চুল পড়া অনেকের কাছেই শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়; এটি আত্মবিশ্বাস, সামাজিক জীবন এবং মানসিক সুস্থতার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে গুরুতর চুল পড়ার একটি বিশেষ রোগে এবার নতুন আশার সন্ধান পেয়েছেন গবেষকেরা। বাতের চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি ওষুধ কিছু রোগীর মাথায় প্রায় সম্পূর্ণ চুল ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।
যে রোগে নিজের শরীরই চুলের গোড়ায় আক্রমণ করে
রোগটির নাম অ্যালোপেশিয়া এরিয়াটা। এটি একটি স্বপ্রতিরোধী রোগ, যেখানে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে চুলের গোড়াকে আক্রমণ করে। ফলে মাথার ত্বকে ছোট ছোট অংশে চুল পড়ে যেতে পারে। গুরুতর অবস্থায় মাথার সব চুলের পাশাপাশি ভ্রু ও শরীরের অন্যান্য লোমও ঝরে যেতে পারে।
এতদিন এই রোগের গুরুতর পর্যায়ে নির্ভরযোগ্যভাবে কার্যকর চিকিৎসার সুযোগ ছিল সীমিত। এবার সেই জায়গাতেই সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলেছে উপাডাসিটিনিব নামের একটি ওষুধ।
২৪ সপ্তাহেই উল্লেখযোগ্য চুল গজানোর প্রমাণ
উপাডাসিটিনিব মূলত বিভিন্ন ধরনের বাত ও প্রদাহজনিত রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। গবেষকদের ধারণা ছিল, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার অতিরিক্ত সক্রিয়তা কমানোর মাধ্যমে এটি চুলের গোড়াকেও রক্ষা করতে পারে।
এই ধারণা যাচাই করতে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও চীনের বিভিন্ন হাসপাতালে দুটি বড় আন্তর্জাতিক পরীক্ষায় গুরুতর অ্যালোপেশিয়া এরিয়াটায় আক্রান্ত রোগীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের গড়ে মাথার প্রায় ৮৪ শতাংশ চুল আগেই পড়ে গিয়েছিল। অনেকের ক্ষেত্রে অন্তত ছয় মাস ধরে নতুন করে চুলও গজায়নি।
রোগীদের দৈনিক ১৫ মিলিগ্রাম, ৩০ মিলিগ্রাম উপাডাসিটিনিব অথবা নিষ্ক্রিয় ওষুধ দেওয়া হয়। ২৪ সপ্তাহ পর দেখা যায়, দুই মাত্রা মিলিয়ে প্রায় অর্ধেক রোগীর মাথার অন্তত ৮০ শতাংশ চুল ফিরে এসেছে।
১৫ মিলিগ্রাম মাত্রার দলে ৩৫ শতাংশের বেশি এবং ৩০ মিলিগ্রাম মাত্রার দলে প্রায় ৪৬ শতাংশ রোগীর মাথায় ৯০ শতাংশের বেশি চুল ফিরে আসে।
পাঁচজনের একজনের মাথায় প্রায় পুরো চুল ফিরে এসেছে
গবেষণার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফলগুলোর একটি হলো, প্রায় ২০ শতাংশ রোগী চুল পড়ার প্রচলিত মাপকাঠিতে শূন্য পর্যায়ে পৌঁছান। অর্থাৎ তাদের মাথায় প্রায় সম্পূর্ণ চুল ফিরে আসে।
এর বিপরীতে নিষ্ক্রিয় ওষুধ গ্রহণকারী দলের মাত্র প্রায় ১ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়।
গবেষকদের মতে, ফলাফলটি শুধু দ্রুত চুল গজানোর সম্ভাবনাই দেখায়নি, বরং গুরুতর চুল পড়ার ক্ষেত্রেও চিকিৎসাটির কার্যকারিতা কতটা গভীর হতে পারে, তারও ইঙ্গিত দিয়েছে।![]()
কীভাবে কাজ করে এই ওষুধ
উপাডাসিটিনিব শরীরের একটি নির্দিষ্ট কোষীয় সংকেতপথকে বাধা দেয়, যাকে জেএকে-স্ট্যাট পথ বলা হয়। এই পথ প্রদাহ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ওষুধটি এই সংকেত কমিয়ে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার অতিরিক্ত আক্রমণ কিছুটা থামাতে পারে। ফলে চুলের গোড়াগুলো আবার স্বাভাবিকভাবে কাজ করার সুযোগ পেতে পারে এবং নতুন চুল গজাতে পারে।
এখনই স্থায়ী সমাধান বলা যাচ্ছে না
গবেষণার ফল আশাব্যঞ্জক হলেও উপাডাসিটিনিবকে অ্যালোপেশিয়া এরিয়াটার স্থায়ী নিরাময় বলা যাচ্ছে না। গুরুতর চুল পড়ার এই রোগের জন্য ওষুধটি এখনো নির্দিষ্টভাবে অনুমোদিত হয়নি।
তবে পরীক্ষায় ওষুধটির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন কোনো অপ্রত্যাশিত সমস্যা দেখা যায়নি। বাতের চিকিৎসায় ব্যবহারের সময় যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো সম্পর্কে চিকিৎসকেরা আগে থেকেই জানেন, পরীক্ষাতেও মূলত সেই নিরাপত্তা-চিত্রই দেখা গেছে।
গবেষকদের ভাষ্য, গুরুতর অ্যালোপেশিয়া এরিয়াটায় আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্ক ও কিশোরদের জন্য উপাডাসিটিনিব ভবিষ্যতে কার্যকর একটি চিকিৎসার বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















