রাশিয়ায় তিন দিনব্যাপী পার্লামেন্ট নির্বাচন শেষ হওয়ার দিনে রাজধানী মস্কো ও আশপাশের এলাকায় বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিনের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি রাজধানীর ওপর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ড্রোন হামলা। হামলায় মস্কো অঞ্চলে দুজন নিহত হয়েছেন। রাশিয়ার নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেনের খেরসন অঞ্চলেও দুজন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজন নির্বাচনী কর্মকর্তা।
রোববার রাশিয়ার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ স্টেট ডুমার নির্বাচনে ভোটগ্রহণের শেষ দিন ছিল। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর এটিই রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত প্রথম স্টেট ডুমা নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই নির্বাচনকে ইউক্রেনের যুদ্ধের প্রতি জনগণের সমর্থনের একটি পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
মস্কোর মেয়র সোবিয়ানিন টেলিগ্রামে বলেন, শত্রুপক্ষের ড্রোনের সবচেয়ে বড় হামলা প্রতিহত করা হয়েছে। তাঁর দাবি, নির্বাচন ব্যাহত করার উদ্দেশ্যেই এই নজিরবিহীন হামলা পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে হামলাকারীরা সেই উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারেনি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
হামলায় মস্কোর তেল শোধনাগারের একটি স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই শোধনাগার এর আগেও ড্রোন হামলার লক্ষ্য হয়েছিল।
রাশিয়ার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টি আবারও স্টেট ডুমায় নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখবে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ভিন্নমতের জন্য খুব কম জায়গা রয়েছে বলে সমালোচকেরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন। নির্বাচনের ফলাফলকে ক্রেমলিন পুতিনের নীতি এবং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রতি জনগণের সমর্থনের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
তিন দিনের ভোটগ্রহণের শেষ দিনে নির্বাচন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সাইবার হামলার খবর পাওয়া গেলেও ভোটগ্রহণ সামগ্রিকভাবে নির্বিঘ্নে এগিয়েছে। মস্কোর স্থানীয় সময় রোববার দুপুরের শুরুতেই ভোটার উপস্থিতি ৫০ শতাংশ ছাড়িয়েছে বলে রাশিয়ার ইন্টারফ্যাক্স সংবাদ সংস্থা কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে।
তবে যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের কারণে অনেক প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাননি। উদারপন্থী ইয়াবলোকো পার্টির যেসব প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, তাঁদের অনেকে নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নির্বাচনের আগে দলটির দুই জ্যেষ্ঠ নেতাকে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে মন্তব্যের কারণে দীর্ঘ মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রাশিয়ায় সেনাবাহিনীকে ‘অসম্মান’ করা কিংবা কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর জন্য দীর্ঘ কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইয়াবলোকোর নেতা নিকোলাই রিবাকভ প্রতীকী প্রতিবাদের পথ বেছে নেন। তিনি ব্যালট পেপারে নিজের দলের নাম লিখে ‘শান্তির জন্য’ স্লোগান লেখেন এবং সেটি ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট করেন।
নির্বাচন ঘিরে রাশিয়া-ইউক্রেনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
রাশিয়ার নির্বাচন কর্তৃপক্ষ শনিবার জানিয়েছিল, মস্কোর অনলাইন ভোটিং ব্যবস্থা সাইবার হামলার শিকার হয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেন রাশিয়ার এই নির্বাচনকে ‘ছদ্ম নির্বাচন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ইউক্রেনে সামরিক আইন জারি থাকায় দেশটিতে নির্বাচন স্থগিত রয়েছে।
পুতিনও নির্বাচনে ইউক্রেনের হস্তক্ষেপের অভিযোগ করেছেন। শুক্রবার তিনি বলেন, রাশিয়ার নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেনের জাপোরিঝিয়া অঞ্চলে মঙ্গলবার নিজ বাড়িতে এক নির্বাচনী কর্মকর্তা নিহত হওয়ার ঘটনায় ইউক্রেন জড়িত ছিল। তবে রয়টার্স ওই ঘটনার বিস্তারিত স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি এবং কিয়েভ থেকেও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মস্কো বলছে, ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থা এবং অন্যান্য শত্রুপক্ষ রাশিয়ার ভেতরে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা বাড়িয়েছে। ক্রেমলিনের বক্তব্য অনুযায়ী, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে চলমান সংঘাতের সময়ে জাতীয় ঐক্য এবং কিছু মাত্রার সেন্সরশিপ প্রয়োজন।
রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধকে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছে। একই সঙ্গে মস্কো এই যুদ্ধকে শত্রুভাবাপন্ন পশ্চিমের বিরুদ্ধে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবেও তুলে ধরে।
যুদ্ধের চাপ ও অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা না থাকলেও রাশিয়ার অভ্যন্তরে যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক চাপের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বার্লিনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান নেস্টের মতে, যুদ্ধের প্রভাব ক্রমেই সাধারণ রুশ নাগরিকদের জীবনে অনুভূত হচ্ছে। এর ফলে জমে থাকা উদ্বেগ ও অসন্তোষ ক্ষমতাসীন দলের পরিবর্তে নির্বাচনে অনুমোদিত অন্য দলগুলোর পক্ষে ভোটে প্রতিফলিত হতে পারে।
বিশেষ করে কমিউনিস্ট পার্টি এবং নিউ পিপল পার্টি কিছু অতিরিক্ত ভোট পেতে পারে বলে প্রতিষ্ঠানটি মনে করছে। তবে বড় ইস্যুগুলোতে এই দুই দলই সাধারণত ইউনাইটেড রাশিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভোট দিয়েছে।
নির্বাচনের আগে শুক্রবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া টেলিভিশন ভাষণে পুতিন রুশ নাগরিকদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জনগণের ভোট রাশিয়ার সেনাদের প্রতি সমর্থন এবং দেশের ঐক্যের বিষয়টি তুলে ধরবে।
প্রাথমিক ফলাফল রোববার গ্রিনিচ মান সময় সন্ধ্যা ৬টার দিকে আসতে শুরু করার কথা। সোমবার আরও পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















