১২:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাঞ্জিবারে দ্বিতীয় ‘রাশিদ ভিলেজ’ প্রকল্প চালুর নির্দেশ শেখ হামদানের মস্কো অঞ্চলে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় নিহত ২, রুশ রাজধানীর তেল শোধনাগারেও আঘাত ভারত-আমিরাত সম্পর্ক আরও জোরদারে মোদি-শেখ মোহামেদের আলোচনা দুবাইয়ের ফ্যাশনে নতুন মোড়, শোর চেয়ে এখন বড় হচ্ছে ব্যবসা ম্যাকলমোর বিতর্কে অবস্থান বদল, কনসার্টে ক্ষমা চাইলেন এড শিরান দুবাই মলে হঠাৎ হাজির শেখ মোহাম্মদ, অবাক দর্শনার্থীরা সংযুক্ত আরব আমিরাতে হাইব্রিড-ইলেকট্রিক গাড়ির চাহিদা বাড়ছে, এগিয়ে টয়োটা-টেসলা-বিওয়াইডি নিখোঁজের পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার, সাত মাসে এখনো নিখোঁজ ২ হাজারের বেশি রিয়াদ বিমানবন্দরের কাছে ভয়াবহ আগুন, হুথি হামলার পর ব্যাপক ফ্লাইট বিপর্যয় সৌদি আরবের আকাশে বাড়ছে হুমকি, রিয়াদসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরে জরুরি সতর্কতা

অবৈধ সোনার খনিতে নারীদের নির্মম জীবন, কলম্বিয়ার বাউজো কাউকায় গ্যাংদের দখল

কলম্বিয়ার প্রত্যন্ত পার্বত্য অঞ্চল বাউজো কাউকার জারাগোজা শহরে বসবাসকারী মারিয়ার জীবনের একটি নীতি খুব সহজ—“আপনি যত কম জানবেন, তত বেশি দিন বাঁচবেন।” শহরটির ওপর প্রভাবশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণ এতটাই গভীর যে তাদের সদস্যদের পরিচয় জানা থাকলেও অনেক বাসিন্দা ইচ্ছা করেই তা জানতে চান না। কারণ, সেখানে অজ্ঞতাই অনেক সময় আত্মরক্ষার ঢাল।

কলম্বিয়ার আন্তিওকিয়া প্রদেশের বাউজো কাউকা দীর্ঘদিন ধরেই প্রাকৃতিক সম্পদের দখল নিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘাতের কেন্দ্র। একসময় এ অঞ্চলের অবৈধ অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি ছিল কোকা চাষ—যে উদ্ভিদ থেকে কোকেন তৈরি করা হয়। কিন্তু গত কয়েক বছরে পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন সোনার অবৈধ খনিই এই অঞ্চলের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।

বিশ্ববাজারে সোনার চাহিদা বেড়ে যাওয়া এবং গত পাঁচ বছরে ধাতুটির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়ায় বাউজো কাউকা পরিণত হয়েছে অবৈধ সোনা উত্তোলনের এক ধরনের ‘ওয়াইল্ড ওয়েস্টে’। এখানে শুধু অর্থনীতিই নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনও নিয়ন্ত্রিত হয় সোনার খনিকে ঘিরে। জমি, খনির যন্ত্রপাতি, শ্রম এবং স্থানীয় নিয়ম—সবকিছুর ওপরই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব রয়েছে।

শৈশব থেকেই খনির জীবনে

মারিয়ার খনির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল খুব অল্প বয়সেই। মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি পড়াশোনা ছেড়ে খনিতে কাজ শুরু করেন। ১৪ বছর বয়সে সহজ জীবনের আশায় বাড়ি ছেড়ে এক পুরুষের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু পরিস্থিতি সহজ হওয়ার বদলে তিনি আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন খনিনির্ভর অর্থনীতিতে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সংসার সামলানোর দায়িত্বও।

খনি এলাকায় নারীদের জন্য ঘরের বাইরে কাজের সুযোগ খুবই সীমিত। এমন একটি কাজ হলো ‘চাতারেয়ারা’ হিসেবে কাজ করা। খনিতে ফেলে দেওয়া পাথর ও খনিজ বর্জ্যের স্তূপ থেকে নারীরা খুঁজে দেখেন, সেখানে সোনার কোনো ক্ষুদ্র অংশ রয়েছে কি না।

অনেক নারী ভোর ৩টার দিকেই ঘুম থেকে ওঠেন। দিনের অন্য শ্রম শুরু করার আগে তাদের ঘরের কাজ শেষ করতে হয়। এরপর খনিজ বর্জ্য সংগ্রহের কাজে যেতে হয়। পর্যাপ্ত উপাদান সংগ্রহ করতে অনেক সময় এক মাসেরও বেশি লেগে যায়। তারপর সেগুলো নিয়ে যেতে হয় মিল বা প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে। সেখানে কাজের পরিমাণ অনুযায়ী সামান্য পারিশ্রমিক পান তারা।

Illegal mining has muddied tropical rivers worldwide | Science | AAAS

নদীও হারাচ্ছে নারীদের জীবিকা

একসময় নদীতে সোনা খোঁজা ছিল নারীদের আরেকটি প্রচলিত কাজ। কিন্তু ভারী খননযন্ত্র ও ড্রেজার নদীর তলদেশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করায় সেই কাজও কঠিন হয়ে পড়েছে।

এখন নদীতে সোনা খুঁজতে নারীদের অনেক দূরে যেতে হয়। নৌকায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এরপর পায়ে হেঁটে প্রত্যন্ত এলাকায় যেতে হয়। অনেককে সেখানে কয়েক মাস পর্যন্ত অবস্থান করতে হয়।

কিছু মা সন্তানদের আত্মীয়দের কাছে রেখে যান। কিন্তু সবার সেই সুযোগ থাকে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে সন্তানদের স্কুল থেকে সরিয়ে তাদের সঙ্গে প্রত্যন্ত খনন এলাকায় নিয়ে যায়।

এই যাত্রায় নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। যৌন সহিংসতা সেখানে সাধারণ ঘটনা। ছেলেশিশুদের সশস্ত্র গোষ্ঠীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হতে পারে। মেয়েদের ক্ষেত্রে বয়সে অনেক বড় পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে। মারিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, দারিদ্র্যই অনেক পরিবারকে এমন ঝুঁকি নিতে বাধ্য করে।

খনির পাশে যৌন শোষণের অন্ধকার জগত

খনিকে ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনীতিতে নারীদের জন্য আরেকটি নির্মম বাস্তবতা রয়েছে। অধিকাংশ খনি শহরেই কোনো না কোনো ধরনের যৌন ব্যবসার কেন্দ্র রয়েছে। কোথাও তা অনুমোদিত বা সহনীয় যৌনকাজের পর্যায়ে থাকলেও কোথাও পরিস্থিতি গড়ায় সরাসরি দাসত্ব ও জবরদস্তিতে।

এখন ত্রিশের শেষ দিকে থাকা মারিয়া জানান, মাত্র ১৩ বছর বয়সে প্রথমবার এক খনি প্রশাসক তাকে অর্থের বিনিময়ে যৌন সম্পর্কে বাধ্য করার চেষ্টা করেছিলেন।

তার অভিজ্ঞতায় নারীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের সহিংসতা এতটাই নিয়মিত যে তা অনেকের কাছে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কিন্তু এই ‘স্বাভাবিকতা’ আসলে তৈরি হয়েছে ভয়, দারিদ্র্য এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে।

গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান ইনসাইট ক্রাইমের অ্যালিসিয়া ফ্লোরেসের মতে, বাউজো কাউকার বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী স্থানীয় মানুষের চলাফেরা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে। অনেক এলাকায় তারা রাতের নির্দিষ্ট সময়ের পর বাইরে বের হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। মানুষের কী করা যাবে এবং কী করা যাবে না, তা নির্ধারণ করে দেয় তাদের নিজস্ব আচরণবিধি।

Women lead brutal lives in Colombia's illegal gold-mining regions

গ্যাংরাই যেন প্রশাসন

এই আচরণবিধির আওতায় স্থানীয় বাসিন্দাদের রাস্তা বা সেতু মেরামতের মতো সামাজিক কাজেও অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। একই সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের মানুষের রক্ষাকর্তা ও সেবাদাতা হিসেবে তুলে ধরে।

কিন্তু এই তথাকথিত সুরক্ষার পেছনে থাকে ভয়ের রাজত্ব। বাসিন্দারা জানেন, নির্দেশ অমান্য করলে সহিংস প্রতিশোধের শিকার হতে পারেন।

খনিশ্রমিকদের কাছ থেকে আদায় করা হয় ‘ভাকুনা’ নামে পরিচিত চাঁদা। সাধারণত সোনা থেকে অর্জিত আয়ের একটি অংশ দিতে হয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে। বিনিময়ে তারা নিরাপত্তা দেওয়ার দাবি করে।

আগে এই অর্থ দেওয়ার বিনিময়ে কিছুটা নিরাপত্তা পাওয়া যেত বলে স্থানীয়দের অনেকে মনে করেন। কিন্তু বিভিন্ন অপরাধী গোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় সেই ব্যবস্থা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনেক বাসিন্দাকে এখন একাধিক গোষ্ঠীকে অর্থ দিতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে কলম্বিয়ার রাষ্ট্রীয় বাহিনীকেও অর্থ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সরকারের নীতিতেও দ্বন্দ্ব

সরকারও এই পরিস্থিতি সহজে সামাল দিতে পারছে না। সাবেক বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর সরকারের সময় কারিগরি বা ক্ষুদ্র পরিসরের খনিশ্রমিকদের নদীতে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে সোনা সংগ্রহের সুযোগ দিয়ে আইন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে তাদের বৈধ জীবিকার সুযোগ তৈরি করা।

অন্যদিকে সেনাবাহিনী অবৈধ খনিশিবিরে অভিযান চালিয়ে খনির যন্ত্রপাতি ধ্বংস বা জব্দ করে।

Women lead brutal lives in Colombia's illegal gold-mining regions

দুটি নীতির মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের দ্বন্দ্ব। কারণ পুরোনো পদ্ধতিতে এখন আর আগের মতো সোনা পাওয়া যায় না। ফলে অনেক খনিশ্রমিককে আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু এসব যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ প্রায়ই থাকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে।

ফলে অবৈধ খনির বিরুদ্ধে সরকারি অভিযান শেষ পর্যন্ত সেই শ্রমিকদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করে, যাদের সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে আনাই সরকারের লক্ষ্য।

বেরিয়ে এসেও ফিরতে হলো সোনার কাছে

মারিয়া একসময় এই জীবন থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন। ৩৫ বছর বয়সে নতুন এক সঙ্গীর সহায়তায় তিনি আবার পড়াশোনা শুরু করেন। রাতে এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পড়াশোনা করে শেষ পর্যন্ত ছোট শিশুদের শিক্ষক হিসেবে কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করেন।

কিছুদিন তিনি শিশুদের নিয়ে সমাজকর্মী হিসেবেও কাজ করেন। সেই চাকরিটি তাকে খনি অর্থনীতি থেকে দূরে থাকার সুযোগ দিয়েছিল।

কিন্তু চাকরির চুক্তি শেষ হয়ে যাওয়ার পর জারাগোজায় তার সামনে আর কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প ছিল না। শেষ পর্যন্ত সোনার টানেই তাকে আবার সেই পুরোনো জগতে ফিরতে হয়।

মারিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদও খুব কম। তার ভাষায়, রাজনৈতিক প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতি দেন। কোনো ভয়াবহ সহিংসতা বা ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটলে কিছুদিন মানুষের দৃষ্টি সেদিকে থাকে। মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নামে, কখনো এক দিনের জন্য মিছিলও হয়। কিন্তু এরপর আবার সবকিছু নীরব হয়ে যায়।

বাউজো কাউকার নারীদের জীবন তাই শুধু দারিদ্র্য বা অবৈধ খনির গল্প নয়। এটি এমন এক সমাজের চিত্র, যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদের বিপুল মূল্য মানুষের জীবনে সমৃদ্ধি না এনে বরং সহিংসতা, শোষণ, ভয় এবং নির্ভরতার নতুন চক্র তৈরি করেছে। সোনার দাম বাড়ছে, খনির বিস্তার ঘটছে—কিন্তু সেই সম্পদের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে অসংখ্য নারীর নিরাপত্তা, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

জাঞ্জিবারে দ্বিতীয় ‘রাশিদ ভিলেজ’ প্রকল্প চালুর নির্দেশ শেখ হামদানের

অবৈধ সোনার খনিতে নারীদের নির্মম জীবন, কলম্বিয়ার বাউজো কাউকায় গ্যাংদের দখল

১১:২৯:১১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কলম্বিয়ার প্রত্যন্ত পার্বত্য অঞ্চল বাউজো কাউকার জারাগোজা শহরে বসবাসকারী মারিয়ার জীবনের একটি নীতি খুব সহজ—“আপনি যত কম জানবেন, তত বেশি দিন বাঁচবেন।” শহরটির ওপর প্রভাবশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণ এতটাই গভীর যে তাদের সদস্যদের পরিচয় জানা থাকলেও অনেক বাসিন্দা ইচ্ছা করেই তা জানতে চান না। কারণ, সেখানে অজ্ঞতাই অনেক সময় আত্মরক্ষার ঢাল।

কলম্বিয়ার আন্তিওকিয়া প্রদেশের বাউজো কাউকা দীর্ঘদিন ধরেই প্রাকৃতিক সম্পদের দখল নিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘাতের কেন্দ্র। একসময় এ অঞ্চলের অবৈধ অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি ছিল কোকা চাষ—যে উদ্ভিদ থেকে কোকেন তৈরি করা হয়। কিন্তু গত কয়েক বছরে পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন সোনার অবৈধ খনিই এই অঞ্চলের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।

বিশ্ববাজারে সোনার চাহিদা বেড়ে যাওয়া এবং গত পাঁচ বছরে ধাতুটির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়ায় বাউজো কাউকা পরিণত হয়েছে অবৈধ সোনা উত্তোলনের এক ধরনের ‘ওয়াইল্ড ওয়েস্টে’। এখানে শুধু অর্থনীতিই নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনও নিয়ন্ত্রিত হয় সোনার খনিকে ঘিরে। জমি, খনির যন্ত্রপাতি, শ্রম এবং স্থানীয় নিয়ম—সবকিছুর ওপরই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব রয়েছে।

শৈশব থেকেই খনির জীবনে

মারিয়ার খনির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল খুব অল্প বয়সেই। মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি পড়াশোনা ছেড়ে খনিতে কাজ শুরু করেন। ১৪ বছর বয়সে সহজ জীবনের আশায় বাড়ি ছেড়ে এক পুরুষের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু পরিস্থিতি সহজ হওয়ার বদলে তিনি আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন খনিনির্ভর অর্থনীতিতে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সংসার সামলানোর দায়িত্বও।

খনি এলাকায় নারীদের জন্য ঘরের বাইরে কাজের সুযোগ খুবই সীমিত। এমন একটি কাজ হলো ‘চাতারেয়ারা’ হিসেবে কাজ করা। খনিতে ফেলে দেওয়া পাথর ও খনিজ বর্জ্যের স্তূপ থেকে নারীরা খুঁজে দেখেন, সেখানে সোনার কোনো ক্ষুদ্র অংশ রয়েছে কি না।

অনেক নারী ভোর ৩টার দিকেই ঘুম থেকে ওঠেন। দিনের অন্য শ্রম শুরু করার আগে তাদের ঘরের কাজ শেষ করতে হয়। এরপর খনিজ বর্জ্য সংগ্রহের কাজে যেতে হয়। পর্যাপ্ত উপাদান সংগ্রহ করতে অনেক সময় এক মাসেরও বেশি লেগে যায়। তারপর সেগুলো নিয়ে যেতে হয় মিল বা প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে। সেখানে কাজের পরিমাণ অনুযায়ী সামান্য পারিশ্রমিক পান তারা।

Illegal mining has muddied tropical rivers worldwide | Science | AAAS

নদীও হারাচ্ছে নারীদের জীবিকা

একসময় নদীতে সোনা খোঁজা ছিল নারীদের আরেকটি প্রচলিত কাজ। কিন্তু ভারী খননযন্ত্র ও ড্রেজার নদীর তলদেশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করায় সেই কাজও কঠিন হয়ে পড়েছে।

এখন নদীতে সোনা খুঁজতে নারীদের অনেক দূরে যেতে হয়। নৌকায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এরপর পায়ে হেঁটে প্রত্যন্ত এলাকায় যেতে হয়। অনেককে সেখানে কয়েক মাস পর্যন্ত অবস্থান করতে হয়।

কিছু মা সন্তানদের আত্মীয়দের কাছে রেখে যান। কিন্তু সবার সেই সুযোগ থাকে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে সন্তানদের স্কুল থেকে সরিয়ে তাদের সঙ্গে প্রত্যন্ত খনন এলাকায় নিয়ে যায়।

এই যাত্রায় নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। যৌন সহিংসতা সেখানে সাধারণ ঘটনা। ছেলেশিশুদের সশস্ত্র গোষ্ঠীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হতে পারে। মেয়েদের ক্ষেত্রে বয়সে অনেক বড় পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে। মারিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, দারিদ্র্যই অনেক পরিবারকে এমন ঝুঁকি নিতে বাধ্য করে।

খনির পাশে যৌন শোষণের অন্ধকার জগত

খনিকে ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনীতিতে নারীদের জন্য আরেকটি নির্মম বাস্তবতা রয়েছে। অধিকাংশ খনি শহরেই কোনো না কোনো ধরনের যৌন ব্যবসার কেন্দ্র রয়েছে। কোথাও তা অনুমোদিত বা সহনীয় যৌনকাজের পর্যায়ে থাকলেও কোথাও পরিস্থিতি গড়ায় সরাসরি দাসত্ব ও জবরদস্তিতে।

এখন ত্রিশের শেষ দিকে থাকা মারিয়া জানান, মাত্র ১৩ বছর বয়সে প্রথমবার এক খনি প্রশাসক তাকে অর্থের বিনিময়ে যৌন সম্পর্কে বাধ্য করার চেষ্টা করেছিলেন।

তার অভিজ্ঞতায় নারীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের সহিংসতা এতটাই নিয়মিত যে তা অনেকের কাছে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কিন্তু এই ‘স্বাভাবিকতা’ আসলে তৈরি হয়েছে ভয়, দারিদ্র্য এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে।

গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান ইনসাইট ক্রাইমের অ্যালিসিয়া ফ্লোরেসের মতে, বাউজো কাউকার বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী স্থানীয় মানুষের চলাফেরা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে। অনেক এলাকায় তারা রাতের নির্দিষ্ট সময়ের পর বাইরে বের হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। মানুষের কী করা যাবে এবং কী করা যাবে না, তা নির্ধারণ করে দেয় তাদের নিজস্ব আচরণবিধি।

Women lead brutal lives in Colombia's illegal gold-mining regions

গ্যাংরাই যেন প্রশাসন

এই আচরণবিধির আওতায় স্থানীয় বাসিন্দাদের রাস্তা বা সেতু মেরামতের মতো সামাজিক কাজেও অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। একই সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের মানুষের রক্ষাকর্তা ও সেবাদাতা হিসেবে তুলে ধরে।

কিন্তু এই তথাকথিত সুরক্ষার পেছনে থাকে ভয়ের রাজত্ব। বাসিন্দারা জানেন, নির্দেশ অমান্য করলে সহিংস প্রতিশোধের শিকার হতে পারেন।

খনিশ্রমিকদের কাছ থেকে আদায় করা হয় ‘ভাকুনা’ নামে পরিচিত চাঁদা। সাধারণত সোনা থেকে অর্জিত আয়ের একটি অংশ দিতে হয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে। বিনিময়ে তারা নিরাপত্তা দেওয়ার দাবি করে।

আগে এই অর্থ দেওয়ার বিনিময়ে কিছুটা নিরাপত্তা পাওয়া যেত বলে স্থানীয়দের অনেকে মনে করেন। কিন্তু বিভিন্ন অপরাধী গোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় সেই ব্যবস্থা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনেক বাসিন্দাকে এখন একাধিক গোষ্ঠীকে অর্থ দিতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে কলম্বিয়ার রাষ্ট্রীয় বাহিনীকেও অর্থ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সরকারের নীতিতেও দ্বন্দ্ব

সরকারও এই পরিস্থিতি সহজে সামাল দিতে পারছে না। সাবেক বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর সরকারের সময় কারিগরি বা ক্ষুদ্র পরিসরের খনিশ্রমিকদের নদীতে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে সোনা সংগ্রহের সুযোগ দিয়ে আইন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে তাদের বৈধ জীবিকার সুযোগ তৈরি করা।

অন্যদিকে সেনাবাহিনী অবৈধ খনিশিবিরে অভিযান চালিয়ে খনির যন্ত্রপাতি ধ্বংস বা জব্দ করে।

Women lead brutal lives in Colombia's illegal gold-mining regions

দুটি নীতির মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের দ্বন্দ্ব। কারণ পুরোনো পদ্ধতিতে এখন আর আগের মতো সোনা পাওয়া যায় না। ফলে অনেক খনিশ্রমিককে আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু এসব যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ প্রায়ই থাকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে।

ফলে অবৈধ খনির বিরুদ্ধে সরকারি অভিযান শেষ পর্যন্ত সেই শ্রমিকদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করে, যাদের সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে আনাই সরকারের লক্ষ্য।

বেরিয়ে এসেও ফিরতে হলো সোনার কাছে

মারিয়া একসময় এই জীবন থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন। ৩৫ বছর বয়সে নতুন এক সঙ্গীর সহায়তায় তিনি আবার পড়াশোনা শুরু করেন। রাতে এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পড়াশোনা করে শেষ পর্যন্ত ছোট শিশুদের শিক্ষক হিসেবে কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করেন।

কিছুদিন তিনি শিশুদের নিয়ে সমাজকর্মী হিসেবেও কাজ করেন। সেই চাকরিটি তাকে খনি অর্থনীতি থেকে দূরে থাকার সুযোগ দিয়েছিল।

কিন্তু চাকরির চুক্তি শেষ হয়ে যাওয়ার পর জারাগোজায় তার সামনে আর কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প ছিল না। শেষ পর্যন্ত সোনার টানেই তাকে আবার সেই পুরোনো জগতে ফিরতে হয়।

মারিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদও খুব কম। তার ভাষায়, রাজনৈতিক প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতি দেন। কোনো ভয়াবহ সহিংসতা বা ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটলে কিছুদিন মানুষের দৃষ্টি সেদিকে থাকে। মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নামে, কখনো এক দিনের জন্য মিছিলও হয়। কিন্তু এরপর আবার সবকিছু নীরব হয়ে যায়।

বাউজো কাউকার নারীদের জীবন তাই শুধু দারিদ্র্য বা অবৈধ খনির গল্প নয়। এটি এমন এক সমাজের চিত্র, যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদের বিপুল মূল্য মানুষের জীবনে সমৃদ্ধি না এনে বরং সহিংসতা, শোষণ, ভয় এবং নির্ভরতার নতুন চক্র তৈরি করেছে। সোনার দাম বাড়ছে, খনির বিস্তার ঘটছে—কিন্তু সেই সম্পদের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে অসংখ্য নারীর নিরাপত্তা, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ।