বিদেশে বসবাস অনেকের কাছে স্বপ্নপূরণের গল্প। ভালো চাকরি, নিরাপদ জীবন কিংবা নতুন সুযোগের আশায় মানুষ দেশ ছেড়ে পাড়ি জমায় দূরদেশে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই দূরত্বই কখনো কখনো হয়ে ওঠে গভীর অস্বস্তি ও অপরাধবোধের কারণ। বিশেষ করে বাবা-মা যখন বয়সের ভারে ধীরে ধীরে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তখন হাজার মাইল দূরে থাকা সন্তানের কাছে তাদের পাশে থাকতে না পারার কষ্ট আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
একজন প্রবাসী মেয়ের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে সেই কঠিন বাস্তবতাই। তিনি জানিয়েছেন, দূর দেশে বসবাস করার কারণে বয়স বাড়তে থাকা বাবাকে প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা করা তার জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। শুধু সময়ের দূরত্ব নয়, দেশে ফিরে আসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিপুল ব্যয়, দীর্ঘ যাত্রা এবং নানা বাস্তব জটিলতা।
বাবার বয়স বাড়ছে, বাড়ছে দুশ্চিন্তাও
সন্তান বড় হয়ে নিজের জীবন নিয়ে দূরে চলে গেলেও বাবা-মায়ের বয়স থেমে থাকে না। বরং সময় যত এগোয়, তাদের শারীরিক ও দৈনন্দিন প্রয়োজন তত বাড়তে পারে। দূরে থাকা সন্তান তখন ফোনে খোঁজ নেওয়া, প্রয়োজনীয় অর্থ পাঠানো কিংবা অন্য কারও মাধ্যমে সহযোগিতা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েন।
কিন্তু কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে শুধু ফোনে পাশে থাকা সম্ভব হয় না। বাবার অসুস্থতা, হাসপাতালে যাওয়া কিংবা দৈনন্দিন কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সময় সন্তানের শারীরিক উপস্থিতির প্রয়োজন হতে পারে। তখন দূরত্বটা কেবল ভৌগোলিক থাকে না, মানসিক চাপেরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দেশে ফিরতে চাইলেও আছে বড় খরচ
প্রবাসজীবনের আরেকটি কঠিন দিক হলো হঠাৎ দেশে ফেরার ব্যয়। বিমানের টিকিট, যাতায়াত, ছুটির ব্যবস্থা এবং বিদেশে নিজের দায়িত্ব সামলে দ্রুত দেশে পৌঁছানো—সবকিছু একসঙ্গে সামলানো সহজ নয়।
বিশেষ করে জরুরি প্রয়োজনে আগেভাগে পরিকল্পনা করার সুযোগ থাকে না। ফলে অনেক সময় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি খরচ করে ফিরতে হয়। আর কর্মজীবীদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময়ের জন্য দেশে থাকা মানে চাকরি ও আয়সংক্রান্ত সমস্যার মুখোমুখি হওয়াও সম্ভব।
দূরত্বের সঙ্গে আসে এক ধরনের অপরাধবোধ
প্রবাসে থাকা সন্তানদের অনেকেই মনে করেন, তারা বাবা-মায়ের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো মিস করছেন। দূর থেকে যতই খোঁজ নেওয়া হোক, পাশে বসে কথা বলা কিংবা প্রয়োজনের মুহূর্তে হাত বাড়িয়ে দেওয়ার বিকল্প সবসময় তৈরি হয় না।
বাবার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অনুভূতি আরও গভীর হতে পারে। সন্তান তখন নিজের জীবন ও দায়িত্বের পাশাপাশি ভাবতে বাধ্য হন—প্রয়োজনে তিনি কত দ্রুত পরিবারের কাছে ফিরতে পারবেন।
প্রবাসজীবনের সাফল্যের আড়ালে অন্য এক বাস্তবতা
বিদেশে বসবাসের গল্প সাধারণত অর্থনৈতিক সুযোগ ও উন্নত জীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকে। কিন্তু এর আরেকটি দিক হলো পরিবার থেকে দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন থাকা। বাবা-মা যখন তরুণ ছিলেন, তখন সন্তান হয়তো তাদের কাছেই ছিল। কিন্তু বয়স বাড়ার সময় সন্তান যদি হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকে, তখন সেই সম্পর্কের দায়িত্ব পালন অনেক বেশি কঠিন হয়ে যায়।
এই অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, বিদেশে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত শুধু একজন ব্যক্তির জীবন বদলায় না; তার প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর। অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি পরিবারকে সময় দেওয়া, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পাশে দাঁড়ানো এবং বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আগেভাগে পরিকল্পনা করাও তাই গুরুত্বপূর্ণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















