নেপালে ভয়াবহ বন্যা, কাদা ও পাথরের স্রোতে শত শত মানুষের মৃত্যুর কয়েক মাস আগেই দেশটি চীনের সঙ্গে হিমবাহ ও বন্যার ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করেছিল। ২৭ মে কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নেপাল ও চীনের কর্মকর্তারা সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে বন্যা, আবহাওয়া ও হিমবাহজনিত দুর্যোগ পর্যবেক্ষণ এবং মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন।
বৈঠকে যৌথভাবে ঝুঁকি কমানোর পদক্ষেপ হিসেবে হিমবাহ হ্রদের তালিকা তৈরি ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানচিত্র প্রণয়নের প্রস্তাবও উঠে আসে। তবে নেপালের দুই কর্মকর্তা জানান, বৈঠকের পর হিমবাহের ঝুঁকি ও পানির স্তর নিয়ে চীনের কাছ থেকে তারা প্রত্যাশিত মাত্রায় তথ্য পাননি। তাদের আশঙ্কা ছিল, তথ্যের সীমিত আদান-প্রদান বড় ধরনের দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি নেওয়ার সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
চীনের দাবি, তথ্য দেওয়া হয়েছে সময়মতো
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৈঠক বা নেপালের অতিরিক্ত তথ্য চাওয়ার বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। তবে নেপালে চীনা দূতাবাস জানিয়েছে, দুই দেশ বিষয়টি নিয়ে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখেছে এবং মে মাসের বৈঠকে সীমান্তপারের দুর্যোগসংক্রান্ত তথ্য ভাগাভাগিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। চীনের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, তাদের ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের জন্য দুর্গম হিমালয় অঞ্চলের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন।
নেপালের কর্মকর্তারা অবশ্য জানান, চীন থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস পাওয়া গেলেও তুষারধস, পানির স্তর, ভূমিধস বা চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনাগুলো নিয়ে নিয়মিত তথ্য পাওয়া যায়নি। গত বছর একই এলাকায় হিমবাহ হ্রদের পানি হঠাৎ ছেড়ে যাওয়ার ঘটনায় অন্তত নয়জন নেপালে মারা যান এবং আরও অনেকে নিখোঁজ হন।
দুর্যোগের ১২ দিন আগে সতর্কবার্তা
বিপর্যয়ের ১২ দিন আগে চীনের বিশ্ব আবহাওয়া কেন্দ্র নেপালকে ই-মেইলে জানায়, ১৪ থেকে ১৯ আগস্ট ওই এলাকায় মৌসুমি নিম্নচাপের প্রভাব পড়তে পারে। এতে নেপালের বিভিন্ন অঞ্চলে অতিবৃষ্টির পাশাপাশি ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার মতো ধারাবাহিক ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল।
তবে বুধবারের মূল বিপর্যয়টি ঘটে তুলনামূলকভাবে কম পর্যবেক্ষিত একটি এলাকায় হিমবাহের অংশ ধসে পড়ার পর। প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, উপত্যকার মাটিতে হিমবাহের অংশটি আছড়ে পড়ে দ্রুতগতির আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করে। বন্যার স্রোত সীমান্ত থেকে ১৬৮ কিলোমিটার downstream পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রায় ৫ কোটি ৭৪ লাখ ঘনমিটার পানি বহন করে। এতে অন্তত চারটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্র ধ্বংস হয়।
ভবিষ্যৎ দুর্যোগ ঠেকাতে তথ্য চায় নেপাল
বন্যায় ১৯টি সেতু ও প্রায় ৪০ কিলোমিটার মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নেপালের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ১০ শতাংশের বেশি নষ্ট হয়। সর্বশেষ হিসাবে দুই দেশে প্রায় ৮০০ মানুষ মারা গেছেন এবং ৩ হাজারের বেশি নিখোঁজ রয়েছেন।
নেপালের কর্মকর্তারা বলছেন, এই বিপর্যয়ের পর চীনের সঙ্গে সহযোগিতা আরও বাড়ানোই তাদের অগ্রাধিকার। তারা তুষারধস ও হিমবাহ হ্রদের পানি ছাড়ার ঝুঁকি পর্যবেক্ষণে যৌথ গবেষণা ও ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চান। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে থাকা ব্যবস্থার আদলে চীনের সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের চুক্তি করার পরিকল্পনাও রয়েছে। নেপাল প্রতি ১০ মিনিটে বৃষ্টিপাত ও নদীর পানির স্তরসংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা চায়, যাতে ভবিষ্যতে দ্রুত সতর্কবার্তা দিয়ে মানুষের জীবন রক্ষা করা যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ গলনের গতি বাড়ছে, তুষারের আচ্ছাদন কমছে এবং তুষারপাত আরও অনিয়মিত হচ্ছে। ফলে হিমালয় অঞ্চলে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে ২০২৩ সালের এক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও হিমবাহঝুঁকি বাড়ায় নেপাল-চীন সীমান্তে দ্রুত তথ্য বিনিময় এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















