নেপালের এক দশকের সশস্ত্র সংঘাত শেষ হওয়ার দুই দশক পেরিয়ে গেলেও জোরপূর্বক নিখোঁজ হওয়া হাজারো মানুষের ভাগ্য ও অবস্থান এখনো অজানা। আন্তর্জাতিক জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের দিবসে রোববার এসব পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা এবং বিচারহীনতার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
২০০৬ সালের সমন্বিত শান্তিচুক্তির মাধ্যমে নেপালের মাওবাদী সংঘাতের অবসান ঘটে। এক দশকের ওই সংঘাতে প্রায় ১৭ হাজার মানুষ নিহত হন। নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন। মাওবাদী বিদ্রোহী ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী—উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই মানুষকে জোরপূর্বক নিখোঁজ করার অভিযোগ রয়েছে। তবে অন্তর্বর্তীকালীন বিচারপ্রক্রিয়ায় এখনো একটি মামলারও নিষ্পত্তি হয়নি।
বছরের পর বছর ঝুলে আছে বিচারপ্রক্রিয়া
শান্তিচুক্তির পর সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন এবং জোরপূর্বক নিখোঁজ ব্যক্তিদের তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। কিন্তু ধারাবাহিক সরকারি গড়িমসি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও নেতৃত্বে বারবার পরিবর্তনের কারণে প্রতিষ্ঠান দুটির কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এতে নিখোঁজদের পরিবারের আস্থাও ক্রমে কমেছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, নিখোঁজদের পরিবারের কাছে ৩০ আগস্ট শুধু স্মরণের দিন নয়; দুই দশক পরও প্রিয়জনের ভাগ্য ও অবস্থান সম্পর্কে অনিশ্চয়তার কথা মনে করিয়ে দেওয়ার দিন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, জোরপূর্বক নিখোঁজের অভিযোগে ৩ হাজার ২৮৮টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তির সংখ্যা ২ হাজার ৫৫৭। এর মধ্যে ৪৮ জনের সন্ধান মিললেও ২ হাজার ৫০১ জন এখনো নিখোঁজ।
পুরুষরাই অধিকাংশ নিখোঁজ
নথিভুক্ত নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ২ হাজার ৩৫৩ জন, অর্থাৎ ৯২ দশমিক ০২ শতাংশ পুরুষ। নারী রয়েছেন ২০৪ জন, যা মোট সংখ্যার ৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
ন্যাশনাল নেটওয়ার্ক অব দ্য ভিকটিমস অব সিরিয়াস হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশনের রাম ভান্ডারি সরকারের প্রতি প্রক্রিয়াটি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বাবা, একজন শিক্ষক, ২০০১ সালে বেসিসাহারে রয়্যাল নেপালি আর্মির হাতে নিখোঁজ হন।
ভুক্তভোগীদের সংগঠনগুলোর অভিযোগ, কমিশনগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক যোগাযোগ প্রভাব ফেলেছে। মেয়াদ বাড়ানো, কমিশন ভেঙে দেওয়া এবং পুনর্গঠনের ধারাবাহিকতায় বিচার আরও পিছিয়েছে। তাদের দাবি, বিচারপ্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে।

নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে পরিবারগুলো
২০২৬ সালের মে মাসে জারি করা এক অধ্যাদেশে সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের তদন্ত কমিশনের কমিশনারদের অপসারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে রাজনৈতিকভাবে কম প্রভাবিত ব্যক্তিদের নিয়োগের আশা তৈরি হলেও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সরকারকে প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
কনফ্লিক্ট ভিকটিমস কমন প্ল্যাটফর্মের সাবেক চেয়ারম্যান সুমন অধিকারীর বাবা মুক্তি অধিকারী ২০০২ সালে লামজুংয়ের একটি স্কুলে শিক্ষকতা করার সময় মাওবাদীদের হাতে নিহত হন। অধিকারীর ভাষায়, নিখোঁজদের পরিবারকে কখনো কখনো প্রতীকী দেহ ব্যবহার করে প্রিয়জনের শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে হয়েছে।
সংঘাতকালীন এসব ঘটনা আজও জবাবদিহির দাবি জিইয়ে রেখেছে। ভুক্তভোগীদের পরিবারগুলোর প্রত্যাশা, নতুন সরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখিয়ে সত্য উদ্ঘাটন ও বিচারপ্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেবে। সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় নিখোঁজ স্বজনদের মতোই দুই দশক আগে নিখোঁজ হওয়া মানুষের পরিবারগুলোরও একটাই আকাঙ্ক্ষা—প্রিয়জনের সন্ধান পাওয়া।
নেপালে জোরপূর্বক নিখোঁজ ২,৫০১ জনের পরিবার এখনো সেই উত্তরের অপেক্ষায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















