মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ দেশটির তেলের মজুত ও সরবরাহ বাড়াবে এবং এর ফলে ভবিষ্যতে সাধারণ আমেরিকানদের জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। তবে জ্বালানি বাজারের বিশ্লেষকেরা এই দাবির সঙ্গে একমত নন।
ট্রাম্পের দাবি কতটা বাস্তবসম্মত
ট্রাম্প শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি তেলের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছে। তাঁর দাবি, এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মজুত দ্বিগুণেরও বেশি হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির দাম কমে আসবে।
এরপর রোববার তিনি জানান, ভেনেজুয়েলার তেলের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত জাতীয় তেল মজুত পূরণ করতেও ব্যবহার করা হবে। ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে ব্যবহারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুত চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মাটির নিচে থাকা বিপুল তেল আর বাজারে পৌঁছানো তেল এক বিষয় নয়। বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার দুর্বল ও অপর্যাপ্ত তেল অবকাঠামোর কারণে নতুন করে বিপুল পরিমাণ তেল উত্তোলন করতে দীর্ঘ সময় এবং বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।
তেল বাজারে আসতে লাগতে পারে বহু বছর
পেট্রোলিয়াম বিশ্লেষক প্যাট্রিক ডি হ্যানের মতে, ভেনেজুয়েলার ভূগর্ভে কয়েক হাজার কোটি ব্যারেল তেল থাকলেও সেটিকে বাজারে আনতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এবং বহু বছরের কাজ দরকার।
তিনি মনে করেন, নতুন করে তেল উত্তোলন ও সরবরাহ বাড়ানোর প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে কয়েক মাসের মধ্যে জ্বালানির দামে বড় ধরনের পরিবর্তন আসার আশা করা ঠিক হবে না।
৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল নিয়ে প্রশ্ন
তেলবাজার গবেষক ররি জনস্টনের মতে, ট্রাম্পের ঘোষণায় ভূগর্ভে থাকা তেলের পরিমাণ এবং বাস্তবে বাজারে সরবরাহ করা সম্ভব এমন তেলের পরিমাণকে এক করে দেখা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল মজুত তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে দেবে না। উল্লেখযোগ্য হারে উৎপাদন বাড়াতে দেশটির তেল খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ দরকার হবে এবং সেই প্রক্রিয়ায় কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
তাই ট্রাম্পের উল্লেখ করা ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল অল্প সময়ের মধ্যে বাজারে এসে জ্বালানির দাম কমিয়ে দেবে—এমন ধারণাকে তিনি বিভ্রান্তিকর বলে মনে করেন।
উৎপাদন বাড়লেও তা সহজ হবে না
অর্থনীতিবিদ ট্রেসি শুচার্টও দ্রুত সস্তা তেলের প্রবাহ শুরু হওয়ার ধারণা নাকচ করেছেন। তাঁর মতে, ভেনেজুয়েলা বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১২ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করছে।
সাম্প্রতিক উৎপাদন বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে আগে থেকেই চালু থাকা কূপগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে। নতুন করে বিপুল পরিমাণ তেল উত্তোলনের জন্য আরও কঠিন ও ব্যয়বহুল অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
তাঁর হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানির দামে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে এমন অতিরিক্ত তেল উৎপাদন শুরু হতে পাঁচ থেকে ১৫ বছরও সময় লাগতে পারে।
দেড় মিলিয়ন ব্যারেল উৎপাদনের লক্ষ্য
পণ্যবাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলারের মধ্যপ্রাচ্য ও তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোটবিষয়ক গবেষণা প্রধান আমেনা বকরও বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
তাঁর মতে, ভেনেজুয়েলার দৈনিক তেল উৎপাদন ১৫ লাখ ব্যারেলের ওপরে নিতে নতুন তেল অবকাঠামো গড়ে তুলতে কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক ও বড় বিনিয়োগ দরকার হবে।
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ অবশ্য জানিয়েছেন, নতুন যুক্তরাষ্ট্র-ভেনেজুয়েলা জ্বালানি চুক্তির আওতায় ১৭টি তেলক্ষেত্র উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব ক্ষেত্র থেকে দৈনিক ১৫ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এখনই কমছে না আমেরিকানদের জ্বালানি ব্যয়
বিশ্লেষকদের বক্তব্যের মূল কথা হলো, ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল মজুত দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সেই তেল দ্রুত উত্তোলন করে বাজারে সরবরাহ করা সম্ভব নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















