স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস গড়ে তুলতে অনেকেই চিনি কমানোর পাশাপাশি এমন একটি খাদ্যপদ্ধতি খুঁজছেন, যা দীর্ঘদিন অনুসরণ করা যায়। এ ক্ষেত্রে ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যপদ্ধতি বেশ জনপ্রিয়। শাকসবজি, ফল, ডাল, সম্পূর্ণ শস্য, বাদাম, বীজ, মাছ ও স্বাস্থ্যকর চর্বিকে গুরুত্ব দেওয়া এই খাদ্যপদ্ধতিতে অতিরিক্ত চিনি বাদ দিয়ে ৩০ দিনের একটি খাবারের পরিকল্পনা তৈরি করেছে EatingWell।
পুষ্টিবিদদের তৈরি এই পরিকল্পনাটি মূলত প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৮০০ ক্যালরির জন্য সাজানো। প্রয়োজন অনুযায়ী এটিকে ১ হাজার ৫০০ বা ২ হাজার ক্যালরিতেও সামঞ্জস্য করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন অন্তত ৭৪ গ্রাম প্রোটিন এবং ৩০ গ্রাম খাদ্যআঁশ রাখার লক্ষ্য রয়েছে, যাতে দীর্ঘ সময় পেট ভরা অনুভূতি বজায় থাকে।
এই পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এতে অতিরিক্ত চিনি নেই। অর্থাৎ খাবার বা পানীয়তে আলাদাভাবে যোগ করা চিনি, মধু, আগাভে বা কর্ন সিরাপের মতো উপাদান এড়িয়ে চলা হয়েছে। তবে ফলের মতো প্রাকৃতিকভাবে থাকা চিনি পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়নি।
প্রথম সপ্তাহে কী থাকছে
প্রথম দিনের শুরু হতে পারে রাস্পবেরি, পিচ ও চিয়া বীজের স্মুদি দিয়ে। দুপুরে অ্যাভোকাডো ও টুনা সালাদ স্যান্ডউইচ এবং রাতে বক চয় ও ভাতের সঙ্গে ওভেনে রান্না করা স্যামন রাখা হয়েছে।
দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম দিন পর্যন্ত সকালের খাবারে ব্রকলি, টমেটো ও সাদা বিনের কিশ রাখা হয়েছে। দুপুরের খাবারে ২০ মিনিটে তৈরি করা যায় এমন কালো বিনের স্যুপ রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে বিভিন্ন দিনে লেবু-ডিল মুরগি ও ভাতের ক্যাসেরোল, ছোলা ও ফেটা চিজের শস্যভিত্তিক বাটি, তেলাপিয়া মাছের টাকো এবং সবুজ বিন ও আলুর সঙ্গে মুরগির মতো খাবার রয়েছে।

ষষ্ঠ দিনে কটেজ চিজের উচ্চ-প্রোটিন বাটি, অ্যাভোকাডো-টুনা সালাদ স্যান্ডউইচ ও মাছের টাকো বাটি রাখা হয়েছে। সপ্তম দিনে রাস্পবেরি-পিচ-চিয়া স্মুদি, এডামামে-সমৃদ্ধ গ্রিক সালাদ এবং চিকেন গুয়াকামোলে বাটি রয়েছে।
এই সপ্তাহে বাদাম, পেস্তা, ফল, হুমাস, কটেজ চিজ, দই ও চিনাবাদাম-ওটসের তৈরি এনার্জি বলের মতো খাবারও নাশতা হিসেবে রাখা হয়েছে।
দ্বিতীয় সপ্তাহে বাড়ছে খাবারের বৈচিত্র্য
অষ্টম দিনে সকালের খাবারের সঙ্গে গ্রিক সালাদ ও এডামামে এবং রাতে একটি সমৃদ্ধ মূল খাবার রাখা হয়েছে। নবম থেকে দ্বাদশ দিনে সকালের খাবারে আপেল ও ডালিমের ওভারনাইট ওটস এবং দুপুরে উচ্চ-প্রোটিন পাস্তা সালাদ রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে গাজর, কেফির, কমলা ও অন্যান্য ফল যুক্ত করা হয়েছে।
দশম থেকে দ্বাদশ দিনে একই ধরনের খাবারের পুনরাবৃত্তি রাখা হলেও রাতের খাবারে পরিবর্তন আনা হয়েছে। কোথাও মুরগি, কোথাও সবজি ও শস্যভিত্তিক খাবার, আবার কোথাও সবুজ বিনের সালাদের মতো পদ রয়েছে।
১৩ ও ১৪তম দিনে বেক করা পাস্তা ও বসন্তের সবজি, হার্ব-মেরিনেট করা সবজি ও ছোলার সালাদ এবং পেস্টো, ডিম ও আলুর স্কিলেটের মতো খাবার যোগ হয়েছে।
তৃতীয় সপ্তাহে ডাল, সবজি ও প্রোটিন
১৫ থেকে ১৯তম দিনে সকালের খাবারে কিশমিশ ও আখরোটসহ শেডেড গমের খাবার রাখা হয়েছে। দুপুরে ছোলা, বিট ও ফেটা চিজের সালাদের সঙ্গে মুরগির মাংস যুক্ত করা হয়েছে।
এই সপ্তাহে আপেল, নাশপাতি, কলা, কটেজ চিজ, বাদাম ও দইয়ের মতো খাবার নাশতা হিসেবে রয়েছে। রাতের খাবারে মাছ, মুরগি, সবজি ও বাদামি চালের মতো বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে।
২০তম দিনে ডিম, টমেটো ও ফেটা চিজের নাশতা পিটা, দুপুরে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার এবং রাতে আরেকটি ভারসাম্যপূর্ণ খাবার রাখা হয়েছে। ২১তম দিনে কটেজ চিজ বা শস্যভিত্তিক নাশতা, ক্রিমি বাসিল-টমেটো চিকেন পাস্তা বেক এবং সবুজ শাকসবজি রাখা হয়েছে।
চতুর্থ সপ্তাহে চিয়া পুডিং ও মুরগির স্যুপ

২২তম দিনে অ্যাভোকাডো-টুনা স্যান্ডউইচের মতো খাবার রাখা হয়েছে। ২৩ থেকে ২৬তম দিনে সকালের খাবারে স্ট্রবেরি চিয়া পুডিং এবং দুপুরে উচ্চ-প্রোটিন লেবু ও হলুদ-মেশানো মুরগির স্যুপ রাখা হয়েছে।
রাতের খাবারে বিভিন্ন সবজি, মুরগি ও শস্যের পদ রয়েছে। নাশতায় কটেজ চিজ, ফল, দই, চিয়া সিড জ্যাম ও আপেল-পাই এনার্জি বলের মতো খাবার রাখা হয়েছে।
২৭ ও ২৮তম দিনে আবার কিশমিশ ও আখরোটসহ শেডেড গমের খাবার ফিরেছে। দুপুরে ক্যাপ্রেস-ধাঁচের ছোলার সালাদসহ বিভিন্ন প্রোটিন ও সবজির পদ রয়েছে।
শেষ দুই দিন
২৯তম দিনে সকালের খাবারে ব্রকলি, টমেটো ও সাদা বিনের কিশের সঙ্গে কমলা, দুপুরে উচ্চ-প্রোটিন ক্যাপ্রেস ছোলার সালাদ এবং রাতে ভাজা বাঁধাকপির সালাদসহ একটি মূল খাবার রাখা হয়েছে।
৩০তম দিনে একই কিশ ও কমলা দিয়ে সকালের খাবার শুরু করে দুপুরে এডামামে-সমৃদ্ধ গ্রিক সালাদ ও কলা রাখা হয়েছে। রাতে রয়েছে তুলনামূলকভাবে বেশি ক্যালরির একটি খাবার। দিনের নাশতায় কলা ও চিনাবাদাম মাখনের দই এবং কটেজ চিজের স্ন্যাক জার রাখা হয়েছে।
কেন এই খাদ্যপদ্ধতিতে চিনি বাদ দেওয়া হয়েছে
এই পরিকল্পনায় অতিরিক্ত চিনি বাদ দেওয়া হলেও ফল, দুধ বা অন্যান্য খাবারে স্বাভাবিকভাবে থাকা চিনি নিষিদ্ধ করা হয়নি। অর্থাৎ এটি মূলত ‘নো-অ্যাডেড-সুগার’ পদ্ধতি।
পরিকল্পনাটির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত চিনি খাবারে মিষ্টতা যোগ করলেও সাধারণত খুব বেশি পুষ্টিগুণ দেয় না। যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য অনুযায়ী, গড়ে একজন প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিদিন প্রায় ১৭ চা-চামচ অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ করেন। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন নারীদের জন্য দিনে সর্বোচ্চ ৬ চা-চামচ এবং পুরুষদের জন্য ৯ চা-চামচ অতিরিক্ত চিনি সীমার কথা বলে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সামান্য অতিরিক্ত চিনি খেলেই স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হবে। বরং নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসে অতিরিক্ত চিনি কমিয়ে পুষ্টিকর খাবারের জায়গা বাড়ানোই এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য।

খাদ্যআঁশ ও প্রোটিনের ওপর জোর
৩০ দিনের পরিকল্পনাটিতে প্রতিদিন অন্তত ৩০ গ্রাম খাদ্যআঁশ রাখার লক্ষ্য রয়েছে। ডাল, ছোলা, বিন, সম্পূর্ণ শস্য, বাদাম, বীজ, ফল ও সবজি থেকে এই আঁশ পাওয়া যায়।
খাদ্যআঁশ হজমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে পারে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে ভূমিকা রাখে। পর্যাপ্ত খাদ্যআঁশ গ্রহণ হৃদ্রোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও কিছু ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত বলেও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে।
অন্যদিকে মাছ, মুরগি, ডিম, দই, কটেজ চিজ, ডাল, ছোলা ও বাদামের মতো খাবার থেকে প্রোটিন নেওয়া হয়েছে। ফলে খাবারের প্রতিটি পর্যায়ে প্রোটিন ও খাদ্যআঁশের সমন্বয় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যপদ্ধতির বৈশিষ্ট্য
ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যপদ্ধতির মূল ভিত্তি হলো উদ্ভিদজাত খাবার বেশি খাওয়া। এর মধ্যে রয়েছে শাকসবজি, ফল, ডাল, সম্পূর্ণ শস্য, বাদাম ও বীজ। পাশাপাশি মাছ, সামুদ্রিক খাবার, পরিমিত দুগ্ধজাত খাবার এবং স্বাস্থ্যকর চর্বিও রাখা হয়।
এই খাদ্যপদ্ধতি ১৯৬০-এর দশক থেকে গবেষণার বিষয় হয়ে ওঠে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যের ওপর গবেষণায় হৃদ্রোগসহ বিভিন্ন ইতিবাচক স্বাস্থ্যফলের সঙ্গে এই ধরনের খাদ্যাভ্যাসের সম্পর্ক দেখা যায়।
বর্তমানে ‘ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যপদ্ধতি’ বলতে শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের খাবার বোঝায় না। বরং এর মূল নীতিগুলো বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির খাবারের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যায়।
১,৫০০ নাকি ২,০০০ ক্যালরি?

পরিকল্পনাটি মূলত ১,৮০০ ক্যালরির জন্য তৈরি। তবে কারও দৈনিক প্রয়োজন যদি কম হয়, কিছু নাশতা বাদ দিয়ে ১,৫০০ ক্যালরির সংস্করণ অনুসরণ করা যায়। আবার বেশি ক্যালরি প্রয়োজন হলে বাদাম, বাদামের মাখন, কেফির, অতিরিক্ত ফল বা অন্য কোনো পুষ্টিকর খাবার যোগ করে প্রায় ২,০০০ ক্যালরিতে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তবে ক্যালরির প্রয়োজন সবার এক নয়। বয়স, দৈহিক গঠন, শারীরিক পরিশ্রম, জীবনযাপন ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত প্রয়োজনের ওপর তা নির্ভর করে। তাই একটি নির্দিষ্ট ক্যালরি সবার জন্য উপযুক্ত ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
পরিকল্পনাটির নির্মাতারাও এটিকে কঠোর নিয়ম হিসেবে না দেখে অনুপ্রেরণা হিসেবে ব্যবহারের কথা বলেছেন। একই খাবার প্রতিদিন খেলেও সমস্যা নেই; আবার একই ধরনের পুষ্টিগুণের অন্য খাবার দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা যায়।
বিশেষ করে ১,২০০ ক্যালরির মতো খুব কম ক্যালরির খাদ্যতালিকা বেশিরভাগ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা কঠিন করে তুলতে পারে বলে পরিকল্পনাটিতে এমন সংস্করণ রাখা হয়নি।
সব মিলিয়ে এই ৩০ দিনের খাদ্যতালিকার মূল বার্তা হলো—চিনি একেবারে শূন্য করার চেয়ে অতিরিক্ত চিনি কমিয়ে ফল, সবজি, ডাল, সম্পূর্ণ শস্য, মাছ, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের পরিমাণ বাড়ানো। তবে দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যপরিকল্পনা ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী হওয়া উচিত; বিশেষ স্বাস্থ্যগত অবস্থা বা বিশেষ খাদ্যচাহিদা থাকলে নিবন্ধিত পুষ্টিবিদ বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















