ঠিক ২০ বছর আগে, ২০০৬ সালের ২৪ আগস্ট, সৌরজগতের গ্রহের তালিকা থেকে বাদ পড়ে প্লুটো। তখন থেকে মহাকাশবিজ্ঞানের ইতিহাসে ‘গ্রহ’ শব্দটির সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক থামেনি। বরং সময়ের সঙ্গে প্লুটোকে আবার গ্রহের মর্যাদা দেওয়ার দাবিও নতুন করে সামনে এসেছে।
২০০৬ সালে চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়নের সাধারণ অধিবেশনে পৃথিবীর বাইরে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছিল—কোন মহাজাগতিক বস্তুকে গ্রহ বলা হবে?
প্রায় ২ হাজার ৫০০ সদস্যের সংগঠনের অধিবেশনে এ বিষয়ে ভোট হলেও ভোট দেওয়ার যোগ্য সদস্য ছিলেন ৪২৪ জন। তারা যে সংজ্ঞা গ্রহণ করেন, তাতে কোনো মহাজাগতিক বস্তুকে গ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে।
প্রথমত, সেটিকে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিজের মহাকর্ষের কারণে তাকে প্রায় গোলাকার আকৃতি ধারণ করার মতো পর্যাপ্ত ভর থাকতে হবে। তৃতীয়ত, নিজের কক্ষপথের আশপাশ থেকে অন্য মহাজাগতিক বস্তু সরিয়ে বা নিয়ন্ত্রণ করে সেই কক্ষপথকে তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার রাখতে হবে।
প্লুটোর ক্ষেত্রেই সমস্যাটি তৈরি হয় তৃতীয় শর্ত নিয়ে। ফলে একই দিন আরেকটি প্রস্তাবের মাধ্যমে প্লুটোকে গ্রহের তালিকা থেকে সরিয়ে ‘বামন গ্রহ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আবিষ্কারের প্রায় ৭৬ বছর পর সৌরজগতের গ্রহ পরিবারের বাইরে চলে যায় প্লুটো।
এরিসকে ঘিরেই শুরু হয় বড় প্রশ্ন

প্লুটোর ভাগ্য বদলে দেওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এরিস নামের আরেকটি বরফাচ্ছাদিত মহাজাগতিক বস্তুর আবিষ্কারের।
২০০৫ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্লুটোর চেয়েও দূরের কক্ষপথে থাকা এরিসকে শনাক্ত করেন। তখন প্রশ্ন ওঠে—এরিসকে কি সৌরজগতের দশম গ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে?
কিন্তু সমস্যা ছিল আরও বড়। কুইপার বেল্টে প্লুটোর মতো আরও অনেক বস্তু রয়েছে। সেগুলোকেও যদি গ্রহ বলা হয়, তাহলে সৌরজগতের গ্রহের সংখ্যা কত হবে—এ প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ত।
শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞা গ্রহণ করে। সেই সংজ্ঞার ফলেই শুধু এরিস নয়, প্লুটোসহ আরও বেশ কিছু অনুরূপ মহাজাগতিক বস্তু গ্রহের মর্যাদা হারায়।
নিউ হরাইজনস বদলে দেয় প্লুটোকে দেখার চোখ
প্লুটোকে গ্রহের মর্যাদা থেকে সরানোর কয়েক মাস আগেই, ২০০৬ সালের ১৯ জানুয়ারি, নাসা প্লুটোর উদ্দেশে নিউ হরাইজনস মহাকাশযান পাঠিয়েছিল।
প্রায় ৪৮০ কোটি কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সাড়ে নয় বছর পর, ২০১৫ সালে মহাকাশযানটি প্লুটোর মাত্র প্রায় ১২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার কাছ দিয়ে উড়ে যায়।
এরপর পৃথিবীতে পাঠানো ছবিগুলো প্লুটো সম্পর্কে মানুষের ধারণাই বদলে দেয়।
দেখা যায়, প্লুটোর পৃষ্ঠে রয়েছে নাইট্রোজেনের বরফে তৈরি হিমবাহ, পৃথিবীর বরফস্তরের মতো বিস্তৃত বরফাঞ্চল, ৩ হাজার মিটারের বেশি উঁচু বিশাল বরফের পাহাড় এবং স্তরে স্তরে বিস্তৃত নাইট্রোজেনসমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডলীয় কুয়াশা।
শুধু তাই নয়, প্লুটোর পৃষ্ঠে সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনেরও প্রমাণ পাওয়া যায়। পৃথিবী ও মঙ্গলের মতো সেখানেও ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় নানা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্লুটোর রয়েছে পাঁচটি উপগ্রহও।
এই নতুন তথ্যই আবার পুরোনো প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে—প্লুটোকে কি সত্যিই গ্রহ বলা যাবে না?
নিউ হরাইজনস মিশনের প্রধান তদন্তকারী অ্যালান স্টার্ন ২০০৬ সালে প্লুটোকে গ্রহের মর্যাদা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের সময়ই বলেছিলেন, প্লুটোর জটিল পৃষ্ঠ, উপগ্রহের ব্যবস্থা এবং বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে মানুষ যখন বিস্তারিত জানতে পারবে, তখন তাকে গ্রহ নয় বলা কঠিন হবে। তার মতে, নিজের মহাকর্ষের কারণে গোলাকার আকৃতি ধরে রাখা এবং পাঁচটি উপগ্রহ থাকা—ভূ-ভৌত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে প্লুটো একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রহ।
‘প্লুটোকে আবার গ্রহ বানাও’
২০ বছর পর প্লুটোকে আবার গ্রহের তালিকায় ফিরিয়ে আনার দাবি বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের জ্যোতির্বিজ্ঞানী মহলে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এর পেছনে একটি প্রতীকী বিষয়ও রয়েছে। প্লুটোই একমাত্র গ্রহসদৃশ বস্তু, যা একজন মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী আবিষ্কার করেছিলেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ‘Make Pluto a Planet Again’ বা ‘প্লুটোকে আবার গ্রহ বানাও’ স্লোগানও শোনা যাচ্ছে।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে মার্কিন সিনেটের এক শুনানিতে নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যানও প্লুটোকে আবার গ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে অবস্থান জানান। তিনি বলেন, বৈজ্ঞানিক মহলের উচিত এ বিতর্কটি আবার পর্যালোচনা করা।
এর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের মেয়াদেও নাসার পক্ষ থেকে একই ধরনের আবেদন সামনে এসেছিল। টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কও সম্প্রতি ট্রাম্পকে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে প্লুটোকে আবার গ্রহ ঘোষণা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে বিষয়টি এত সহজ নয়।
গ্রহ হলে চাঁদের কী হবে?
প্লুটোকে আবার গ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরোধিতাও রয়েছে বিজ্ঞানীদের মধ্যে।
ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গ্রহবিজ্ঞানী মাইক ব্রাউন, যিনি এরিস আবিষ্কারের সঙ্গে যুক্ত এবং প্লুটোকে গ্রহের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে ‘প্লুটো কিলার’ নামে পরিচিত, এ দাবির সমালোচনা করেছেন।
প্লুটোর ২০ বছর পূর্তিতে Scientific American-এ তিনি যুক্তি দেন, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা গ্রহণ করা হলে যাতে প্লুটোকে গ্রহ হিসেবে রাখা যায়, একই যুক্তিতে আরও অনেক মহাজাগতিক বস্তুকেও গ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
তার যুক্তির সবচেয়ে বড় উদাহরণ চাঁদ। প্লুটো যদি তার বর্তমান বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে গ্রহ হতে পারে, তাহলে চাঁদসহ আরও অনেক মহাজাগতিক বস্তুকেও গ্রহ হিসেবে বিবেচনা করার প্রশ্ন উঠবে।
অর্থাৎ, প্লুটোকে ফিরিয়ে আনার বিতর্কটি শুধু একটি মহাজাগতিক বস্তুর নামের পাশে ‘গ্রহ’ শব্দটি বসানোর বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে—আসলে গ্রহ বলতে কী বোঝানো হবে, সেই মৌলিক বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞার প্রশ্ন।
২০ বছর আগে যে সিদ্ধান্ত প্লুটোকে গ্রহ পরিবার থেকে সরিয়ে দিয়েছিল, নিউ হরাইজনসের আবিষ্কার তার বৈজ্ঞানিক গুরুত্বকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। এখন প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কি গ্রহের সংজ্ঞাই বদলাবেন, নাকি প্লুটোকে তার বর্তমান ‘বামন গ্রহ’ পরিচয়েই থাকতে হবে—সেই বিতর্কের উত্তর এখনও মেলেনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















