রাজশাহীর বাজারে সুগন্ধি চালের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। ছয় মাসের ব্যবধানে প্যাকেটজাত চিনিগুঁড়া বা পোলাওয়ের চালের দাম ১৩৫-১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ২৩০ টাকা কেজিতে উঠেছে। খোলা চিনিগুঁড়া চালও তিন মাসের ব্যবধানে ১১৫-১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১৭০-১৮০ টাকা হয়েছে। এতে বিশেষ আয়োজন ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে পোলাও রান্নাও অনেক পরিবারের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
রাজশাহীর পাইকারি বাজারে বর্তমানে সুগন্ধি চাল ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং খুচরা বাজারে প্রায় ২১০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। দেশি কালিজিরা চালের দাম ১২০-১২৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা হয়েছে। দিনাজপুরের সুগন্ধি কাটারিভোগ চালও কেজিতে প্রায় ১৫ টাকা বেড়ে ৯৫-১০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রফতানি নিয়ে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ
সুগন্ধি চালের দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে বিদেশে রফতানিকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীদের একটি অংশ। তাদের দাবি, রফতানির কারণে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমেছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তিনটি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি মোট ১ হাজার ৫৩০ মেট্রিক টন চাল রফতানি করেছে। প্রধানত ব্রি-৩৪ বা চিনিগুঁড়া ধান থেকে এ সুগন্ধি চাল তৈরি হয়।
রাজশাহীর সাহেববাজারের ব্যবসায়ী অশোক প্রসাদ বলেন, গত কোরবানির ঈদের পর থেকেই সুগন্ধি চালের দাম বাড়তে শুরু করে এবং কেজিতে প্রায় ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তার মতে, রফতানি বন্ধ হলে দাম কমতে পারে।
![]()
কাদিরগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ী জসীম উদ্দিনও রফতানির অনুমতিকে মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন। তিনি জানান, দুই সপ্তাহ আগে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা তার দোকানে গিয়ে ২০০ টাকা কেজি দরে পোলাওয়ের চাল বিক্রির বিষয়ে প্রশ্ন করেন এবং তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তার দাবি, কোম্পানির গুদাম থেকেই ২০০ টাকা কেজি দরে চাল কিনতে হচ্ছে। এরপর পরিবহন ও কমিশন খরচ যুক্ত হওয়ায় কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
ধানের সংকট ও উৎপাদন ব্যয়ও দায়ী
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে শুধু রফতানি নয়, উৎপাদন ও সরবরাহ সংকটের বিষয়টিও উঠে এসেছে। গত মৌসুমে তীব্র তাপপ্রবাহ ও অনাবৃষ্টির কারণে উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় সুগন্ধি ধানের ফলন প্রত্যাশামতো হয়নি। পাশাপাশি মৌসুমের শুরুতেই বড় চাল প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি দামে ধান কিনে মজুত করায় ছোট মিল ও খোলা বাজারে সরবরাহ কমেছে।
ধান প্রক্রিয়াজাত করে সুগন্ধি চাল উৎপাদনে বিশেষ পদ্ধতি ও পলিশিংয়ের প্রয়োজন হয়। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, মিলিং ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। দিনাজপুরের এক আড়তদার জানান, ৭৫ কেজির এক বস্তা ধান মৌসুমে ৪ হাজার টাকা থেকে পরে ৬ হাজার এবং বর্তমানে সাড়ে ৮ হাজার টাকায় উঠেছে।
ক্রেতা ও রেস্তোরাঁয় বাড়তি চাপ
দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে সাধারণ ক্রেতাদের কেনাকাটায়। আগে অনেকে একবারে ৫-১০ কেজি সুগন্ধি চাল কিনলেও এখন ১-২ কেজিতে নামিয়ে এনেছেন। কেউ কেউ সাধারণ চালেই ফিরে যাচ্ছেন।

এক ক্রেতা জানান, পাঁচ মাস আগে ১৪০ টাকা কেজিতে কেনা পোলাওয়ের চাল এখন ২৩০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। আরেক গৃহিণী বলেন, মেয়ের জন্মদিনে আত্মীয়দের জন্য পোলাও রান্না করতে গিয়ে খোলা চিনিগুঁড়া চালের দামও ১৫০ টাকার বেশি দেখে তিনি হতবাক হয়েছেন।
রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদেরও বাড়তি খরচ সামলাতে হচ্ছে। কুমারপাড়ার এক রেস্তোরাঁ মালিক জানান, ছয় মাস আগে পোলাওয়ের চাল ১৩০ টাকা কেজিতে কিনলেও এখন একই চালের জন্য প্রায় ২০০ টাকা দিতে হচ্ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে খাবারের দাম বাড়াতে পারছেন না।
কৃষকের ঘরে নেই বাড়তি আয়ের সুফল
চালের দাম বাড়লেও এর সুফল এখনই কৃষকেরা পাচ্ছেন না। গোদাগাড়ীর কৃষক আসফাকুজ্জামান বাবু জানান, তিনি দুই বিঘা জমিতে সুগন্ধি ধান চাষ করে ছয় মাস আগেই ধান বিক্রি করে দিয়েছেন। এখন ধান থাকলে বেশি দাম পেতেন বলে মনে করেন তিনি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, দেশের বেশির ভাগ ব্রি-৩৪ বা চিনিগুঁড়া ধান উৎপাদিত হয় দিনাজপুরে। এ ছাড়া ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়েও এ ধানের আবাদ হয়। দিনাজপুরে এবার ২ লাখ ৬০ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে চিনিগুঁড়া ধানের আবাদ হয়েছে ৯৫ হাজার হেক্টরে। গত বছর এ ধানের আবাদ হয়েছিল ৯৪ হাজার হেক্টরে।
দিনাজপুরে চিনিগুঁড়া ধান থেকে সুগন্ধি চাল প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাত করছে বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। জেলার বোচাগঞ্জে একটি অটো রাইস মিল স্থানীয়ভাবে এ চাল প্রক্রিয়াজাত করছে। এ ধানকে ঘিরে জেলায় ছোট-বড় প্রায় ২০০টি অটো রাইস মিল গড়ে উঠেছে। তবে বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে কৃষকের পাওয়া দামের বড় ব্যবধান রয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
সুগন্ধি চালের এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে রফতানি, ধানের সরবরাহ সংকট, উৎপাদন ব্যয় ও মজুত—কোন কারণ কতটা ভূমিকা রাখছে, তা নিয়ে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে। তবে অল্প সময়ে দাম এতটা বেড়ে যাওয়ায় বাজারে নজরদারি জোরদারের দাবি উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















