বাংলাদেশে মোট জ্বালানির প্রায় ৪৭ শতাংশ পরিবহন খাতে ব্যবহৃত হয়। বছরে ৬৫ লাখ টন জ্বালানি তেল ব্যবহারের মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ ৫৫ হাজার টনই যায় পরিবহনে। তেলের ব্যবহার কমাতে সরকার ইলেকট্রিক গাড়ির প্রসারে উদ্যোগী হলেও দেশের সড়কে ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলছে। এসব যান মূলত জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ দিয়ে চার্জ দেওয়া হয়। এখন অটোরিকশার চার্জিংয়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবায়নে রয়েছে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ।
বর্তমানে প্রচলিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় সাধারণত চার থেকে পাঁচটি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি থাকে। এতে মোট ভোল্টেজ দাঁড়ায় প্রায় ৪৮ থেকে ৬০ ভোল্ট। ব্যাটারির ক্ষমতা সাধারণত ১০০ থেকে ১৫০ অ্যাম্পিয়ার-আওয়ার। একটি অটোরিকশা পূর্ণ চার্জ দিতে আনুমানিক ৬ থেকে ১০ ইউনিট বিদ্যুৎ লাগে। চার্জিংয়ের সময় অপচয় ও চার্জারের ক্ষতি বিবেচনায় নিলে প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ৭ থেকে ১১ ইউনিট।
চার্জিং অবকাঠামোতেই বড় ব্যয়
একটি অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার উপযোগী অবকাঠামো তৈরি করতেই কমপক্ষে দেড় লাখ টাকা প্রয়োজন। অথচ একটি অটোরিকশার দাম সর্বোচ্চ প্রায় এক লাখ টাকা এবং ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকাতেও অনেক অটোরিকশা পাওয়া যায়। ফলে একজন চালকের পক্ষে আলাদাভাবে এমন অবকাঠামো তৈরি করা কঠিন।

সরকার বিভিন্ন সময়ে অটোরিকশার জন্য সোলার চার্জিং স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। আগের সরকারও এ উদ্যোগ জোরালোভাবে নিয়েছিল। কিন্তু দেশে অটোরিকশার সংখ্যার তুলনায় প্রয়োজনীয় চার্জিং স্টেশন গড়ে ওঠেনি।
দিনের চার্জিং, রাতের ব্যবহারে সমস্যা
সোলার চার্জিংয়ের বড় সীমাবদ্ধতা হলো সময়। চালকেরা সাধারণত দিনভর অটোরিকশা চালিয়ে রাতে গ্যারেজ বা বাসায় ব্যাটারি চার্জ করেন। কিন্তু সৌরবিদ্যুৎ থেকে চার্জ নিতে হলে দিনের বেলায় ব্যাটারি চার্জ করতে হবে।
এ সমস্যা সমাধানে দুই সেট ব্যাটারি ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। এক সেট অটোরিকশায় থাকবে, অন্য সেট দিনে চার্জ হবে। কিন্তু এতে ব্যাটারির খরচ দ্বিগুণ হয়ে যায়। এক সেট লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির দামই প্রায় ৬০ হাজার টাকা।
অর্থনৈতিক হিসাবেও বড় প্রশ্ন
দুই সেট ব্যাটারির জন্য বিনিয়োগ দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। প্রতিটি সেট চার্জ করতে ১০০ টাকা করে নিলে দুই সেট থেকে আয় ২০০ টাকা। একটি ব্যাটারি সেট গড়ে ৪০০ থেকে ৬০০ বার চার্জ দেওয়া যায়। মাঝামাঝি ৫০০ বার ধরলে দুই সেট থেকে মোট চার্জিং আয় প্রায় এক লাখ টাকা। ফলে শুধু চার্জিং আয় দিয়ে মূল বিনিয়োগ ফেরত পাওয়াই কঠিন।
এর সঙ্গে প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি স্টোরেজ ও অন্যান্য চার্জিং সরঞ্জামের ব্যয় যুক্ত হয়। বর্তমানে তাই সোলার বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে চার্জিং স্টেশন চালানো তুলনামূলক লাভজনক।

লিথিয়াম ব্যাটারিতে সম্ভাবনা
তবে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি ব্যবহার করলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। এর দাম কমপক্ষে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে, কিন্তু একটি লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি প্রায় ৩ হাজার বার চার্জ দেওয়া যায় এবং দীর্ঘ সময় চার্জ ধরে রাখতে পারে। অর্থাৎ প্রাথমিক ব্যয় বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর ব্যবহার নিয়ে সম্ভাবনা রয়েছে।
অটোরিকশার জন্য সোলার চার্জিং অবকাঠামো তৈরির আগে ব্যাটারির ধরন, চার্জিংয়ের সময়, বিদ্যুতের দাম, স্টেশন স্থাপনের ব্যয়, চার্জিং ফি এবং চালকদের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ জরুরি।
নীতিমালা ও সরকারি উদ্যোগ
পিডিবির পরিচালক (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম জানান, সৌরবিদ্যুতের জন্য সরকার ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে এ বিষয়ে একটি উল্লেখযোগ্য পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশা করছেন তিনি। সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে নীতিমালার কাজও চলছে। এতে সোলার সিস্টেম ও রুফটপ সোলারসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা রাখা হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বি. ডি. রহমত উল্লাহ মনে করেন, অটোরিকশার ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুতের বিকল্প নেই। তাঁর মতে, গ্রিডের বিদ্যুৎ দিয়ে এ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। অটোরিকশাগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় এনে সৌরবিদ্যুতের চার্জিং স্টেশন স্থাপনের মাধ্যমে এ খাতকে নীতিমালার মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তিনি মনে করেন, এখন কাজ শুরু করলে এক বছরের মধ্যেই ফলপ্রসূ ফলাফল পাওয়া সম্ভব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















