একটি দেশের সামরিক বাহিনীকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনেই থাকতে হয়—এটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক শর্ত। কিন্তু সেই রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ যদি সামরিক পেশাদারিত্ব, অভিজ্ঞতা ও স্বাধীন মূল্যায়নের জায়গা সংকুচিত করে ফেলে, তাহলে তার মূল্য দিতে হয় যুদ্ধক্ষেত্রে। আবার সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর নামে যদি একটি বাহিনীর রাজনৈতিক ক্ষমতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তাতেও গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও পাকিস্তানের সামরিক-রাজনৈতিক সম্পর্কের দিকে তাকালে এই দুই বিপরীত ঝুঁকি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিন দেশের পরিস্থিতি এক নয়, কিন্তু তিনটি ঘটনাতেই একটি অভিন্ন প্রশ্ন সামনে আসে—রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও সামরিক কার্যকারিতার মধ্যে ভারসাম্য কোথায়?
যুক্তরাষ্ট্রে আনুগত্য বনাম পেশাদারিত্ব
যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের অস্থিরতা এই প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে এনেছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে সেনাপ্রধান জেনারেল র্যান্ডি জর্জের বিরোধ এবং পরবর্তী সময়ে জর্জের অপসারণ কেবল একটি প্রশাসনিক ঘটনা হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে ধারাবাহিক পরিবর্তন এবং চার তারকা জেনারেলের সংখ্যা কমে যাওয়ার মতো বিষয়।
সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘অবজেক্টিভ সিভিলিয়ান কন্ট্রোল’ ধারণার মূল কথা হলো, রাজনৈতিক নেতৃত্ব জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করবে এবং সামরিক বাহিনী সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য পেশাদার পরামর্শ ও সামরিক সক্ষমতা সরবরাহ করবে। কিন্তু এই ব্যবস্থা কার্যকর হতে হলে সামরিক নেতৃত্বকে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষার বদলে পেশাগত দক্ষতার ভিত্তিতে কাজ করার সুযোগ দিতে হয়।

দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন সামরিক সংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তন আনতে চাইছে। যুদ্ধক্ষমতা, ‘ওয়ারিয়র’ মানসিকতা এবং তথাকথিত রাজনৈতিক শুদ্ধতার বিরুদ্ধে অবস্থান সেই পরিবর্তনের অংশ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সংস্কারটি কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং তার ফলে বাহিনীর যুদ্ধক্ষমতা বাড়ছে, নাকি উল্টো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?
যুদ্ধের সময় নেতৃত্বে ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সামরিক মোতায়েন চলার সময়েই মার্কিন সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তন ঘটছে। একই সঙ্গে আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—ড্রোন, দূরপাল্লার নির্ভুল অস্ত্র এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ—নিয়ে পরীক্ষামূলক উদ্যোগও সংকুচিত হচ্ছে।
জেনারেল জর্জের অধীনে ইতালিতে ১৭৩তম এয়ারবোর্ন ব্রিগেডের সঙ্গে ইউক্রেনের যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে একটি মানববিহীন আক্রমণ ইউনিট গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নতুন নেতৃত্বের ‘ব্যাক-টু-বেসিকস’ দৃষ্টিভঙ্গিতে সেই প্রকল্প বন্ধ হওয়ার পথে। ইউরোপীয় কমান্ডের নেতৃত্বে থাকা জেনারেল ক্রিস ডোনাহিউও জুলাইয়ে অপসারিত হন। ফলে যুদ্ধের চরিত্র বদলে যাওয়ার যে বাস্তবতা, তার সঙ্গে সামরিক বাহিনী কত দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারবে—সেটিই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরেকটি উদ্বেগ বেসামরিক হতাহতের বিষয়টি ঘিরে। পেন্টাগনের বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমানোর কর্মসূচি সংকুচিত করার পর মার্কিন সামরিক অভিযানে বিপুল সংখ্যক বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এখন সেই সক্ষমতার একটি অংশ পুনর্গঠনের প্রস্তাবও এসেছে। অর্থাৎ যে ব্যবস্থা একসময় অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হয়েছিল, বাস্তব যুদ্ধ আবার তার প্রয়োজনীয়তা সামনে আনছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার সংকট। একের পর এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার অপসারণ বাহিনীর অন্য কর্মকর্তাদের মধ্যেও একটি ধারণা তৈরি করতে পারে—পেশাগত মতামতের চেয়ে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য অবস্থানই হয়তো পদোন্নতির জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো আনুষ্ঠানিক আনুগত্যের পরীক্ষা না থাকলেও এমন সংস্কৃতি তৈরি হওয়া সামরিক প্রতিষ্ঠানের জন্য বিপজ্জনক।
চীনে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অন্য রূপ
চীনের ক্ষেত্রে চিত্রটি আরও কাঠামোগত। পিপলস লিবারেশন আর্মি শুরু থেকেই কমিউনিস্ট পার্টির বাহিনী। সেখানে সেনাবাহিনীর ওপর পার্টির নিয়ন্ত্রণ কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তিগত নীতি। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও সামরিক আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে যুদ্ধক্ষমতাকেই চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে তুলে ধরেছেন।
কিন্তু দুর্নীতি ও আনুগত্যের প্রশ্নে শির ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান সামরিক বাহিনীর অভিজ্ঞ নেতৃত্বকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। ২০২২ সালের পর শতাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অপসারিত হয়েছেন বা জনসমক্ষে তাদের উপস্থিতি বন্ধ হয়েছে। উচ্চপদে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যেও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। শীর্ষ পর্যায়ের বহু গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘ সময় পূর্ণ হয়নি।
এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে তাইওয়ানকে ঘিরে চীনের সামরিক পরিকল্পনায়। তাইওয়ান অবরোধ বা আক্রমণ হবে চীনের জন্য অত্যন্ত জটিল সামরিক অভিযান। সেখানে শুধু একটি বাহিনীর দক্ষতা যথেষ্ট নয়; স্থল, নৌ, বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, মহাকাশ, সাইবার এবং অন্যান্য সক্ষমতার সমন্বিত ব্যবহার প্রয়োজন হবে।
সমস্যা হলো, ১৯৭৯ সালের পর চীনের সামরিক বাহিনী বড় কোনো যুদ্ধ করেনি। ফলে বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সীমিত। শীর্ষ পর্যায়ের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের অপসারণের ফলে অপেক্ষাকৃত কম অভিজ্ঞ নেতৃত্বকে আরও বড় দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের সবচেয়ে অভিজ্ঞ দুই কর্মকর্তা ঝাং ইউশিয়া ও লিউ ঝেনলি তদন্তের আওতায় আসায় শীর্ষ নেতৃত্বে বাস্তব যুদ্ধ-অভিজ্ঞতার ঘাটতি আরও প্রকট হয়েছে।

চীন অবশ্যই এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে। শি জিনপিং নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারেন এবং সামরিক কাঠামো পুনর্গঠন করতে পারেন। কিন্তু যে বাহিনী তার ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল সামরিক অভিযানের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তার অভিজ্ঞ নেতৃত্ব যদি একই সময়ে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও যুদ্ধক্ষমতার মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
পাকিস্তানে উল্টো সমস্যা
পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটা ভিন্ন। সেনাপ্রধান ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের হাতে একীভূত হওয়ায় সামরিক কমান্ড আরও কেন্দ্রীভূত হয়েছে। আধুনিক যুদ্ধের দৃষ্টিকোণ থেকে এর যুক্তি আছে। বিভিন্ন সামরিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রকে একই কাঠামোর অধীনে এনে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা ভবিষ্যৎ যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয়।
কিন্তু পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সংস্কারের তাৎপর্য শুধু সামরিক দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির সেনাবাহিনী বহুদিন ধরেই সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। ইমরান খানের কারাবাস এবং সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে তার বিরোধ পাকিস্তানের বেসামরিক-সামরিক ভারসাম্যহীনতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
তাই সামরিক কমান্ড আরও কেন্দ্রীভূত হলে সেটি একই সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণও বাড়াতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ সামরিক পেশাদারিত্বকে সংকুচিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে, চীনে রাজনৈতিক শুদ্ধি সামরিক অভিজ্ঞতাকে ক্ষয় করছে; পাকিস্তানে আবার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়াই এমন একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা বাড়াতে পারে, যার রাজনৈতিক প্রভাব ইতোমধ্যে গণতান্ত্রিক কাঠামোর তুলনায় অনেক বেশি।
ভারতের জন্য শিক্ষাটি কোথায়
ভারতের সামনে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো এই দুই বিপরীত ঝুঁকি এড়িয়ে চলা। সশস্ত্র বাহিনীকে অবশ্যই নির্বাচিত সরকারের নির্ধারিত জাতীয় লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ করতে হবে। সামরিক শক্তি কখন এবং কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বের। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে সামরিক বাহিনীকে নির্ভয়ে বলতে দিতে হবে—লক্ষ্যটি অর্জনযোগ্য কি না, তার জন্য কী সক্ষমতা প্রয়োজন এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি কী।
একই সঙ্গে সামরিক বাহিনীর পেশাদার চরিত্র অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি। একটি দেশের সেনাবাহিনীর যুদ্ধ-সংস্কৃতি কোনো নির্দিষ্ট সরকার বা রাজনৈতিক দলের আদর্শ থেকে নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়। সেটি নির্ধারিত হবে যুদ্ধের বাস্তব প্রয়োজন, সামরিক পেশাদারিত্ব এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা স্বার্থ দিয়ে।
এর অর্থ এই নয় যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিরক্ষা বিষয়ে দূরে থাকবে। বরং এর বিপরীতটাই প্রয়োজন। প্রতিরক্ষা শিল্পে স্বনির্ভরতা, সীমান্ত অবকাঠামো, সামরিক প্রযুক্তি, মহাকাশ ও সাইবার সক্ষমতা—এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সক্রিয় দিকনির্দেশনা অপরিহার্য। কারণ ভবিষ্যতের যুদ্ধ কোনো একটি বাহিনীর একক লড়াই হবে না। স্থল, সমুদ্র, আকাশের পাশাপাশি মহাকাশ, সাইবার ও তথ্যক্ষেত্রও যুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
এই বাস্তবতায় ভারতের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভবিষ্যতে যৌথতা ও থিয়েটার কমান্ড আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে। তবে সেই কাঠামো ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তা চাহিদা অনুযায়ী তৈরি হওয়া উচিত; রাজনৈতিক প্রতীকের মর্যাদা দেওয়ার জন্য নয়।
হান্টিংটনের মূল সতর্কতাটি এখানেই প্রাসঙ্গিক। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে যুদ্ধের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে, কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই সামরিক নেতৃত্বকে সত্য কথা বলার মতো পেশাগত পরিসর দিতে হবে। শুধু রাজনৈতিক আনুগত্য সামরিক শক্তিকে কার্যকর করে না; আবার সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক ক্ষমতা সীমাহীন করাও নিরাপদ নয়।
ভারতের জন্য সঠিক পথ হলো—রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি গড়ে তুলতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের আরও গভীর সম্পৃক্ততা, একই সঙ্গে সামরিক বাহিনীর পেশাদার নিরপেক্ষতা, অভিজ্ঞতার মর্যাদা এবং নির্ভীক পরামর্শ নিশ্চিত করা। কারণ পরবর্তী যুদ্ধের সাফল্য শুধু অস্ত্রের পরিমাণে নির্ধারিত হবে না; নির্ধারিত হবে রাজনৈতিক লক্ষ্য, সামরিক বাস্তবতা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মধ্যে কতটা কার্যকর সমন্বয় তৈরি করা যায় তার ওপর।
লেখক: ব্রিগেডিয়ার (অব.) অনিল রামান, তক্ষশিলা ইনস্টিটিউশনের জিওস্ট্র্যাটেজি প্রোগ্রামের গবেষণা ফেলো।
ব্রিগেডিয়ার (অব.) অনিল রামান 


















