০৫:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ট্রাম্প-শি বৈঠকে বড় চুক্তির চেয়ে ছোট সমঝোতার সম্ভাবনাই বেশি এআই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ছে ভয়, ৭৩ শতাংশের মতে বিপদ ঠেকাতে যথেষ্ট করছে না কোম্পানিগুলো যুক্তরাজ্যের ঋণ বেড়ে চাপে চ্যান্সেলর, বাজেটের আর্থিক সুযোগ কমছে তাইওয়ান ইস্যুতে ট্রাম্পকে চাপ দেবেন শি, ১৯৮২ সালের চুক্তির দোহাইয়ে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের দাবি ভারতে ইউপিআইয়ে নতুন ফি, আরও শক্তিশালী হবে PhonePe-গুগল পে নাইজেরিয়ায় হেফাজতে ৩৭ খনি শ্রমিকের মৃত্যু, বেঁচে ফেরাদের ভয়াবহ বর্ণনা ট্রাম্প-শি বৈঠকে তিন ‘টি’: বাণিজ্যে সামান্য অগ্রগতি, তাইওয়ানে অনড়তা, প্রযুক্তিতে অনিশ্চয়তা সৌদি আরবকে হুথি হামলা ঠেকাতে সামরিক সহায়তা দেবে ব্রিটেন, জ্বালানি সংকটের শঙ্কা নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের নতুন হাইকমিশনার হচ্ছেন পররাষ্ট্র সচিব সিয়াম পাটওয়ারীকে রিমান্ডে নিলেই বের হবে বাসে ককটেল-আগুনের নেপথ্যে কারা: রাশেদ খাঁন

ট্রাম্প-শি বৈঠকে তিন ‘টি’: বাণিজ্যে সামান্য অগ্রগতি, তাইওয়ানে অনড়তা, প্রযুক্তিতে অনিশ্চয়তা

  • রানা মিটার
  • ০৫:১০:২৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 12

২৪ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক হতে যাচ্ছে। কয়েক মাসের ব্যবধানে আবারও দুই নেতার আলোচনায় ফিরে আসছে তিনটি পরিচিত বিষয়—বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও তাইওয়ান। তবে এবারের বৈঠকের পরিবেশ আগের তুলনায় কিছুটা বদলেছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ প্রযুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার আরও গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি ইস্যুতে পরিণত করেছে।

তারপরও এই বৈঠক থেকে বড় ধরনের কৌশলগত সমঝোতা আশা করার কারণ কম। দুই দেশের মধ্যে এমন কিছু ক্ষেত্র আছে যেখানে সীমিত সমঝোতা সম্ভব, কিন্তু মৌলিক স্বার্থের সংঘাত এত গভীর যে একটি শীর্ষ বৈঠক দিয়ে সম্পর্কের গতিপথ বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

বাণিজ্যে সমঝোতা হতে পারে, পরিবর্তন নয়

তিনটি ইস্যুর মধ্যে বাণিজ্যই তুলনামূলকভাবে সহজ। প্রায় এক বছর আগে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যে সমঝোতায় পৌঁছেছিল, তার ধারাবাহিকতা এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে।

সেই সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক কমানোর পাশাপাশি কিছু উচ্চপ্রযুক্তি পণ্যের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেছিল। বিনিময়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিরল মাটি ও অন্যান্য কৌশলগত খনিজের সরবরাহ অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

এবার দুই পক্ষের লক্ষ্য সম্ভবত সেই কাঠামোই ধরে রাখা। কিছু শর্তে পরিবর্তন আসতে পারে, কিন্তু নতুন কোনো মৌলিক বাণিজ্য ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম।

এর সঙ্গে একটি বাণিজ্য বোর্ড গঠনের পরিকল্পনাও আলোচনায় রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হতে পারে দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্কের তুলনামূলকভাবে কম সংবেদনশীল বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি কী ক্ষমতা পাবে, কতটা স্থায়ী হবে এবং বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

চীন একই সঙ্গে বড় ব্যবসায়ী নেতাদের বৈঠকে নিয়ে আসার আগ্রহ দেখিয়েছে। এতে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি করপোরেট পর্যায়েও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা স্পষ্ট। কিন্তু কোন খাতে দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব, তার ওপরই এই উদ্যোগের বাস্তব গুরুত্ব নির্ভর করবে।Trump and Xi, Hoping to Ease Trade War, Agree to 1-Year Truce - The New  York Times

তাইওয়ানে বড় সমঝোতার সম্ভাবনা ক্ষীণ

তাইওয়ান প্রশ্নটি অনেক বেশি জটিল। এখানে দুই পক্ষের মৌলিক অবস্থানের মধ্যে যে দূরত্ব, তা কোনো একটি বৈঠকে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই সীমিত।

ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ান আক্রান্ত হলে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে আগ্রহী নয়। বরং কৌশলগত অস্পষ্টতার দীর্ঘদিনের নীতিই বজায় রাখা হচ্ছে।

চীনের অবস্থানও একই সঙ্গে কঠোর ও হিসাবি। বেইজিং তাইওয়ানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, কিন্তু যুদ্ধই যে তার একমাত্র পছন্দ—এমনটা বলা যায় না। বরং তাইওয়ানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করার নানা পথ খোলা রাখাই চীনের কৌশলের অংশ।

এই কারণে ২০২৮ সালের তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বর্তমান বৈঠকের চেয়েও দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন তাইওয়ান-চীন সম্পর্কের হিসাব বদলাতে পারে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রশাসন এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কতটা সক্রিয় থাকবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

চীন তাইওয়ান ঘিরে সামরিক বিকল্প প্রস্তুত রাখবে, কিন্তু একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও রাজনৈতিক চাপ ব্যবহার করে দ্বীপটির ওপর প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে। তাই বৈঠকে তাইওয়ান নিয়ে উত্তেজনা কমানোর ভাষা থাকলেও বাস্তব নীতিতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।

প্রযুক্তি ও এআই: নতুন প্রতিযোগিতার কেন্দ্র

সবচেয়ে দ্রুত বদলে যাওয়া ক্ষেত্র হলো প্রযুক্তি। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর কেবল বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ সামরিক সক্ষমতার সঙ্গেও যুক্ত।

মে মাসের বৈঠকে এআই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা সামনে আসা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। এরপর দুই দেশ এআই-সংক্রান্ত জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি যোগাযোগের জন্য একটি হটলাইন তৈরির ধারণাও প্রকাশ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে এআই নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির সামাজিক প্রভাব, তথ্যের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং বিপুলসংখ্যক তথ্যকেন্দ্রের বিস্তার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। চীনেও এআইয়ের সুফল নিয়ে আগ্রহ রয়েছে, বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবার মতো ক্ষেত্রে। তবে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।

চীনের ক্ষেত্রে এআইয়ের নিয়ন্ত্রণযোগ্যতা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এমন কোনো প্রযুক্তি, যা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে বড় সামাজিক বা রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, তা বেইজিংয়ের কাছে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের কারণ।

তারপরও এআই নিয়ে দ্রুত সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ এই প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা সরাসরি কৌশলগত সুবিধার সঙ্গে সম্পর্কিত। কোনো পক্ষই এমন ছাড় দিতে চাইবে না, যা প্রতিদ্বন্দ্বীকে এগিয়ে দেবে।

ফলে বৈঠকের প্রকাশ্য ফলাফল সম্ভবত নতুন কোনো বড় চুক্তির পরিবর্তে আরও আলোচনার প্রতিশ্রুতি হতে পারে। গোপনে কিছু সমঝোতার চেষ্টা চললেও প্রকাশ্য নীতিতে দ্রুত পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা সীমিত।

বৈঠকের আসল গুরুত্ব কোথায়

ট্রাম্প-শি বৈঠকের গুরুত্ব হয়তো কোনো নাটকীয় ঘোষণায় নয়, বরং দুই দেশের নেতাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ অব্যাহত রাখার মধ্যেই নিহিত।

বিশ্বের দুই প্রধান শক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতা যতই বাড়ুক, যোগাযোগের পথ খোলা রাখা সংঘাত নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। জি২০ ও এপেকের মতো আন্তর্জাতিক সম্মেলনেও ভবিষ্যতে দুই নেতার আরও বৈঠক হতে পারে। অল্প সময়ে একাধিকবার মুখোমুখি হওয়া অন্তত দেখায় যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও সংলাপের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা হচ্ছে না।

কিন্তু আলোচনার টেবিলে সৌজন্য যতই থাকুক, মূল সমস্যাগুলো রয়ে যাবে। বাণিজ্যে পারস্পরিক স্বার্থ থাকলেও প্রযুক্তিতে প্রতিযোগিতা তীব্র। তাইওয়ান প্রশ্নে দুই দেশের কৌশলগত লক্ষ্য আরও মৌলিকভাবে পরস্পরবিরোধী।

এই বাস্তবতায় আসন্ন বৈঠককে সম্পর্কের মোড় ঘোরানো কোনো মুহূর্ত হিসেবে দেখার চেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নিয়ন্ত্রণে রেখে সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার আরেকটি ধাপ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত। দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য কমেনি; কিন্তু তারা এখনও কথা বলছে—এই বিষয়টিই হয়তো বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল।

জনপ্রিয় সংবাদ

ট্রাম্প-শি বৈঠকে বড় চুক্তির চেয়ে ছোট সমঝোতার সম্ভাবনাই বেশি

ট্রাম্প-শি বৈঠকে তিন ‘টি’: বাণিজ্যে সামান্য অগ্রগতি, তাইওয়ানে অনড়তা, প্রযুক্তিতে অনিশ্চয়তা

০৫:১০:২৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২৪ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক হতে যাচ্ছে। কয়েক মাসের ব্যবধানে আবারও দুই নেতার আলোচনায় ফিরে আসছে তিনটি পরিচিত বিষয়—বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও তাইওয়ান। তবে এবারের বৈঠকের পরিবেশ আগের তুলনায় কিছুটা বদলেছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ প্রযুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার আরও গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি ইস্যুতে পরিণত করেছে।

তারপরও এই বৈঠক থেকে বড় ধরনের কৌশলগত সমঝোতা আশা করার কারণ কম। দুই দেশের মধ্যে এমন কিছু ক্ষেত্র আছে যেখানে সীমিত সমঝোতা সম্ভব, কিন্তু মৌলিক স্বার্থের সংঘাত এত গভীর যে একটি শীর্ষ বৈঠক দিয়ে সম্পর্কের গতিপথ বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

বাণিজ্যে সমঝোতা হতে পারে, পরিবর্তন নয়

তিনটি ইস্যুর মধ্যে বাণিজ্যই তুলনামূলকভাবে সহজ। প্রায় এক বছর আগে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যে সমঝোতায় পৌঁছেছিল, তার ধারাবাহিকতা এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে।

সেই সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক কমানোর পাশাপাশি কিছু উচ্চপ্রযুক্তি পণ্যের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেছিল। বিনিময়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিরল মাটি ও অন্যান্য কৌশলগত খনিজের সরবরাহ অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

এবার দুই পক্ষের লক্ষ্য সম্ভবত সেই কাঠামোই ধরে রাখা। কিছু শর্তে পরিবর্তন আসতে পারে, কিন্তু নতুন কোনো মৌলিক বাণিজ্য ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম।

এর সঙ্গে একটি বাণিজ্য বোর্ড গঠনের পরিকল্পনাও আলোচনায় রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হতে পারে দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্কের তুলনামূলকভাবে কম সংবেদনশীল বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি কী ক্ষমতা পাবে, কতটা স্থায়ী হবে এবং বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

চীন একই সঙ্গে বড় ব্যবসায়ী নেতাদের বৈঠকে নিয়ে আসার আগ্রহ দেখিয়েছে। এতে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি করপোরেট পর্যায়েও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা স্পষ্ট। কিন্তু কোন খাতে দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব, তার ওপরই এই উদ্যোগের বাস্তব গুরুত্ব নির্ভর করবে।Trump and Xi, Hoping to Ease Trade War, Agree to 1-Year Truce - The New  York Times

তাইওয়ানে বড় সমঝোতার সম্ভাবনা ক্ষীণ

তাইওয়ান প্রশ্নটি অনেক বেশি জটিল। এখানে দুই পক্ষের মৌলিক অবস্থানের মধ্যে যে দূরত্ব, তা কোনো একটি বৈঠকে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই সীমিত।

ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ান আক্রান্ত হলে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে আগ্রহী নয়। বরং কৌশলগত অস্পষ্টতার দীর্ঘদিনের নীতিই বজায় রাখা হচ্ছে।

চীনের অবস্থানও একই সঙ্গে কঠোর ও হিসাবি। বেইজিং তাইওয়ানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, কিন্তু যুদ্ধই যে তার একমাত্র পছন্দ—এমনটা বলা যায় না। বরং তাইওয়ানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করার নানা পথ খোলা রাখাই চীনের কৌশলের অংশ।

এই কারণে ২০২৮ সালের তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বর্তমান বৈঠকের চেয়েও দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন তাইওয়ান-চীন সম্পর্কের হিসাব বদলাতে পারে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রশাসন এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কতটা সক্রিয় থাকবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

চীন তাইওয়ান ঘিরে সামরিক বিকল্প প্রস্তুত রাখবে, কিন্তু একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও রাজনৈতিক চাপ ব্যবহার করে দ্বীপটির ওপর প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে। তাই বৈঠকে তাইওয়ান নিয়ে উত্তেজনা কমানোর ভাষা থাকলেও বাস্তব নীতিতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।

প্রযুক্তি ও এআই: নতুন প্রতিযোগিতার কেন্দ্র

সবচেয়ে দ্রুত বদলে যাওয়া ক্ষেত্র হলো প্রযুক্তি। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর কেবল বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ সামরিক সক্ষমতার সঙ্গেও যুক্ত।

মে মাসের বৈঠকে এআই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা সামনে আসা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। এরপর দুই দেশ এআই-সংক্রান্ত জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি যোগাযোগের জন্য একটি হটলাইন তৈরির ধারণাও প্রকাশ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে এআই নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির সামাজিক প্রভাব, তথ্যের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং বিপুলসংখ্যক তথ্যকেন্দ্রের বিস্তার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। চীনেও এআইয়ের সুফল নিয়ে আগ্রহ রয়েছে, বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবার মতো ক্ষেত্রে। তবে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।

চীনের ক্ষেত্রে এআইয়ের নিয়ন্ত্রণযোগ্যতা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এমন কোনো প্রযুক্তি, যা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে বড় সামাজিক বা রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, তা বেইজিংয়ের কাছে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের কারণ।

তারপরও এআই নিয়ে দ্রুত সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ এই প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা সরাসরি কৌশলগত সুবিধার সঙ্গে সম্পর্কিত। কোনো পক্ষই এমন ছাড় দিতে চাইবে না, যা প্রতিদ্বন্দ্বীকে এগিয়ে দেবে।

ফলে বৈঠকের প্রকাশ্য ফলাফল সম্ভবত নতুন কোনো বড় চুক্তির পরিবর্তে আরও আলোচনার প্রতিশ্রুতি হতে পারে। গোপনে কিছু সমঝোতার চেষ্টা চললেও প্রকাশ্য নীতিতে দ্রুত পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা সীমিত।

বৈঠকের আসল গুরুত্ব কোথায়

ট্রাম্প-শি বৈঠকের গুরুত্ব হয়তো কোনো নাটকীয় ঘোষণায় নয়, বরং দুই দেশের নেতাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ অব্যাহত রাখার মধ্যেই নিহিত।

বিশ্বের দুই প্রধান শক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতা যতই বাড়ুক, যোগাযোগের পথ খোলা রাখা সংঘাত নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। জি২০ ও এপেকের মতো আন্তর্জাতিক সম্মেলনেও ভবিষ্যতে দুই নেতার আরও বৈঠক হতে পারে। অল্প সময়ে একাধিকবার মুখোমুখি হওয়া অন্তত দেখায় যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও সংলাপের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা হচ্ছে না।

কিন্তু আলোচনার টেবিলে সৌজন্য যতই থাকুক, মূল সমস্যাগুলো রয়ে যাবে। বাণিজ্যে পারস্পরিক স্বার্থ থাকলেও প্রযুক্তিতে প্রতিযোগিতা তীব্র। তাইওয়ান প্রশ্নে দুই দেশের কৌশলগত লক্ষ্য আরও মৌলিকভাবে পরস্পরবিরোধী।

এই বাস্তবতায় আসন্ন বৈঠককে সম্পর্কের মোড় ঘোরানো কোনো মুহূর্ত হিসেবে দেখার চেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নিয়ন্ত্রণে রেখে সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার আরেকটি ধাপ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত। দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য কমেনি; কিন্তু তারা এখনও কথা বলছে—এই বিষয়টিই হয়তো বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল।