ব্রিটিশ রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলের জন্য বড় অঙ্কের অনুদান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ডানপন্থি জনতাবাদী দল রিফর্ম ইউকে-কে দেওয়া বিপুল অর্থকে ঘিরে ওয়েস্টমিনস্টারে সমালোচনা শুরু হয়েছে। তবে দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ বলছে, সমস্যাটি রাজনৈতিক দলগুলোতে অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ নয়; বরং ব্রিটিশ রাজনীতিতে বৈধ ও স্বচ্ছ অর্থের ঘাটতি।
সম্প্রতি ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা থেকে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া বেন ডেলো ও ক্রিস্টোফার হারবর্ন—দুজনই রিফর্ম ইউকের জন্য ৩ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড করে অনুদান দিয়েছেন। অর্থাৎ দলটি তাদের কাছ থেকে মোট ৭ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড পেয়েছে। এই বিপুল অর্থ ব্রিটিশ রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছে।
দ্য ইকোনমিস্টের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই দাতার অতীত নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ডেলো ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অর্থপাচার ঠেকাতে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বাস্তবায়নে ব্যর্থতার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। পরে তাকে ক্ষমা করে দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দুজনই রিফর্ম ইউকের প্রতি ঘনিষ্ঠ এবং দলটির নেতা নাইজেল ফারাজের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি সমর্থনশীল।
তবে বড় অঙ্কের অনুদান দেওয়া হয়েছে বলেই সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক দুর্নীতি হিসেবে দেখা উচিত নয়—এমনটাই যুক্তি দ্য ইকোনমিস্টের।
অনুদান নিয়ে কেন এত বিতর্ক
রিফর্ম ইউকের বিপুল অনুদানকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ রাজনীতিতে মূলত তিনটি যুক্তি সামনে এসেছে। সমালোচকদের একটি অংশ মনে করে, দলটি রাজনৈতিক অনুদানের নিয়ম বারবার নমনীয়ভাবে ব্যাখ্যা করে এবং কখনো কখনো তা ভাঙার কাছাকাছিও যায়। দ্বিতীয়ত, এত বড় অঙ্কের অর্থ দলটিকে অন্য রাজনৈতিক দলের তুলনায় অন্যায্য সুবিধা দিতে পারে। তৃতীয়ত, রাজনীতিতে বিপুল অর্থের উপস্থিতিই গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
দ্য ইকোনমিস্ট মনে করে, এই তিনটি যুক্তির মধ্যে মূলত প্রথমটির ভিত্তি রয়েছে। অর্থাৎ অনুদান গ্রহণের ক্ষেত্রে আইন ও নিয়ম কঠোরভাবে মানা জরুরি। কিন্তু বৈধভাবে রাজনৈতিক দলকে দেওয়া অর্থের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া ব্রিটিশ গণতন্ত্রের জন্য উপকারী হবে—এমন যুক্তি যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে রিফর্ম ইউকে দুই জ্যেষ্ঠ নেতাকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়। তাদের এমন এক ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল, যেখানে সম্ভাব্য এক দাতাকে অনুদান দেওয়ার নিয়ম ভাঙতে উৎসাহিত করার মতো বক্তব্য শোনা যায়। সেই সময় ফারাজকেও একটি ভিডিওতে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। সেখানে অন্যরা নিয়ম ভাঙার বিষয়ে আলোচনা করছিলেন। ফারাজ দাবি করেন, তিনি বিষয়টি ঠিকমতো শুনছিলেন না। একই সঙ্গে দলের আরও কিছু অনুদান নিয়েও সংসদ ও পুলিশ তদন্ত করছে।
দ্য ইকোনমিস্টও বলছে, বিদেশি অর্থসহ রাজনৈতিক অনুদানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন অবশ্যই মানতে হবে। কিন্তু নিয়ম মানার প্রশ্নটি আলাদা; বৈধ অর্থের প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া আরেকটি বিষয়।
ব্রিটিশ রাজনীতিতে আসলে অর্থের ঘাটতি
দ্য ইকোনমিস্টের প্রধান যুক্তি হলো, ব্রিটেনে রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম অর্থ রয়েছে।
গত বছর ইংল্যান্ডের ডেভনভিত্তিক গাধা কল্যাণমূলক দাতব্য প্রতিষ্ঠান ডঙ্কি স্যাংচুয়ারি যে পরিমাণ অর্থ পেয়েছে, তা ব্রিটেনের সব বড় রাজনৈতিক দল সম্মিলিতভাবে যে অনুদান পেয়েছে তার চেয়েও বেশি। একইভাবে রয়্যাল অপেরা হাউসও বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত অনুদানের চেয়ে বেশি অর্থ পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করলে পার্থক্য আরও স্পষ্ট। রিফর্ম ইউকের পাওয়া ৭ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে চলতি বছরের রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থিতা নির্ধারণের নির্বাচনে ব্যয় হওয়া অর্থের তুলনায়ও কম।
ব্রিটিশ রাজনৈতিক দলগুলো এমন এক ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করে, যেখানে জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী দল দেশের বিপুল সরকারি ব্যয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ পায়। দ্য ইকোনমিস্টের হিসাবে, এই সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি পাউন্ডের বেশি। অথচ যে দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, তাদের নীতিনির্ধারণ ও গবেষণার সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে খুবই সীমিত।
অনেক বিরোধী দলের ছায়ামন্ত্রীর সঙ্গে মাত্র দুই বা তিনজন কর্মী কাজ করেন। ফলে সরকারে যাওয়ার আগেই একটি দলকে প্রয়োজনীয় নীতি, আইন ও প্রশাসনিক পরিকল্পনা তৈরির জন্য পর্যাপ্ত গবেষণা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
রিফর্ম ইউকে জানিয়েছে, নতুন অর্থের একটি অংশ ব্যবহার করে তারা নীতিবিষয়ক গবেষকের সংখ্যা দ্বিগুণ করবে। তবে তাতেও মোট গবেষকের সংখ্যা দাঁড়াবে মাত্র ২০ জনে। দ্য ইকোনমিস্টের মতে, সেটিও ব্রিটিশ রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারণী সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে কেবল একটি শুরু হতে পারে।
অর্থ কি সত্যিই নির্বাচন কিনে নিতে পারে?
বড় অঙ্কের রাজনৈতিক অনুদানের বিরোধীদের অন্যতম আশঙ্কা হলো, বিপুল অর্থ কোনো দলকে নির্বাচনে অন্যায্য সুবিধা দিতে পারে।
তবে দ্য ইকোনমিস্ট মনে করে, একটি নির্দিষ্ট সীমার পর অর্থ সরাসরি নির্বাচনী বিজয় কিনে দিতে পারে না। ব্রিটেনে নির্বাচনী প্রচারের ওপর যে ব্যয়সীমা রয়েছে, সেটিও বড় দল ও ছোট দলের মধ্যে অর্থের ব্যবধান কিছুটা কমিয়ে দেয়।
অর্থাৎ কোনো দল হঠাৎ বিপুল অর্থ পেলেই সে অর্থ ইচ্ছেমতো নির্বাচনী প্রচারে ব্যয় করতে পারবে—এমন নয়।
বরং রিফর্ম ইউকের ক্ষেত্রে বিপুল অর্থ দলটির অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলেও বিশ্লেষণে ইঙ্গিত করা হয়েছে। দলের ভেতরে আগে থেকেই বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। নতুন অর্থ কে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং কীভাবে ব্যয় করা হবে, তা নিয়ে সেই দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হতে পারে।
অনুদানকে দুর্নীতি হিসেবে দেখার ঝুঁকি
ব্রিটিশ রাজনীতিতে রাজনৈতিক অনুদান নিয়ে সাধারণ মানুষের সন্দেহও দ্য ইকোনমিস্টের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অনেক ব্রিটিশ নাগরিক মনে করেন, কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক দলকে বড় অঙ্কের অর্থ দিলে নিশ্চয়ই তার বিনিময়ে কোনো সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশ্য রয়েছে। কিন্তু এই ধারণা যদি এতটাই বিস্তৃত হয় যে বৈধ রাজনৈতিক অনুদানকেও স্বাভাবিকভাবেই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তাহলে সৎ ও জনস্বার্থে বিশ্বাসী মানুষও রাজনৈতিক দলকে অর্থ দিতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
এর ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থের উৎস আরও সংকীর্ণ হয়ে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত কেবল বিত্তশালী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বা বিতর্কিত দাতারাই রাজনৈতিক অর্থায়নে সক্রিয় থাকবে—এমন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
দ্য ইকোনমিস্ট মনে করে, ব্রিটিশ রাজনীতির প্রয়োজন আরও বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় দাতা গোষ্ঠী। এমন মানুষ ও প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, যারা রাজনৈতিক দলগুলোকে ক্ষমতায় যাওয়ার আগে নীতিনির্ধারণ, আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ সহায়তার অর্থ জোগাবে।
নতুন আইন হলে বিতর্ক আরও বাড়বে
ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অনুদানের সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একটি প্রস্তাব অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি বছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ পাউন্ড পর্যন্ত অনুদান দিতে পারবেন।
কিন্তু নতুন নিয়ম যদি অতীতের অনুদানের ওপরও প্রয়োগ করা হয়, তাহলে রিফর্ম ইউকেকে পাওয়া বিপুল অর্থের বড় অংশ ফেরত দিতে হতে পারে।
এমন ব্যবস্থা নিয়ে দ্য ইকোনমিস্টের আপত্তি আরও কঠোর। তাদের মতে, আইন প্রণয়নের পর তা অতীতের কর্মকাণ্ডের ওপর প্রয়োগ করা হলে আইনের শাসনের মৌলিক ধারণাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
ব্রিটিশ ইতিহাসে অতীতের কর্মকাণ্ডকে পরে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার ঘটনা খুবই বিরল এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে ঘটেছে। তাই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের আটকাতে নির্বাচনী নিয়মকে পরে বদলে দেওয়া হলে সেটি উল্টো রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজকেই রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে।
কারণ, রিফর্মের সমর্থকেরা তখন এটিকে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাবে।
প্রতিপক্ষের জন্যও অন্য পথ আছে
দ্য ইকোনমিস্টের শেষ যুক্তি হলো, রিফর্ম ইউকের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে যারা উদ্বিগ্ন, তাদের সমাধান আইন করে অনুদান আটকে দেওয়া নয়।
বরং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়েই তাদের মোকাবিলা করা উচিত। অন্য দলগুলো যদি মনে করে রিফর্ম ইউকে দেশের জন্য ক্ষতিকর রাজনৈতিক পথের প্রতিনিধিত্ব করছে, তাহলে তাদের নিজেদের সংগঠন, নীতি, প্রচার ও জনসম্পৃক্ততা শক্তিশালী করতে হবে।
অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার উত্তর রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাই হওয়া উচিত।
ব্রিটিশ রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও নিয়ম মানার প্রয়োজন অবশ্যই রয়েছে। বিদেশি অর্থ, অবৈধ অনুদান বা আইন ভঙ্গের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। কিন্তু বৈধ রাজনৈতিক অর্থায়নকে সামগ্রিকভাবে সন্দেহের চোখে দেখা এবং অর্থের প্রবাহ সীমিত করে দেওয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
বরং রাজনৈতিক দলগুলো যদি ক্ষমতায় যাওয়ার আগে পর্যাপ্ত গবেষণা, নীতি প্রণয়ন ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিতে না পারে, তাহলে গণতন্ত্রের মানই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দ্য ইকোনমিস্টের দৃষ্টিতে তাই ব্রিটিশ রাজনীতির সমস্যা টাকা বেশি থাকা নয়; বরং রাজনীতিতে বৈধ, স্বচ্ছ ও জনস্বার্থনির্ভর অর্থের ঘাটতি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















