২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর শুরু হওয়া তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ শুধু আফগানিস্তান বা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিই বদলায়নি; এর দীর্ঘ ছায়া পড়েছিল পাকিস্তানের করাচির ওপরও। গত ২৫ বছরে করাচি এমন এক নিরাপত্তা বাস্তবতার মধ্য দিয়ে গেছে, যেখানে আন্তর্জাতিক জিহাদি নেটওয়ার্ক, স্থানীয় জঙ্গি সংগঠন, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী, রাজনৈতিক সহিংসতা ও অপরাধী চক্র পরস্পরের সঙ্গে কখনো সহযোগিতা করেছে, কখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে।
৯/১১-এর পর আফগানিস্তানে তালেবানের প্রথম সরকার পতন এবং আল-কায়েদার ওপর মার্কিন সামরিক অভিযান শুরু হলে অনেক জঙ্গি সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে ঢুকে পড়ে। পাকিস্তানের দুর্গম উপজাতীয় অঞ্চলগুলো তাদের জন্য আশ্রয়ের সুযোগ তৈরি করলেও করাচি তাদের সামনে খুলে দেয় আরও বড় সম্ভাবনা। বিশাল জনসংখ্যা, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ এবং আগে থেকেই থাকা জিহাদি সংগঠন ও মাদ্রাসাভিত্তিক নেটওয়ার্ক শহরটিকে তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
সিন্ধু পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিটে ২০০২ সালের শুরুতে যোগ দেওয়া কর্মকর্তা রাজা উমর খাত্তাবের অভিজ্ঞতায়, করাচির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তখন মূলত সাম্প্রদায়িক সংঘাতের সঙ্গে পরিচিত ছিল। কিন্তু ৯/১১-এর পর যে ধরনের আন্তর্জাতিক জিহাদি সহিংসতা শহরে ঢুকতে শুরু করে, সেটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের হুমকি। করাচি ধীরে ধীরে আন্তঃদেশীয় জিহাদি যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিতে পরিণত হয়।
২০০২: একের পর এক হামলায় বদলে গেল করাচি

৯/১১-এর প্রথম বার্ষিকীর সময় করাচিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। ২০০২ সালের জানুয়ারিতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর সাংবাদিক ড্যানিয়েল পার্ল অপহৃত হন এবং পরে তাকে হত্যা করা হয়। একই বছরের মে মাসে শেরাটন হোটেলের বাইরে ফরাসি নৌ প্রকৌশলীদের বহনকারী একটি বাসে আত্মঘাতী হামলা হয়। পরের মাসে হামলার শিকার হয় মার্কিন কনস্যুলেট। খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠানগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
তদন্তকারীরা দ্রুত বুঝতে পারেন, এই হামলাগুলোর পেছনে আফগানিস্তান থেকে ছড়িয়ে পড়া আল-কায়েদার সদস্যদের সঙ্গে পাকিস্তানের স্থানীয় জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। আগে করাচিতে যে ধরনের সহিংসতা দেখা যেত, তার তুলনায় এই নতুন সন্ত্রাস ছিল অনেক বেশি আন্তর্জাতিক, সংগঠিত ও বহুমাত্রিক।
এরপর শহরটি পরিণত হয় বিভিন্ন সশস্ত্র নেটওয়ার্কের মিলনস্থলে। আল-কায়েদা, জুন্দুল্লাহ, লস্কর-ই-ঝাংভি, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি, আনসারুশ শরিয়া, আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট, ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্সসহ বিভিন্ন সংগঠন এখানে সক্রিয় ছিল। এর সঙ্গে বেলুচ ও সিন্ধি জাতিগত বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর তৎপরতাও যুক্ত হয়।
আল-কায়েদার পুরোনো শিকড়ও ছিল করাচিতে
৯/১১-এর পর আল-কায়েদার সদস্যরা হঠাৎ করাচিতে এসেছে—বিষয়টি এত সরল ছিল না। সংগঠনটির করাচি-সংযোগ আরও আগে থেকেই ছিল। ১৯৯৮ সালে পূর্ব আফ্রিকায় মার্কিন দূতাবাসে বোমা হামলার সঙ্গে জড়িত মোহাম্মদ সাদিক ওদেহকে করাচি বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ওসামা বিন লাদেনের ঘনিষ্ঠ কুরিয়ার আবু আহমেদ আল-কুয়েতিও শহরে একটি নিরাপদ আস্তানা ব্যবহার করতেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
৯/১১-এর পর এই পুরোনো যোগাযোগগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও এফবিআইয়ের সঙ্গে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী আল-কায়েদার সদস্যদের খুঁজতে অভিযান শুরু করে। পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গি নেতা আটক বা নিহত হতে থাকেন। করাচিও এই অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
২০০৩ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফকে রাওয়ালপিন্ডিতে দুই সপ্তাহের মধ্যে দুবার হত্যার চেষ্টা করা হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। এরপর নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা অভিযান জোরদার হয়। ওই সময় স্থানীয় তরুণ জঙ্গিদের একটি অংশ আল-কায়েদার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলে এবং জুন্দুল্লাহ নামে একটি সংগঠন তৈরি করে।
টিটিপির উত্থানে নতুন সংকট
২০০৭ সালে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি গঠনের পর পাকিস্তানের জঙ্গিবাদ নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়কে রাজা উমর খাত্তাব করাচি ও পাকিস্তানের জন্য ‘চরম ধ্বংসযজ্ঞের’ সময় হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
২০০৯ সালের দিকে পাকিস্তানি সামরিক অভিযানের কারণে উপজাতীয় এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত অনেক জঙ্গি করাচিতে এসে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে শুরু করে। বিশেষ করে পশতুন-অধ্যুষিত শহরতলি ও প্রান্তিক এলাকাগুলোতে তারা ঘাঁটি গড়ে তোলে। তারা শুধু আশ্রয় নেয়নি; নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে চাঁদাবাজি, স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ ও ভয়ভীতি তৈরির ব্যবস্থা গড়ে তোলে। পুলিশ সদস্য, রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষাবিদ এবং পোলিও টিকাদান কর্মীরাও তাদের হামলার লক্ষ্য হন।
টিটিপির করাচি নেটওয়ার্ক আবার একক কোনো কাঠামোর অধীনে ছিল না। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা জঙ্গিরা নিজেদের আলাদা দল ও অর্থের উৎস নিয়ন্ত্রণ করত। সোয়াত, দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তান ও মোহমান্দ থেকে আসা বিভিন্ন গোষ্ঠী শহরের ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে। সহজে চাঁদা আদায়ের সুযোগ থাকায় এসব গোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজনও তৈরি হয়।
স্থানীয় জঙ্গিদের সঙ্গে টিটিপির যোগাযোগ ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বাইরের জঙ্গিরা জনবল, অস্ত্র ও আত্মঘাতী হামলাকারী সরবরাহ করত; আর করাচিতে জন্ম নেওয়া বা দীর্ঘদিন বসবাস করা স্থানীয় সদস্যরা শহরের জটিল ভৌগোলিক ও সামাজিক কাঠামো সম্পর্কে গভীর জ্ঞান কাজে লাগাত।
এই সহযোগিতা পরবর্তীতে আরও বড় হামলার পথ তৈরি করে। টিটিপি, আল-কায়েদা এবং উজবেকিস্তানের ইসলামিক মুভমেন্টের মতো বিদেশি জঙ্গি সংগঠন একসঙ্গে পাকিস্তানি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। ২০১১ সালে করাচির পিএনএস মেহরান নৌঘাঁটিতে হামলা এবং ২০১৪ সালে জিন্নাহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা ছিল এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
বিমানবন্দর হামলার পর বড় ধরনের অভিযান
২০১৪ সালের বিমানবন্দর হামলা করাচির নিরাপত্তা ইতিহাসে বড় মোড় তৈরি করে। এর পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী উপজাতীয় এলাকায় অপারেশন জার্ব-ই-আজব শুরু করে। একই সময়ে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া করাচির নিরাপত্তা অভিযান আরও জোরদার হয়। পাকিস্তান রেঞ্জার্স ও সন্ত্রাসবিরোধী বিভাগ বা সিটিডির সমন্বিত অভিযানে শহরের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা টিটিপি নেটওয়ার্ক ধীরে ধীরে ভেঙে দেওয়া হয়।
এর ফলে করাচিতে আগের মতো প্রকাশ্য ও বিস্তৃত জঙ্গি নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু জঙ্গিবাদ পুরোপুরি শেষ হয়নি। বরং এর কাঠামো বদলাতে শুরু করে।
বড় সংগঠন ভেঙে ছোট নেটওয়ার্ক
২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি এসে আল-কায়েদার বিদেশি সদস্যদের অনেকে আফগান সীমান্তের দিকে সরে যায়, কেউ নিহত বা গ্রেপ্তার হয়। কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া স্থানীয় সদস্য, মতাদর্শ ও যোগাযোগ পুরোপুরি বিলীন হয়নি। ২০১৪ সালে আল-কায়েদার নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরি আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট বা AQIS গঠন করেন এবং আসিম উমরকে এর নেতা করেন।
করাচিতে আগে থেকে থাকা স্থানীয় জঙ্গি নেটওয়ার্কের ওপর ভর করেই AQIS নিজেদের কাঠামো গড়ে তোলে। ফলে বিদেশি নেতৃত্বের পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে পরিচিত, শহরের সামাজিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা জানা সদস্যরা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—জঙ্গি সংগঠনগুলো আর সবসময় একটি সুস্পষ্ট কমান্ড কাঠামোর মধ্যে থাকছিল না। একটি হামলার তদন্ত করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রায়ই অন্য সংগঠন বা আরেকটি ছোট সেলের সন্ধান পেত। সদস্য, অর্থ, দক্ষতা ও মতাদর্শ এক সংগঠন থেকে অন্য সংগঠনে প্রবাহিত হতে থাকে।
করাচিরই শিক্ষিত তরুণ যখন জঙ্গি
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক ছিল জঙ্গিদের সামাজিক পরিচয়ের বদল। তারা আর শুধু সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকা থেকে আসা যোদ্ধা ছিল না। করাচির শিক্ষিত, শহুরে ও পেশাজীবী তরুণদের একটি অংশও উগ্রবাদী মতাদর্শে আকৃষ্ট হতে শুরু করে।
২০১৫ সালের মে মাসে সাফুরা গথে একটি বাসে হামলা চালিয়ে ইসমাইলি সম্প্রদায়ের ৪৫ জনকে হত্যা করা হয়। রাজা উমর খাত্তাবের মতে, এই হামলা গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে বিশেষভাবে নাড়া দেওয়ার মতো ছিল। কারণ হামলায় জড়িতদের মধ্যে ছিল শিক্ষিত, শহুরে ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত তরুণরা।
সাদ আজিজের মতো অভিজাত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের স্নাতক এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী নূরিন লেঘারির মতো ঘটনাগুলো কর্তৃপক্ষকে নতুন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—কীভাবে উচ্চশিক্ষিত ও স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে থাকা তরুণরা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে।
এই সময় আনসারুশ শরিয়ার মতো সংগঠনও সামনে আসে। ২০১৭ সালের মধ্যে সিটিডি সংগঠনটির কাঠামো ভেঙে দিতে সক্ষম হয়। এর সদস্যদের বড় অংশ ছিল মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত ও তরুণ।
ফলে করাচির জঙ্গিবাদের নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে যায়—বড় সংগঠনগুলো দুর্বল হলেও ছোট, গোপন ও স্থানীয়ভাবে স্বনির্ভর সেল তৈরি হচ্ছে।
আল-কায়েদা ও আইএসের প্রতিযোগিতা
ইরাক ও সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের উত্থান জিহাদি রাজনীতিতে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি করে। আল-কায়েদার তুলনায় আইএসের আরও আগ্রাসী ও প্রকাশ্য খেলাফত প্রতিষ্ঠার মডেল কিছু টিটিপি সদস্যকে আকৃষ্ট করে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করাচিতে আইএস দীর্ঘস্থায়ী ও সুসংগঠিত উপস্থিতি তৈরি করতে পারেনি।
এর অন্যতম কারণ হিসেবে গবেষক মুহাম্মদ ইসরার মাদানিকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, পাকিস্তান-আফগানিস্তানের জঙ্গি পরিবেশ দীর্ঘদিন ধরে দেওবন্দি মতাদর্শভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোর প্রভাবাধীন ছিল। ফলে আইএসের সালাফি মতাদর্শের জন্য সেখানে বড় ধরনের স্থায়ী ভিত্তি তৈরি করা কঠিন হয়।
তবে সংগঠনগুলোর প্রতিযোগিতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল জঙ্গিবাদের কাঠামোগত পরিবর্তন। আগের মতো কঠোর কমান্ড কাঠামোর বদলে ছোট ছোট, নমনীয় ও পরস্পর-সংযুক্ত নেটওয়ার্ক তৈরি হয়।
আফগানিস্তানে তালেবানের প্রত্যাবর্তন, নতুন উদ্বেগ
২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসার পর পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে সহিংসতা আবার বাড়তে শুরু করে। প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আফগানিস্তানে তালেবানের সাফল্য টিটিপির মতো সংগঠনকে নতুন গতি, আদর্শিক উৎসাহ ও সীমান্তের ওপারে আশ্রয়ের সুযোগ দেয়।
এই পরিস্থিতিতে আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টও স্থানীয় জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২২ সালে কাবুলে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় জাওয়াহিরি নিহত হওয়ার পরও এই যোগাযোগ পুরোপুরি ভেঙে যায়নি।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, আল-কায়েদার প্রচারমাধ্যম আস-সাহাব পাকিস্তানি রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় টিটিপির হামলাকে সমর্থন জানিয়েছে। একই প্রতিবেদনে AQIS-কে ইত্তিহাদ-উল-মুজাহিদিন পাকিস্তানের ‘অপারেশনাল ব্যাকবোন’ হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে।
আপাত শান্ত করাচির ভেতরে কি নতুন ঝুঁকি?
আজকের করাচি ২০০৮-১৪ সালের করাচি নয়। শহরে আগের মতো প্রতিদিনের টার্গেট কিলিং, সাম্প্রদায়িক হামলা কিংবা কৌশলগত স্থাপনায় ধারাবাহিক বড় আক্রমণ নেই। ২০১৩ সালের নিরাপত্তা অভিযান পুরোনো সশস্ত্র নেটওয়ার্ক ও তাদের প্রকাশ্য নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই ভেঙে দিয়েছে।
কিন্তু এই শান্তিকে পুরোপুরি নিরাপদ মনে করার সুযোগ নেই।
২০২৩ সালে টিটিপির একটি সশস্ত্র দল করাচি পুলিশ সদর দপ্তরে হামলা চালিয়ে কয়েক ঘণ্টার অবরোধ পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। পরে জামাতুল আহরারের সদস্যরা সিন্ধু রেঞ্জার্সের একটি স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেখতে পায়, সীমান্তের ওপার থেকে আসা হামলাকারীদের সহায়তায় করাচির ভেতরে স্থানীয় সহযোগী ও গোপন সেল কাজ করেছে।
এখানেই করাচির গত ২৫ বছরের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। জঙ্গি সংগঠনগুলো কেবল একটি পতাকা বা নামের অধীনে কাজ করে না। নেতা নিহত হলে সংগঠন ভেঙে যেতে পারে, নাম বদলাতে পারে, দল ভাগ হয়ে যেতে পারে; কিন্তু ব্যক্তিগত যোগাযোগ, অর্থের পথ ও উগ্র মতাদর্শ টিকে থাকতে পারে।

৯/১১-এর ২৫ বছর পর
৯/১১-এর পর শুরু হওয়া যুদ্ধ আল-কায়েদার নেতৃত্ব ও অবকাঠামোকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করেছে, তালেবান আবার ক্ষমতায় এসেছে এবং আল-কায়েদা ও আইএস উভয়ই বড় ধরনের সামরিক ও সাংগঠনিক ধাক্কা খেয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে উগ্রবাদী মতাদর্শ ও তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা শেষ হয়ে গেছে।
বরং সময়ের সঙ্গে জঙ্গিবাদের কৌশল বদলেছে। প্রকাশ্য ভূখণ্ড দখল বা বড় আকারের সামরিক কাঠামোর বদলে গোপন যোগাযোগ, স্থানীয় সম্পর্ক, ছোট সেল এবং দীর্ঘমেয়াদি আদর্শিক প্রভাবের ওপর বেশি গুরুত্ব দেখা যাচ্ছে। ইসলামিক স্টেটের তথাকথিত খেলাফত প্রতিষ্ঠার ব্যর্থতাও জঙ্গি সংগঠনগুলোকে দেখিয়েছে যে প্রকাশ্যে ভূখণ্ড ধরে রাখার চেয়ে গোপনে টিকে থাকা অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।
করাচির ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। শহরটি হয়তো আগের সেই ভয়াবহ পর্যায় থেকে অনেক দূরে সরে এসেছে, কিন্তু সীমান্তের ওপারের জঙ্গি নেটওয়ার্ক এবং শহরের ভেতরের সম্ভাব্য সহযোগীদের মধ্যে যোগাযোগের ঝুঁকি রয়ে গেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অস্ত্রধারী ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা নয়; বরং তাদের পেছনে থাকা সম্পর্ক, অর্থের প্রবাহ, নিরাপদ আশ্রয়, স্থানীয় সহযোগী এবং মতাদর্শিক যোগাযোগ শনাক্ত করা। দীর্ঘদিন ধরে করাচির সিটিডির কর্মকর্তারা যে মানব গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন, তাদের অবসর, মৃত্যু বা বদলির কারণে সেই প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতার একটি অংশ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
৯/১১-এর ২৫ বছর পর তাই করাচির গল্পকে শুধু অতীতের সন্ত্রাসের গল্প হিসেবে দেখা যায় না। বড় বড় জঙ্গি সংগঠনের কাঠামো ভেঙে গেলেও তাদের রেখে যাওয়া মতাদর্শ, ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও গোপন নেটওয়ার্ক নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে। করাচির দীর্ঘ নিরাপত্তা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—সন্ত্রাসের চেহারা বদলালেও তার সামাজিক ও সাংগঠনিক শিকড় সহজে মুছে যায় না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















