০৯:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পটিয়ায় কক্সবাজার এক্সপ্রেসের বগি লাইনচ্যুত, ঢাকা-চট্টগ্রামের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাসভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব, দূরপাল্লায় ২০ পয়সা ও শহরে ১৮ পয়সা তৃতীয় দেশে নির্বাসন: পানামায় পাঠানো ইরানি খ্রিষ্টানের অনিশ্চিত জীবন জার্মানিতে ডানপন্থার উত্থানের জ্বালানি: হারিয়ে যাওয়া গৌরবের নস্টালজিয়া জিন্নাহর প্রতিকৃতি সরানোয় তাইয়েবকে হুমকির অভিযোগ, তদন্তের দাবি এডিপি বাস্তবায়নে পাঁচ বছরের সর্বনিম্ন হার, দুই মাসে অগ্রগতি মাত্র ১.৮৫ শতাংশ ডেঙ্গুতে আরও ৬ মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি ১,৬৫৫ বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ছকে দেখলে ভারতেরই কৌশলগত ক্ষতি নাক থেকে অন্ত্র—শরীরের অদৃশ্য প্রতিরক্ষা দেয়াল, কীভাবে কাজ করে মিউকোসাল ইমিউন সিস্টেম? পাঞ্জাবই কি পাকিস্তান? ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণে বাড়ছে প্রাদেশিক বৈষম্য

মানবিক সংকট কি এখন বিশ্বের নতুন স্বাভাবিকতা? যুদ্ধ থামছে না, বদলে যাচ্ছে শুধু বিশ্বের মনোযোগ

বিশ্বজুড়ে মানবিক সংকটের চিত্র এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একের পর এক যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, ক্ষুধা ও ধ্বংস যেন মানুষের কাছে ধীরে ধীরে পরিচিত বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। সুদানে ভয়াবহ সংঘাত চলছে, গাজায় মানবিক বিপর্যয় অব্যাহত, ইয়েমেন এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধের ক্ষত বহন করছে। আফগানিস্তানে কয়েক দশকের যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও বঞ্চনা মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। অন্যদিকে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সংঘাত চলছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এসব সংকটের মধ্যে বেড়ে উঠছে লাখ লাখ শিশু। বাস্তুচ্যুতি, নিরাপত্তাহীনতা, ক্ষুধা ও ত্রাণের ওপর নির্ভরতা তাদের কাছে আর সাময়িক অভিজ্ঞতা নয়। যুদ্ধ ও সংকট তাদের শৈশব কেড়ে নিচ্ছে।

কিন্তু বিপদ শুধু এই নয় যে সংকটগুলো দীর্ঘ হচ্ছে। আরও বড় বিপদ হলো—বিশ্ব ধীরে ধীরে এসব সংকয়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে।

যখন কোনো মানবিক বিপর্যয়কে মানুষ স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন তার প্রতি জরুরি মনোযোগ কমে যায়। রাজনৈতিক অগ্রাধিকার অন্যদিকে সরে যায়। দাতাদের অর্থায়ন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আর দীর্ঘদিন ধরে সংকটে আটকে থাকা মানুষগুলো ধীরে ধীরে বিশ্বের চোখের আড়ালে চলে যায়।

তখন তারা পরিণত হয় ‘উপেক্ষিত সংকটে’।

সমস্যার অভাব নয়, সমস্যার কাঠামোতেই সংকট

মানবিক সহায়তার জগতে নতুন ধারণার অভাব নেই। স্থানীয় সংস্থাকে শক্তিশালী করা, আগাম প্রস্তুতি ও আগাম পদক্ষেপ, নগদ সহায়তা, মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, নমনীয় অর্থায়ন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে জবাবদিহি এবং মানবিক সহায়তা, উন্নয়ন ও শান্তি প্রতিষ্ঠাকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার মতো ধারণা বহু বছর ধরেই আলোচিত হচ্ছে।

কিন্তু বাস্তবে পরিবর্তন খুব সীমিত।

২০২৬ সালের ওডিআই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ১০ শতাংশেরও কম সরাসরি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের সংস্থাগুলোর কাছে পৌঁছেছিল। অথচ ‘গ্র্যান্ড বার্গেইন’-এর লক্ষ্য ছিল এই অংশ ২৫ শতাংশে উন্নীত করা।

অর্থাৎ সমস্যা শুধু নতুন ধারণার অভাব নয়। আসল সমস্যা হলো, বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রণোদনা, অর্থায়ন, জবাবদিহি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো এখনো যথেষ্ট বদলায়নি।

মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো খাবার, আশ্রয়, চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিতে আগের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ হয়েছে। কিন্তু সহায়তা পৌঁছে দেওয়া আর কোনো সংকটের গতিপথ বদলে দেওয়া এক বিষয় নয়।

একটি সংস্থা কত খাবার বিতরণ করল, কত মানুষকে আশ্রয় দিল কিংবা কত শিশুকে সাময়িক শিক্ষার আওতায় আনল—এসব হিসাব করা সহজ। কিন্তু এক বছর পর একই মানুষগুলো যদি আবার ক্ষুধার্ত থাকে, পাঁচ বছর পরও শিশুরা যদি অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রে পড়ে এবং এক দশক পরও পরিবারগুলো যদি বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—আমরা কি সত্যিই মানবিক প্রয়োজন কমাচ্ছি, নাকি শুধু সেটিকে সামাল দিয়ে যাচ্ছি?

সুদানে যুদ্ধের দুই বছর পরও নিশ্চুপ বিশ্ব

সুদান দেখাচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী সংকটের ভয়াবহতা

সুদান এই সমস্যার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণগুলোর একটি।

সংঘাত চতুর্থ বছরে প্রবেশ করার সময় ইউনিসেফের হিসাবে দেশটিতে ৩ কোটি ৩৭ লাখ মানুষ মানবিক সহায়তার প্রয়োজনের মধ্যে ছিল। তাদের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৭৩ লাখ শিশু। অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ৯১ লাখের বেশি।

শুধু তাই নয়, স্কুলে যাওয়ার বয়সী অন্তত ৮০ লাখ শিশু শিক্ষার বাইরে রয়েছে। দেশটির প্রায় অর্ধেক স্কুল আর শ্রেণিকক্ষ হিসেবে স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে না।

এসব শুধু পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ।

একটি শিশু যুদ্ধ থেকে বেঁচে গেলেও তার ভবিষ্যৎ হারিয়ে যেতে পারে, যদি সে বছরের পর বছর শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। তাই শিক্ষা কোনো মানবিক আবেদন বা ত্রাণ কর্মসূচির প্রতিদ্বন্দ্বী খাত হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি একটি দেশের পুনরুদ্ধারের মৌলিক অবকাঠামো।

আফগানিস্তানের মেয়েদের হারিয়ে যাওয়া বছর

আফগানিস্তানও একই ধরনের দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সতর্কবার্তা দিচ্ছে।

ইউনিসেফের ২০২৬ সালের আগস্টের হিসাবে, ২০২১ সালের পর থেকে ২৬ লাখের বেশি মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

পাঁচ বছর সহজেই দশ বছরে পরিণত হতে পারে। দশ বছর বিশ বছরে গড়াতে পারে। একসময় বিশ্ব আর প্রশ্ন করে না—এই জরুরি অবস্থা কবে শেষ হবে? বরং সেই পরিস্থিতির সঙ্গেই বসবাস করতে শেখে।

এটাই মানবিক সংকটের সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ—যখন অসহনীয় পরিস্থিতি ধীরে ধীরে সহনীয় বলে মনে হতে শুরু করে।

Sudan’s war displaced crisis peaks as millions eye return to ruined homes

মানবিক সহায়তা যুদ্ধের সমাধান নয়

এখানে আরও একটি কঠিন সত্য স্বীকার করতে হবে। মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো সেই সংঘাতের সমাধান করতে পারে না, যেখান থেকে মানবিক সংকটের জন্ম।

তারা জীবন বাঁচাতে পারে, বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দিতে পারে, খাদ্য, পানি, আশ্রয়, চিকিৎসা ও শিক্ষা দিতে পারে। কিন্তু তারা সুদানের যুদ্ধের রাজনৈতিক সমাধান করতে পারে না। ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকট মেটাতে পারে না। কিংবা বিশ্বের অন্য কোথাও চলতে থাকা সশস্ত্র সংঘাত একা বন্ধ করতে পারে না।

আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটিও দীর্ঘদিন ধরে একই বাস্তবতার কথা বলে আসছে—মানবিক কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প নয়। সশস্ত্র সংঘাত প্রতিরোধ ও বন্ধ করতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

তাই মানবিক সহায়তা অবশ্যই স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও নীতিনিষ্ঠ থাকতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন কূটনৈতিক তৎপরতা, সংঘাত প্রতিরোধ, জবাবদিহি এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার জন্য চাপ।

সহায়তা যুদ্ধের ক্ষতি কমাতে পারে। কিন্তু যে পরিস্থিতি যুদ্ধ সৃষ্টি করে, সেটি শেষ করতে পারে না।

সংকট সামলানো নয়, সংকটের গতিপথ বদলানো

তাই মানবিক সাফল্যের সংজ্ঞাটিও নতুন করে ভাবতে হবে।

শুধু কত মানুষকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে, সেটিই সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। বরং দেখতে হবে—সময় গড়ানোর সঙ্গে মানুষের ঝুঁকি ও নির্ভরতা কমছে কি না।

কত মানুষ আর মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকছে না, কত শিশু নিয়মিত শিক্ষায় ফিরছে, পরিবারগুলো ভবিষ্যতের ধাক্কা মোকাবিলায় কতটা সক্ষম হচ্ছে, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা দায়িত্ব নিতে পারছে এবং সামগ্রিক মানবিক প্রয়োজন সময়ের সঙ্গে কমছে কি না—এসবও গুরুত্বপূর্ণ সূচক হওয়া উচিত।

আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর সাফল্যও শুধু তাদের কর্মসূচির আকার দিয়ে মাপা উচিত নয়। বরং তারা সংকটের শেষে কী রেখে যাচ্ছে, সেটিই হওয়া উচিত বড় প্রশ্ন।

আরও শক্তিশালী স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, কার্যকর সেবা ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় সক্ষম জনগোষ্ঠী—এসবই হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের চিহ্ন।

অর্থায়নের কাঠামোতেও পরিবর্তন দরকার

এ জন্য দাতাদের অর্থায়নের ধরনও বদলাতে হবে।

শুধু বর্তমান মানবিক প্রয়োজন সামাল দেওয়ার জন্য অর্থ দেওয়া যথেষ্ট নয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠন, স্থানীয় সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করা, মানুষের জীবিকা পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন প্রয়োজন।

কারণ মানুষকে বছরের পর বছর ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল রেখে কোনো সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।World News in Brief: Gaza crossings closed, fighting in Sudan continues,  Afghanistan quake victims | UN News

যেন বিশ্ব ভুলে না যায়

দীর্ঘস্থায়ী প্রতিটি বড় মানবিক সংকটের জন্য একটি প্রকাশ্য ‘মানবিক স্বাভাবিকীকরণ সূচক’ চালু করা যেতে পারে। সেখানে সংকটের স্থায়িত্ব, বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা, অপূর্ণ মানবিক প্রয়োজন, স্কুলের বাইরে থাকা শিশু, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, জরুরি সেবা ব্যবস্থার ধ্বংস, মানবিক অর্থায়ন এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার মতো বিষয় নিয়মিত প্রকাশ করা যেতে পারে।

তাহলে একটি সরল প্রশ্নের উত্তর খোঁজা সম্ভব হবে—আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কি সংকট কমাচ্ছে, নাকি শুধু মানুষকে সেই সংকটের মধ্যেই টিকিয়ে রাখছে?

যদি বছরের পর বছর উত্তরটি দ্বিতীয়টিই হয়, তাহলে নতুন কোনো কৌশলগত নথি বা আরেকটি মূল্যায়ন দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন হবে পুরো ব্যবস্থার পরিবর্তন।

মানবিক সহায়তার জগতে আরেকটি নতুন শব্দ বা নতুন পরিভাষার বিপ্লবের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন প্রণোদনা, জবাবদিহি, অর্থায়ন এবং রাজনৈতিক সাহসের পরিবর্তন।

শেষ পর্যন্ত মানবিক ব্যবস্থার সাফল্য মাপা উচিত সে কত দক্ষতার সঙ্গে মানুষের দুর্ভোগ সামলাতে পারে, তা দিয়ে নয়; বরং কতটা কার্যকরভাবে সেই দুর্ভোগকে স্থায়ী হয়ে যাওয়া থেকে ঠেকাতে পারে, তা দিয়ে।

কোনো শিশুর হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ যেন একটি ‘উপেক্ষিত সংকটের’ স্বাভাবিক মূল্য হয়ে না দাঁড়ায়। সুদানে নয়, গাজায় নয়, ইয়েমেনে নয়, আফগানিস্তানে নয়—কোথাও নয়।

বিশ্বের নতুন স্বাভাবিকতা হতে পারে না স্থায়ী দুর্ভোগ।

আর যদি বর্তমান মানবিক কাঠামো সেই দুর্ভোগকে স্থায়ী হয়ে যাওয়া থেকে ঠেকাতে না পারে, তাহলে প্রশ্নটি শুধু সংকট নিয়ে নয়—প্রশ্ন উঠতে হবে সেই কাঠামো নিয়েও।

জনপ্রিয় সংবাদ

পটিয়ায় কক্সবাজার এক্সপ্রেসের বগি লাইনচ্যুত, ঢাকা-চট্টগ্রামের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ

মানবিক সংকট কি এখন বিশ্বের নতুন স্বাভাবিকতা? যুদ্ধ থামছে না, বদলে যাচ্ছে শুধু বিশ্বের মনোযোগ

০৫:৫১:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশ্বজুড়ে মানবিক সংকটের চিত্র এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একের পর এক যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, ক্ষুধা ও ধ্বংস যেন মানুষের কাছে ধীরে ধীরে পরিচিত বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। সুদানে ভয়াবহ সংঘাত চলছে, গাজায় মানবিক বিপর্যয় অব্যাহত, ইয়েমেন এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধের ক্ষত বহন করছে। আফগানিস্তানে কয়েক দশকের যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও বঞ্চনা মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। অন্যদিকে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সংঘাত চলছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এসব সংকটের মধ্যে বেড়ে উঠছে লাখ লাখ শিশু। বাস্তুচ্যুতি, নিরাপত্তাহীনতা, ক্ষুধা ও ত্রাণের ওপর নির্ভরতা তাদের কাছে আর সাময়িক অভিজ্ঞতা নয়। যুদ্ধ ও সংকট তাদের শৈশব কেড়ে নিচ্ছে।

কিন্তু বিপদ শুধু এই নয় যে সংকটগুলো দীর্ঘ হচ্ছে। আরও বড় বিপদ হলো—বিশ্ব ধীরে ধীরে এসব সংকয়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে।

যখন কোনো মানবিক বিপর্যয়কে মানুষ স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন তার প্রতি জরুরি মনোযোগ কমে যায়। রাজনৈতিক অগ্রাধিকার অন্যদিকে সরে যায়। দাতাদের অর্থায়ন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আর দীর্ঘদিন ধরে সংকটে আটকে থাকা মানুষগুলো ধীরে ধীরে বিশ্বের চোখের আড়ালে চলে যায়।

তখন তারা পরিণত হয় ‘উপেক্ষিত সংকটে’।

সমস্যার অভাব নয়, সমস্যার কাঠামোতেই সংকট

মানবিক সহায়তার জগতে নতুন ধারণার অভাব নেই। স্থানীয় সংস্থাকে শক্তিশালী করা, আগাম প্রস্তুতি ও আগাম পদক্ষেপ, নগদ সহায়তা, মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, নমনীয় অর্থায়ন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে জবাবদিহি এবং মানবিক সহায়তা, উন্নয়ন ও শান্তি প্রতিষ্ঠাকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার মতো ধারণা বহু বছর ধরেই আলোচিত হচ্ছে।

কিন্তু বাস্তবে পরিবর্তন খুব সীমিত।

২০২৬ সালের ওডিআই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ১০ শতাংশেরও কম সরাসরি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের সংস্থাগুলোর কাছে পৌঁছেছিল। অথচ ‘গ্র্যান্ড বার্গেইন’-এর লক্ষ্য ছিল এই অংশ ২৫ শতাংশে উন্নীত করা।

অর্থাৎ সমস্যা শুধু নতুন ধারণার অভাব নয়। আসল সমস্যা হলো, বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রণোদনা, অর্থায়ন, জবাবদিহি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো এখনো যথেষ্ট বদলায়নি।

মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো খাবার, আশ্রয়, চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিতে আগের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ হয়েছে। কিন্তু সহায়তা পৌঁছে দেওয়া আর কোনো সংকটের গতিপথ বদলে দেওয়া এক বিষয় নয়।

একটি সংস্থা কত খাবার বিতরণ করল, কত মানুষকে আশ্রয় দিল কিংবা কত শিশুকে সাময়িক শিক্ষার আওতায় আনল—এসব হিসাব করা সহজ। কিন্তু এক বছর পর একই মানুষগুলো যদি আবার ক্ষুধার্ত থাকে, পাঁচ বছর পরও শিশুরা যদি অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রে পড়ে এবং এক দশক পরও পরিবারগুলো যদি বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—আমরা কি সত্যিই মানবিক প্রয়োজন কমাচ্ছি, নাকি শুধু সেটিকে সামাল দিয়ে যাচ্ছি?

সুদানে যুদ্ধের দুই বছর পরও নিশ্চুপ বিশ্ব

সুদান দেখাচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী সংকটের ভয়াবহতা

সুদান এই সমস্যার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণগুলোর একটি।

সংঘাত চতুর্থ বছরে প্রবেশ করার সময় ইউনিসেফের হিসাবে দেশটিতে ৩ কোটি ৩৭ লাখ মানুষ মানবিক সহায়তার প্রয়োজনের মধ্যে ছিল। তাদের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৭৩ লাখ শিশু। অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ৯১ লাখের বেশি।

শুধু তাই নয়, স্কুলে যাওয়ার বয়সী অন্তত ৮০ লাখ শিশু শিক্ষার বাইরে রয়েছে। দেশটির প্রায় অর্ধেক স্কুল আর শ্রেণিকক্ষ হিসেবে স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে না।

এসব শুধু পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ।

একটি শিশু যুদ্ধ থেকে বেঁচে গেলেও তার ভবিষ্যৎ হারিয়ে যেতে পারে, যদি সে বছরের পর বছর শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। তাই শিক্ষা কোনো মানবিক আবেদন বা ত্রাণ কর্মসূচির প্রতিদ্বন্দ্বী খাত হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি একটি দেশের পুনরুদ্ধারের মৌলিক অবকাঠামো।

আফগানিস্তানের মেয়েদের হারিয়ে যাওয়া বছর

আফগানিস্তানও একই ধরনের দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সতর্কবার্তা দিচ্ছে।

ইউনিসেফের ২০২৬ সালের আগস্টের হিসাবে, ২০২১ সালের পর থেকে ২৬ লাখের বেশি মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

পাঁচ বছর সহজেই দশ বছরে পরিণত হতে পারে। দশ বছর বিশ বছরে গড়াতে পারে। একসময় বিশ্ব আর প্রশ্ন করে না—এই জরুরি অবস্থা কবে শেষ হবে? বরং সেই পরিস্থিতির সঙ্গেই বসবাস করতে শেখে।

এটাই মানবিক সংকটের সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ—যখন অসহনীয় পরিস্থিতি ধীরে ধীরে সহনীয় বলে মনে হতে শুরু করে।

Sudan’s war displaced crisis peaks as millions eye return to ruined homes

মানবিক সহায়তা যুদ্ধের সমাধান নয়

এখানে আরও একটি কঠিন সত্য স্বীকার করতে হবে। মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো সেই সংঘাতের সমাধান করতে পারে না, যেখান থেকে মানবিক সংকটের জন্ম।

তারা জীবন বাঁচাতে পারে, বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দিতে পারে, খাদ্য, পানি, আশ্রয়, চিকিৎসা ও শিক্ষা দিতে পারে। কিন্তু তারা সুদানের যুদ্ধের রাজনৈতিক সমাধান করতে পারে না। ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকট মেটাতে পারে না। কিংবা বিশ্বের অন্য কোথাও চলতে থাকা সশস্ত্র সংঘাত একা বন্ধ করতে পারে না।

আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটিও দীর্ঘদিন ধরে একই বাস্তবতার কথা বলে আসছে—মানবিক কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প নয়। সশস্ত্র সংঘাত প্রতিরোধ ও বন্ধ করতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

তাই মানবিক সহায়তা অবশ্যই স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও নীতিনিষ্ঠ থাকতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন কূটনৈতিক তৎপরতা, সংঘাত প্রতিরোধ, জবাবদিহি এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার জন্য চাপ।

সহায়তা যুদ্ধের ক্ষতি কমাতে পারে। কিন্তু যে পরিস্থিতি যুদ্ধ সৃষ্টি করে, সেটি শেষ করতে পারে না।

সংকট সামলানো নয়, সংকটের গতিপথ বদলানো

তাই মানবিক সাফল্যের সংজ্ঞাটিও নতুন করে ভাবতে হবে।

শুধু কত মানুষকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে, সেটিই সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। বরং দেখতে হবে—সময় গড়ানোর সঙ্গে মানুষের ঝুঁকি ও নির্ভরতা কমছে কি না।

কত মানুষ আর মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকছে না, কত শিশু নিয়মিত শিক্ষায় ফিরছে, পরিবারগুলো ভবিষ্যতের ধাক্কা মোকাবিলায় কতটা সক্ষম হচ্ছে, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা দায়িত্ব নিতে পারছে এবং সামগ্রিক মানবিক প্রয়োজন সময়ের সঙ্গে কমছে কি না—এসবও গুরুত্বপূর্ণ সূচক হওয়া উচিত।

আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর সাফল্যও শুধু তাদের কর্মসূচির আকার দিয়ে মাপা উচিত নয়। বরং তারা সংকটের শেষে কী রেখে যাচ্ছে, সেটিই হওয়া উচিত বড় প্রশ্ন।

আরও শক্তিশালী স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, কার্যকর সেবা ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় সক্ষম জনগোষ্ঠী—এসবই হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের চিহ্ন।

অর্থায়নের কাঠামোতেও পরিবর্তন দরকার

এ জন্য দাতাদের অর্থায়নের ধরনও বদলাতে হবে।

শুধু বর্তমান মানবিক প্রয়োজন সামাল দেওয়ার জন্য অর্থ দেওয়া যথেষ্ট নয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠন, স্থানীয় সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করা, মানুষের জীবিকা পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন প্রয়োজন।

কারণ মানুষকে বছরের পর বছর ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল রেখে কোনো সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।World News in Brief: Gaza crossings closed, fighting in Sudan continues,  Afghanistan quake victims | UN News

যেন বিশ্ব ভুলে না যায়

দীর্ঘস্থায়ী প্রতিটি বড় মানবিক সংকটের জন্য একটি প্রকাশ্য ‘মানবিক স্বাভাবিকীকরণ সূচক’ চালু করা যেতে পারে। সেখানে সংকটের স্থায়িত্ব, বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা, অপূর্ণ মানবিক প্রয়োজন, স্কুলের বাইরে থাকা শিশু, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, জরুরি সেবা ব্যবস্থার ধ্বংস, মানবিক অর্থায়ন এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার মতো বিষয় নিয়মিত প্রকাশ করা যেতে পারে।

তাহলে একটি সরল প্রশ্নের উত্তর খোঁজা সম্ভব হবে—আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কি সংকট কমাচ্ছে, নাকি শুধু মানুষকে সেই সংকটের মধ্যেই টিকিয়ে রাখছে?

যদি বছরের পর বছর উত্তরটি দ্বিতীয়টিই হয়, তাহলে নতুন কোনো কৌশলগত নথি বা আরেকটি মূল্যায়ন দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন হবে পুরো ব্যবস্থার পরিবর্তন।

মানবিক সহায়তার জগতে আরেকটি নতুন শব্দ বা নতুন পরিভাষার বিপ্লবের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন প্রণোদনা, জবাবদিহি, অর্থায়ন এবং রাজনৈতিক সাহসের পরিবর্তন।

শেষ পর্যন্ত মানবিক ব্যবস্থার সাফল্য মাপা উচিত সে কত দক্ষতার সঙ্গে মানুষের দুর্ভোগ সামলাতে পারে, তা দিয়ে নয়; বরং কতটা কার্যকরভাবে সেই দুর্ভোগকে স্থায়ী হয়ে যাওয়া থেকে ঠেকাতে পারে, তা দিয়ে।

কোনো শিশুর হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ যেন একটি ‘উপেক্ষিত সংকটের’ স্বাভাবিক মূল্য হয়ে না দাঁড়ায়। সুদানে নয়, গাজায় নয়, ইয়েমেনে নয়, আফগানিস্তানে নয়—কোথাও নয়।

বিশ্বের নতুন স্বাভাবিকতা হতে পারে না স্থায়ী দুর্ভোগ।

আর যদি বর্তমান মানবিক কাঠামো সেই দুর্ভোগকে স্থায়ী হয়ে যাওয়া থেকে ঠেকাতে না পারে, তাহলে প্রশ্নটি শুধু সংকট নিয়ে নয়—প্রশ্ন উঠতে হবে সেই কাঠামো নিয়েও।