ব্রিকসের দিল্লি সম্মেলনের দৃশ্যপট আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি প্রচলিত ধারণাকে আবার সামনে এনেছে। রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের শি জিনপিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধিদের একই মঞ্চে দেখা গেছে। আর পুরো আয়োজনের নেতৃত্বে ছিল ভারত—যে দেশ একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোয়াড অংশীদার।
এই দৃশ্যকে পশ্চিমা বিশ্লেষণের একটি অংশ ব্রিকসের ক্রমবর্ধমান পশ্চিমবিরোধী চরিত্রের প্রমাণ হিসেবে দেখছে। এই ব্যাখ্যার কিছু ভিত্তি অবশ্যই আছে। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য প্রায়ই হারিয়ে যায়—পশ্চিমের বাইরে অবস্থান করা আর পশ্চিমবিরোধী হওয়া এক জিনিস নয়।
দিল্লিতে গৃহীত ব্রিকসের ৪৫ পৃষ্ঠার ঘোষণাপত্র এই পার্থক্য বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। ১১ সদস্যের সর্বসম্মতভাবে অনুমোদিত দলিলটি দেখিয়েছে, সংগঠনটির ভেতরে একই সঙ্গে ভিন্ন ধরনের ভূরাজনৈতিক প্রবণতা কাজ করছে।
এক ছাতার নিচে ভিন্ন রাজনীতি
ব্রিকসের সবচেয়ে স্পষ্ট পশ্চিমবিরোধী অবস্থান দেখা যায় রাশিয়া, চীন ও ইরানের মধ্যে। রাশিয়া ২০২২ সালের পর থেকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ধরে রাখার উদাহরণ হিসেবে ব্রিকসকে ব্যবহার করছে। চীনের কাছে এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমানোর বৃহত্তর প্রচেষ্টার একটি অংশ। আর ইরানের অবস্থান সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতের কারণে আরও সরাসরি মুখোমুখি।
কিন্তু ব্রাজিল, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থান আলাদা। এই দেশগুলো বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে হলেও তাদের লক্ষ্য বিদ্যমান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করা নয়। বরং তারা চায় এসব প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান শক্তিগুলোর প্রতিনিধিত্ব এবং প্রভাব বাড়ুক।
এই পার্থক্যটি ব্রিকসের চরিত্র বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংগঠনটিকে যদি একমাত্রিক পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এর ভেতরের কূটনৈতিক বাস্তবতা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
দিল্লিতে ভারতের কূটনৈতিক পরীক্ষা
দিল্লি সম্মেলনের বড় প্রশ্ন ছিল—এত ভিন্ন অবস্থানের দেশ কি একটি অভিন্ন ঘোষণাপত্রে একমত হতে পারে?
ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো পরস্পরবিরোধী অবস্থানে থাকা দেশগুলো একই আলোচনার টেবিলে বসে যৌথ ঘোষণায় সম্মত হওয়া নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন। ভারতের ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। দেশটি শুধু পশ্চিম ও অ-পশ্চিম বিশ্বের মধ্যকার ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করেনি; অ-পশ্চিমা দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মধ্যেও সমন্বয়ের জায়গা তৈরি করেছে।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব নিরুপমা রাও এই ঘটনাকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে এই ঐকমত্যের মূল্যও ছিল। ইউক্রেন যুদ্ধের উল্লেখ বাদ পড়া নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। তবু ব্রিকসের মতো বৈচিত্র্যময় সংগঠনের ক্ষেত্রে প্রতিটি আন্তর্জাতিক সংকটে একই অবস্থান গ্রহণের চেয়ে এমন কিছু সাধারণ নীতিতে ঐকমত্য তৈরি করা বেশি কার্যকর হতে পারে, যা সদস্যদের ভিন্ন জাতীয় স্বার্থের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বড় শক্তির সমঝোতায় মাঝারি শক্তির ঝুঁকি
ব্রিকসকে কেবল পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে দেখার আরেকটি সমস্যা হলো, এতে বৈশ্বিক রাজনীতিতে বড় শক্তিগুলোর নতুন সমীকরণ যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক এখন কেবল সংঘাতের সরল রেখায় চলছে না। প্রতিদ্বন্দ্বিতা, চাপ, আলোচনা এবং সম্ভাব্য সমঝোতা—সবকিছু একই সময়ে উপস্থিত। যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের সাম্প্রতিক গতিপথও তার উদাহরণ। বাণিজ্যিক উত্তেজনা থেকে দুই দেশ আবার কৌশলগত স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনায় ফিরেছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারত, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা কানাডার মতো মাঝারি শক্তির সামনে একটি জটিল বাস্তবতা তৈরি হয়। পুরোনো ‘পশ্চিম বনাম অ-পশ্চিম’ বিভাজন দিয়ে সবকিছু ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। বড় শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে কোনো সমঝোতায় পৌঁছালে তার প্রভাব তাদের বাইরে থাকা দেশগুলোর ওপরও পড়ে। ফলে এসব দেশের জন্য কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ধরে রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ব্রিকসকে দুর্বল করার কৌশল কি ভারতের স্বার্থ রক্ষা করবে?
ভারতের অভ্যন্তরে এমন মতও রয়েছে যে ব্রিকসের ভেতর থেকেই সংগঠনটির চীনা প্রভাব ঠেকানো উচিত। যুক্তিটি হলো, ব্রিকস যত শক্তিশালী হবে, চীন তত বেশি সেটিকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারবে। এমনকি ভারতকে সংগঠনটি ছেড়ে দেওয়া উচিত—এমন মতও প্রকাশিত হয়েছে।
চীনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ আছে। কিন্তু সংগঠনটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে অকার্যকর করে দেওয়া সেই প্রভাব কমাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং ভারত সরে গেলে বা ব্রিকসের কার্যকারিতা নষ্ট হলে সংগঠনটি আরও ছোট একটি পরিসরে পরিণত হতে পারে, যেখানে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি থাকবে।
ভারতের জন্য ব্রিকসের আরেকটি মূল্য রয়েছে। ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে একই কাঠামোর মধ্যে থেকে ভারত নিজের কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ পায়। দিল্লি সম্মেলনে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমঝোতা তৈরির যে ভূমিকা ভারত পালন করেছে, সেটিও এই অবস্থানের সুফল।
তাই ব্রিকসকে চীনের নেতৃত্বাধীন একটি প্রকল্প হিসেবে দেখার পরিবর্তে এর ভেতরে থেকে চীনের প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা ভারতের জন্য একটি পৃথক কৌশল হতে পারে।
মুদ্রা প্রশ্নে ভারতের সতর্ক অবস্থান
ব্রিকসের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় অভিন্ন মুদ্রার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দিল্লির ঘোষণাপত্রে কোনো অভিন্ন ব্রিকস মুদ্রা চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়নি। ভারত বরং সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন এবং জাতীয় মুদ্রাগুলোর মধ্যে কার্যকর আর্থিক সংযোগ বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা এবং ডলারের বিকল্প হিসেবে একটি নতুন অভিন্ন মুদ্রা প্রতিষ্ঠা করা একই নীতি নয়। ভারত এখন পর্যন্ত এই সীমারেখা অতিক্রম করেনি।
দিল্লি সম্মেলন তাই ব্রিকস সম্পর্কে একটি সরল সিদ্ধান্তের পরিবর্তে আরও জটিল চিত্র সামনে এনেছে। সংগঠনটির ভেতরে রাশিয়া, চীন ও ইরানের মতো দৃঢ় পশ্চিমবিরোধী অবস্থান রয়েছে। আবার এমন সদস্যও রয়েছে যারা বৈশ্বিক ক্ষমতার কাঠামো বদলাতে চায়, কিন্তু পশ্চিমের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে আগ্রহী নয়।
এই দুই প্রবণতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই ব্রিকসের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। ২০২৭ সালে চীন সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর এই ভারসাম্য কতটা টিকে থাকে, সেটিই হবে পরবর্তী বড় পরীক্ষা।
ভারতের ক্ষেত্রেও আসল প্রশ্ন হবে শুধু সম্মেলন আয়োজন করা নয়। বরং সংগঠনের ভেতরে সক্রিয় থেকে ভিন্নমতের মধ্যে সমন্বয় ঘটানো, নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং ব্রিকসকে পশ্চিমবিরোধী সামরিক বা রাজনৈতিক জোটে পরিণত হওয়ার পথ থেকে দূরে রাখার সক্ষমতা কতটা ধরে রাখা যায়—সেটিই হয়ে উঠবে বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা।
হার্শ পান্ডে 



















