১০:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পাকিস্তানে পেট্রোল ভর্তুকিতে ৩০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন পটিয়ায় কক্সবাজার এক্সপ্রেসের বগি লাইনচ্যুত, ঢাকা-চট্টগ্রামের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাসভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব, দূরপাল্লায় ২০ পয়সা ও শহরে ১৮ পয়সা তৃতীয় দেশে নির্বাসন: পানামায় পাঠানো ইরানি খ্রিষ্টানের অনিশ্চিত জীবন জার্মানিতে ডানপন্থার উত্থানের জ্বালানি: হারিয়ে যাওয়া গৌরবের নস্টালজিয়া জিন্নাহর প্রতিকৃতি সরানোয় তাইয়েবকে হুমকির অভিযোগ, তদন্তের দাবি এডিপি বাস্তবায়নে পাঁচ বছরের সর্বনিম্ন হার, দুই মাসে অগ্রগতি মাত্র ১.৮৫ শতাংশ ডেঙ্গুতে আরও ৬ মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি ১,৬৫৫ বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ছকে দেখলে ভারতেরই কৌশলগত ক্ষতি নাক থেকে অন্ত্র—শরীরের অদৃশ্য প্রতিরক্ষা দেয়াল, কীভাবে কাজ করে মিউকোসাল ইমিউন সিস্টেম?

চীনের শুদ্ধি অভিযান: দুর্বলতার চিহ্ন নয়, ক্ষমতা ধরে রাখার এক দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থা

দীর্ঘদিন ধরে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির স্থায়িত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গবেষকেরা একটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন—প্রতিষ্ঠান। মাও সেতুংয়ের ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনের পর দলটি এমন এক রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছিল, যেখানে নেতৃত্বের মেয়াদ, সমষ্টিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কর্মকর্তাদের তুলনামূলক নিয়মতান্ত্রিক উন্নয়ন ব্যবস্থা দলীয় শাসনকে স্থিতিশীল করেছিল। ইউরোপের একের পর এক কমিউনিস্ট সরকার যখন ভেঙে পড়েছে, তখন চীনের ব্যবস্থা টিকে থাকার পেছনে এই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকেই বড় কারণ হিসেবে দেখা হয়েছে।

কিন্তু শি জিনপিংয়ের আমলে সেই ব্যাখ্যা ক্রমেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্টের মেয়াদের সাংবিধানিক সীমা তুলে দেওয়া হয়েছে, সমষ্টিগত নেতৃত্বের গুরুত্ব কমেছে এবং উত্তরসূরি নির্ধারণের প্রচলিত রীতিও কার্যত অদৃশ্য। একই সঙ্গে দল ও সামরিক বাহিনীতে ধারাবাহিকভাবে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত, অপসারণ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সামরিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেই এর ব্যাপ্তি বিশেষভাবে দৃশ্যমান। ২০২২ সাল থেকে বহু জেনারেল ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল দলীয় শুদ্ধি অভিযানের আওতায় পড়েছেন।

বাইরের পর্যবেক্ষকদের কাছে এমন পরিস্থিতি সহজেই ক্ষমতার দুর্বলতার লক্ষণ বলে মনে হতে পারে। একজন নেতা যদি ক্রমাগত নিজের চারপাশের কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেন, তাহলে সেটিকে অনাস্থা, অভ্যন্তরীণ সংকট কিংবা শাসনব্যবস্থার ভঙ্গুরতার প্রমাণ হিসেবে দেখা স্বাভাবিক। কিন্তু চীনের অভিজ্ঞতা অন্য একটি বাস্তবতা সামনে আনে। ধারাবাহিক শুদ্ধি অভিযান সত্ত্বেও দলটি ভেঙে পড়েনি। বরং এই প্রক্রিয়াই হয়তো দলটির নিয়ন্ত্রণ আরও গভীর করেছে।

China's Military Purge Shows No Sign of Stopping - Domino Theory

শুদ্ধি মানেই বহিষ্কার নয়

চীনা কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বোঝার জন্য ‘শুদ্ধি’ শব্দটির প্রচলিত অর্থের বাইরে তাকাতে হয়। সব ক্ষেত্রেই এর লক্ষ্য কাউকে দল থেকে বের করে দেওয়া বা ধ্বংস করা নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে দল এমন একটি পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, যার উদ্দেশ্য হলো কর্মকর্তাকে নিজের ভুল স্বীকার করানো, তাকে পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখা এবং প্রয়োজনে তার অবস্থান কমিয়ে দিয়েও দলীয় কাঠামোর ভেতরে ধরে রাখা।

এই ব্যবস্থার শিকড় চীনা কমিউনিস্ট আন্দোলনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে। ১৯২৯ সালে ফুজিয়ান প্রদেশের গুতিয়ানে মাওয়ের প্রস্তাবিত দলীয় সংশোধন নীতিতে কর্মকর্তাদের নানা রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বিচ্যুতিকে এক ধরনের ‘অসুস্থতা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার মাধ্যমে সেই অসুস্থতা সংশোধনের ধারণা তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

পরবর্তীতে ইয়ানআন পর্বে এই পদ্ধতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সালের সংশোধন অভিযানে কর্মকর্তাদের আত্মজীবনী লিখতে হয়েছে, নিজেদের রাজনৈতিক আচরণ পরীক্ষা করতে হয়েছে, সহকর্মীদের সামনে আত্মসমালোচনা করতে হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত দলীয় কর্তৃপক্ষের মূল্যায়নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল শুধু শাস্তি দেওয়া নয়; বরং দলীয় কাঠামোর মধ্যে তাদের পুনর্গঠন করা।

এই ব্যবস্থার নিষ্ঠুরতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ইয়ানআন অভিযানে নির্যাতন হয়েছে, বহু মানুষ মারা গেছেন এবং পরবর্তী বিভিন্ন রাজনৈতিক অভিযানে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। কিন্তু চীনা ব্যবস্থার একটি বৈশিষ্ট্য ছিল—অনেক ক্ষেত্রেই কর্মকর্তাকে পুরোপুরি বাদ না দিয়ে তার বিরুদ্ধে একটি স্থায়ী রেকর্ড তৈরি করা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের জন্য সেই তথ্য সংরক্ষণ করা।

নথিই হয়ে ওঠে ক্ষমতার হাতিয়ার

আজকের চীনে এই প্রক্রিয়ার মৌলিক কাঠামো খুব একটা বদলায়নি। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তাকে নিজের কর্মকাণ্ড ও ভুলের ব্যাখ্যা দিতে হয়। তার বক্তব্য যাচাই করা হয় সহকর্মীদের মূল্যায়ন এবং পূর্ববর্তী প্রশাসনিক নথির সঙ্গে মিলিয়ে। এরপর সম্ভাব্য শাস্তির একটি ধাপ নির্ধারিত হয়—কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া থেকে শুরু করে দল থেকে বহিষ্কার পর্যন্ত।

Xi Tells Officials Scared of Being Purged: It's OK to Make Mistakes - WSJ

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শাস্তির মধ্যবর্তী ধাপগুলোই ব্যবহৃত হয়। গুরুতর সতর্কবার্তা, পদাবনতি, পরীক্ষামূলক অবস্থান কিংবা রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক করে রাখা—এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে একজন কর্মকর্তা দলীয় কাঠামোর বাইরে না গিয়েও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকেন।

আর এই পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল হয় একটি নথি। আত্মসমালোচনা, সহকর্মীদের মূল্যায়ন, তদন্তের ফল এবং সিদ্ধান্ত—সবকিছু কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ফাইলে জমা থাকে। সেই ফাইল ভবিষ্যতে আবার খোলা যেতে পারে। ফলে শাস্তি শেষ হলেও ঝুঁকি শেষ হয় না।

এই ব্যবস্থার শক্তি এখানেই। এটি শুধু কাউকে শাস্তি দেওয়ার উপায় নয়; এটি একটি বিশাল তথ্যভান্ডার। প্রায় এক শতাব্দী ধরে কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক আচরণ, সম্পর্ক, ভুল, আনুগত্য এবং দুর্বলতার তথ্য সংরক্ষণ করার ফলে দল তার নিজস্ব আমলাতন্ত্র সম্পর্কে বিপুল পরিমাণ তথ্য হাতে রাখে। স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অভ্যন্তরীণ হুমকি ঠেকাতে তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনের ব্যক্তিগত নথি ব্যবস্থা সেই তথ্য সরবরাহ করে।

ভয়ের সঙ্গে আনুগত্যের সমীকরণ

এখানে শুদ্ধি অভিযানের আরেকটি রাজনৈতিক কার্যকারিতা রয়েছে। একজন কর্মকর্তা জানেন, তার অতীতের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কোনো না কোনো নথিতে সংরক্ষিত। আজ তাকে ক্ষমা করা হলেও ভবিষ্যতে সেই ফাইল আবার সামনে আসতে পারে। ফলে দলীয় সদস্যের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে সব সময় প্রকাশ্য দমন-পীড়নের প্রয়োজন হয় না।

এক অর্থে এটি আত্মনিয়ন্ত্রণ তৈরি করে। দলের সদস্যরা জানেন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার থেকে বিচ্যুত হলে তার মূল্য দিতে হতে পারে। আবার যথেষ্ট অনুশোচনা, আনুগত্য এবং সহযোগিতা দেখালে সম্পূর্ণভাবে দল থেকে ছিটকে পড়ার সম্ভাবনা কমে। এই দ্বৈত সংকেত—ভয় এবং ক্ষমার সম্ভাবনা—ব্যবস্থাটিকে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শাস্তির দায় সাধারণত একক কোনো নেতার ওপর বর্তায় না। তদন্তকারী দল, সহকর্মী, প্রশাসনিক কমিটি এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ—বিভিন্ন স্তর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এমনকি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নিজের আত্মসমালোচনাও পুরো প্রক্রিয়ার অংশ। ফলে শাস্তির সিদ্ধান্তটি একটি যৌথ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ফল হিসেবে উপস্থাপিত হয়।

এটি শুধু শৃঙ্খলা রক্ষার কৌশল নয়; এটি সমন্বয়ের ব্যবস্থাও। চীনের বিশাল দলীয় ও প্রশাসনিক কাঠামোর বিভিন্ন অংশের নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে। কিন্তু যখন কেন্দ্র কোনো শুদ্ধি অভিযানকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন স্থানীয় ও প্রাদেশিক কর্মকর্তাদের কাছে বার্তা পরিষ্কার হয়ে যায়—এই নির্দেশ অমান্য করার সুযোগ সীমিত। ফলে অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মধ্যেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব একটি অভিন্ন রাজনৈতিক লক্ষ্য চাপিয়ে দিতে পারে।

Do China's recent military purges spell trouble for Xi Jinping?

শি জিনপিংয়ের ‘স্ব-সংস্কার’ ধারণা

শি জিনপিং এই ঐতিহাসিক পদ্ধতিকে শুধু প্রশাসনিক কৌশল হিসেবে দেখেন না। তিনি দলের টিকে থাকার সঙ্গে এটিকে সরাসরি যুক্ত করেছেন। তাঁর ধারণায়, একটি কমিউনিস্ট দলের পতন বাইরের শত্রুর কারণে যতটা হতে পারে, তার চেয়ে বেশি হতে পারে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার ক্ষয় থেকে।

এই কারণেই ‘স্ব-সংস্কার’ বা দলের নিজের ভেতর থেকেই নিজেকে সংশোধনের ধারণা শি আমলে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। দলের অসুস্থতা সারাতে বাইরের কোনো শক্তির প্রয়োজন নেই; দল নিজেই নিজের দুর্বলতা শনাক্ত করবে, কর্মকর্তাদের সংশোধন করবে এবং প্রয়োজন হলে কাউকে সরিয়ে দেবে।

এই ধারণার প্রতীকী ব্যবহারও লক্ষণীয়। ২০১৪ সালে শি শত শত জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাকে গুতিয়ানে নিয়ে গিয়েছিলেন—যে স্থান মাওয়ের দলীয় সংশোধন নীতির ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। ২০২৪ সালেও সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক কাজ নিয়ে ইয়ানআনে বৈঠক আয়োজন করা হয়। অর্থাৎ বর্তমান নেতৃত্ব অতীতের সংশোধন অভিযানকে শুধু ইতিহাস হিসেবে দেখছে না; বরং বর্তমান শাসনব্যবস্থার শক্তির উৎস হিসেবেও ব্যবহার করছে।

এই পদ্ধতির মূল্যও আছে

তবে যে ব্যবস্থা দলকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করে, সেটিই রাষ্ট্রের অন্য কিছু সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীতে অতিরিক্ত রাজনৈতিক আনুগত্যের গুরুত্ব কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতার চেয়ে বেশি হয়ে উঠলে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

যে কর্মকর্তা জানেন, রাজনৈতিক ভুল তার কর্মজীবন শেষ করে দিতে পারে, তিনি স্বাভাবিকভাবেই এমন সিদ্ধান্ত নিতে চাইবেন যা রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ। এর ফলে উদ্যোগ, স্বাধীন মূল্যায়ন এবং ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। উচ্চপর্যায়ের সামরিক পদ দীর্ঘ সময় শূন্য থাকা কিংবা তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ওপর দায়িত্ব পড়া সেই সমস্যার সম্ভাব্য দিক নির্দেশ করে।

অর্থাৎ দলীয় নিয়ন্ত্রণ যত শক্তিশালী হয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যকর স্বাধীনতা তত সংকুচিত হতে পারে। চীনের নেতৃত্ব এই বিনিময় মেনে নিতে প্রস্তুত—কারণ তাদের কাছে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণই শাসনের প্রথম শর্ত।

Xi Jinping wants to be seen as on a par with Mao Zedong and Deng Xiaoping |  South China Morning Post

আসল প্রশ্ন শুদ্ধি নয়, উত্তরাধিকার

তবু এই পুরো ব্যবস্থার একটি সীমা আছে। শুদ্ধি অভিযান কাউকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কর্মকর্তাদের আনুগত্য নিশ্চিত করতে পারে, বিপুল পরিমাণ তথ্য জমা করতে পারে এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের ঝুঁকি কমাতে পারে। কিন্তু এটি একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না—এর পর কে?

এখানেই চীনের বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।

মাও ও দেং শিয়াওপিংয়ের মতো পুরোনো নেতারা বিপ্লবী বৈধতা ও ব্যক্তিগত কর্তৃত্বের ওপর নির্ভর করতে পেরেছিলেন। পরবর্তী সময়ে দল মেয়াদসীমা, সমষ্টিগত নেতৃত্ব এবং নিয়মিত উত্তরাধিকার প্রক্রিয়ার মতো প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিল। শি জিনপিংয়ের সময়ে এসব ব্যবস্থার অনেকটাই দুর্বল হয়েছে। ফলে একজন শক্তিশালী নেতার অধীনে শৃঙ্খলা যতই কার্যকর হোক, তার পরবর্তী নেতৃত্ব কীভাবে নির্ধারিত হবে—সেই প্রশ্নের উত্তর একই ব্যবস্থার মধ্যে সহজে পাওয়া যায় না।

বরং অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ফল হতে পারে উত্তরসূরি তৈরির পথ আরও সংকীর্ণ হয়ে যাওয়া। যদি সম্ভাব্য কোনো নেতা স্বাধীন রাজনৈতিক ভিত্তি, নিজস্ব অনুসারী গোষ্ঠী কিংবা আলাদা কর্তৃত্ব গড়ে তুলতে না পারেন, তাহলে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ভারসাম্যও তৈরি হয় না।

এই কারণেই চীনের জেনারেলদের একের পর এক তদন্তের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্ন। কোনো সামরিক কর্মকর্তা তদন্তের আওতায় পড়লেন কি না, সেটি বর্তমান শাসনব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের অংশ। কিন্তু বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার পর ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সমস্যা।

Xi Jinping's latest purge: paranoid or purposeful?

চীনের শক্তি ও দুর্বলতা একই জায়গায়

চীনের কমিউনিস্ট পার্টির স্থায়িত্বকে শুধু শি জিনপিংয়ের ব্যক্তিগত ক্ষমতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা তাই যথেষ্ট নয়। দলটি দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি শৃঙ্খলা ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে কর্মকর্তাদের ভুল, আনুগত্য, সম্পর্ক ও রাজনৈতিক আচরণকে নথিবদ্ধ করা হয়; প্রয়োজন হলে সেই নথি আবার ব্যবহার করা যায়। এই কাঠামো দলীয় ভাঙন ঠেকাতে এবং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তাই ধারাবাহিক শুদ্ধি অভিযানকে শুধু অস্থিরতার লক্ষণ হিসেবে দেখলে চীনা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। শুদ্ধি এখানে একই সঙ্গে শাস্তি, তথ্য সংগ্রহ, ভয় সৃষ্টি, আনুগত্য নিশ্চিতকরণ এবং আমলাতান্ত্রিক সমন্বয়ের হাতিয়ার।

কিন্তু এই ব্যবস্থার সাফল্যও একটি সীমারেখায় এসে থামে। একটি দল তার সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাদের রাজনৈতিক আচরণ নথিবদ্ধ করতে পারে এবং সম্ভাব্য বিদ্রোহ ঠেকাতে পারে। কিন্তু ক্ষমতার পরবর্তী বৈধ কেন্দ্র কোথায় তৈরি হবে, সেই প্রশ্নকে শুধু শৃঙ্খলা দিয়ে সমাধান করা যায় না।

চীনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তাই আজ কতজন কর্মকর্তা অপসারিত হলেন, তা নয়। বরং এমন এক ব্যবস্থায় পরবর্তী নেতৃত্ব কীভাবে নির্ধারিত হবে, যেখানে বর্তমান নেতৃত্বের শক্তির অন্যতম ভিত্তিই হলো সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের স্বাধীন রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে উঠতে না দেওয়া।

দলটি হয়তো রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হতে পারে, একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার কিছু ক্ষেত্রে আরও দুর্বল হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার আসল প্রশ্ন রয়ে যাবে ক্ষমতার উত্তরাধিকার। শুদ্ধি অভিযান সেই প্রশ্নকে স্থগিত রাখতে পারে; এর উত্তর দিতে পারে না।

জনপ্রিয় সংবাদ

পাকিস্তানে পেট্রোল ভর্তুকিতে ৩০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন

চীনের শুদ্ধি অভিযান: দুর্বলতার চিহ্ন নয়, ক্ষমতা ধরে রাখার এক দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থা

০৭:০২:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দীর্ঘদিন ধরে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির স্থায়িত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গবেষকেরা একটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন—প্রতিষ্ঠান। মাও সেতুংয়ের ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনের পর দলটি এমন এক রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছিল, যেখানে নেতৃত্বের মেয়াদ, সমষ্টিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কর্মকর্তাদের তুলনামূলক নিয়মতান্ত্রিক উন্নয়ন ব্যবস্থা দলীয় শাসনকে স্থিতিশীল করেছিল। ইউরোপের একের পর এক কমিউনিস্ট সরকার যখন ভেঙে পড়েছে, তখন চীনের ব্যবস্থা টিকে থাকার পেছনে এই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকেই বড় কারণ হিসেবে দেখা হয়েছে।

কিন্তু শি জিনপিংয়ের আমলে সেই ব্যাখ্যা ক্রমেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্টের মেয়াদের সাংবিধানিক সীমা তুলে দেওয়া হয়েছে, সমষ্টিগত নেতৃত্বের গুরুত্ব কমেছে এবং উত্তরসূরি নির্ধারণের প্রচলিত রীতিও কার্যত অদৃশ্য। একই সঙ্গে দল ও সামরিক বাহিনীতে ধারাবাহিকভাবে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত, অপসারণ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সামরিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেই এর ব্যাপ্তি বিশেষভাবে দৃশ্যমান। ২০২২ সাল থেকে বহু জেনারেল ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল দলীয় শুদ্ধি অভিযানের আওতায় পড়েছেন।

বাইরের পর্যবেক্ষকদের কাছে এমন পরিস্থিতি সহজেই ক্ষমতার দুর্বলতার লক্ষণ বলে মনে হতে পারে। একজন নেতা যদি ক্রমাগত নিজের চারপাশের কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেন, তাহলে সেটিকে অনাস্থা, অভ্যন্তরীণ সংকট কিংবা শাসনব্যবস্থার ভঙ্গুরতার প্রমাণ হিসেবে দেখা স্বাভাবিক। কিন্তু চীনের অভিজ্ঞতা অন্য একটি বাস্তবতা সামনে আনে। ধারাবাহিক শুদ্ধি অভিযান সত্ত্বেও দলটি ভেঙে পড়েনি। বরং এই প্রক্রিয়াই হয়তো দলটির নিয়ন্ত্রণ আরও গভীর করেছে।

China's Military Purge Shows No Sign of Stopping - Domino Theory

শুদ্ধি মানেই বহিষ্কার নয়

চীনা কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বোঝার জন্য ‘শুদ্ধি’ শব্দটির প্রচলিত অর্থের বাইরে তাকাতে হয়। সব ক্ষেত্রেই এর লক্ষ্য কাউকে দল থেকে বের করে দেওয়া বা ধ্বংস করা নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে দল এমন একটি পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, যার উদ্দেশ্য হলো কর্মকর্তাকে নিজের ভুল স্বীকার করানো, তাকে পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখা এবং প্রয়োজনে তার অবস্থান কমিয়ে দিয়েও দলীয় কাঠামোর ভেতরে ধরে রাখা।

এই ব্যবস্থার শিকড় চীনা কমিউনিস্ট আন্দোলনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে। ১৯২৯ সালে ফুজিয়ান প্রদেশের গুতিয়ানে মাওয়ের প্রস্তাবিত দলীয় সংশোধন নীতিতে কর্মকর্তাদের নানা রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বিচ্যুতিকে এক ধরনের ‘অসুস্থতা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার মাধ্যমে সেই অসুস্থতা সংশোধনের ধারণা তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

পরবর্তীতে ইয়ানআন পর্বে এই পদ্ধতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সালের সংশোধন অভিযানে কর্মকর্তাদের আত্মজীবনী লিখতে হয়েছে, নিজেদের রাজনৈতিক আচরণ পরীক্ষা করতে হয়েছে, সহকর্মীদের সামনে আত্মসমালোচনা করতে হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত দলীয় কর্তৃপক্ষের মূল্যায়নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল শুধু শাস্তি দেওয়া নয়; বরং দলীয় কাঠামোর মধ্যে তাদের পুনর্গঠন করা।

এই ব্যবস্থার নিষ্ঠুরতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ইয়ানআন অভিযানে নির্যাতন হয়েছে, বহু মানুষ মারা গেছেন এবং পরবর্তী বিভিন্ন রাজনৈতিক অভিযানে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। কিন্তু চীনা ব্যবস্থার একটি বৈশিষ্ট্য ছিল—অনেক ক্ষেত্রেই কর্মকর্তাকে পুরোপুরি বাদ না দিয়ে তার বিরুদ্ধে একটি স্থায়ী রেকর্ড তৈরি করা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের জন্য সেই তথ্য সংরক্ষণ করা।

নথিই হয়ে ওঠে ক্ষমতার হাতিয়ার

আজকের চীনে এই প্রক্রিয়ার মৌলিক কাঠামো খুব একটা বদলায়নি। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তাকে নিজের কর্মকাণ্ড ও ভুলের ব্যাখ্যা দিতে হয়। তার বক্তব্য যাচাই করা হয় সহকর্মীদের মূল্যায়ন এবং পূর্ববর্তী প্রশাসনিক নথির সঙ্গে মিলিয়ে। এরপর সম্ভাব্য শাস্তির একটি ধাপ নির্ধারিত হয়—কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া থেকে শুরু করে দল থেকে বহিষ্কার পর্যন্ত।

Xi Tells Officials Scared of Being Purged: It's OK to Make Mistakes - WSJ

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শাস্তির মধ্যবর্তী ধাপগুলোই ব্যবহৃত হয়। গুরুতর সতর্কবার্তা, পদাবনতি, পরীক্ষামূলক অবস্থান কিংবা রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক করে রাখা—এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে একজন কর্মকর্তা দলীয় কাঠামোর বাইরে না গিয়েও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকেন।

আর এই পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল হয় একটি নথি। আত্মসমালোচনা, সহকর্মীদের মূল্যায়ন, তদন্তের ফল এবং সিদ্ধান্ত—সবকিছু কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ফাইলে জমা থাকে। সেই ফাইল ভবিষ্যতে আবার খোলা যেতে পারে। ফলে শাস্তি শেষ হলেও ঝুঁকি শেষ হয় না।

এই ব্যবস্থার শক্তি এখানেই। এটি শুধু কাউকে শাস্তি দেওয়ার উপায় নয়; এটি একটি বিশাল তথ্যভান্ডার। প্রায় এক শতাব্দী ধরে কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক আচরণ, সম্পর্ক, ভুল, আনুগত্য এবং দুর্বলতার তথ্য সংরক্ষণ করার ফলে দল তার নিজস্ব আমলাতন্ত্র সম্পর্কে বিপুল পরিমাণ তথ্য হাতে রাখে। স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অভ্যন্তরীণ হুমকি ঠেকাতে তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনের ব্যক্তিগত নথি ব্যবস্থা সেই তথ্য সরবরাহ করে।

ভয়ের সঙ্গে আনুগত্যের সমীকরণ

এখানে শুদ্ধি অভিযানের আরেকটি রাজনৈতিক কার্যকারিতা রয়েছে। একজন কর্মকর্তা জানেন, তার অতীতের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কোনো না কোনো নথিতে সংরক্ষিত। আজ তাকে ক্ষমা করা হলেও ভবিষ্যতে সেই ফাইল আবার সামনে আসতে পারে। ফলে দলীয় সদস্যের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে সব সময় প্রকাশ্য দমন-পীড়নের প্রয়োজন হয় না।

এক অর্থে এটি আত্মনিয়ন্ত্রণ তৈরি করে। দলের সদস্যরা জানেন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার থেকে বিচ্যুত হলে তার মূল্য দিতে হতে পারে। আবার যথেষ্ট অনুশোচনা, আনুগত্য এবং সহযোগিতা দেখালে সম্পূর্ণভাবে দল থেকে ছিটকে পড়ার সম্ভাবনা কমে। এই দ্বৈত সংকেত—ভয় এবং ক্ষমার সম্ভাবনা—ব্যবস্থাটিকে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শাস্তির দায় সাধারণত একক কোনো নেতার ওপর বর্তায় না। তদন্তকারী দল, সহকর্মী, প্রশাসনিক কমিটি এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ—বিভিন্ন স্তর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এমনকি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নিজের আত্মসমালোচনাও পুরো প্রক্রিয়ার অংশ। ফলে শাস্তির সিদ্ধান্তটি একটি যৌথ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ফল হিসেবে উপস্থাপিত হয়।

এটি শুধু শৃঙ্খলা রক্ষার কৌশল নয়; এটি সমন্বয়ের ব্যবস্থাও। চীনের বিশাল দলীয় ও প্রশাসনিক কাঠামোর বিভিন্ন অংশের নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে। কিন্তু যখন কেন্দ্র কোনো শুদ্ধি অভিযানকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন স্থানীয় ও প্রাদেশিক কর্মকর্তাদের কাছে বার্তা পরিষ্কার হয়ে যায়—এই নির্দেশ অমান্য করার সুযোগ সীমিত। ফলে অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মধ্যেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব একটি অভিন্ন রাজনৈতিক লক্ষ্য চাপিয়ে দিতে পারে।

Do China's recent military purges spell trouble for Xi Jinping?

শি জিনপিংয়ের ‘স্ব-সংস্কার’ ধারণা

শি জিনপিং এই ঐতিহাসিক পদ্ধতিকে শুধু প্রশাসনিক কৌশল হিসেবে দেখেন না। তিনি দলের টিকে থাকার সঙ্গে এটিকে সরাসরি যুক্ত করেছেন। তাঁর ধারণায়, একটি কমিউনিস্ট দলের পতন বাইরের শত্রুর কারণে যতটা হতে পারে, তার চেয়ে বেশি হতে পারে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার ক্ষয় থেকে।

এই কারণেই ‘স্ব-সংস্কার’ বা দলের নিজের ভেতর থেকেই নিজেকে সংশোধনের ধারণা শি আমলে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। দলের অসুস্থতা সারাতে বাইরের কোনো শক্তির প্রয়োজন নেই; দল নিজেই নিজের দুর্বলতা শনাক্ত করবে, কর্মকর্তাদের সংশোধন করবে এবং প্রয়োজন হলে কাউকে সরিয়ে দেবে।

এই ধারণার প্রতীকী ব্যবহারও লক্ষণীয়। ২০১৪ সালে শি শত শত জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাকে গুতিয়ানে নিয়ে গিয়েছিলেন—যে স্থান মাওয়ের দলীয় সংশোধন নীতির ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। ২০২৪ সালেও সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক কাজ নিয়ে ইয়ানআনে বৈঠক আয়োজন করা হয়। অর্থাৎ বর্তমান নেতৃত্ব অতীতের সংশোধন অভিযানকে শুধু ইতিহাস হিসেবে দেখছে না; বরং বর্তমান শাসনব্যবস্থার শক্তির উৎস হিসেবেও ব্যবহার করছে।

এই পদ্ধতির মূল্যও আছে

তবে যে ব্যবস্থা দলকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করে, সেটিই রাষ্ট্রের অন্য কিছু সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীতে অতিরিক্ত রাজনৈতিক আনুগত্যের গুরুত্ব কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতার চেয়ে বেশি হয়ে উঠলে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

যে কর্মকর্তা জানেন, রাজনৈতিক ভুল তার কর্মজীবন শেষ করে দিতে পারে, তিনি স্বাভাবিকভাবেই এমন সিদ্ধান্ত নিতে চাইবেন যা রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ। এর ফলে উদ্যোগ, স্বাধীন মূল্যায়ন এবং ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। উচ্চপর্যায়ের সামরিক পদ দীর্ঘ সময় শূন্য থাকা কিংবা তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ওপর দায়িত্ব পড়া সেই সমস্যার সম্ভাব্য দিক নির্দেশ করে।

অর্থাৎ দলীয় নিয়ন্ত্রণ যত শক্তিশালী হয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যকর স্বাধীনতা তত সংকুচিত হতে পারে। চীনের নেতৃত্ব এই বিনিময় মেনে নিতে প্রস্তুত—কারণ তাদের কাছে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণই শাসনের প্রথম শর্ত।

Xi Jinping wants to be seen as on a par with Mao Zedong and Deng Xiaoping |  South China Morning Post

আসল প্রশ্ন শুদ্ধি নয়, উত্তরাধিকার

তবু এই পুরো ব্যবস্থার একটি সীমা আছে। শুদ্ধি অভিযান কাউকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কর্মকর্তাদের আনুগত্য নিশ্চিত করতে পারে, বিপুল পরিমাণ তথ্য জমা করতে পারে এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের ঝুঁকি কমাতে পারে। কিন্তু এটি একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না—এর পর কে?

এখানেই চীনের বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।

মাও ও দেং শিয়াওপিংয়ের মতো পুরোনো নেতারা বিপ্লবী বৈধতা ও ব্যক্তিগত কর্তৃত্বের ওপর নির্ভর করতে পেরেছিলেন। পরবর্তী সময়ে দল মেয়াদসীমা, সমষ্টিগত নেতৃত্ব এবং নিয়মিত উত্তরাধিকার প্রক্রিয়ার মতো প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিল। শি জিনপিংয়ের সময়ে এসব ব্যবস্থার অনেকটাই দুর্বল হয়েছে। ফলে একজন শক্তিশালী নেতার অধীনে শৃঙ্খলা যতই কার্যকর হোক, তার পরবর্তী নেতৃত্ব কীভাবে নির্ধারিত হবে—সেই প্রশ্নের উত্তর একই ব্যবস্থার মধ্যে সহজে পাওয়া যায় না।

বরং অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ফল হতে পারে উত্তরসূরি তৈরির পথ আরও সংকীর্ণ হয়ে যাওয়া। যদি সম্ভাব্য কোনো নেতা স্বাধীন রাজনৈতিক ভিত্তি, নিজস্ব অনুসারী গোষ্ঠী কিংবা আলাদা কর্তৃত্ব গড়ে তুলতে না পারেন, তাহলে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ভারসাম্যও তৈরি হয় না।

এই কারণেই চীনের জেনারেলদের একের পর এক তদন্তের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্ন। কোনো সামরিক কর্মকর্তা তদন্তের আওতায় পড়লেন কি না, সেটি বর্তমান শাসনব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের অংশ। কিন্তু বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার পর ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সমস্যা।

Xi Jinping's latest purge: paranoid or purposeful?

চীনের শক্তি ও দুর্বলতা একই জায়গায়

চীনের কমিউনিস্ট পার্টির স্থায়িত্বকে শুধু শি জিনপিংয়ের ব্যক্তিগত ক্ষমতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা তাই যথেষ্ট নয়। দলটি দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি শৃঙ্খলা ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে কর্মকর্তাদের ভুল, আনুগত্য, সম্পর্ক ও রাজনৈতিক আচরণকে নথিবদ্ধ করা হয়; প্রয়োজন হলে সেই নথি আবার ব্যবহার করা যায়। এই কাঠামো দলীয় ভাঙন ঠেকাতে এবং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তাই ধারাবাহিক শুদ্ধি অভিযানকে শুধু অস্থিরতার লক্ষণ হিসেবে দেখলে চীনা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। শুদ্ধি এখানে একই সঙ্গে শাস্তি, তথ্য সংগ্রহ, ভয় সৃষ্টি, আনুগত্য নিশ্চিতকরণ এবং আমলাতান্ত্রিক সমন্বয়ের হাতিয়ার।

কিন্তু এই ব্যবস্থার সাফল্যও একটি সীমারেখায় এসে থামে। একটি দল তার সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাদের রাজনৈতিক আচরণ নথিবদ্ধ করতে পারে এবং সম্ভাব্য বিদ্রোহ ঠেকাতে পারে। কিন্তু ক্ষমতার পরবর্তী বৈধ কেন্দ্র কোথায় তৈরি হবে, সেই প্রশ্নকে শুধু শৃঙ্খলা দিয়ে সমাধান করা যায় না।

চীনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তাই আজ কতজন কর্মকর্তা অপসারিত হলেন, তা নয়। বরং এমন এক ব্যবস্থায় পরবর্তী নেতৃত্ব কীভাবে নির্ধারিত হবে, যেখানে বর্তমান নেতৃত্বের শক্তির অন্যতম ভিত্তিই হলো সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের স্বাধীন রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে উঠতে না দেওয়া।

দলটি হয়তো রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হতে পারে, একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার কিছু ক্ষেত্রে আরও দুর্বল হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার আসল প্রশ্ন রয়ে যাবে ক্ষমতার উত্তরাধিকার। শুদ্ধি অভিযান সেই প্রশ্নকে স্থগিত রাখতে পারে; এর উত্তর দিতে পারে না।