বাংলাদেশের গভীরতর জ্বালানি সংকটে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়ে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১০৭ শতাংশ বেশি। একই সময়ে গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় থাকা ১ হাজার ৮৫৭টি আবেদনের বিপরীতে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার শিল্প বিনিয়োগ আটকে আছে। রোববার মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ যৌথভাবে উপস্থাপিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণাটি ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ: আরও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশের জন্য জ্বালানি’ শীর্ষক উপস্থাপনায় তুলে ধরা হয়। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট হাসিব হাসান এটি উপস্থাপন করেন। এমসিসিআই ও পলিসি এক্সচেঞ্জের যৌথ উদ্যোগ বাংলাদেশ বিজনেস ক্লাইমেট ইনডেক্সের তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণাটি করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে বড় ঘাটতি
গবেষণায় বলা হয়েছে, ব্যবসায়িক অবকাঠামোর মান কমেছে। এখন অবকাঠামোর শারীরিক প্রবেশাধিকারের চেয়ে নির্ভরযোগ্য সরবরাহই ব্যবসার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৭৪ দশমিক ২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তারা কখনো কখনো বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মুখে পড়ে। ১৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বলেছে, ইউটিলিটি সংযোগ পেতে প্রায়ই অনানুষ্ঠানিক অর্থ দিতে হয়েছে। অবকাঠামো সরবরাহে কাঠামোগত বা নিয়ন্ত্রক উন্নতি দেখেছে মাত্র ২০ দশমিক ১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান।
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি), বিপরীতে কার্যকর সরবরাহ ২ হাজার ৪২০ এমএমসিএফডি। ফলে ঘাটতি ১ হাজার ৩৮০ এমএমসিএফডি বা মোট চাহিদার ৩৬ শতাংশ। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সার উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস সরবরাহ করায় সিএনজি স্টেশন ও শিল্প খাত সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়ছে। সিএনজি খাতে সরবরাহ চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ পূরণ করছে।
এলএনজি সরবরাহে বাধা, শিল্পে স্থবিরতা
এলএনজি আমদানির একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত বাধাও সংকটকে তীব্র করেছে। ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের পর এক্সেলারেটের ৬০০ এমএমসিএফডি সক্ষমতার ভাসমান এলএনজি স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) বন্ধ হয়ে যায় এবং এখনো আংশিকভাবে চালু হয়েছে। মহেশখালীর সম্মিলিত এলএনজি আমদানি সক্ষমতাও প্রায় ১ হাজার ৫০ এমএমসিএফডির সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম কার্যকর রয়েছে। আগস্টে তিন দফা দরপত্রে লক্ষ্যমাত্রার তিনটি এলএনজি কার্গোর মধ্যে দুটি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে, তাও বাড়তি দামে। পাশাপাশি দেশে গ্যাস উৎপাদন টানা নয় বছর ধরে কমছে।
গবেষণায় বলা হয়, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পাঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে নরসিংদী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ। নরসিংদীতে ৩ হাজারের বেশি টেক্সটাইল ও ডাইং মিল রয়েছে, যা দেশের স্থানীয় কাপড়ের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ জোগান দেয়। সেখানে ৩০০টির বেশি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং কিছু কারখানা বয়লার চালাতে কাঠ ব্যবহার করছে। গাজীপুরে গ্যাস সরবরাহ চাহিদার মাত্র ৪৫ শতাংশ। নারায়ণগঞ্জে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, তাদের ১ হাজার ৮৫০ সদস্য কারখানার মধ্যে প্রায় ৯০০টি বন্ধ রয়েছে।
আমদানি নির্ভরতা ও ব্যয় বাড়ছে
আইইইএফএর তথ্য উদ্ধৃত করে গবেষণায় বলা হয়েছে, চার বছর আগে প্রাথমিক জ্বালানিতে বাংলাদেশের আমদানি নির্ভরতা ছিল ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ, যা এখন বেড়ে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। এশিয়ার স্পট এলএনজির দামও জানুয়ারির ১০ দশমিক ৫ ডলার থেকে আগস্টে বেড়ে ২৫ দশমিক ৩ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, কাতারে সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং ইউরোপে আগাম শীতকালীন মজুদের কারণে দাম বেড়েছে।
এ সংকটে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমেছে, যা আগের বছর ছিল ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ। একই সময়ে অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা বাবদ অর্থপ্রদান চলতি অর্থবছরে ৪৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সমাধানে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ
গবেষণায় শিল্প ও রপ্তানি অঞ্চলের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক ও পূর্বানুমানযোগ্য গ্যাস-বিদ্যুৎ রেশনিং সূচি, এলএনজি আমদানি ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়িয়ে অন্তত সাত দিনের কৌশলগত মজুত এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দক্ষতা বৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদে পারমাণবিক বিদ্যুৎসহ বহুমুখী জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার, একাধিক এফএসআরইউ ও দীর্ঘমেয়াদি সরকারি পর্যায়ের চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি সংগ্রহে বৈচিত্র্য আনা, সক্ষমতা-চার্জ কাঠামো সংস্কার এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো শক্তিশালী করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গবেষণার মতে, কর্মকর্তাদের ধারণা অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি টেকসইভাবে কাটিয়ে উঠতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে। তাই জ্বালানি নিরাপত্তাকে কেবল ইউটিলিটি খাতের বিষয় নয়, বরং কৌশলগত অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















