মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও তৎকালীন বিরোধী নেতা আবদুল্লাহ ইয়ামিনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে দেশটির পিপলস ন্যাশনাল কংগ্রেস (কংগ্রেস পার্টি)। দলটির অভিযোগ, অর্থপাচারের মামলায় ইয়ামিনের বিচার ছিল রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত এবং এর মাধ্যমে বিরোধী কণ্ঠ দমনের চেষ্টা করা হয়েছে।
২০১৯ সালের ২৮ নভেম্বর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে কংগ্রেস পার্টি দাবি করে, ইয়ামিনের বিরুদ্ধে আনা অর্থপাচারের অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দলটির ভাষ্য, বর্তমান প্রশাসনের নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণের অংশ হিসেবেই তার বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছিল। বিচার শেষ হওয়ার আগেই তাকে আটক করা হয়, যার ফলে ২০১৯ সালের এপ্রিলের সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগও বাধাগ্রস্ত হয়। নির্বাচনের কয়েক দিন আগে পর্যন্ত তাকে জামিন দেওয়া হয়নি বলেও বিবৃতিতে দাবি করা হয়।
বিচারকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
ইয়ামিনের মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক চাপের অভিযোগও তুলেছে কংগ্রেস পার্টি। বিবৃতিতে বলা হয়, রায় ঘোষণার শুনানির দিন ৫ নভেম্বর ২০১৯ ফৌজদারি আদালতের প্রধান বিচারক আহমেদ হাইলামকে বিচারিক দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে দেয় বিচারিক সেবা কমিশন।
পরে লিখিত বক্তব্যে বিচারক হাইলাম অভিযোগ করেন, বিচার চলাকালে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা তাকে ইয়ামিনকে দোষী সাব্যস্ত করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। মামলার শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এরপর বিচারক আলী রশীদকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারক করা হয়। ৯ নভেম্বর তিনি গণমাধ্যমে বিচারক হাইলামের বক্তব্যের বিরোধিতা করে মন্তব্য করেন। কংগ্রেস পার্টির দাবি, চলমান বিচার নিয়ে বিচারকের গণমাধ্যমে কথা বলা মালদ্বীপের বিচারক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ ঘটনায় রশীদের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে দলটি দাবি করে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ
বিবৃতিতে মালদ্বীপের বিচারিক সেবা কমিশনের কর্মকাণ্ড নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। দলটির দাবি, ওই সময় কমিশন একাধিক কর্মরত বিচারককে সরিয়ে দিচ্ছিল, যার মধ্যে প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আরও তিন বিচারপতিও ছিলেন।
কংগ্রেস পার্টি আরও অভিযোগ করে, কমিশনে ক্ষমতাসীন দলের নেতা এবং তার সাবেক অন্তত দুজন আইনজীবীর উপস্থিতি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা নিয়ে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদকের দেওয়া সুপারিশের মধ্যে সরকার রাজনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট অংশ বেছে নিয়েছে বলেও দলটি অভিযোগ করে।
প্রসিকিউটর জেনারেলের পদত্যাগ
ইয়ামিনের সাজা ঘোষণার দিনই দেশটির প্রসিকিউটর জেনারেল পদত্যাগ করেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ইয়ামিনের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনায় ভূমিকা রাখা প্রসিকিউটর জেনারেল সংসদে তার অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেন।
ইয়ামিনের আইনজীবীরা এই পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে আদালতের কার্যক্রম স্থগিত করার আবেদন করেন। তাদের যুক্তি ছিল, এ অবস্থায় ইয়ামিন তার জামিনের অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। তবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারক আলী রশীদ আবেদনটি নাকচ করে দ্রুত সাজা ঘোষণা করেন বলে কংগ্রেস পার্টির বিবৃতিতে দাবি করা হয়।
বিবৃতির শেষাংশে মালদ্বীপ সরকারের প্রতি আইনের শাসন নিশ্চিত এবং ইয়ামিনের সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সুরক্ষার আহ্বান জানানো হয়। কংগ্রেস পার্টি অবিলম্বে তাকে মুক্তির দাবি করে এবং মামলাটিকে শুরু থেকেই অন্যায্য ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















