বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারত। প্রায় ৪ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারের নামমাত্র মোট দেশজ উৎপাদন নিয়ে দেশটি বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতি। বিশাল বাজারের কারণে বিশ্বের বহু দেশ ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী। ভৌগোলিকভাবেও ভারত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির বিস্তৃত ভূখণ্ড ভারত মহাসাগরের উত্তর প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত।
এতসব কৌশলগত সুবিধা থাকার পরও বর্তমান বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে ভারতের গুরুত্ব কি আগের তুলনায় কমছে? কয়েকটি কারণ বিশ্লেষণ করলে এমন একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল বদল
দীর্ঘদিন ধরে চীনের উত্থান ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ছিল ভারত। দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তায় নিজেদের প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি ভারত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, কোয়াড, আইটু-ইউটু এবং ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডরের মতো বিভিন্ন উদ্যোগে যুক্ত হয়েছিল।
চীনও বুঝতে পেরেছিল, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত চীনকে ঘিরে ফেলতে চাইছে। প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগর দিয়ে চীনের পণ্য রপ্তানির পথও ভবিষ্যতে সংকুচিত করার চেষ্টা হতে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল বেইজিংয়ের।
কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টাতে শুরু করে। রাশিয়ার বৃহত্তর ইউরেশিয়া অংশীদারত্বের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চীন উত্তর দিকের স্থলপথ এবং আর্কটিক মহাসাগর হয়ে সমুদ্রপথ ব্যবহারে গুরুত্ব বাড়ায়।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রও চীনের সঙ্গে সংঘাতের বদলে ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা’র দিকে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৬ সালের মে মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের সময় এ অবস্থানের ঘোষণা আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র তার ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের নাম আবার প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমান্ডে পরিবর্তন করে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ভারতের গুরুত্বের জায়গায় ধীরে ধীরে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশের পরিচয় বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
২০২৫ সালের সংঘাত বদলে দিয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য
দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি আসে ২০২৫ সালের মে মাসের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পর।
২০১৬ ও ২০১৯ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আগ্রাসী পদক্ষেপের পর ভারতীয় সরকার ধারণা করেছিল, পাকিস্তানকে সামরিকভাবে চাপে রাখা সম্ভব। সেই আত্মবিশ্বাস থেকেই ২০২৫ সালের ৭ মে পাকিস্তানের নয়টি লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়।
কিন্তু পাকিস্তান পাল্টা শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং ১০ মে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নিতে হয়।
যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও ভারত সেই ভূমিকা যথাযথভাবে স্বীকার করেনি। এর ফলে যে দেশটির সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার চেষ্টা করছিল ভারত, সেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেই প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ার মতো একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়ে নয়াদিল্লি।
অন্যদিকে পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে স্বীকৃতি পায়। এর পরপরই ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব পাকিস্তানের সঙ্গে কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করে।
এরপর চলতি মাসে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। ফলে পশ্চিম এশিয়ায় নিজের কৌশলগত অবস্থান কীভাবে এবং কেন দুর্বল হয়েছে, তা নিয়ে ভারতকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।
প্রতিবেশীদের সঙ্গে দূরত্ব
দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে কম সমন্বিত অঞ্চলগুলোর একটি। এর অন্যতম কারণ ভারতের সঙ্গে বেশিরভাগ প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ নয়।
আঞ্চলিক সহযোগিতার সংগঠন সার্কও কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সমালোচকদের মতে, অন্য দক্ষিণ এশীয় দেশগুলো একজোট হয়ে ভারতের প্রভাবের ভারসাম্য তৈরি করতে পারে—এমন সম্ভাবনা এড়াতেই ভারত সার্ককে কার্যকর হতে দেয়নি।
কিন্তু ভারতের নীতিনির্ধারকদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন, শুধু অর্থনীতি ও সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে কোনো দেশের বৈশ্বিক মর্যাদা স্থায়ী করা যায় না। আঞ্চলিক দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে না পারলে ভারতের আন্তর্জাতিক প্রভাবও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাবে না।
বৈশ্বিক দক্ষিণে চীনের এগিয়ে থাকা
ভারত দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে উন্নয়নশীল বিশ্বের বা বৈশ্বিক দক্ষিণের অন্যতম মুখপাত্র হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অবকাঠামো, জ্বালানি ও অন্যান্য বৃহৎ প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে চীন অনেক বেশি এগিয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের দিকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে ঝুঁকেছে। এতে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর কাছে ভারতের অগ্রাধিকার সম্পর্কে একটি পরিষ্কার বার্তা গেছে।
এর একটি উদাহরণ হলো ব্রিকসের অভিন্ন মুদ্রা চালুর প্রস্তাবের বিরোধিতা। যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের বিকল্প হিসেবে অভিন্ন মুদ্রা তৈরির উদ্যোগে ভারত সমর্থন দেয়নি। যদিও নিজ নিজ জাতীয় মুদ্রায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বিরোধিতা করেনি দেশটি।
মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের উত্থান
ভারতের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হওয়ার আরেকটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে পাকিস্তানের কূটনৈতিক সক্রিয়তা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ৪০ দিনব্যাপী যুদ্ধের পর যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে সরাসরি আলোচনায় বসানো হয়। পাকিস্তানের উদ্যোগে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকও সম্পন্ন হয়। পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা এখনও চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি।
পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক তৎপরতা বিশ্বের বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হলেও ভারত ও ইসরায়েল এর ব্যতিক্রম। দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরুর মাত্র তিন দিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইসরায়েল সফর করেন এবং দেশটির প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানান। কিন্তু গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। এর মধ্য দিয়ে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে ভারতের প্রকৃত অগ্রাধিকার আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাকিস্তানের কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ার ফলে দেশটিকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার জন্য ভারতের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
অর্থনীতিতে শক্তিশালী হওয়াই পাকিস্তানের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ
এই পাঁচটি কারণে বর্তমান সময়ে ভারতের কৌশলগত গুরুত্ব কিছুটা কমেছে বলে বিশ্লেষণটি মনে করে। বিপরীতে পাকিস্তানের সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক পরিসরে এই অবস্থান ধরে রাখতে পাকিস্তানকে এখন অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির দিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ কোনো দেশের নাগরিককেন্দ্রিক সুশাসন ও অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
এ কারণে তৃণমূল পর্যায়ে সম্পদ ও ক্ষমতা কীভাবে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়, তা নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। এই বিতর্ককে শুধু আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর যৌক্তিক পরিণতির দিকে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
ভারতের কৌশলগত প্রভাবের পরিবর্তন যেমন দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে, তেমনি পাকিস্তানের জন্যও এটি নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সেই সুযোগ দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগাতে হলে কূটনীতি ও সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ভিত আরও শক্তিশালী করাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















