পাবনায় এবার পেঁয়াজের রেকর্ড উৎপাদন হলেও সংরক্ষিত পেঁয়াজের পচন নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। চৈত্র-বৈশাখে ঘরে তোলা পেঁয়াজ ভরা বর্ষায় অস্বাভাবিকভাবে পচে নষ্ট হচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী মাচা বা চাতালের পাশাপাশি কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের আধুনিক সংরক্ষণাগারেও পচন ঠেকানো যাচ্ছে না।
কৃষকদের দাবি, সংরক্ষিত দেশি ও হাইব্রিড—দুই জাতের পেঁয়াজেরই প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে ভালো ফলনের যে স্বস্তি তৈরি হয়েছিল, তা এখন বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কায় পরিণত হয়েছে।
অস্বাভাবিক সময়ে পচনে বিপাকে কৃষক
আটঘরিয়া উপজেলার চান্দাই গ্রামের কৃষক আয়েন উদ্দিন প্রায় ২৫০ মণ হাইব্রিড পেঁয়াজ মাচায় সংরক্ষণ করেছিলেন। সম্প্রতি মাচা থেকে পেঁয়াজ বের করে তিনি দেখতে পান, অনেক পেঁয়াজ পচে গেছে।
একই উপজেলার লক্ষীপুর গ্রামের সিদ্দিকুর রহমান গত সাত-আট বছর ধরে পেঁয়াজ মজুতের সঙ্গে জড়িত। এবার মৌসুমের শুরুতে বিভিন্ন হাট ও এলাকা থেকে সাড়ে তিন মণ পেঁয়াজ কিনে দাম বাড়ার আশায় সংরক্ষণ করেছিলেন। গত কয়েক বছর লাভ হলেও এবার পচনের কারণে সেই সম্ভাবনা অনেকটাই কমে গেছে।

সাথিয়ার ক্ষেতুপাড়া এলাকার কৃষক আব্দুর রহমান জানান, ভালো পেঁয়াজ বর্তমানে মণপ্রতি ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হলেও পচা পেঁয়াজের দাম ৩০০ থেকে ৭০০ টাকার বেশি দিতে চাইছেন না ক্রেতারা। তার ২৮০ মণ পেঁয়াজের অর্ধেক নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে উৎপাদন খরচ তুলতে পারবেন কি না, তা নিয়েই শঙ্কায় তিনি।
রেকর্ড উৎপাদন, তবু বাড়ছে ক্ষতি
পাবনা জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ৫৪ হাজার ৩৩৫ হেক্টর জমিতে রেকর্ড ৯ লাখ ৯৫ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। জেলার চাহিদা পূরণের পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাবনার পেঁয়াজ সরবরাহ করা হয়। এ কারণে কৃষকরা বড় পরিমাণে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে রাখেন। বর্তমানে জেলায় প্রায় ২ লাখ ৭১ হাজার টন পেঁয়াজ মজুত রয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তা ও স্থানীয়দের মতে, পেঁয়াজ তোলার সময় শিলাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির কারণে কন্দে অতিরিক্ত আর্দ্রতা থেকে যাওয়া, দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের জন্য উপযোগী নয় এমন হাইব্রিড জাত নির্বাচন, অতিরিক্ত সার ও রাসায়নিক ব্যবহার এবং গাদাগাদি করে সংরক্ষণ—এসব কারণে পচন বেড়েছে। অতিরিক্ত আর্দ্রতায় পেঁয়াজে অঙ্কুরও গজাচ্ছে, ফলে দ্রুত নষ্ট হচ্ছে।

আধুনিক সংরক্ষণেও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব
সুজানগরের বনকোলা গ্রামের কৃষক উকিল উদ্দিন কৃষি বিপণন বিভাগের আধুনিক সংরক্ষণাগারে নিয়ম মেনে ৪০০ মণ দেশি পেঁয়াজ রেখেও পচন ঠেকাতে পারেননি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঘন ঘন লোডশেডিং। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে আধুনিক সংরক্ষণাগারের যন্ত্র নিয়মিত চালানো সম্ভব না হওয়ায় পেঁয়াজের ক্ষতি আরও বেড়েছে।
তবে ‘এয়ার ফ্লো মেশিন’ ব্যবহারকারীদের পেঁয়াজ তুলনামূলক কম নষ্ট হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, পচন কমাতে কৃষকদের মধ্যে ইতোমধ্যে ৫ হাজার ৩৩০টি এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক বলেন, এ বছর পেঁয়াজের ফলন রেকর্ড পরিমাণ হলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সংরক্ষিত পেঁয়াজের পচন বেড়েছে। এতে কৃষকদের লোকসানের মুখে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে জাতীয় বাজারে পেঁয়াজের সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই বলেও তিনি জানিয়েছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















