ইউক্রেনের সম্মুখসারির আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিটগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় সংকট সবসময় ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি নয়। শত্রুর ড্রোন শনাক্ত করা, আগাম সতর্কতা পাওয়া এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সচল রাখার জন্য যেসব বৈদ্যুতিন যন্ত্রপাতি দরকার, সেগুলোর ঘাটতিই এখন বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে।
ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে কঠিন বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম জোগাড়
ইউক্রেনের কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনাকারী এক সার্জেন্ট, যিনি ‘ইয়াঙ্কি’ নামে পরিচিত, জানিয়েছেন, তাদের ইউনিটের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি হলো প্রয়োজনীয় সহায়ক সরঞ্জাম সংগ্রহ করা।
তার ভাষায়, মূল অস্ত্রের চেয়ে বৈদ্যুতিন যুদ্ধ সরঞ্জাম, ড্রোন শনাক্তকারী যন্ত্র, বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা এবং বড় ব্যাটারি জোগাড় করাই বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই ধরনের কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিচু দিয়ে উড়ে আসা বিমান, হেলিকপ্টার, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন মোকাবিলায় ব্যবহৃত হয়। ইউক্রেনের সম্মুখসারির প্রতিরক্ষায় এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ড্রোন শনাক্ত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
রুশ ড্রোনের হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনীয় সেনারা ক্রমেই ছোট হাতে বহনযোগ্য কিংবা যানবাহনে বসানো ড্রোন শনাক্তকারী যন্ত্র ব্যবহার করছেন। এসব যন্ত্র ড্রোন থেকে আসা বেতার সংকেত শনাক্ত করে আগাম সতর্কবার্তা দিতে পারে।
কিন্তু এসব সরঞ্জামের পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। ফলে কোনো কোনো ইউনিটকে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম যন্ত্রপাতি নিয়েই কাজ করতে হচ্ছে।
ইয়াঙ্কি জানান, তাদের আরেকটি বড় প্রয়োজন বহনযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা ও বড় ব্যাটারি। সম্মুখসারির অবস্থানগুলোতে বিদ্যুতের সংযোগ সহজলভ্য নয়। তার ওপর রুশ হামলায় ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামো প্রায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বহনযোগ্য বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ব্যাটারি দিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা, কম্পিউটার, ড্রোন সরঞ্জাম, সেন্সর এবং বৈদ্যুতিন যুদ্ধব্যবস্থা সচল রাখা যায়। প্রচলিত জেনারেটর ব্যবহার করলে বেশি শব্দ হয়, যা সেনাদের অবস্থান শত্রুর কাছে প্রকাশ করে দিতে পারে।
বৈদ্যুতিন যুদ্ধেও সরঞ্জামের ঘাটতি
রুশ যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত করা এবং ড্রোনের কার্যক্রমে বাধা দিতে বৈদ্যুতিন যুদ্ধব্যবস্থা ইউক্রেনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই সরঞ্জামগুলোর অনেকগুলো তুলনামূলকভাবে নতুন এবং প্রচলিত গোলাবারুদের মতো ব্যাপক হারে উৎপাদিত হয় না।
চাহিদা বেশি হলেও উৎপাদন সীমিত। এর সঙ্গে সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থার নানা জটিলতা যুক্ত হওয়ায় সম্মুখসারির সব ইউনিট সমানভাবে সরঞ্জাম পাচ্ছে না।
ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীতে অস্ত্র ও সরঞ্জাম সংগ্রহের ব্যবস্থা অনেক পশ্চিমা দেশের মতো পুরোপুরি কেন্দ্রীভূত নয়। অনেক ইউনিট নিজেদের উদ্যোগে সরঞ্জাম সংগ্রহ করে। কখনো তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা হয়।
এই ব্যবস্থার একটি সুবিধা হলো সেনারা সরাসরি নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করে দ্রুত নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারে। তবে এর ফলে এক ইউনিটের কাছে পর্যাপ্ত সরঞ্জাম থাকলেও অন্য ইউনিটে একই সরঞ্জামের তীব্র ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেন গুরুত্বপূর্ণ
ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষায় কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টিংগার, পোল্যান্ডের পিওরুন এবং সোভিয়েত নকশার ইগলার মতো ব্যবস্থা এর অন্তর্ভুক্ত।
রুশ বিমান ও হেলিকপ্টারের নিচু উচ্চতায় অভিযান পরিচালনা কঠিন করে তুলতে এসব অস্ত্র বড় ভূমিকা রেখেছে। রুশ পাইলটদের সামনে অনেক সময় দুটি ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প তৈরি হয়—উঁচু দিয়ে উড়লে স্থলভিত্তিক দীর্ঘপাল্লার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নজরে পড়ার আশঙ্কা, আর নিচু দিয়ে উড়লে কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের ঝুঁকি।
এর ফলে ইউক্রেনের অন্যান্য স্থলভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপও কিছুটা কমেছে।
সম্মুখসারিতে কয়েকশ মিটারও জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন
ইয়াঙ্কির ইউনিট এমন পদাতিক সেনাদের আকাশ প্রতিরক্ষা দেয়, যাদের যুদ্ধক্ষেত্রের সবচেয়ে সামনের অবস্থানে পৌঁছাতে হয়। ফলে তার ইউনিটও সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকির মধ্যে থাকে।
তিনি জানান, সেখানে পরিস্থিতি এতটাই বিপজ্জনক যে নিরাপদ সুযোগের অপেক্ষায় মাত্র ৩০০ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করতেও সাত দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। এত অল্প দূরত্ব পাড়ি দেওয়াও কখনো জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
ইয়াঙ্কি বর্তমানে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি আধুনিক সামরিক কৌশল ও মানদণ্ডের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি ইউক্রেনে ফিরে গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন কৌশল ও প্রযুক্তি কাজে লাগাতে চান।
শুধু ক্ষেপণাস্ত্র নয়, পুরো ব্যবস্থাটিই গুরুত্বপূর্ণ
যুদ্ধের শুরু থেকে ইউক্রেনের বিভিন্ন ইউনিট মাঝেমধ্যে কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতির কথাও জানিয়েছে। তবে বড় ধরনের স্থলভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মতো সংকটজনক ঘাটতি এই অস্ত্রগুলোতে দীর্ঘমেয়াদে দেখা যায়নি। মিত্র দেশগুলোও যুদ্ধের বিভিন্ন সময়ে নতুন সরবরাহ দিয়েছে।
তবে যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু ক্ষেপণাস্ত্র থাকলেই আকাশ প্রতিরক্ষা কার্যকর হয় না। শত্রুর লক্ষ্য শনাক্ত করা, দ্রুত সতর্কতা পাওয়া, যোগাযোগ বজায় রাখা এবং অস্ত্র ও সেন্সর সচল রাখার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিগত অবকাঠামো প্রয়োজন।
ইউক্রেনের বর্তমান অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, আধুনিক যুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের ঘাটতি সবসময় চোখে দেখা যায় না। কখনো একটি ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে সেটি ছোড়ার আগে শত্রুর অবস্থান শনাক্ত করে দেওয়ার ছোট একটি বৈদ্যুতিন যন্ত্রই হয়ে উঠতে পারে বেশি মূল্যবান।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















