পাকিস্তানে নারীদের ওপর নির্যাতন, হয়রানি ও সহিংসতার ঘটনা যেন থামছেই না। প্রতিদিনই কোনো না কোনো নারী শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের পরিণতি হচ্ছে মৃত্যু। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, নির্যাতনের শিকার নারীদের জন্য নিরাপদে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগও খুব সীমিত।
হিনা জাভেদের মর্মান্তিক মৃত্যু
সম্প্রতি পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির একটি আবাসিক ভবনের বাথরুম থেকে হিনা জাভেদ নামের এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এক বছরেরও কম সময় আগে তার বিয়ে হয়েছিল সাবেক অধ্যাপক ফয়সাল আসগরের সঙ্গে।
প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে মনে হলেও পরে পাওয়া আলামত পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। হিনার হাত বাঁধা ছিল, গলায় তার জড়ানো ছিল এবং সেটি বাথরুমের ঝরনার দণ্ডের সঙ্গে বাঁধা ছিল। তার মুখে কাপড়ও গুঁজে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
ময়নাতদন্তে তার ঘাড় ভাঙা এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। পাঁজর, কোমর ও ঠোঁটেও আঘাতের প্রমাণ ছিল। এসব আলামত থেকে তাকে নির্যাতন করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার শরীরে বিষক্রিয়ার সম্ভাব্য চিহ্নও পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় তার স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তদন্ত ও আদালতের কার্যক্রম চলছে।
নির্যাতনের অভিযোগেও নারীরা নিরাপদ নন
পাকিস্তানে নারীদের হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগকে অনেক সময় গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না। অভিযোগ করার পরও অনেক নারী বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন। কখনো তাদেরই দোষারোপ করা হয় যে, তারা নিজেদের আচরণের কারণে পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
এমন পরিস্থিতিতে বহু নারী অভিযোগ করতেই ভয় পান। কারণ, অভিযোগ করলে নির্যাতন আরও বেড়ে যেতে পারে কিংবা সামাজিকভাবে অপমানিত হতে পারেন—এমন আশঙ্কা তাদের মধ্যে কাজ করে।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের ২৮ শতাংশ নারী এবং বিবাহিত নারীদের ৩৪ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের শারীরিক ও যৌন সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ অসংখ্য নির্যাতনের ঘটনা কখনোই কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায় না।
বাড়ছে সহিংসতার ঘটনা
একটি বেসরকারি সংস্থার সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পাকিস্তানে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ৭ হাজার ৭১টি ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। এর আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ২৫৩। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রকাশ্যে আসা ঘটনাই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তবে এই সংখ্যা পুরো চিত্র তুলে ধরে না। কারণ পারিবারিক ও সামাজিক চাপের কারণে অনেক নারী নির্যাতনের কথা প্রকাশ করতে পারেন না।
কোথায় যাবেন নির্যাতনের শিকার নারীরা?
নারী নির্যাতনের এই সংকটের পেছনে দুটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামো অনেক নারীকে সহিংস সম্পর্কের মধ্যেই আটকে রাখে। দ্বিতীয়ত, নির্যাতন থেকে পালিয়ে যাওয়া নারীদের জন্য নিরাপদ ও গোপন আশ্রয়ের ব্যবস্থা খুবই অপ্রতুল।
অনেক ক্ষেত্রে আইনি কাঠামোও জটিলতা তৈরি করে। আদালতের নির্দেশে কোনো নারীকে তার আইনগত অভিভাবকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব। অথচ সেই অভিভাবকই যদি তার নির্যাতনকারী হন, তাহলে ওই নারী আবারও একই বিপদের মধ্যে পড়ে যান।
নারীরা একে অন্যকে সাহায্য করতেও সবসময় সক্ষম হন না। পুরুষতান্ত্রিক পারিবারিক কাঠামোর কারণে অনেক নারী নিজের বন্ধু, স্বজন কিংবা প্রতিবেশী নির্যাতনের শিকার হলেও কার্যকরভাবে পাশে দাঁড়াতে পারেন না।
প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয়
হিনা জাভেদের ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, নির্যাতনের শিকার নারীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় কতটা জরুরি। শুধু আইন থাকলেই হবে না, সেই আইন বাস্তবে প্রয়োগের পাশাপাশি নারীদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রও তৈরি করতে হবে।
এসব আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, আইনি সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। একই সঙ্গে এমন আইন দরকার, যাতে কোনো নারীকে তার নির্যাতনকারীর কাছে জোর করে ফিরিয়ে দেওয়া না হয়।
হিনা জাভেদের জন্য হয়তো অনেক দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু এখনো অসংখ্য নারীকে রক্ষা করার সুযোগ রয়েছে। তাদের জন্য নিরাপদ জায়গা তৈরি করা গেলে হয়তো ভবিষ্যতে আর কোনো নারীকে নির্যাতনের পর বাথরুমে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে হবে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















