পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকায় ২০২৬–২৭ সালের সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে ১৬ কোটি ২০ লাখের বেশি শিশু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। সংস্থাটির হিসাবে, এই সংখ্যা অঞ্চলটির মোট শিশুর দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি।
ইউনিসেফ বলছে, এল নিনোর প্রভাবে খরা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে শিশুদের খাদ্য ও পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও পয়োনিষ্কাশন, শিক্ষা এবং সুরক্ষার ওপর। আফ্রিকার ১৩টি দেশকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে উগান্ডা, জিবুতি, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, কেনিয়া, মাদাগাস্কার, মালাউই, মোজাম্বিক, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, সুদান, জাম্বিয়া ও জিম্বাবুয়ে।
ইউনিসেফের পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকা অঞ্চলের পরিচালক এতলেভা কাদিল্লি বলেন, এল নিনোর হুমকি ক্রমেই বাড়ছে এবং শিশুদের জন্য এর ঝুঁকি ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। খাদ্য ও পানির সংকট, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ এবং শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাঘাত—সব মিলিয়ে অঞ্চলটির শিশুরা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
তিনি বলেন, বড় ধরনের জলবায়ুজনিত দুর্যোগ আঘাত হানলে শিশুদের পাশাপাশি তাদের ওপর নির্ভরশীল স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাও চরম চাপের মুখে পড়তে পারে।
কোথায় কী ধরনের ঝুঁকি
এল নিনোর প্রভাব পুরো অঞ্চলে একই রকম হবে না। পূর্ব আফ্রিকায় স্বল্পমেয়াদি বৃষ্টির মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন অংশে কম বৃষ্টিপাত ও দুর্বল ফসল উৎপাদন খাদ্য নিরাপত্তার পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলতে পারে।
ইউনিসেফের আশঙ্কা, জলবায়ুর এই ধাক্কার প্রভাব শুধু ২০২৬ সালেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। অপুষ্টি, রোগের প্রাদুর্ভাব এবং শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক সেবা ব্যাহত হওয়ার মতো পরিস্থিতি ২০২৭ সাল পর্যন্ত চলতে পারে।
সোমালিয়ায় সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে বন্যায় সরাসরি ২৫ লাখ পর্যন্ত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে ইউনিসেফের একটি মূল্যায়নে উঠে এসেছে। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার পাশাপাশি শিশুদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও শিক্ষার সুযোগ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইথিওপিয়ায় ইতোমধ্যে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও দুর্বলতার মধ্যে থাকা এলাকাগুলোতে কয়েক হাজার শিশুর ওপর প্রভাব পড়তে পারে। দক্ষিণ সুদানে খরা, অতিরিক্ত তাপ ও স্থানীয় পর্যায়ের বন্যা খাদ্য সংকট ও অপুষ্টি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে রোগের প্রাদুর্ভাব এবং দুর্ভিক্ষ ও বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিও আরও তীব্র হতে পারে।
দুর্যোগের আগেই প্রস্তুতির আহ্বান
ইউনিসেফের সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি হলো—দুর্যোগ আঘাত হানার আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন নেই। বর্তমানে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ১ শতাংশেরও কম আগাম প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমে ব্যয় করা হয়।
অথচ ইউনিসেফের মতে, দুর্যোগের আগে পদক্ষেপ নিলে জীবন রক্ষা করা, পরবর্তী মানবিক সংকটের মাত্রা কমানো এবং উন্নয়নের অর্জনগুলো ধরে রাখা সম্ভব।
সংস্থাটি তাই ১৩টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত দেশে শিশুদের জন্য জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো আগেই প্রস্তুত রাখার আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পুষ্টি সহায়তার সরঞ্জাম আগে থেকেই মজুত করা, অপুষ্টি শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা কার্যক্রম বাড়ানো, রোগ পর্যবেক্ষণ ও টিকাদান জোরদার করা এবং নিরাপদ পানি, পয়োনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা।
জলবায়ুজনিত দুর্যোগে যাতে শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে না পড়ে, সে জন্য স্কুলের অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং প্রয়োজন হলে বিকল্প শিক্ষাকেন্দ্র প্রস্তুত রাখার কথাও বলেছে সংস্থাটি।
বাস্তুচ্যুতি ও পারিবারিক দুর্বলতা বাড়লে শিশুদের সুরক্ষার জন্য মানসিক সহায়তা, বিচ্ছিন্ন পরিবারের সদস্যদের খুঁজে বের করে পুনর্মিলন এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধের ব্যবস্থাও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।
১৭ কোটি ৩০ লাখ ডলারের অর্থায়ন চায় ইউনিসেফ
এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় ১৩টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত দেশে আগাম প্রস্তুতি ও জীবন রক্ষাকারী সহায়তার জন্য বিদ্যমান ২০২৬ সালের মানবিক সহায়তা পরিকল্পনার আওতা থেকে ১৭ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার বরাদ্দ চেয়েছে ইউনিসেফ।
সংস্থাটি বলছে, এখনই নমনীয় অর্থায়ন পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এল নিনোর প্রভাব আরও তীব্র হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ইউনিসেফের হিসাবে, দুর্যোগ ঝুঁকি কমাতে প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগ ভবিষ্যতে পুনরুদ্ধার ব্যয়ে সর্বোচ্চ ১৫ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারে।
কাদিল্লি বলেন, কোন শিশু সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে এবং তাদের কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া যায়, সে সম্পর্কে এখন যথেষ্ট তথ্য রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো—বিশ্ব কি আগেই ব্যবস্থা নেবে, নাকি সংকট আরও ভয়াবহ হওয়ার পর পদক্ষেপ নেবে।
এল নিনো কী
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত প্রবণতা, যা প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও চরম আবহাওয়ার ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে।
পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকায় এর প্রভাব অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে। কোথাও অতিরিক্ত বৃষ্টি ও বন্যা, আবার কোথাও কম বৃষ্টি, খরা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
উগান্ডাসহ ১৩টি দেশের জন্য তাই আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং দুর্যোগের আগে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে ইউনিসেফ। সংস্থাটির মতে, এখনই প্রস্তুতি নেওয়া গেলে জলবায়ুজনিত বড় ধাক্কায় শিশুদের ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















