নেপালের ভয়াবহ হিমালয় বন্যার সূত্রপাত কীভাবে হয়েছিল, তার নতুন চিত্র সামনে এসেছে চীনা গবেষকদের ড্রোন ভিডিও ও ছবিতে। ২৬ আগস্ট সকালে লাংটাং লিরুংয়ের উত্তর ঢালে ঘটে যাওয়া বরফ-পাথরের বিশাল ধসের দৃশ্য দুর্ঘটনাক্রমে ক্যামেরায় ধারণ হয়। এতদিন স্যাটেলাইটের দূরসংবেদন চিত্রের ওপর ভিত্তি করেই বিপর্যয়ের সূত্রপাত নিয়ে বেশিরভাগ বিশ্লেষণ করা হচ্ছিল।
শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দুর্যোগে ৬৭৫টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে এবং ২ হাজার ৪৯৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। চীনের অংশে আরও প্রায় ৫০০ মানুষ নিখোঁজ, যাদের মধ্যে অনেক বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। প্রায় এক লাখ মানুষ দুর্যোগে বেঁচে গেলেও ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। ধসে পড়া ভবন ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের টানেলে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় ভারত, চীন ও কোরিয়া থেকে বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দলও নেপালে পৌঁছেছে।
ড্রোনে ধরা পড়ল ধসের মুহূর্ত
চীনের একটি পাহাড়চূড়া রাডার স্টেশনে থাকা ড্রোন অপারেটর সম্ভবত অনিচ্ছাকৃতভাবেই লাংটাং লিরুংয়ের প্রায় ৫ হাজার মিটার উচ্চতার উত্তর ঢালে ঘটে যাওয়া বরফ-পাথরের ধস ধারণ করেন। প্রায় মেঘমুক্ত সকালে লাংটাং লিরুং ও কিমশুম শৃঙ্গের মনোরম দৃশ্য ধারণের সময় হঠাৎ পাহাড় বেয়ে সাদা বরফের প্রবাহ নেমে আসে। একই সঙ্গে লেন্দে খোলা উপত্যকায় উঠতে থাকে বাদামি ধুলোর বিশাল মেঘ।
চীনা গবেষকদের ভিডিও ও ছবিও একই ঘটনার আরও প্রমাণ দিয়েছে। এতে ধারণা জোরালো হয়েছে যে লাংটাং লিরুংয়ের চূড়ার নিচে বরফক্ষেত্রের প্রান্তে থাকা ঝুলন্ত হিমবাহসহ পাথুরে পাহাড়ের অংশ ভেঙে পড়েছিল। অর্থাৎ শুধু হিমবাহের বরফের স্তর ধসে পড়েনি; বরং পাহাড়ের মূল শিলাস্তরই ভেঙে পড়ার সূত্রপাত করেছে।

পাহাড়ের ১,৫০০ মিটার নিচে নেমে আসে বিপুল ভর
গবেষকদের ধারণা, প্রায় ৫০ কোটি টন পাথর ও বরফ একসঙ্গে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিটার নিচে নেমে আসে। পতনের সময় গতি, ঘর্ষণ ও প্রচণ্ড শক্তিতে বরফ-পাথরের বড় অংশ চূর্ণ ও গলে যায়। এরপর এই বিপুল উপাদান বর্ষায় ফুলে ওঠা লেন্দে খোলার পানির সঙ্গে মিশে যায়।
এরপর ধসের গতি এতটাই প্রবল ছিল যে নিচের ধ্বংসাবশেষে ঢাকা হিমবাহে আঘাত করার সময় ৫ দশমিক ২ মাত্রার কম্পন সৃষ্টি হয়। প্রবল স্রোত নদীপথে নেমে গিয়ে সম্ভবত সাময়িকভাবে নদীর প্রবাহও আটকে দেয়। পরে গলে যাওয়া বরফ, পাথর ও কাদার মিশ্রণ ভয়াবহ গতিতে নিচের দিকে ধেয়ে যায়।
২০ মিনিটে ধ্বংস চীনা সীমান্ত ভবন
ধসের পর মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে কাদামাটির স্রোত গিরং এলাকায় চীনের ছয়তলা কাস্টমস ও অভিবাসন ভবনকে গ্রাস করে। আরও প্রায় ৩০ মিনিটের মধ্যে কাদার এই স্রোত ত্রিশূলী নদীর নিচু উপত্যকায় পৌঁছে পথে থাকা স্থাপনা ও অবকাঠামো ধ্বংস করে। চীনের অংশে ত্রিশূলীর পশ্চিম শাখা নদীতেও এই কাদা উজানের দিকে প্রবেশ করে।
ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপকতা এতটাই ছিল যে ভারী সরঞ্জাম ব্যবহারের পরও চীনা উদ্ধারকারীদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া কাস্টমস ও অভিবাসন ভবনের এলাকায় পৌঁছাতে তিন দিন লেগে যায়।

হিমালয়ের ভঙ্গুরতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
এ ধরনের ঘটনা অবশ্য একেবারে নজিরবিহীন নয়। ২০১২ সালে অন্নপূর্ণা-৪, ২০১৭ সালে মাকালুর কাছে সালদিম শৃঙ্গ এবং ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে লাংটাং এলাকায় বরফ-পাথরের ধসের ঘটনাতেও ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছিল।
এখন বিজ্ঞানীদের প্রধান প্রশ্ন, লাংটাংয়ের উত্তর ঢালে এবার পাহাড়ের মূল শিলাস্তর কেন ভেঙে পড়ল। বিশ্বের সর্বোচ্চ ও অপেক্ষাকৃত নবীন পর্বতমালা হিমালয় এখনো ভূকম্পনপ্রবণ ও ভঙ্গুর। গবেষকদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। উষ্ণতার কারণে পাহাড়ের ফাটলে জমে থাকা পারমাফ্রস্ট বরফ গলে পানি হয়ে শিলার গভীরে ঢুকলে বরফের সেই প্রাকৃতিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পাথরের অংশ সহজে আলাদা হয়ে যেতে পারে।
হিমালয়ের হিমবাহ দীর্ঘদিন ধরেই প্রাকৃতিকভাবে পিছু হটছে। শেষ বরফযুগের অবসান এবং প্রায় ৬০০ বছর আগের ক্ষুদ্র বরফযুগের পর থেকে এই পরিবর্তন চলমান। তবে জলবায়ু পরিবর্তন সেই গলনপ্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করেছে। লাংটাংয়ের উত্তর ঢালের বরফপ্রপাতও পিছু হটে শিলাস্তর উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। চলতি গ্রীষ্মে ট্রান্স-হিমালয় অঞ্চলের তাপমাত্রা এক দশকের মধ্যে অন্যতম বেশি থাকায় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে থাকতে পারে।
প্রকাশিত নতুন ড্রোনচিত্র তাই শুধু এবারের বিপর্যয়ের কারণ বোঝার ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; ভবিষ্যতে হিমালয়ের অনুরূপ বিপজ্জনক ঘটনা শনাক্ত ও পূর্বাভাস দেওয়ার গবেষণাতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















