০৯:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পটিয়ায় কক্সবাজার এক্সপ্রেসের বগি লাইনচ্যুত, ঢাকা-চট্টগ্রামের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাসভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব, দূরপাল্লায় ২০ পয়সা ও শহরে ১৮ পয়সা তৃতীয় দেশে নির্বাসন: পানামায় পাঠানো ইরানি খ্রিষ্টানের অনিশ্চিত জীবন জার্মানিতে ডানপন্থার উত্থানের জ্বালানি: হারিয়ে যাওয়া গৌরবের নস্টালজিয়া জিন্নাহর প্রতিকৃতি সরানোয় তাইয়েবকে হুমকির অভিযোগ, তদন্তের দাবি এডিপি বাস্তবায়নে পাঁচ বছরের সর্বনিম্ন হার, দুই মাসে অগ্রগতি মাত্র ১.৮৫ শতাংশ ডেঙ্গুতে আরও ৬ মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি ১,৬৫৫ বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ছকে দেখলে ভারতেরই কৌশলগত ক্ষতি নাক থেকে অন্ত্র—শরীরের অদৃশ্য প্রতিরক্ষা দেয়াল, কীভাবে কাজ করে মিউকোসাল ইমিউন সিস্টেম? পাঞ্জাবই কি পাকিস্তান? ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণে বাড়ছে প্রাদেশিক বৈষম্য

১৪ নবজাতকের মৃত্যু: পাকিস্তানের উন্নয়ন ভাবনায় যে কঠিন প্রশ্ন সামনে এলো

ইসলামাবাদের একটি হাসপাতালে গত আগস্টে আগুনে ১৪ নবজাতকের মৃত্যু শুধু একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা নয়; এটি পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার, জনসেবা এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান নিয়ে গভীর প্রশ্ন সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের কূটনৈতিক গুরুত্ব যখন বাড়ছে, তখন দেশের অভ্যন্তরে এমন একটি ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে—রাষ্ট্রের দৃশ্যমান ক্ষমতা ও সাধারণ নাগরিকের দৈনন্দিন নিরাপত্তার মধ্যে ব্যবধান কতটা বড়।

চার দশক আগে জাপান সরকারের অর্থায়নে ইসলামাবাদে যে শিশু হাসপাতালটি চালু হয়েছিল, সেখানে মূলত নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের শিশুরাই চিকিৎসা নেয়। ২৬ আগস্ট হাসপাতালের নবজাতক বিভাগে আগুন ছড়িয়ে পড়ার সময় ১৫টি শিশু ইনকিউবেটর অথবা অক্সিজেনের সহায়তায় ছিল। শেষ পর্যন্ত মাত্র একটি শিশু বেঁচে যায়।

প্রাথমিকভাবে এয়ার কন্ডিশনারের ত্রুটি থেকে আগুনের সূত্রপাতের কথা বলা হলেও পরবর্তী অভিযোগগুলো আরও উদ্বেগজনক। নিরাপত্তাকর্মীর অনুপস্থিতির কারণে নবজাতক বিভাগের দরজা বন্ধ ছিল এবং আগুন লাগার পর উদ্ধারকাজে বাধা তৈরি হয় বলে অভিযোগ ওঠে। নিহত শিশুদের স্বজনদের ক্ষোভের কেন্দ্রে ছিল শুধু আগুন নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থার ব্যর্থতা, যেখানে বিপদের মুহূর্তে দ্রুত উদ্ধার করার মৌলিক প্রস্তুতিও যথেষ্ট ছিল না।

আন্তর্জাতিক পরিচিতি বনাম নাগরিকের বাস্তবতা

ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটেছে, যখন পাকিস্তান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে দৃশ্যমান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত অবসানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেশটির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। একই সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তি হিসেবে পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্বও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের।

কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতির এই পরিচয়ের পাশে রয়েছে আরেকটি পাকিস্তান—যেখানে হাসপাতালের অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা এখনো বড় ধরনের ঘাটতির মুখে। নবজাতকদের মৃত্যু সেই বৈপরীত্যকে নির্মমভাবে সামনে এনেছে।

সরকার তাৎক্ষণিকভাবে রাজধানীর স্বাস্থ্যব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা শীর্ষ আমলাকে বরখাস্ত করেছে এবং তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। তবে কোনো কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া বা তদন্ত কমিটি গঠন করাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। মূল প্রশ্ন হলো, কেন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলার ব্যবস্থা এত দুর্বল ছিল এবং কেন সংকটের মুহূর্তে উদ্ধারকাজ কার্যকরভাবে পরিচালিত হলো না।

মানব উন্নয়নের সূচকে অবনতি

পাকিস্তানের সংকটটি কেবল একটি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জাতিসংঘের সর্বশেষ মানব উন্নয়ন সূচকেও দেশটির অবস্থানের অবনতি ঘটেছে। ২০১৬ সালে ১৪৭তম অবস্থানে থাকা পাকিস্তান চলতি বছর ১৬৮তম স্থানে নেমেছে এবং ‘নিম্ন মানব উন্নয়ন’ শ্রেণিতে রয়েছে।

এই অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার সামরিক সক্ষমতা, কূটনৈতিক প্রভাব বা বড় অবকাঠামো দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। নাগরিক কতটা নিরাপদে চিকিৎসা পায়, শিশু কতটা সুরক্ষিতভাবে জন্ম নেয়, জরুরি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র কত দ্রুত মানুষের পাশে দাঁড়ায়—এসবও রাষ্ট্রের সক্ষমতার মৌলিক মাপকাঠি।

অর্থনীতির চাপ এই সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। পাকিস্তানের সর্বশেষ অর্থনৈতিক জরিপ অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশটি তার মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৭ শতাংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করেছে। বিপরীতে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয়েছে ১ শতাংশেরও কম।

এখানেই রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের প্রশ্নটি সামনে আসে। মহাসড়ক, বড় অবকাঠামো কিংবা দৃশ্যমান উন্নয়ন প্রকল্প রাজনৈতিকভাবে সহজে প্রদর্শনযোগ্য। কিন্তু হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা আধুনিক করা, দক্ষ অগ্নিনির্বাপণ বাহিনী গড়ে তোলা, চিকিৎসাকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া কিংবা দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা—এসবের সুফল ধীরে আসে এবং তাৎক্ষণিকভাবে রাজনৈতিক প্রচারের উপযোগী নাও হতে পারে। অথচ মানুষের জীবনের সঙ্গে এসবের সম্পর্ক সরাসরি।Pakistani PM suspends top health official after 14 newborn babies killed in  hospital fire - BBC News

করব্যবস্থার দুর্বলতা

জনসেবায় বিনিয়োগ বাড়াতে হলে রাষ্ট্রের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ থাকতে হবে। পাকিস্তানের অন্যতম বড় দুর্বলতা এখানেই। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির মোট জনসংখ্যার ৪ শতাংশেরও কম মানুষ আয়কর প্রদানকারী হিসেবে নিবন্ধিত।

সরকার বহুবার করব্যবস্থা সংস্কারের অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু কর ফাঁকি ও কর আদায়ের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা যায়নি। এর ফলে রাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে ক্রমাগত সংকটে পড়তে হচ্ছে।

অন্যদিকে ঋণের বোঝা বাড়ছে। নতুন অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থ ব্যয় করা হলেও নাগরিকদের মৌলিক সেবার ঘাটতি পূরণে পর্যাপ্ত মনোযোগ না থাকলে উন্নয়নের হিসাব অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একটি নতুন সড়ক অর্থনীতিকে গতিশীল করতে পারে, কিন্তু সেই অর্থনীতির মানুষ যদি পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পায় বা একটি হাসপাতালের আগুন থেকে নবজাতককে উদ্ধার করার মতো সক্ষমতা না থাকে, তাহলে উন্নয়নের প্রকৃত মূল্য নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।

দুর্নীতির অর্থনৈতিক মূল্য

পাকিস্তানের সমস্যার আরেকটি বড় দিক দুর্নীতি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের গত বছরের একটি বিস্তৃত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্নীতির কারণে দেশটি প্রতিবছর মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত হারাতে পারে।

এই পরিমাণ অর্থের তাৎপর্য বিশাল। প্রতিবেদনে উল্লেখিত হিসাব অনুযায়ী, দুর্নীতির ফলে যে সম্পদ হারিয়ে যায় তা স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সম্মিলিত বার্ষিক ব্যয়ের দ্বিগুণেরও বেশি এবং স্বাস্থ্য খাতে বার্ষিক ব্যয়ের প্রায় ছয় গুণের সমান।

অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল নৈতিকতার নয়, সরাসরি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতারও। যে অর্থ হাসপাতাল উন্নত করতে, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা শক্তিশালী করতে বা দরিদ্র মানুষের জন্য চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ব্যয় হতে পারত, তার একটি বড় অংশ যদি দুর্নীতির কারণে হারিয়ে যায়, তাহলে জনসেবার দুর্বলতা অব্যাহত থাকার ঝুঁকি থেকেই যায়।

নিরাপত্তা ও জনকল্যাণের ভারসাম্য

পাকিস্তানের সামনে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ভারতের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনা এবং আফগানিস্তান সীমান্তের সংঘাত দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধও হয়েছে।

তবে একটি দেশের নিরাপত্তা কেবল সীমান্ত রক্ষা দিয়ে নিশ্চিত হয় না। নাগরিকের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষাও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা যখন বিপুল, তখন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষায় দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগ না করলে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাও দুর্বল হতে পারে।

পাকিস্তানের জনসংখ্যা ২৫ কোটির কিছু বেশি। তাদের একটি বড় অংশ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে বলে বিভিন্ন হিসাব ইঙ্গিত দেয়। ফলে রাষ্ট্রের সামনে একই সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা এবং মানব নিরাপত্তা—দুই ধরনের দায়িত্ব রয়েছে। একটিকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে অন্যটিকে দীর্ঘদিন অবহেলা করলে তার সামাজিক মূল্য শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই দিতে হয়।

শুধু তদন্ত নয়, কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন

ইসলামাবাদের হাসপাতালের আগুনের পর প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রীরা দেশের হাসপাতালগুলোর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন। এটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, কোনো বড় দুর্ঘটনার পর তাৎক্ষণিক নির্দেশনা জারি করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না।

পাকিস্তানে একের পর এক দুর্ঘটনা ও সংকটের পর সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এসেছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেই প্রতিশ্রুতি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনে রূপ নেয়নি। ফলে একই ধরনের ঝুঁকি বারবার ফিরে এসেছে।

এখন পাকিস্তানের সামনে অন্তত দুটি কঠিন কাজ জরুরি। প্রথমত, করব্যবস্থাকে কার্যকর করে আরও বেশি নাগরিক ও প্রভাবশালী অর্থনৈতিক গোষ্ঠীকে করের আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি কমিয়ে সরকারি সম্পদের অপচয় বন্ধ করতে হবে। এর সঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জরুরি উদ্ধার এবং জননিরাপত্তাকে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকারে আনতে হবে।

১৪ নবজাতকের মৃত্যু পাকিস্তানকে যে প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে, তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি দেশের প্রভাব যতই বাড়ুক, তার রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হয় সাধারণ মানুষের জীবনে। হাসপাতালের একটি অগ্নিকাণ্ড সেই পরীক্ষায় কোথায় দুর্বলতা রয়েছে, তা নির্মমভাবে প্রকাশ করতে পারে।

এই মৃত্যুগুলো যদি কেবল আরেকটি তদন্ত, কয়েকটি বরখাস্ত এবং কিছু নতুন নির্দেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো হবে না। কিন্তু ঘটনাটিকে যদি করব্যবস্থা, দুর্নীতি, স্বাস্থ্য খাত, জরুরি সেবা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিবেচনার সূচনা হিসেবে দেখা হয়, তবেই এই মর্মান্তিক ঘটনার রাজনৈতিক ও সামাজিক শিক্ষা বাস্তব সংস্কারে রূপ নিতে পারে।

লেখক: ফারহান বুখারি, ইসলামাবাদভিত্তিক বিদেশবিষয়ক সাংবাদিক।

জনপ্রিয় সংবাদ

পটিয়ায় কক্সবাজার এক্সপ্রেসের বগি লাইনচ্যুত, ঢাকা-চট্টগ্রামের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ

১৪ নবজাতকের মৃত্যু: পাকিস্তানের উন্নয়ন ভাবনায় যে কঠিন প্রশ্ন সামনে এলো

০৫:৫৪:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইসলামাবাদের একটি হাসপাতালে গত আগস্টে আগুনে ১৪ নবজাতকের মৃত্যু শুধু একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা নয়; এটি পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার, জনসেবা এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান নিয়ে গভীর প্রশ্ন সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের কূটনৈতিক গুরুত্ব যখন বাড়ছে, তখন দেশের অভ্যন্তরে এমন একটি ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে—রাষ্ট্রের দৃশ্যমান ক্ষমতা ও সাধারণ নাগরিকের দৈনন্দিন নিরাপত্তার মধ্যে ব্যবধান কতটা বড়।

চার দশক আগে জাপান সরকারের অর্থায়নে ইসলামাবাদে যে শিশু হাসপাতালটি চালু হয়েছিল, সেখানে মূলত নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের শিশুরাই চিকিৎসা নেয়। ২৬ আগস্ট হাসপাতালের নবজাতক বিভাগে আগুন ছড়িয়ে পড়ার সময় ১৫টি শিশু ইনকিউবেটর অথবা অক্সিজেনের সহায়তায় ছিল। শেষ পর্যন্ত মাত্র একটি শিশু বেঁচে যায়।

প্রাথমিকভাবে এয়ার কন্ডিশনারের ত্রুটি থেকে আগুনের সূত্রপাতের কথা বলা হলেও পরবর্তী অভিযোগগুলো আরও উদ্বেগজনক। নিরাপত্তাকর্মীর অনুপস্থিতির কারণে নবজাতক বিভাগের দরজা বন্ধ ছিল এবং আগুন লাগার পর উদ্ধারকাজে বাধা তৈরি হয় বলে অভিযোগ ওঠে। নিহত শিশুদের স্বজনদের ক্ষোভের কেন্দ্রে ছিল শুধু আগুন নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থার ব্যর্থতা, যেখানে বিপদের মুহূর্তে দ্রুত উদ্ধার করার মৌলিক প্রস্তুতিও যথেষ্ট ছিল না।

আন্তর্জাতিক পরিচিতি বনাম নাগরিকের বাস্তবতা

ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটেছে, যখন পাকিস্তান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে দৃশ্যমান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত অবসানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেশটির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। একই সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তি হিসেবে পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্বও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের।

কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতির এই পরিচয়ের পাশে রয়েছে আরেকটি পাকিস্তান—যেখানে হাসপাতালের অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা এখনো বড় ধরনের ঘাটতির মুখে। নবজাতকদের মৃত্যু সেই বৈপরীত্যকে নির্মমভাবে সামনে এনেছে।

সরকার তাৎক্ষণিকভাবে রাজধানীর স্বাস্থ্যব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা শীর্ষ আমলাকে বরখাস্ত করেছে এবং তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। তবে কোনো কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া বা তদন্ত কমিটি গঠন করাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। মূল প্রশ্ন হলো, কেন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলার ব্যবস্থা এত দুর্বল ছিল এবং কেন সংকটের মুহূর্তে উদ্ধারকাজ কার্যকরভাবে পরিচালিত হলো না।

মানব উন্নয়নের সূচকে অবনতি

পাকিস্তানের সংকটটি কেবল একটি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জাতিসংঘের সর্বশেষ মানব উন্নয়ন সূচকেও দেশটির অবস্থানের অবনতি ঘটেছে। ২০১৬ সালে ১৪৭তম অবস্থানে থাকা পাকিস্তান চলতি বছর ১৬৮তম স্থানে নেমেছে এবং ‘নিম্ন মানব উন্নয়ন’ শ্রেণিতে রয়েছে।

এই অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার সামরিক সক্ষমতা, কূটনৈতিক প্রভাব বা বড় অবকাঠামো দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। নাগরিক কতটা নিরাপদে চিকিৎসা পায়, শিশু কতটা সুরক্ষিতভাবে জন্ম নেয়, জরুরি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র কত দ্রুত মানুষের পাশে দাঁড়ায়—এসবও রাষ্ট্রের সক্ষমতার মৌলিক মাপকাঠি।

অর্থনীতির চাপ এই সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। পাকিস্তানের সর্বশেষ অর্থনৈতিক জরিপ অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশটি তার মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৭ শতাংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করেছে। বিপরীতে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয়েছে ১ শতাংশেরও কম।

এখানেই রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের প্রশ্নটি সামনে আসে। মহাসড়ক, বড় অবকাঠামো কিংবা দৃশ্যমান উন্নয়ন প্রকল্প রাজনৈতিকভাবে সহজে প্রদর্শনযোগ্য। কিন্তু হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা আধুনিক করা, দক্ষ অগ্নিনির্বাপণ বাহিনী গড়ে তোলা, চিকিৎসাকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া কিংবা দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা—এসবের সুফল ধীরে আসে এবং তাৎক্ষণিকভাবে রাজনৈতিক প্রচারের উপযোগী নাও হতে পারে। অথচ মানুষের জীবনের সঙ্গে এসবের সম্পর্ক সরাসরি।Pakistani PM suspends top health official after 14 newborn babies killed in  hospital fire - BBC News

করব্যবস্থার দুর্বলতা

জনসেবায় বিনিয়োগ বাড়াতে হলে রাষ্ট্রের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ থাকতে হবে। পাকিস্তানের অন্যতম বড় দুর্বলতা এখানেই। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির মোট জনসংখ্যার ৪ শতাংশেরও কম মানুষ আয়কর প্রদানকারী হিসেবে নিবন্ধিত।

সরকার বহুবার করব্যবস্থা সংস্কারের অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু কর ফাঁকি ও কর আদায়ের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা যায়নি। এর ফলে রাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে ক্রমাগত সংকটে পড়তে হচ্ছে।

অন্যদিকে ঋণের বোঝা বাড়ছে। নতুন অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থ ব্যয় করা হলেও নাগরিকদের মৌলিক সেবার ঘাটতি পূরণে পর্যাপ্ত মনোযোগ না থাকলে উন্নয়নের হিসাব অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একটি নতুন সড়ক অর্থনীতিকে গতিশীল করতে পারে, কিন্তু সেই অর্থনীতির মানুষ যদি পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পায় বা একটি হাসপাতালের আগুন থেকে নবজাতককে উদ্ধার করার মতো সক্ষমতা না থাকে, তাহলে উন্নয়নের প্রকৃত মূল্য নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।

দুর্নীতির অর্থনৈতিক মূল্য

পাকিস্তানের সমস্যার আরেকটি বড় দিক দুর্নীতি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের গত বছরের একটি বিস্তৃত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্নীতির কারণে দেশটি প্রতিবছর মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত হারাতে পারে।

এই পরিমাণ অর্থের তাৎপর্য বিশাল। প্রতিবেদনে উল্লেখিত হিসাব অনুযায়ী, দুর্নীতির ফলে যে সম্পদ হারিয়ে যায় তা স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সম্মিলিত বার্ষিক ব্যয়ের দ্বিগুণেরও বেশি এবং স্বাস্থ্য খাতে বার্ষিক ব্যয়ের প্রায় ছয় গুণের সমান।

অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল নৈতিকতার নয়, সরাসরি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতারও। যে অর্থ হাসপাতাল উন্নত করতে, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা শক্তিশালী করতে বা দরিদ্র মানুষের জন্য চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ব্যয় হতে পারত, তার একটি বড় অংশ যদি দুর্নীতির কারণে হারিয়ে যায়, তাহলে জনসেবার দুর্বলতা অব্যাহত থাকার ঝুঁকি থেকেই যায়।

নিরাপত্তা ও জনকল্যাণের ভারসাম্য

পাকিস্তানের সামনে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ভারতের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনা এবং আফগানিস্তান সীমান্তের সংঘাত দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধও হয়েছে।

তবে একটি দেশের নিরাপত্তা কেবল সীমান্ত রক্ষা দিয়ে নিশ্চিত হয় না। নাগরিকের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষাও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা যখন বিপুল, তখন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষায় দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগ না করলে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাও দুর্বল হতে পারে।

পাকিস্তানের জনসংখ্যা ২৫ কোটির কিছু বেশি। তাদের একটি বড় অংশ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে বলে বিভিন্ন হিসাব ইঙ্গিত দেয়। ফলে রাষ্ট্রের সামনে একই সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা এবং মানব নিরাপত্তা—দুই ধরনের দায়িত্ব রয়েছে। একটিকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে অন্যটিকে দীর্ঘদিন অবহেলা করলে তার সামাজিক মূল্য শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই দিতে হয়।

শুধু তদন্ত নয়, কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন

ইসলামাবাদের হাসপাতালের আগুনের পর প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রীরা দেশের হাসপাতালগুলোর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন। এটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, কোনো বড় দুর্ঘটনার পর তাৎক্ষণিক নির্দেশনা জারি করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না।

পাকিস্তানে একের পর এক দুর্ঘটনা ও সংকটের পর সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এসেছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেই প্রতিশ্রুতি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনে রূপ নেয়নি। ফলে একই ধরনের ঝুঁকি বারবার ফিরে এসেছে।

এখন পাকিস্তানের সামনে অন্তত দুটি কঠিন কাজ জরুরি। প্রথমত, করব্যবস্থাকে কার্যকর করে আরও বেশি নাগরিক ও প্রভাবশালী অর্থনৈতিক গোষ্ঠীকে করের আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি কমিয়ে সরকারি সম্পদের অপচয় বন্ধ করতে হবে। এর সঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জরুরি উদ্ধার এবং জননিরাপত্তাকে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকারে আনতে হবে।

১৪ নবজাতকের মৃত্যু পাকিস্তানকে যে প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে, তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি দেশের প্রভাব যতই বাড়ুক, তার রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হয় সাধারণ মানুষের জীবনে। হাসপাতালের একটি অগ্নিকাণ্ড সেই পরীক্ষায় কোথায় দুর্বলতা রয়েছে, তা নির্মমভাবে প্রকাশ করতে পারে।

এই মৃত্যুগুলো যদি কেবল আরেকটি তদন্ত, কয়েকটি বরখাস্ত এবং কিছু নতুন নির্দেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো হবে না। কিন্তু ঘটনাটিকে যদি করব্যবস্থা, দুর্নীতি, স্বাস্থ্য খাত, জরুরি সেবা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিবেচনার সূচনা হিসেবে দেখা হয়, তবেই এই মর্মান্তিক ঘটনার রাজনৈতিক ও সামাজিক শিক্ষা বাস্তব সংস্কারে রূপ নিতে পারে।

লেখক: ফারহান বুখারি, ইসলামাবাদভিত্তিক বিদেশবিষয়ক সাংবাদিক।