পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ও কিংবদন্তি ক্রিকেটার জাভেদ মিয়াঁদাদ কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। দীর্ঘদিনের সতীর্থ ইমরানকে ‘সৎ মানুষ’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি পাকিস্তান সরকারের প্রতি আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করে তাঁকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
১৯৯২ সালে ইমরান খানের নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতেছিল। সেই দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন মিয়াঁদাদ। দুজন পাকিস্তানের হয়ে ৭৮টি টেস্ট ম্যাচ একসঙ্গে খেলেছেন, যা দেশটির ক্রিকেট ইতিহাসে একই দলের দুই সতীর্থের মধ্যে সর্বোচ্চ।
‘আমরা সবাই পাকিস্তানি, একসঙ্গে বসে সমস্যার সমাধান করুন’
পাকিস্তানি সাংবাদিকদের পরিচালিত একটি অনুষ্ঠানে ইমরান খান প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মিয়াঁদাদ বলেন, বিষয়টি কেন এত দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে, সেটিই তাঁর বোধগম্য হচ্ছে না।
তিনি বলেন, “কেউ আমাকে এটা বুঝিয়ে বলুন। সে কি পাকিস্তানকে খেয়ে ফেলবে? আমরা সবাই পাকিস্তানি। আমাদের একসঙ্গে বসে সমস্যার সমাধান করা উচিত। পাকিস্তানের এখন সেটিই প্রয়োজন। বিষয়টি অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ করা হচ্ছে, এটা ঠিক নয়।”
৬৯ বছর বয়সী মিয়াঁদাদ তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনে ইমরানের সঙ্গে কোনো বিরোধ বা শত্রুতার কথা অস্বীকার করেন। তাঁর ভাষায়, তাঁদের মধ্যে কখনো শত্রুতা ছিল না, কোনো বড় ধরনের ঝগড়াও হয়নি।
ইংল্যান্ডে কাউন্টি ক্রিকেট খেলার সময় ইমরানের সঙ্গে কাটানো দিনের স্মৃতিও তুলে ধরেন মিয়াঁদাদ। তিনি জানান, তাঁরা প্রায় ছয় মাস ইংল্যান্ডে একসঙ্গে ছিলেন এবং পরে পাকিস্তান দলের অধিনায়কত্বও ইমরানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
‘ইমরান একজন সৎ মানুষ’
মিয়াঁদাদ বলেন, ইমরান শুধু তাঁর সতীর্থ নন, দীর্ঘ সময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধাও। ক্রিকেট মাঠে তাঁরা পাকিস্তানের জন্য লড়াই করেছেন এবং একসঙ্গে দেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছেন।
আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “সে-ও কারও সন্তান। আমি প্রায়ই ভাবি—বেচারা মানুষটি কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম। একসঙ্গে কাউন্টি ক্রিকেট খেলেছি, সময় কাটিয়েছি, একে অপরকে খুব ভালোভাবে বুঝতাম।”
ইমরানের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে অতীতে সমালোচনা করেছিলেন মিয়াঁদাদ। অবসরের পর ইমরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড পরিচালনা নিয়েও তিনি একাধিকবার প্রশ্ন তুলেছিলেন। তবে এবার তিনি ইমরানের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও পাকিস্তানের জন্য সাবেক অধিনায়কের অবদানের কথা সামনে এনেছেন।
মিয়াঁদাদ বলেন, “যেটা ভুল, সেটা ভুল। তবে অবশ্যই সে জাতীয় বীর। আমি প্রার্থনা করি, এই সমস্যার সমাধান হোক। আমি পাকিস্তান সরকারের কাছেও আবেদন করছি। হয়তো অনেক কিছু বলার অবস্থানে আমি নেই, কিন্তু এটুকু বলতে পারি—সে আমার সহকর্মী। আমরা অনেক সময় একসঙ্গে কাটিয়েছি, একসঙ্গে খেলেছি। আমি ইমরানকে খুব ভালোভাবে চিনি। সে একজন সৎ মানুষ।”
কথা বলতে গিয়ে চোখে পানি
ইমরানের প্রসঙ্গে বলতে বলতে একপর্যায়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি মিয়াঁদাদ। চোখে পানি নিয়ে তিনি বলেন, “আমার প্রার্থনা হলো, শেষ পর্যন্ত যেন ন্যায় ও সঠিক বিষয়টিরই জয় হয়। আমি আর কী বলতে পারি? আপনি আমার চোখে পানি এনে দিয়েছেন। আমি হৃদয় থেকে কথাগুলো বলছি।”
এরপর তিনি আরও বলেন, ইমরানের জন্য তাঁর কিছু করার সুযোগ থাকলে তিনি অবশ্যই তা করবেন। ক্রিকেটে তাঁদের সব প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল পাকিস্তানের জন্য—এখন ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সব বিভেদ ভুলে যাওয়ার সময় এসেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মিয়াঁদাদের ভাষায়, “আমরা সবাই পাকিস্তানি। আমরা সবাই পাকিস্তানের পতাকা বহন করেছি। অন্য সব পার্থক্যের অবসান হওয়া উচিত। দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে সে কারও চেয়ে কম নয়। আমরা ক্রিকেট মাঠে লড়াই করেছি। কার জন্য লড়াই করেছি? পাকিস্তানের জন্য। যা হওয়ার হয়েছে। সবাই ভুল করে। এবার এটা শেষ করুন।”
‘ইমরানের কিছু হলে পুরো পাকিস্তান কাঁদবে’
ইমরানের প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় নিয়েও কথা বলেন মিয়াঁদাদ। তাঁর দাবি, ইমরান দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে চুরি করার অভিযোগ নেই।
ইমরানের শারীরিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মিয়াঁদাদ বলেন, “আল্লাহ না করুন, তাঁর কিছু হয়ে গেলে দেশে কী ঘটবে, সেটা কি আপনারা কল্পনা করতে পারেন? পুরো পাকিস্তান কাঁদবে।”
এর আগে ২৪ আগস্ট পাকিস্তানের ২১ জন সাবেক আন্তর্জাতিক অধিনায়ক দেশটির সরকারের কাছে ইমরানের যথাযথ চিকিৎসা ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্সও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইমরানের বিষয়ে সমর্থন প্রকাশ করেছিলেন।
বিশ্বকাপ জয়ের সেই ঐতিহাসিক জুটি
ইমরান খান ও জাভেদ মিয়াঁদাদের ক্রিকেটীয় বন্ধুত্বের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফাইনালে তৃতীয় উইকেটে দুজন মিলে ১৩৯ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েছিলেন। সেই জুটি পাকিস্তানের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র একদিনের বিশ্বকাপ জয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
বিশ্বকাপ জয়ের পর ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ইমরান। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি।
ক্ষমতা হারানোর পর দুর্নীতিসহ বিভিন্ন মামলায় সাজা পেয়ে কারাবন্দি হন ইমরান। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও মামলায় কোনো অন্যায় করার কথা তিনি অস্বীকার করে আসছেন। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই এসব মামলা করা হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















