধান শেখ হাসিনা ওই পথেই ৩০ বছরের জন্য এই চুক্তি করেছিলেন। এই ডিসেম্বরে তার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে।

মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন মাস আগেই ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের কথার ভেতর দিয়ে বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশ তার মূল নদী পদ্মা, যা ভারতের অংশে গঙ্গা নামে পরিচিত, তার পানি নিয়ে পাকিস্তানের কাছাকাছি একটা জটিলতায় পড়ার ইঙ্গিত পাচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে সহজেই বলা যায়, গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়ন দ্রুত না হওয়ার প্রক্রিয়ায় ঢুকে যেতে পারে।

একদিকে এল নিনোর প্রভাব, অন্যদিকে গ্যাস, বিদ্যুৎ, সার, জ্বালানি তেলের সংকট—সেই সময়ে গঙ্গার পানির অনিশ্চয়তা কত বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জন্য—তা সরকারকে শান্ত মাথায় উপলব্ধি করতে হবে। ইউনূস সরকার ও বর্তমান সরকার মিলে গত দুই বছরে জ্বালানি ও সার সমস্যার সমাধানের সঠিক পথে চলতে পারেনি। গঙ্গার পানি চুক্তির ক্ষেত্রে সরকারের আচরণের পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিকসম্পাদকসারাক্ষণ, The Present World

জনপ্রিয় সংবাদ

নেপালের মরদেহ শনাক্ত সংকট: এখনো নিখোঁজ ২,৪২৬ জন; ৫১৭ বিদেশি নাগরিক

গঙ্গা পানি চুক্তি কি ডিসেম্বরে নবায়ন না হওয়ার টানেলে ঢুকে যাচ্ছে?

০৮:৪৫:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬

“১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তিসংক্রান্ত বিষয়গুলো দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) কাঠামোর আওতায় আলোচনা করা হবে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের বলেন, ১৯৯৬ সালে ৩০ বছরের জন্য স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি চুক্তির আওতায় পানি ও নদীসংক্রান্ত বিষয়গুলো দ্বিপক্ষীয় যৌথ নদী কমিশনের আলোচ্যসূচির অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। চুক্তির যৌথ কমিটির বৈঠকগুলোও কারিগরি পর্যায়ে চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।”

ভারত-বাংলাদেশের গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ এই বছর ডিসেম্বরে শেষ হবে। ডিসেম্বর আসতে আর মাত্র তিন মাস বাকি। সে সময় ২৯ আগস্ট বিকেলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী রণধীর জয়সওয়াল ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন সম্পর্কে ভারতের এই অবস্থান জানিয়ে দিয়েছেন। এবং তিনি এ কথাও বলেছেন, তারা বাংলাদেশের উত্তরের অপেক্ষায় আছেন।

এদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মি. খলিলুর রহমান সংসদে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন বিষয়ে একটি খসড়া প্রস্তাব ভারতকে পাঠিয়েছে আগেই। মি. জয়সওয়ালের মুখ দিয়ে আসা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনেকখানি বাংলাদেশের প্রস্তাবের জবাব যদি ধরে নেওয়া হয়, তাহলে বলা যেতে পারে ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন একটি অনিশ্চয়তায় ঢুকে যাচ্ছে।

Ganga-Padma Water Sharing Agreement | River experts of Bangladesh supported India's claim on water distribution of Padma River from Farakka Barrage dgtld - Anandabazar
ফারাক্কা ব্যারেজ

এরশাদ আমলে কয়েকটি যৌথ নদী কমিশনের মিটিং কভার করার সৌভাগ্য হয়েছিল। তার থেকে বড় সৌভাগ্য হয়েছিল, জেআরসি মিটিং নিয়ে সাংবাদিক আতাউস সামাদের বিশাল ফাইলটি দেখার। তাছাড়া ওই সময়ে পানি বিশেষজ্ঞ মি. আব্বাসের কাছ থেকে কমেন্ট নিতে গিয়ে কিছু কিছু বিষয় জানার সুযোগ হয়। সেই সব অভিজ্ঞতা মিলিয়ে বলা যায়, গঙ্গার পানি চুক্তি জেআরসি মিটিংয়ের আওতায় ঢুকে যাওয়ার অর্থ কোনো একটি বিষয়ে তদন্ত কমিটি করে দেওয়ার মতো। সাধারণত দেখা যায়, সরকার যখন কোনো একটি সেনসেটিভ বিষয় ঝুলিয়ে রাখতে চায়—তখন তার জন্য একটি তদন্ত কমিটি করে দেয়। আর তদন্ত কমিটি করে দেওয়ার অর্থই হলো বিষয়টি কবে নিষ্পত্তি হবে তা কেউ জানে না।

নিম্ন অববাহিকায় কৃষিভিত্তিক অঞ্চল শুধু নয়, সাম্প্রতিক নেপালের প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে বোঝা যায়, পানি চুক্তিগুলো বা নদীসংক্রান্ত বিষয়গুলোর সঙ্গে শুধুমাত্র পানি সরবরাহের বিষয়টি জড়িত থাকে না। এর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িত থাকে পারস্পরিক তথ্য বিনিময়। বিশেষ করে নদীর উপরের অংশের অধিকারীর কাছ থেকে নিম্ন অববাহিকা অঞ্চলের প্রয়োজনীয় তথ্যের।

এই তথ্যের কতটা প্রয়োজন তা ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পরে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার সিন্ধু অববাহিকার নদীগুলোর চুক্তি ভারতের পক্ষ থেকে অকার্যকর বলে ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে পাকিস্তানের মিডিয়ায় পানি বিশেষজ্ঞ ও কূটনীতিকদের দায়িত্বশীল লেখাগুলো পড়লে বোঝা যায়। সেখানে দায়িত্বশীল এই বিশেষজ্ঞরা প্রত্যেকেই লিখছেন বা বলছেন, দুই দেশকে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করে অবিলম্বে পাকিস্তানের স্বার্থে এই সিন্ধু অববাহিকার নদীগুলোর পানি সমস্যার সমাধান করা উচিত। তারা যখন এ কথা বলছেন, এ সময়ে বাস্তবে ভারত ওই অর্থে পানি বন্ধ করেনি। তথ্য শেয়ার বন্ধ করেছে ঠিকই। তাতেই পাকিস্তানকে বন্যা ও খরা—এই দুইয়ে ভুগতে হচ্ছে।

Record Flooding: $40 Billion Of Damage In Pakistan As Monsoons Devastate South Asia
পাকিস্তানের বন্যা

উচ্চ অববাহিকা থেকে তথ্য শেয়ার যে কতটা প্রয়োজনীয়, তা এই সপ্তাহে নেপালের ভোতাকেশির বন্যা বা ঢল—যাই বলা হোক না কেন—সেই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে বোঝা গেল। নেপালে সতর্কতার তথ্য জনগণকে শেয়ার করা হয়েছিল মাত্র ১৫ মিনিট আগে। বিপর্যয়ের পনেরো মিনিট আগে তথ্য শেয়ার করা আর না করার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য থাকে না।

ভারত ও পাকিস্তানের সিন্ধু অববাহিকার নদীগুলোর পানি চুক্তি করা হয়েছিল বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায়। কিন্তু পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞদের লেখা পড়ে ও তাদের বক্তব্য শুনে যা বোঝা যাচ্ছে—এখন আর বিশ্বব্যাংকের এ নিয়ে কিছুই করার নেই। এর একমাত্র উপায় হচ্ছে, দুই দেশের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা। সম্প্রতি জিও টিভি, দ্য পাকিস্তান নিউজ ও পাকিস্তান টাইমসের কয়েকজন কলামিস্টের বক্তব্যে প্রায় একই সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে। তারা বলতে চাচ্ছেন, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মধ্যস্থতা করার থেকেও পাকিস্তানি নেতাদের তাদের কৃষকের কথা ও ভবিষ্যৎ মরুকরণ ও বন্যা ঠেকানোর বিষয়টি চিন্তা করা অনেক বেশি জরুরি। কারণ এর সঙ্গে জড়িত পাকিস্তানের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জীবনযাপন। আর সেজন্য প্রয়োজন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রকৃত উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু করা ও তা কার্যকর করা।

Fight against desertification
পাকিস্তানের মরুকরণ

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার একই গঙ্গার পানিসহ ৫৪টি নদীর পানি সমস্যার সমাধানও একই বিষয়। এর সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা শুধু নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকার ভূমির ওপর জলবায়ুর প্রভাব এবং সেই প্রভাবে ভূমির ও প্রকৃতির পরিবর্তনের বিষয়টিও। তাছাড়া সারা পৃথিবী এ মুহূর্তে ভয়াবহ এল নিনোর ধাক্কার সামনে দাঁড়িয়ে। এশিয়া-প্যাসিফিকের ইন্দোনেশিয়া থেকে শুরু করে সাউথ এশিয়ার পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ মরুকরণ ও বন্যা—দুই বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে। বন্যার সাইকেলও বদলে গেছে। এখন আর দশ বছর তো দূরের কথা, বন্যা যে কোনো মুহূর্তের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আর এই গঙ্গা পানি চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশ গত ৫৬ বছরে অনেক কিছুই দেখেছে ও শুনেছে। ফারাক্কা লং মার্চ থেকে শুরু করে জাতিসংঘে বিষয়টি উত্থাপন করা—এসবই এখন পরিচিত বিষয়। এবং তার ফলও যে কতটুকু হয়, তাও সকলের জানা।

বরং অতীতের ইতিহাস বলে, ফারাক্কা চালু হওয়ার আগেই ইনট্রিম ছাড়াও স্থায়ী চুক্তি করার বিষয়টি সে সময়ের সরকার প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালেই একটা ফ্রেমে এনেছিলেন। কিন্তু সে চুক্তি হওয়ার আগেই তাকে হত্যা করা হয়। তার পরে ১৯৭৭ সালে মোরারজি দেশাই ও জিয়াউর রহমানের আলোচনার ফলে একটা চুক্তি হয়েছিল পাঁচ বছরের জন্য। তবে বাস্তবতা হলো, সেখানে যথেষ্ট তথ্যের ত্রুটি ছিল। তারপরেও বেশিদিন যেমন সে চুক্তি কার্যকর ছিল না, তেমনি তার পর থেকে অন্তর্বর্তীকালীন নবায়নের মধ্য দিয়েই চলে ১৯৯৬ সাল অবধি। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ অবধি বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সরকার থাকলেও কোনো মতেই গঙ্গা পানি চুক্তি ও ৫৪টি নদীর তথ্য সরবরাহের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে দিল্লিতে গঙ্গা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সময় দুই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও এইচ ডি দেবেগৌড়া
১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে দিল্লিতে গঙ্গা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সময় সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও এইচ ডি দেবেগৌড়া

আজ পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞরা তাদের সিন্ধু অববাহিকার নদীগুলো নিয়ে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ নেতাদের যে পথ দেখাচ্ছেন, ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের নেতা ও সরকার প্রধান শেখ হাসিনা ওই পথেই ৩০ বছরের জন্য এই চুক্তি করেছিলেন। এই ডিসেম্বরে তার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে।

মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন মাস আগেই ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের কথার ভেতর দিয়ে বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশ তার মূল নদী পদ্মা, যা ভারতের অংশে গঙ্গা নামে পরিচিত, তার পানি নিয়ে পাকিস্তানের কাছাকাছি একটা জটিলতায় পড়ার ইঙ্গিত পাচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে সহজেই বলা যায়, গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়ন দ্রুত না হওয়ার প্রক্রিয়ায় ঢুকে যেতে পারে।

একদিকে এল নিনোর প্রভাব, অন্যদিকে গ্যাস, বিদ্যুৎ, সার, জ্বালানি তেলের সংকট—সেই সময়ে গঙ্গার পানির অনিশ্চয়তা কত বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জন্য—তা সরকারকে শান্ত মাথায় উপলব্ধি করতে হবে। ইউনূস সরকার ও বর্তমান সরকার মিলে গত দুই বছরে জ্বালানি ও সার সমস্যার সমাধানের সঠিক পথে চলতে পারেনি। গঙ্গার পানি চুক্তির ক্ষেত্রে সরকারের আচরণের পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিকসম্পাদকসারাক্ষণ, The Present World