কাজিরাঙা শুধু আসামের একটি জাতীয় উদ্যান নয়; এটি এমন এক জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থা, যার অস্তিত্ব নির্ভর করে উদ্যানের সীমানার বাইরের ভূপ্রকৃতি, জলপ্রবাহ, বনভূমি ও বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথের ওপরও। তাই কাজিরাঙার চারপাশে পরিবেশ-সংবেদনশীল অঞ্চল বা ইকো-সেনসিটিভ জোনের (ইএসজেড) পরিধি কতটা হবে—এটি নিছক প্রশাসনিক সীমানা নির্ধারণের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, স্থানীয় মানুষের ভবিষ্যৎ এবং একটি অনন্য প্রতিবেশব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা।
ইএসজেডের মূল দর্শনই হলো সংরক্ষিত এলাকার চারপাশে একটি সুরক্ষাবলয় তৈরি করা, যাতে মানুষের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড সরাসরি সংরক্ষিত পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে না পারে। ২০০২ সালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কৌশলের মাধ্যমে এই ধারণা নীতিগত ভিত্তি পায়। একই সময়ের জাতীয় বন্যপ্রাণী কর্মপরিকল্পনায় জাতীয় উদ্যান ও অভয়ারণ্যের চারপাশে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছিল।
এই নীতির উদ্দেশ্য উন্নয়ন থামিয়ে দেওয়া নয়। বরং কোন কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হবে, কোনগুলো অনুমোদনসাপেক্ষে চলবে এবং কোন স্থানীয় ও পরিবেশবান্ধব কাজ অবাধে করা যাবে—তার একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো তৈরি করাই এর লক্ষ্য।
ইএসজেড মানেই উচ্ছেদ নয়
কাজিরাঙার আশপাশের মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা হলো পরিবেশ-সংবেদনশীল অঞ্চল ১০ কিলোমিটার হলে বন বিভাগ তাদের জমি দখল করে নেবে এবং তারা বসতভিটা হারাবেন। কিন্তু ইএসজেডের কাঠামো এমন কোনো স্বয়ংক্রিয় জমি অধিগ্রহণের বিধান তৈরি করে না।
বরং স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন কৃষিকাজ, উদ্যানচর্চা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, জল সংরক্ষণ, জৈব চাষ এবং স্থানীয় প্রয়োজনের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের মতো কর্মকাণ্ড অনুমোদিত থাকার কথা। অন্যদিকে খনন, দূষণকারী শিল্প, করাতকল কিংবা পরিবেশের জন্য বড় ধরনের ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হতে পারে।
অতএব, স্থানীয় মানুষের জীবিকা এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে পরস্পরের বিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করা ইএসজেডের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে আড়াল করে।
কাজিরাঙার সীমানার বাইরেও বন্যপ্রাণীর জীবন
কাজিরাঙার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো—বন্যপ্রাণী মানুষের আঁকা সীমানা মেনে চলে না। বিশেষ করে বর্ষাকালে ব্রহ্মপুত্রের পানি বাড়লে উদ্যানের প্রাণীরা নিরাপদ ও উঁচু ভূমির সন্ধানে দক্ষিণের কার্বি আংলং পাহাড়ের দিকে চলে যায়। এই উচ্চভূমি তাদের জন্য মৌসুমি আশ্রয় এবং কাজিরাঙার প্রতিবেশব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ।
সুতরাং কাজিরাঙাকে কেবল তার ঘোষিত সীমানার ভেতরে সীমাবদ্ধ একটি ভূখণ্ড হিসেবে দেখলে সংরক্ষণের মূল বাস্তবতাই উপেক্ষিত হয়। দক্ষিণের পাহাড়ি অঞ্চল, বনভূমি ও প্রাণীদের চলাচলের করিডর রক্ষা করা উদ্যানটির নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এখানেই ১০ কিলোমিটার সুরক্ষাবলয়ের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
খনন বন্ধের অভিজ্ঞতা সতর্কবার্তা দেয়
কাজিরাঙার দক্ষিণ সীমান্তের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা বাগসের সংরক্ষিত বনাঞ্চল এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। একসময় সেখানে পাথরের খনি পরিচালিত হতো। বর্ষার পানিতে সেখানকার পলি ধুয়ে কাজিরাঙার ভেতরে গিয়ে জমত। এর ফলে উদ্যানের পরিবেশ ও স্থানীয় কৃষিজমি—দুইই ক্ষতির মুখে পড়ত।
বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগে ২০১৯ সালে ওই কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, উদ্যানের বাইরে সংঘটিত কোনো কর্মকাণ্ডও কীভাবে তার ভেতরের প্রতিবেশব্যবস্থাকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত পলি স্থানীয় কৃষিজমিতে জমলে কৃষি উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অর্থাৎ, ১০ কিলোমিটার ইএসজেড কেবল প্রাণীদের জন্য নয়; কাজিরাঙার পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোর দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।

এক কিলোমিটার কি যথেষ্ট?
এই প্রেক্ষাপটে কাজিরাঙার ইএসজেডের প্রস্তাবিত পরিধি ১০ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে এক কিলোমিটার করার যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কাজিরাঙার মতো বিশাল ও জটিল প্রতিবেশব্যবস্থার ক্ষেত্রে এক কিলোমিটারের একটি সরু সুরক্ষাবলয় কি বাস্তবে প্রাণীদের চলাচলের পথ, জলপ্রবাহ, পাহাড়ি উচ্চভূমি এবং সংলগ্ন বনভূমিকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে পারবে?
কাজিরাঙার আয়তন এখন এক হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি, ব্রহ্মপুত্রের জলপথসহ। এর পাশাপাশি কাজিরাঙা টাইগার রিজার্ভের পরিসরও উদ্যানের মূল সীমানার বাইরে বিস্তৃত। লাওখোয়া ও বুরাচাপরির মতো অঞ্চলও এই বৃহত্তর সংরক্ষণ কাঠামোর অংশ।
২০২১ সালে আসাম সরকার লাওখোয়া, বুরাচাপরি এবং অতিরিক্ত সংলগ্ন অঞ্চলসহ কাজিরাঙার জন্য একটি সমন্বিত ইএসজেডের খসড়া কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে সেই প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়। কেন তা করা হয়েছিল, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে আসেনি।
এখন নতুন করে সীমানা নির্ধারণের প্রশ্নে স্বচ্ছতা তাই অত্যন্ত জরুরি।
সংরক্ষণে রাজনীতির জায়গা নেই
১০ কিলোমিটার ইএসজেড নিয়ে অবৈধ বালি-পাথর উত্তোলন বাড়বে—এমন যুক্তিও শোনা যায়। কিন্তু এই আশঙ্কাকে সুরক্ষাবলয় কমানোর যথেষ্ট কারণ হিসেবে দেখা কঠিন। বরং কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অবৈধ খনন বন্ধ করাই সমাধান।
দক্ষিণের পাহাড়ে প্রস্তাবিত উত্তর কার্বি আংলং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের প্রসঙ্গও এখানে আসে। কিন্তু ওই অভয়ারণ্যের প্রস্তাবিত আয়তন মাত্র ৯৬ বর্গকিলোমিটার এবং সেটিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিজ্ঞপ্তিভুক্ত হয়নি। ফলে কাগজে থাকা একটি প্রস্তাবিত অভয়ারণ্যকে বাস্তব সুরক্ষাব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত।
কাজিরাঙার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার বৃহত্তর আবাসভূমি নিরাপদ রাখার ওপর। দক্ষিণের উচ্চভূমি যদি ধীরে ধীরে খনি, বালি-পাথর উত্তোলন, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ কিংবা অন্যান্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের চাপে পড়ে, তাহলে তার অভিঘাত শেষ পর্যন্ত মূল উদ্যানের ওপরই পড়বে।
মানুষ ও প্রাণীর স্বার্থকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর বদলে দুটিকে একই ভবিষ্যতের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। স্থানীয় মানুষের জীবিকা রক্ষা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ—দুটিই সম্ভব, যদি উন্নয়নকে পরিবেশগত সীমার মধ্যে পরিচালিত করা যায়।
কাজিরাঙার সুরক্ষা তাই শুধু একটি জাতীয় উদ্যানের সীমানা রক্ষার প্রশ্ন নয়। এটি একটি বৃহত্তর বাস্তুতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন। দক্ষিণের পাহাড় ও প্রাণীদের চলাচলের পথ নিরাপদ না থাকলে কাজিরাঙার ভেতরের সুরক্ষাও অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
এই কারণে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বিবেচনার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত বাস্তবতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। কাজিরাঙার দক্ষিণ সীমান্তে ১০ কিলোমিটারের ইএসজেড বজায় রাখা সেই বৃহত্তর দায়িত্ব পালনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
পঙ্কজ শর্মা 



















