ফয়সাল আহমেদ
রাসেলস ভাইপার বাংলায় যার নাম চন্দ্রবোড়া। বর্তমানে এ সাপ নিয়ে দেশের মানুষের মুখে মুখে আলোচনা চলছে । সম্প্রতি এই সাপের কামড়ে একজনের মৃত্যু হবার পরে এবং বেশ কয়েক জায়গায় এই সাপ দেখা যাবার পরে- এই আলোচনা এখন টেবিল থেকে সেমিনার অবধি। মূলত কতটা ভয়ংকর এই সাপ, কী এর বৈশিষ্ট্য এবং আচরণই বা কেমন?
রাসেল ভাইপার বাংলায় যাকে বলা হয় চন্দ্রবোড়া এই চন্দ্রবোড়া মূলত ‘ভাইপারিডীয়’ জাতের সাপ। এদের বা ‘রাসেলস ভাইপার’দের হঠাৎ করে দেখলে অজগরের বাচ্চা বলে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এদের মাথা ও পিঠের দিকের রূপ ভিন্নতর। মাথা তুলনামূলকভাবে বড়, ত্রিকোণাকৃতি এবং ঘাড় সরু। এদের বুক থেকে পায়ুপথ পর্যন্ত মোটা, লেজ সরু এবং আকারে ছোট। দেহাবরণের আঁশ শুকনো খসখসে এবং পেছনের দিকে ওল্টানো। আঁশগুলো তিনটি পাশাপাশি শেকলের মতো সারি করে সাজানো। প্রতি সারির সংযুক্ত শেকল-বলয়গুলো গোলাকার, ডিম্বাকৃতি বা বরফি আকৃতির। গায়ের সাধারণ রং বাদামি থেকে হলদেটে। পেট বাদামি বা হলদে চিতিযুক্ত।

চন্দ্রবোড়া সাপের প্রধান খাদ্য ইঁদুর। সময় সময় এগুলোকে পাখিও ধরে খেতে দেখা যায়। শিকার ধরার জন্য এরা ওত পেতে বসে থাকে। শরীর ভারী হওয়ার দরুন এগুলো দৌড়ে শিকার ধরতে পারে না। শিকার নাগালের মধ্যে এলে কালবিলম্ব না করে সঙ্গে সঙ্গে কামড়ে ধরে। ধরার পরপরই শিকারের দেহে বিষ ছেড়ে দেয়। এরপর আহত প্রাণীটির গন্ধ শুঁকে সেটিকে সংগ্রহ করে খায়। অন্যান্য সাপের মতো এদের জিব শব্দ শোনে না। বাতাস ও মাটি থেকে এরা দ্রবীভূত রাসায়নিক দ্রব্যের গন্ধ গ্রহণ করে। এরপর সেই গন্ধ ‘জ্যাকবসন অঙ্গে’ পাঠিয়ে দিয়ে বিশ্লেষণের মাধ্যমে এরা আওয়াজ শনাক্ত করে। ইঁদুরভর্তি ধান ও পাটখেতের আল, পাথর-নুড়ি ভর্তি রেললাইন, ইটের ভাটা ও বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড় এদের পছন্দের আবাসস্থল। লোকালয়ের গাছগাছালির নিচে জমে থাকা শুকনো লতা-পাতা এবং ইঁদুরের গর্ত বা উইয়ের ঢিবিতেও এদের দেখতে পাওয়া যায়। চন্দ্রবোড়া সাপ কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা ও রাজশাহীতে বেশি পরিমাণে দেখা যায়। যমুনার পূর্ব দিকে ঢাকা অঞ্চলেও এদের সন্ধান পাওয়া যায়।
স্ত্রী চন্দ্রবোড়া সাপ ডিম না পেড়ে সরাসরি বাচ্চা প্রসব করে। সিঞ্চিত ডিম স্ত্রী সাপের পেটের বিশেষ থলিতে আবদ্ধ থাকে। বাচ্চা না ফোটা পর্যন্ত ডিমগুলো (ভ্রূণ) পেটের থলিতেই বাড়তে থাকে। বর্ষা মৌসুমের শুরুতে ২০ থেকে ৪০টি পরিণত সাপের অবিকল বাচ্চা বেরিয়ে আসে।

চন্দ্রবোড়া আমাদের দেশের মারাত্মক বিষধর সাপগুলোর অন্যতম। এগুলো রেগে গেলে বা আত্মরক্ষার প্রয়োজনে কোণঠাসা হয়ে পড়লে প্রথমত তীব্র হিস্ হিস্ শব্দ করে শত্রুপক্ষকে ভয় দেখায়। তাতে যথেষ্ট কাজ না হলে এরা ছোবল মারে। চন্দ্রবোড়া কামড়ালে রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।
এদের বিষ গোখরোর বিষের চেয়ে তিন ভাগের এক ভাগ কম বিষাক্ত হলেও মাথা বড় থাকায় এদের বিষথলিতে বিষের পরিমাণ বেশি থাকে। সেই বিষ একবার শত্রুর দেহে পুরো মাত্রায় ঢেলে দিতে পারলে রোগীর অবস্থা হয়ে দাঁড়ায় সঙ্গিন। চন্দ্রবোড়ার বিষ প্রাণিদেহের রক্তকণিকাকে আক্রমণ করে। রক্তের অন্তঃক্ষরণ বা জমাট বেঁধে যাওয়ার জন্য রক্তে যে রাসায়নিক উপাদান থাকে, তা ভেঙে অন্য বস্তুতে পরিণত হয়। এ অবস্থায় রোগী সহজেই মৃত্যুমুখী হয়ে পড়ে। এই সাপের কামড়ে জ্বালাপোড়া অনুভূত হয় এবং ক্ষতস্থান ফুলে ওঠে। রোগীর থুতু-বমি, প্রস্রাব-পায়খানার সঙ্গে রক্ত আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে ফুসফুস, হৃৎপিণ্ড ও বৃক্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং রোগী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

এ সাপের গঠন ও প্রজাতি পরিচয়
এদের পিঠের ও পেটের আঁশ এক ধরনের নয়। এদের মাথা গাঢ় রঙের এবং গলা থেকে তা স্পষ্টভাবে আলাদা করা যায়। লেজ লম্বায় মাঝারি ধরনের। র্যাটেল সাপের লেজ বিশেষভাবে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। পিট ভাইপারের চোখ ও নাকের মাঝখানে তাপ স্পর্শকাতর একটি ছিদ্র রয়েছে। চোখ মাঝারি আকারের। চোয়ালের সামনের দিকে একটি বড়, শক্ত ও নালিযুক্ত বিষদাঁত রয়েছে। বিষদাঁত ও বিষথলির মধ্যে সহজ সংযোগ রয়েছে। মুখ বন্ধ করে রাখা অবস্থায় এই সাপ এর বড় বিষদাঁত ভাঁজ করে রাখতে পারে। এই জাতের সাপের দাঁতগুলো আকারে ছোট। সাধারণভাবে এগুলো স্থলচর। স্থলভাগের বনভূমি, তৃণাঞ্চল ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে মরুভূমিতেও এদের সংখ্যাধিক্য চোখে পড়ে। এই পরিবারের সব সাপ বিষধর এবং এগুলো ছোট মেরুদণ্ডী প্রাণী শিকার করে খায়। এই প্রজাতিতে দুটি উল্লেখযোগ্য উপপরিবার রয়েছে: ভাইপারিনি ও ক্রোটালিনি। এদেরও প্রায় ১৫০টি প্রজাতি আছে। এর মধ্যে ভাইপেরা, কাউসাস, ক্রোটালাস ও বোথোপাস বেশি পরিচিত প্রজাতিগুলোর অন্যতম।
Sarakhon Report 



















