নাইজেরিয়ায় আটক ৩৭ খনি শ্রমিকের মৃত্যুকে ঘিরে চাঞ্চল্য ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। হেফাজত থেকে বেঁচে ফেরা কয়েকজনের দাবি, একটি ছোট ও অতিরিক্ত ভিড়ভাট্টা কক্ষে তাদের আটকে রাখার পর নিরাপত্তাকর্মীরা সেখানে অজ্ঞাত একটি পদার্থ স্প্রে করেছিলেন। এরপরই একের পর এক আটক ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন এবং অনেকে মারা যান।
মৃতদের মধ্যে অনেকেই কিশোর ও তরুণ, যারা দেশটির নাইজার রাজ্যের মিননা শহরের আশপাশে ছোট পরিসরে সোনা উত্তোলনের কাজে যুক্ত ছিলেন। অবৈধভাবে পরিচালিত সোনার খনি বন্ধের অভিযানের অংশ হিসেবে তাদের আটক করেছিল নাইজেরিয়া সিকিউরিটি অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স কর্পস (এনএসসিডিসি)।
ঘটনার পর দেশজুড়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নাইজার রাজ্যে ২৪ ঘণ্টার কারফিউ জারি করা হয়। সংঘর্ষে অন্তত একজন নিহত হয়েছেন।
ছোট কক্ষে গাদাগাদি করে আটক
২২ বছর বয়সী আদামু ইসাহ বলেন, মিননা শহরের বাইরে সোনার খনিতে অভিযান চালানোর সময় গত সপ্তাহে একদল কিশোর ও তরুণকে আটক করা হয়। পরে তাদের শহরে নিয়ে আসা হয়।
ইসাহর ভাষ্য অনুযায়ী, ১৭ সেপ্টেম্বর রাত ৮টার দিকে প্রায় ১৭ জনকে প্রায় ৫ বর্গমিটারের একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। কক্ষটিতে ছিল মাত্র একটি ছোট জানালা। পরে সেখানে আরও প্রায় ৫০ জন আটক খনি শ্রমিককে ঢোকানো হয়।
এত মানুষের জন্য কক্ষটি অত্যন্ত ছোট হয়ে পড়ায় তারা নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে অভিযোগ করতে থাকেন। ইসাহ বলেন, কিছুক্ষণ পর দরজার নিচ দিয়ে অজ্ঞাত একটি পদার্থ স্প্রে করা হয়।
প্রথমে তারা ধারণা করেছিলেন, এত মানুষের কারণে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হওয়ায় হয়তো কোনো সুগন্ধি জাতীয় পদার্থ ছিটানো হচ্ছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।
ইসাহের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে কয়েকজন অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করেন। কেউ কেউ অচেতন হয়ে পড়ে। এরপর একের পর এক মানুষ মারা যেতে থাকেন।
‘শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল’
আরেক জীবিত ব্যক্তি ২৯ বছর বয়সী দাউদা শেহুও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
তার দাবি, আটক কক্ষে এমন একটি পদার্থ স্প্রে করা হয়েছিল, যার গন্ধ সুগন্ধির মতো ছিল। কয়েক ঘণ্টা পর তাদের গলায় চুলকানি শুরু হয় এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হতে থাকে। এরপর একের পর এক মানুষ মারা যেতে থাকেন।
ইসাহ ও শেহু দুজনই জানান, আটকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। তারা সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিলেন এবং দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিলেন। কয়েকজনকে বিভ্রান্ত ও অস্বাভাবিক আচরণ করতে দেখা যায়। পরে তারা অচেতন হয়ে পড়েন।
আরেকজন জীবিত ব্যক্তিও একই ধরনের বর্ণনা দিয়েছেন। নাইজেরিয়ার স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল টিভিসি নিউজে প্রচারিত একটি ভিডিওতে তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে ঘটনার বিবরণ দেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কক্ষটি অত্যন্ত ছোট হওয়ায় আটক ব্যক্তিরা বারবার অভিযোগ করলেও তাদের কথা শোনা হয়নি। পরে কক্ষটি বন্ধ করে ভেতরে ‘সুগন্ধির মতো’ কিছু স্প্রে করা হয়। এরপর মানুষজন একে একে অচেতন হয়ে পড়তে শুরু করেন।
তিনি বলেন, কী স্প্রে করা হয়েছিল তা তিনি জানেন না। তবে পদার্থটির গন্ধ তার কাছে মরিচের মতো মনে হয়েছিল। পরে তিনি নিজেও অচেতন হয়ে পড়েন এবং পরদিন সকালে জ্ঞান ফেরে।
কী স্প্রে করা হয়েছিল, জানা যায়নি
তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স। কক্ষে কী ধরনের পদার্থ স্প্রে করা হয়েছিল বা সেটি মৃত্যুর সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত—এ বিষয়েও নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
নাইজেরিয়ার কর্তৃপক্ষ প্রথমে বলেছিল, কোনো রোগের প্রাদুর্ভাবের কারণে মৃত্যুগুলো হয়ে থাকতে পারে। পরে তারা জানায়, মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত নয় এবং বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।
নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলা আহমেদ তিনুবু ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এনএসসিডিসির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এনএসসিডিসি, দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং নাইজার রাজ্য সরকারকে এ বিষয়ে প্রশ্ন পাঠানো হলেও তারা রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
ক্ষোভ ও বিক্ষোভ
বৃহস্পতিবার ৩৭ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর ঘটনাটি দ্রুত জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। অনেক মৃতদেহ ইসলামি রীতি অনুযায়ী দ্রুত দাফন করা হয়েছে। নাইজার স্টেট জেনারেল হাসপাতালের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ছয়টি মরদেহ তখনও মর্গে ছিল।
ঘটনার প্রতিবাদে শুক্রবার বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ হয়। এতে একজন নিহত হন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নাইজার রাজ্য কর্তৃপক্ষ ২৪ ঘণ্টার কারফিউ জারি করে।
এই ঘটনা নাইজেরিয়ার আটককেন্দ্রগুলোর পরিবেশ এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর হাতে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আচরণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে বিচার শুরুর আগেই দীর্ঘ সময় আটক থাকা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
৩৭ জনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হয়নি। প্রেসিডেন্টের নির্দেশে চলমান তদন্তের ফলেই স্পষ্ট হতে পারে, আটক ব্যক্তিদের মৃত্যুর পেছনে কী ঘটেছিল এবং অভিযোগ করা পদার্থটির সঙ্গে মৃত্যুগুলোর কোনো সম্পর্ক ছিল কি না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















