০৬:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জয়ন্ত রায় চৌধুরী ইউনাইটেড নিউজ অব ইন্ডিয়ার ইংরেজি সংবাদসেবার সম্পাদক হুথি হামলা ঠেকাতে সৌদি জেটে জ্বালানি দেবে ব্রিটিশ বিমানবাহিনী নাসার চন্দ্র-আমন্ত্রণ ফিরিয়ে বিশ্বকে ডাকল ভারত নিজের চন্দ্রাভিযানে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে ইসলামাবাদ অভিমুখী লংমার্চ স্থগিত করল জামায়াতে ইসলামি ক্যারিবীয় সাগরে মাদক নৌযানে মার্কিন হামলা, জাতিসংঘের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ ট্রাম্প-শি বৈঠকে বড় চুক্তির চেয়ে ছোট সমঝোতার সম্ভাবনাই বেশি এআই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ছে ভয়, ৭৩ শতাংশের মতে বিপদ ঠেকাতে যথেষ্ট করছে না কোম্পানিগুলো যুক্তরাজ্যের ঋণ বেড়ে চাপে চ্যান্সেলর, বাজেটের আর্থিক সুযোগ কমছে তাইওয়ান ইস্যুতে ট্রাম্পকে চাপ দেবেন শি, ১৯৮২ সালের চুক্তির দোহাইয়ে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের দাবি ভারতে ইউপিআইয়ে নতুন ফি, আরও শক্তিশালী হবে PhonePe-গুগল পে

ভারতে ইউপিআইয়ে নতুন ফি, আরও শক্তিশালী হবে PhonePe-গুগল পে

ভারতের বহুল ব্যবহৃত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস বা ইউপিআইয়ে বড় পরিবর্তন আসছে। ছয় বছর ধরে প্রায় বিনা খরচে চলা এই ব্যবস্থায় আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে ২ হাজার রুপির বেশি মূল্যের লেনদেনে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ০.৪ শতাংশ হারে ফি নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। নতুন এই ব্যবস্থা থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ইউপিআইয়ের বাজারে আগে থেকেই আধিপত্য থাকা PhonePe ও Google Pay-এর।

রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নতুন মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা এমডিআর থেকে ২০২৮ সালের মার্চ নাগাদ পেমেন্ট অ্যাপগুলো বছরে সর্বোচ্চ ১১০ কোটি ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারে বলে ধারণা করছে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান বার্নস্টেইন। ইউপিআই লেনদেনের বর্তমান বাজার অংশীদারত্ব ধরে নিলে এর প্রায় ৯০ কোটি ডলারই পেতে পারে PhonePe ও Google Pay।

গত মাসে ভারতে ইউপিআইয়ের মাধ্যমে হওয়া মোট লেনদেনের অর্থমূল্যের প্রায় ৮০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করেছে এই দুই প্রতিষ্ঠান। ফলে নতুন ফি ব্যবস্থা ছোট প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি করলেও একই সঙ্গে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজারে অবস্থান আরও শক্ত করার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছেন শিল্প বিশ্লেষকেরা।

বিনা ফি থেকে নতুন আয়ের পথে ইউপিআই

ভারতে ইউপিআইয়ের জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে মূলত দ্রুত, সহজ এবং প্রায় বিনা খরচে টাকা পরিশোধের সুবিধার কারণে। রাস্তার পাশের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বড় প্রযুক্তিপণ্য কেনা—সব ক্ষেত্রেই এখন ইউপিআই ব্যবহার করেন দেশটির ৫০ কোটির বেশি মানুষ।

২০১৬ সালের নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের পর নগদের ঘাটতি, পরে করোনাভাইরাস মহামারির সময় যোগাযোগহীন লেনদেনের প্রয়োজন এবং বিভিন্ন ধরনের গ্রাহক প্রণোদনা ইউপিআইয়ের দ্রুত বিস্তারে বড় ভূমিকা রেখেছে।

এখন সেই বিনা ফি-নির্ভর মডেলে পরিবর্তন আনছে ভারত। ১৫ অক্টোবর থেকে ২ হাজার রুপির বেশি মূল্যের ইউপিআই লেনদেনে ব্যবসায়ীদের ওপর ০.৪ শতাংশ ফি আরোপ করা যাবে।

এই পরিবর্তনের ফলে ইউপিআইয়ের ব্যবসায়িক কাঠামো চীন, সিঙ্গাপুর ও ব্রাজিলের মতো দেশের খুচরা ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার কাছাকাছি চলে যাবে। এসব দেশে ডিজিটাল পেমেন্টে সাধারণত প্রায় ০.৬ শতাংশ থেকে ১.৫ শতাংশ পর্যন্ত ফি রয়েছে।

PhonePe-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা রাহুল চারি বলেছেন, এমডিআর চালুর ফলে এতদিনের উল্লেখযোগ্য পরিচালন ব্যয় ও দায়ের একটি অংশ সামাল দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

গ্রামীণ ভারতে বড় দুই প্রতিষ্ঠানের নজর

নতুন আয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে ভারতের গ্রামীণ বাজারে। বড় শহরের বাইরে ইউপিআই ব্যবহার বাড়াতে এতদিন অবকাঠামো, কর্মী ও পরিচালন ব্যয়ের তুলনায় সম্ভাব্য আয় অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট ছিল না।

শিল্পসংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তির মতে, নতুন ফি থেকে পাওয়া অতিরিক্ত আয় PhonePe ও Google Pay-কে গ্রামীণ ভারতে আরও জোরালোভাবে সম্প্রসারণের উৎসাহ দিতে পারে।

গ্রামাঞ্চলে লেনদেনের পরিমাণ শহরের তুলনায় কম হলেও সেখানকার লেনদেনের তথ্য ব্যবহার করে গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণসহ বিভিন্ন আর্থিক সেবা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে শুধু পেমেন্ট ফি নয়, ভবিষ্যতে অন্যান্য আর্থিক পণ্য থেকেও আয় করার পথ তৈরি হতে পারে।

এতে ভারতের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থায় বড় দুই প্রতিষ্ঠানের প্রভাব আরও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।GPay vs PhonePe

ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো যাবে বড় লেনদেনের দিকে

ইউপিআইয়ের ছোট প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য পরিস্থিতি অবশ্য ভিন্ন হতে পারে। বাজারে টিকে থাকতে তারা বড় অঙ্কের লেনদেনকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারে বলে মনে করছেন নির্বাহী ও বিশ্লেষকেরা।

টিকিট বুকিং, ব্যবসায়িক পেমেন্ট, বিদ্যুৎ-পানি-গ্যাসের বিল পরিশোধ এবং অনলাইন কেনাকাটার মতো খাতে ছোট অ্যাপগুলো বেশি গুরুত্ব দিতে পারে। পাশাপাশি ইউপিআইভিত্তিক ঋণ ও অন্যান্য আর্থিক সেবা সম্প্রসারণের চেষ্টা হতে পারে।

ইউপিআই ব্যবহারের দিক থেকে ১৫ নম্বরে থাকা MobiKwik-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা বিপিন প্রীত সিং মনে করেন, নতুন ফি চালুর ফলে ইউপিআই খাতে বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আরও স্পষ্ট ব্যবসায়িক যুক্তি তৈরি হবে।

তার মতে, শিল্পটি ধীরে ধীরে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির অর্থ স্থানান্তরের বদলে ব্যক্তি থেকে ব্যবসায়ীর অর্থ পরিশোধ এবং অনলাইন বাণিজ্যের দিকে আরও বেশি ঝুঁকতে পারে।

তবে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মনে করছে, সংস্কারটি ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য খুব বেশি সুবিধা নাও আনতে পারে। বরং আগে থেকেই বড় গ্রাহকভিত্তি ও বিস্তৃত বিতরণব্যবস্থা থাকা PhonePe ও Google Pay-ই সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে।

বাজারে আধিপত্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন

নতুন আয়ের সুযোগ ইউপিআইয়ের বাজারে প্রতিযোগিতা নিয়ে পুরোনো বিতর্কও আবার সামনে আনতে পারে।

ভারতের ন্যাশনাল পেমেন্টস করপোরেশন অব ইন্ডিয়া ইউপিআই পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটি আগে দুইবার ইউপিআইয়ে কোনো এক পেমেন্ট অ্যাপের বাজার অংশীদারত্ব ৩০ শতাংশে সীমিত করার পরিকল্পনার সিদ্ধান্ত পিছিয়েছে।

কিন্তু বর্তমানে PhonePe ও Google Pay মিলে প্রায় ৮০ শতাংশ লেনদেনের অর্থমূল্য নিয়ন্ত্রণ করায় বাজারের কেন্দ্রীভবন নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হতে পারে।

নতুন ফি থেকে বাড়তি আয় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রযুক্তি, গ্রাহকসেবা, প্রচার এবং গ্রামীণ সম্প্রসারণে আরও বেশি বিনিয়োগের সুযোগ দেবে। এতে তাদের বাজারের অবস্থান আরও শক্ত হতে পারে। অন্যদিকে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় লেনদেনের বাজার দখলের জন্য নতুন কৌশল নিতে হবে।

ফলে ইউপিআইয়ের নতুন ফি শুধু একটি আর্থিক পরিবর্তন নয়; এটি ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট বাজারের প্রতিযোগিতার কাঠামোকেও বদলে দিতে পারে।

ফি কি শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের ওপর পড়বে?

নতুন ফি ব্যবসায়ীদের ওপর আরোপ করা হলেও এর খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর পড়বে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।

নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবসায়ীরা সরাসরি এই ফি গ্রাহকের কাছ থেকে নিতে পারবেন না। তবে শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পণ্যের দাম সামান্য বাড়িয়ে পরোক্ষভাবে খরচটি সমন্বয় করতে পারে।

তবে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বার্নস্টেইনের বিশ্লেষক, শিল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং মুম্বাইয়ের ছয়জনের বেশি খুচরা ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে রয়টার্সের ধারণা, এই পরিবর্তনের কারণে বড় পরিসরে নগদ অর্থ ব্যবহারে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।

মুম্বাইয়ের দাদার এলাকার একটি বড় পোশাকের দোকান সু্বিধার ব্যবস্থাপক গোবিন্দ রাওয়ালের মতে, তাদের দৈনিক প্রায় ২০ লাখ রুপির বিক্রির ৮০ শতাংশ ইউপিআইয়ের মাধ্যমে হয়। তিনি জানিয়েছেন, ফি বাবদ বাড়তি খরচ গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা তাদের নেই।

তার যুক্তি, গ্রাহকেরা ইউপিআই ব্যবহারে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছেন যে সামান্য খরচ বাড়লেও এর প্রভাব খুব বেশি হওয়ার কথা নয়।

মুম্বাইয়ের আরেক বাসিন্দা ৩১ বছর বয়সী মহেন্দ্র বিষ্ণোইও দৈনন্দিন কেনাকাটায় ইউপিআই ব্যবহার করেন। তিনি আশা করেন, ব্যবসায়ীরা নতুন ফি সামাল দিতে পণ্যের দাম বাড়াবেন না। সামান্য মূল্যবৃদ্ধি হলেও তিনি নগদে ফিরে যাবেন না বলে জানিয়েছেন। তবে তার আশঙ্কা, ভবিষ্যতে ফি যেন আরও বাড়ানো না হয়।

সব মিলিয়ে, ভারতের ইউপিআই ব্যবস্থায় নতুন ফি চালুর সিদ্ধান্ত একদিকে ডিজিটাল পেমেন্ট খাতকে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিকভাবে আরও টেকসই করার সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে বাজারে বড় প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য আরও বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি করছে। আগামী কয়েক বছরে PhonePe ও Google Pay এই বাড়তি আয়ের কতটা গ্রামীণ সম্প্রসারণ ও নতুন আর্থিক সেবায় ব্যবহার করে এবং ছোট প্রতিদ্বন্দ্বীরা কীভাবে নিজেদের জায়গা তৈরি করে—সেটিই ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট বাজারের পরবর্তী বড় সমীকরণ হয়ে উঠতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

জয়ন্ত রায় চৌধুরী ইউনাইটেড নিউজ অব ইন্ডিয়ার ইংরেজি সংবাদসেবার সম্পাদক

ভারতে ইউপিআইয়ে নতুন ফি, আরও শক্তিশালী হবে PhonePe-গুগল পে

০৫:৩২:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভারতের বহুল ব্যবহৃত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস বা ইউপিআইয়ে বড় পরিবর্তন আসছে। ছয় বছর ধরে প্রায় বিনা খরচে চলা এই ব্যবস্থায় আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে ২ হাজার রুপির বেশি মূল্যের লেনদেনে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ০.৪ শতাংশ হারে ফি নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। নতুন এই ব্যবস্থা থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ইউপিআইয়ের বাজারে আগে থেকেই আধিপত্য থাকা PhonePe ও Google Pay-এর।

রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নতুন মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা এমডিআর থেকে ২০২৮ সালের মার্চ নাগাদ পেমেন্ট অ্যাপগুলো বছরে সর্বোচ্চ ১১০ কোটি ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারে বলে ধারণা করছে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান বার্নস্টেইন। ইউপিআই লেনদেনের বর্তমান বাজার অংশীদারত্ব ধরে নিলে এর প্রায় ৯০ কোটি ডলারই পেতে পারে PhonePe ও Google Pay।

গত মাসে ভারতে ইউপিআইয়ের মাধ্যমে হওয়া মোট লেনদেনের অর্থমূল্যের প্রায় ৮০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করেছে এই দুই প্রতিষ্ঠান। ফলে নতুন ফি ব্যবস্থা ছোট প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি করলেও একই সঙ্গে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজারে অবস্থান আরও শক্ত করার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছেন শিল্প বিশ্লেষকেরা।

বিনা ফি থেকে নতুন আয়ের পথে ইউপিআই

ভারতে ইউপিআইয়ের জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে মূলত দ্রুত, সহজ এবং প্রায় বিনা খরচে টাকা পরিশোধের সুবিধার কারণে। রাস্তার পাশের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বড় প্রযুক্তিপণ্য কেনা—সব ক্ষেত্রেই এখন ইউপিআই ব্যবহার করেন দেশটির ৫০ কোটির বেশি মানুষ।

২০১৬ সালের নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের পর নগদের ঘাটতি, পরে করোনাভাইরাস মহামারির সময় যোগাযোগহীন লেনদেনের প্রয়োজন এবং বিভিন্ন ধরনের গ্রাহক প্রণোদনা ইউপিআইয়ের দ্রুত বিস্তারে বড় ভূমিকা রেখেছে।

এখন সেই বিনা ফি-নির্ভর মডেলে পরিবর্তন আনছে ভারত। ১৫ অক্টোবর থেকে ২ হাজার রুপির বেশি মূল্যের ইউপিআই লেনদেনে ব্যবসায়ীদের ওপর ০.৪ শতাংশ ফি আরোপ করা যাবে।

এই পরিবর্তনের ফলে ইউপিআইয়ের ব্যবসায়িক কাঠামো চীন, সিঙ্গাপুর ও ব্রাজিলের মতো দেশের খুচরা ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার কাছাকাছি চলে যাবে। এসব দেশে ডিজিটাল পেমেন্টে সাধারণত প্রায় ০.৬ শতাংশ থেকে ১.৫ শতাংশ পর্যন্ত ফি রয়েছে।

PhonePe-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা রাহুল চারি বলেছেন, এমডিআর চালুর ফলে এতদিনের উল্লেখযোগ্য পরিচালন ব্যয় ও দায়ের একটি অংশ সামাল দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

গ্রামীণ ভারতে বড় দুই প্রতিষ্ঠানের নজর

নতুন আয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে ভারতের গ্রামীণ বাজারে। বড় শহরের বাইরে ইউপিআই ব্যবহার বাড়াতে এতদিন অবকাঠামো, কর্মী ও পরিচালন ব্যয়ের তুলনায় সম্ভাব্য আয় অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট ছিল না।

শিল্পসংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তির মতে, নতুন ফি থেকে পাওয়া অতিরিক্ত আয় PhonePe ও Google Pay-কে গ্রামীণ ভারতে আরও জোরালোভাবে সম্প্রসারণের উৎসাহ দিতে পারে।

গ্রামাঞ্চলে লেনদেনের পরিমাণ শহরের তুলনায় কম হলেও সেখানকার লেনদেনের তথ্য ব্যবহার করে গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণসহ বিভিন্ন আর্থিক সেবা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে শুধু পেমেন্ট ফি নয়, ভবিষ্যতে অন্যান্য আর্থিক পণ্য থেকেও আয় করার পথ তৈরি হতে পারে।

এতে ভারতের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থায় বড় দুই প্রতিষ্ঠানের প্রভাব আরও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।GPay vs PhonePe

ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো যাবে বড় লেনদেনের দিকে

ইউপিআইয়ের ছোট প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য পরিস্থিতি অবশ্য ভিন্ন হতে পারে। বাজারে টিকে থাকতে তারা বড় অঙ্কের লেনদেনকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারে বলে মনে করছেন নির্বাহী ও বিশ্লেষকেরা।

টিকিট বুকিং, ব্যবসায়িক পেমেন্ট, বিদ্যুৎ-পানি-গ্যাসের বিল পরিশোধ এবং অনলাইন কেনাকাটার মতো খাতে ছোট অ্যাপগুলো বেশি গুরুত্ব দিতে পারে। পাশাপাশি ইউপিআইভিত্তিক ঋণ ও অন্যান্য আর্থিক সেবা সম্প্রসারণের চেষ্টা হতে পারে।

ইউপিআই ব্যবহারের দিক থেকে ১৫ নম্বরে থাকা MobiKwik-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা বিপিন প্রীত সিং মনে করেন, নতুন ফি চালুর ফলে ইউপিআই খাতে বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আরও স্পষ্ট ব্যবসায়িক যুক্তি তৈরি হবে।

তার মতে, শিল্পটি ধীরে ধীরে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির অর্থ স্থানান্তরের বদলে ব্যক্তি থেকে ব্যবসায়ীর অর্থ পরিশোধ এবং অনলাইন বাণিজ্যের দিকে আরও বেশি ঝুঁকতে পারে।

তবে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মনে করছে, সংস্কারটি ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য খুব বেশি সুবিধা নাও আনতে পারে। বরং আগে থেকেই বড় গ্রাহকভিত্তি ও বিস্তৃত বিতরণব্যবস্থা থাকা PhonePe ও Google Pay-ই সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে।

বাজারে আধিপত্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন

নতুন আয়ের সুযোগ ইউপিআইয়ের বাজারে প্রতিযোগিতা নিয়ে পুরোনো বিতর্কও আবার সামনে আনতে পারে।

ভারতের ন্যাশনাল পেমেন্টস করপোরেশন অব ইন্ডিয়া ইউপিআই পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটি আগে দুইবার ইউপিআইয়ে কোনো এক পেমেন্ট অ্যাপের বাজার অংশীদারত্ব ৩০ শতাংশে সীমিত করার পরিকল্পনার সিদ্ধান্ত পিছিয়েছে।

কিন্তু বর্তমানে PhonePe ও Google Pay মিলে প্রায় ৮০ শতাংশ লেনদেনের অর্থমূল্য নিয়ন্ত্রণ করায় বাজারের কেন্দ্রীভবন নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হতে পারে।

নতুন ফি থেকে বাড়তি আয় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রযুক্তি, গ্রাহকসেবা, প্রচার এবং গ্রামীণ সম্প্রসারণে আরও বেশি বিনিয়োগের সুযোগ দেবে। এতে তাদের বাজারের অবস্থান আরও শক্ত হতে পারে। অন্যদিকে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় লেনদেনের বাজার দখলের জন্য নতুন কৌশল নিতে হবে।

ফলে ইউপিআইয়ের নতুন ফি শুধু একটি আর্থিক পরিবর্তন নয়; এটি ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট বাজারের প্রতিযোগিতার কাঠামোকেও বদলে দিতে পারে।

ফি কি শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের ওপর পড়বে?

নতুন ফি ব্যবসায়ীদের ওপর আরোপ করা হলেও এর খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর পড়বে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।

নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবসায়ীরা সরাসরি এই ফি গ্রাহকের কাছ থেকে নিতে পারবেন না। তবে শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পণ্যের দাম সামান্য বাড়িয়ে পরোক্ষভাবে খরচটি সমন্বয় করতে পারে।

তবে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বার্নস্টেইনের বিশ্লেষক, শিল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং মুম্বাইয়ের ছয়জনের বেশি খুচরা ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে রয়টার্সের ধারণা, এই পরিবর্তনের কারণে বড় পরিসরে নগদ অর্থ ব্যবহারে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।

মুম্বাইয়ের দাদার এলাকার একটি বড় পোশাকের দোকান সু্বিধার ব্যবস্থাপক গোবিন্দ রাওয়ালের মতে, তাদের দৈনিক প্রায় ২০ লাখ রুপির বিক্রির ৮০ শতাংশ ইউপিআইয়ের মাধ্যমে হয়। তিনি জানিয়েছেন, ফি বাবদ বাড়তি খরচ গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা তাদের নেই।

তার যুক্তি, গ্রাহকেরা ইউপিআই ব্যবহারে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছেন যে সামান্য খরচ বাড়লেও এর প্রভাব খুব বেশি হওয়ার কথা নয়।

মুম্বাইয়ের আরেক বাসিন্দা ৩১ বছর বয়সী মহেন্দ্র বিষ্ণোইও দৈনন্দিন কেনাকাটায় ইউপিআই ব্যবহার করেন। তিনি আশা করেন, ব্যবসায়ীরা নতুন ফি সামাল দিতে পণ্যের দাম বাড়াবেন না। সামান্য মূল্যবৃদ্ধি হলেও তিনি নগদে ফিরে যাবেন না বলে জানিয়েছেন। তবে তার আশঙ্কা, ভবিষ্যতে ফি যেন আরও বাড়ানো না হয়।

সব মিলিয়ে, ভারতের ইউপিআই ব্যবস্থায় নতুন ফি চালুর সিদ্ধান্ত একদিকে ডিজিটাল পেমেন্ট খাতকে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিকভাবে আরও টেকসই করার সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে বাজারে বড় প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য আরও বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি করছে। আগামী কয়েক বছরে PhonePe ও Google Pay এই বাড়তি আয়ের কতটা গ্রামীণ সম্প্রসারণ ও নতুন আর্থিক সেবায় ব্যবহার করে এবং ছোট প্রতিদ্বন্দ্বীরা কীভাবে নিজেদের জায়গা তৈরি করে—সেটিই ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট বাজারের পরবর্তী বড় সমীকরণ হয়ে উঠতে পারে।