ইয়েমেনের হুথি যোদ্ধাদের হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম জানিয়েছেন, সৌদি আরবের অনুরোধে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের একটি ভয়েজার উড়োজাহাজ সৌদি যুদ্ধবিমানকে প্রতিরক্ষামূলক আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহ করবে। তাঁর দাবি, এই সীমিত সময়ের সহায়তা ব্রিটেনের জাতীয় স্বার্থ এবং দেশের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সঙ্গেও যুক্ত।
বার্নহ্যাম সোমবার সন্ধ্যায় সিদ্ধান্তটি অনুমোদন করেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পরামর্শের ভিত্তিতে সৌদি অনুরোধে সাড়া দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। ব্রিটিশ সামরিক সহায়তা কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হতে পারে। এরই মধ্যে একটি ছোট ব্রিটিশ সামরিক পরামর্শক দল সৌদি আরবে মোতায়েন করা হয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহে নতুন শঙ্কা
হুথিদের ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইউরোপের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শোধনাগারে তেল সরবরাহ কমাতে হয়েছে। এতে ইউরোপে তেল সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাড়তে শুরু করেছে জ্বালানির দাম ও মূল্যস্ফীতির চাপ।
ব্রিটেনে ডিজেলের দাম চলতি সপ্তাহেই রেকর্ড উচ্চতায় উঠতে পারে এবং প্রতি লিটারে দুই পাউন্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর পর ফেব্রুয়ারি থেকে একটি সাধারণ পারিবারিক গাড়িতে ডিজেল ভরার খরচ প্রায় ২৯ দশমিক ৬৫ পাউন্ড বেড়েছে। ৫৫ লিটারের একটি পেট্রোল ট্যাংক ভরার খরচও বেড়েছে ৩১ দশমিক ৮৩ পাউন্ড।
জানুয়ারিতে ব্রিটিশ পরিবারের জ্বালানি বিল ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে জ্বালানি কোম্পানিগুলো। এতে অক্টোবরের তুলনায় গড়ে একটি পরিবারের বার্ষিক বিল ৪২৯ পাউন্ড বাড়িয়ে ২ হাজার ১৫২ পাউন্ডে নিয়ে যেতে পারে।
বাব আল-মানদাব নিয়ে উদ্বেগ
হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে বাব আল-মানদাব প্রণালি ঘিরে। লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান করিডর। হুথিরা যদি এই এলাকার কৌশলগত উচ্চভূমি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল থেকে লোহিত সাগর উপকূল বিচ্ছিন্ন করতে পারে, তাহলে প্রণালিটির ওপর তাদের প্রভাব বাড়তে পারে।
ব্রিটিশ কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, বাব আল-মানদাব বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
কাতারও সতর্ক করে বলেছে, হরমুজ প্রণালির পর বাব আল-মানদাব বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি পুরো বিশ্বের জন্য ‘বিপর্যয়কর’ হতে পারে। দেশটি এ সংকট মোকাবিলায় কূটনীতি ও সংলাপের ওপর জোর দিয়েছে।
সৌদি আরবে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা উপস্থিতি
সৌদি আরবে এরই মধ্যে প্রায় ১০০ ব্রিটিশ সেনা দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষায় সহায়তা করছে। চলতি বছরের বসন্তে যুক্তরাজ্য সৌদি আরবে স্কাই সাবর মিসাইল ব্যবস্থা পাঠিয়েছে, যা দেশটির বৃহত্তর আঞ্চলিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। প্রায় ২৫ কোটি পাউন্ড মূল্যের এই ব্যবস্থা যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও লেজারনির্দেশিত বোমা মোকাবিলা করতে পারে।
গত সপ্তাহে হুথিদের ধারাবাহিক হামলার পর সৌদি আরব মক্কা, জেদ্দা ও তাইফ অঞ্চলে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছিল। মক্কায় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুরুর পর এটি ছিল প্রথম এ ধরনের সতর্কতা। ইয়েমেন থেকে ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে ১৩ জন আহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
নিউইয়র্কে বার্নহ্যামের কূটনৈতিক তৎপরতা
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে থাকা বার্নহ্যাম মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল-সৌদের সঙ্গেও তাঁর আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
বার্নহ্যাম বলেছেন, বিদেশের সংঘাতের প্রভাব ব্রিটিশ নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনেও পড়ছে। তাই মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বন্ধে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা জোরদারের পাশাপাশি দেশের জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে তাঁর সরকার।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















