১৭৭৬ সালের আগস্টের শেষভাগে জর্জ ওয়াশিংটন এমন এক সামরিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিলেন, যা কেবল তাঁর নিজের বাহিনীকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়নি; অল্প বয়সী আমেরিকান স্বাধীনতা আন্দোলনের ভবিষ্যৎকেও প্রায় অনিশ্চিত করে তুলেছিল।
২৭ থেকে ২৯ আগস্ট লং আইল্যান্ডে সংঘটিত সেই যুদ্ধ ছিল স্বাধীনতার ঘোষণার পর আমেরিকান বাহিনীর প্রথম বড় সামরিক পরীক্ষা। ওয়াশিংটনের প্রায় ১০ হাজার অনভিজ্ঞ সৈন্যের বিপরীতে ছিল ২০ থেকে ২২ হাজার ব্রিটিশ ও জার্মান ভাড়াটে সৈন্য। পরাজয়ের পর আমেরিকান বাহিনী কার্যত দ্বীপের মধ্যে আটকা পড়ে যায়।
সামরিক ইতিহাসের বিচারে এটি ছিল ওয়াশিংটনের সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়গুলোর একটি। কিন্তু এর আরও গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এই বিপর্যয় শেষ পর্যন্ত বিপ্লবের পতনে পরিণত হয়নি। আর তার পেছনে ওয়াশিংটনের নেতৃত্বের পাশাপাশি কাজ করেছিল এমন কিছু পরিস্থিতি, যেগুলোকে নিছক সৌভাগ্য ছাড়া অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
ব্রিটিশদের লক্ষ্য ছিল এক আঘাতেই বিদ্রোহের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া
ব্রিটিশ নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছিল, আমেরিকান বিদ্রোহ দীর্ঘায়িত হলে সেটিকে দমন করা ক্রমেই কঠিন হবে। তাই উপনিবেশবিষয়ক ব্রিটিশ মন্ত্রী লর্ড জর্জ জার্মেইনের কৌশল ছিল শুরুতেই বিপুল সামরিক শক্তি কেন্দ্রীভূত করে ওয়াশিংটনের বাহিনীর ওপর এমন আঘাত হানা, যার পর আর সংগঠিত প্রতিরোধের সুযোগ থাকবে না।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্রিটেন বিপুলসংখ্যক সৈন্য আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে উত্তর আমেরিকায় পাঠায়। ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও জার্মানি থেকে সৈন্য আনা হয়; কানাডা ও দক্ষিণ ক্যারোলিনা থেকেও বাহিনী সরানো হয়। স্থলবাহিনীকে সহায়তা করার জন্য রাজকীয় নৌবাহিনী ও বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকেও কাজে লাগানো হয়।
সৈন্য পরিবহনের এই বিশাল আয়োজন ছিল নিজেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শক্তির প্রদর্শন। নিউইয়র্কের দিকে যখন সেই বহর এগিয়ে আসে, তখন আমেরিকানদের কাছে তা ছিল ভয়াবহ দৃশ্য। সেনাবাহিনীর আকার ছিল নিউইয়র্কসহ প্রায় সব আমেরিকান শহরের জনসংখ্যার তুলনায় বিস্ময়করভাবে বড়।
ওয়াশিংটনের বাহিনী ছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
সৈন্যদের বড় অংশ ছিল অনভিজ্ঞ। গোলাবারুদের ঘাটতি ছিল। বহু সৈন্যের নিয়োগের মেয়াদ কয়েক মাসের মধ্যেই শেষ হওয়ার কথা। পলায়ন ও বিশ্বাসঘাতকতার সমস্যা ছিল। গুটিবসন্তেও বাহিনীর একটি বড় অংশ আক্রান্ত হয়েছিল।
তারপরও নিউইয়র্ক রক্ষার সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি ছিল। স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই গুরুত্বপূর্ণ শহরটি বিনা লড়াইয়ে ছেড়ে দেওয়া নতুন রাষ্ট্রের মনোবলকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারত। ওয়াশিংটনের সামনে তাই সামরিক বিচারে দুর্বল হলেও রাজনৈতিকভাবে প্রয়োজনীয় একটি অবস্থান ধরে রাখার চাপ ছিল।
কিন্তু বিপদ আরও বাড়ল তাঁর নিজের কিছু সিদ্ধান্তে।
ভুল অনুমান, ভুল প্রস্তুতি
ওয়াশিংটন তাঁর সীমিত বাহিনীকে ম্যানহাটন ও লং আইল্যান্ডে ভাগ করে রেখেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, ব্রিটিশদের মূল আক্রমণ আসবে ম্যানহাটনের দিকে। ফলে লং আইল্যান্ডে শত্রুর প্রকৃত উদ্দেশ্য ও গতিপথ তিনি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেননি।
এখানে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর সমন্বয় ছিল বড় সুবিধা। জেনারেল উইলিয়াম হাও এবং তাঁর ভাই অ্যাডমিরাল রিচার্ড হাও স্থল ও সমুদ্র—দুই দিকের অভিযানকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করতে পারছিলেন।
রিচার্ড হাও বিশেষভাবে জলপথ ব্যবহার করে সৈন্য অবতরণ ও স্থলবাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত অভিযান পরিচালনায় দক্ষ ছিলেন। উইলিয়াম হাও আবার হালকা পদাতিক বাহিনী ব্যবহারের ক্ষেত্রে অগ্রণী ছিলেন, যা আমেরিকার অপ্রচলিত যুদ্ধপরিবেশে বিশেষ কার্যকর ছিল।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতার একটি ছিল ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে অসম্পূর্ণ তথ্য।
ব্রুকলিনের দিকে যাওয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পথ তিনি সুরক্ষিত করেছিলেন। কিন্তু একটি বিকল্প পথ—জ্যামাইকা গিরিপথ—প্রায় অরক্ষিত ছিল। ব্রিটিশ জেনারেল হেনরি ক্লিনটন সেই পথ সম্পর্কে জানতেন। কারণ নিউইয়র্কে তাঁর পারিবারিক পরিচয় ও শৈশবের কারণে এলাকার ভূপ্রকৃতি তাঁর অজানা ছিল না।
এই একটি তথ্যই যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেয়।

রাতের অন্ধকারে ঘুরে গেল ব্রিটিশ বাহিনী
২৬ আগস্ট রাতে ব্রিটিশ ও জার্মান সৈন্যদের একটি বড় অংশকে সামনে থেকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। এতে আমেরিকানদের ধারণা হয়, প্রধান আক্রমণ ওই দিকেই হবে।
কিন্তু একই সময়ে ক্লিনটন ও কর্নওয়ালিস প্রায় ১০ হাজার সৈন্য নিয়ে অন্য পথ ধরে অগ্রসর হচ্ছিলেন। রাতের অন্ধকারে তাঁরা জ্যামাইকা গিরিপথ অতিক্রম করে আমেরিকান বাহিনীর পেছনে পৌঁছে যান।
২৭ আগস্ট সকালে আক্রমণ শুরু হওয়ার পর আমেরিকান সৈন্যরা বুঝতে পারে, বিপদ শুধু সামনে নয়—তাদের পেছনেও শত্রু অবস্থান নিয়েছে।
এরপর যা ঘটে তা ছিল প্রায় সম্পূর্ণ বিপর্যয়। আমেরিকান বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। প্রায় ৭০০ থেকে ১ হাজার সৈন্য নিহত হয় এবং তিনজন সেনাপতি বন্দি হন। ওয়াশিংটন ব্রুকলিনের উঁচু অবস্থান থেকে পরিস্থিতি দেখছিলেন, কিন্তু তখন তাঁর হাতে পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার মতো কার্যকর কোনো উপায় ছিল না।
তখন মনে হচ্ছিল, বিপ্লবের সামরিক বাহিনীর পরিণতি নির্ধারিত হয়ে গেছে।
কিন্তু ব্রিটিশরা শেষ আঘাতটি করেনি।
একটি সিদ্ধান্ত, যা ইতিহাস বদলে দিল
ব্রিটিশ বাহিনী আমেরিকানদের কার্যত ঘিরে ফেলেছিল। ওয়াশিংটনের বাহিনীর সামনে ছিল শত্রু, পেছনে ছিল জলরাশি। তবু জেনারেল হাও সরাসরি সর্বাত্মক আক্রমণের পথ বেছে নিলেন না।
এর একটি কারণ ছিল বাঙ্কার হিলের অভিজ্ঞতা। সুরক্ষিত অবস্থানে থাকা আমেরিকান সৈন্যদের ওপর সম্মুখ আক্রমণ চালালে ব্রিটিশদেরও বিপুল প্রাণহানি হতে পারত। হাও তাই অবরোধের প্রস্তুতি নেওয়াকে নিরাপদ মনে করলেন।
সামরিক যুক্তিতে এই সিদ্ধান্ত বোধগম্য। কিন্তু ওয়াশিংটনের জন্য সেটিই হয়ে গেল বেঁচে থাকার সুযোগ।
আর তারপর প্রকৃতি আমেরিকানদের পক্ষে দাঁড়াল।
প্রথমে শুরু হলো প্রবল উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ঝড়। এর ফলে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর পক্ষে আমেরিকান বাহিনীকে জলপথ দিয়ে পুরোপুরি আটকে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
তারপর রাতের আকাশ ঢেকে দিল ঘন কুয়াশা।
ওয়াশিংটন বুঝলেন, এটাই হয়তো তাঁর শেষ সুযোগ।
নীরব রাতের সেই পালানো
ম্যাসাচুসেটসের মার্বেলহেড থেকে আসা জেলেদের নেতৃত্বে কর্নেল জন গ্লোভার ও তাঁর লোকেরা নৌকা নিয়ে সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার কাজে নামে। পরিকল্পনাটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সামান্য শব্দ বা ভুল হলে ব্রিটিশ বাহিনী পুরো অভিযানটি ধরে ফেলতে পারত।
কিন্তু তা হয়নি।
প্রায় ৯ হাজার ৫০০ আমেরিকান সৈন্যকে রাতের অন্ধকারে লং আইল্যান্ড থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো বাহিনী দ্বীপ থেকে সরে যায়। ওয়াশিংটনও শেষ পর্যন্ত দ্বীপ ত্যাগ করেন এবং তাঁর বাহিনীর সঙ্গে ম্যানহাটনে ফিরে আসেন।
যে সেনাবাহিনী কিছুক্ষণ আগেও ধ্বংস বা বন্দিত্বের মুখে ছিল, সেটিই বেঁচে গেল।
এই পালিয়ে যাওয়া কোনো গৌরবময় সামরিক বিজয় ছিল না। কিন্তু বিপ্লবের জন্য এর গুরুত্ব ছিল একটি বড় বিজয়ের সমান।
পরাজয়ের পর টিকে থাকার শক্তিই ছিল আসল পরীক্ষা
লং আইল্যান্ডের ঘটনা ওয়াশিংটনের নেতৃত্বের একটি জটিল ছবি সামনে আনে। তিনি ভুল করেছিলেন—এতে সন্দেহ নেই। শত্রুর উদ্দেশ্য ভুল বুঝেছিলেন। ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য সংগ্রহ করতে পারেননি। বাহিনীকে এমনভাবে ছড়িয়ে রেখেছিলেন, যা বিপদের সময় তাদের দুর্বল করে দিয়েছিল।
কিন্তু একজন সেনাপতির মূল্যায়ন শুধু তাঁর বিজয় দিয়ে হয় না। পরাজয়ের পর তিনি কী করেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ওয়াশিংটন তাঁর বাহিনীকে ধরে রাখেন। বিপর্যয়ের পরও মনোবল হারাননি। তিনি বুঝেছিলেন, একটি যুদ্ধে পরাজয় মানেই যুদ্ধের সমাপ্তি নয়।
এই মানসিক দৃঢ়তা পরবর্তী সময়ে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
লং আইল্যান্ডে আমেরিকান বিপ্লব জেতেনি। কিন্তু সেটি হারেওনি।
যদি ব্রিটিশ বাহিনী সেদিন দ্রুত সর্বাত্মক আক্রমণ চালাত, যদি হাও ঝুঁকি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেন, যদি ঝড় না উঠত, যদি কুয়াশা না নামত কিংবা যদি জ্যামাইকা গিরিপথ আগেই সুরক্ষিত থাকত—তাহলে ওয়াশিংটনের বাহিনীর ভাগ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত।
ইতিহাসের বড় মোড়গুলোকে আমরা প্রায়ই মহান নেতাদের দূরদৃষ্টি, সাহস ও কৌশলের ফল হিসেবে দেখি। কিন্তু লং আইল্যান্ডের যুদ্ধ আমাদের আরও অস্বস্তিকর একটি সত্যের সামনে দাঁড় করায়।
কখনও কখনও ইতিহাস বদলায় কারণ কোনো পক্ষ অসাধারণভাবে জয়ী হয়েছে—এমন নয়। বরং বদলায় কারণ বিজয়ী পক্ষ তার হাতে থাকা সুযোগটি পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি এবং পরাজিত পক্ষ অপ্রত্যাশিত একটি পথ খুঁজে পেয়েছে।
১৭৭৬ সালের সেই কয়েকটি রাত আমেরিকান বিপ্লবকে এমনই একটি পথ দিয়েছিল।
সেদিন ওয়াশিংটন একটি যুদ্ধ হেরেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেনাবাহিনীকে হারাননি।
আর সেই পার্থক্যটিই শেষ পর্যন্ত একটি বিপ্লবকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল।
অ্যান্ড্রু ও’শোনেসি 



















