০৩:৩২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
দক্ষিণ চীন সাগরে মালয়েশিয়ার নতুন নজরদারি শক্তি, আকাশে যুক্ত হলো ‘অবিরাম চোখ’ আনকা-এস মালয়েশিয়ায় একক মায়ের সংখ্যা ৩ লাখ ৪০ হাজার ছাড়াল, দারিদ্র্য ও জীবনযুদ্ধের শঙ্কা বাড়ছে চীনের নতুন বার্তা: দেশের টাকা দেশে রাখুন, বিদেশে বিনিয়োগে বাড়ছে কড়াকড়ি মালয়েশিয়ায় ডিজেলে বাড়ছে পাম অয়েলের ব্যবহার, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নতুন পদক্ষেপ ইরান চুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি, লেবাননে যুদ্ধবিরতির দাবিতে জি-৭ নেতারা সিঙ্গাপুরের নেতৃত্বে আসিয়ানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন যুগ, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও তথ্যপ্রবাহে জোর ভারতে  টমেটো-পেঁয়াজ-আলুর দামে আগুন, কৃষকের হাতে নেই ন্যায্য মূল্য পশ্চিমবঙ্গে উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে রাজপথে মমতা, হকারদের পক্ষে তৃণমূলের শক্তি প্রদর্শন কোটা থেকে রাহুলের শিক্ষা বার্তা: ‘স্বপ্ন গড়ার বদলে শিক্ষাব্যবস্থা চাপ ও খরচ বাড়াচ্ছে’ টেলিগ্রামে প্রশ্নফাঁস আতঙ্ক, সতর্কবার্তার পরই ভারতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-১৭৩)

  • Sarakhon Report
  • ১১:০০:৩৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ এপ্রিল ২০২৫
  • 134

বড়ু

কোনো কোনোদিন আসিয়া দেখিতাম, সে উঠানের এক কোণে রান্না করিতেছে। আমি অদূরে পিঁড়ি পাতিয়া বসিতাম। উনানে দাউদাউ করিয়া আগুন জ্বলিতেছে। সেই আগুনের তাপে তার মুখে ফোঁটায় ফোঁটায় মুক্তাবিন্দুর মতো ঘাম শোভা পাইতেছে। ডালের ঘুঁটনি দুই হাতে ঘুরাইয়া সে যখন ভাল খুঁটিত তার হাতের কাচের চুড়িগুলি টুন টুন করিয়া বাজিত। উনানের আগুন কমিয়া গেলে সে তাহাতে আরও লাকড়ি পুরিয়া দিত। আগুন দাউদাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিত। সেই আগুন যেন আমার ভিতরেও জ্বলিয়া উঠিত। শাক রাঁধিবার সময় সেই শাকপাতার গন্ধে সারা বাড়ি আমোদিত হইয়া উঠিত। সেই শাকে ফোড়ং দেওয়ার সময় সে উত্তপ্ত তৈলের মধ্যে আধসিদ্ধ শাকগুলি ছাড়িয়া দিয়া সেই বনের পাতাগুলিকে সুস্বাদু খাদ্যে পরিণত করিত। কিইবা তাহার সংসার। একখানা মাত্র ছোট ঘর। বাপ তাহাকে উঠানের ও-ধারের ঘরে থাকিতে দিয়াছে।

সেখানে কয়েকটি মাটির হাঁড়ি-পাতিল। কতই না যত্নে সেই ঘরখানিকে সে লেপিয়া-পুঁছিয়া পরিষ্কার করিয়া রাখে। সেই হাঁড়ি-পাতিলগুলিকে সে ধুইয়া মুছিয়া কত যত্ন করিয়া যেটা যেখানে শোভা পায় সেখানে সাজায়। মাটির শানকিখানি, তার উপরেও তার যত্নের পরিসীমা নাই। মনে বলে, আমি যদি ওর ঘরের কোনো একটা জিনিসে পরিণত হইতে পারিতাম-ও আমাকে এমনি করিয়া যত্ন করিত। শুধুই মনে মনে ভাবি। মনের কথা প্রকাশ করিয়া বলিবার সুযোগ পাই না। আমি আসিলে দাদি আসিয়া সামনে বসেন। চাচি আসিয়া সামনে বসেন। কতরকমের কথা হয়। কিন্তু যেকথা বলিতে ইচ্ছা করি, সেকথা বলিতে পারি না।

দাদিকে গান গাহিতে বলি। দাদি বলে, “এখন নয় ভাই। সব বাড়িতে লোক। আমি গান গাহিলে লোকে বলিবে, ষাট বছরের বুড়ির ভীমরতি ধরিয়াছে। এই দুপুরবেলা গান ধরিয়াছে। হাটের দিন বিকালে আসিও। তোমাকে প্রাণ ভরিয়া গান শুনাইব।”

হাটের দিন তাঁতিপাড়ার পুরুষেরা শাড়ি-কাপড় লইয়া হাটে যায়। মেয়েরা মাথায় তেল-সিঁদুর পরিয়া এ-বাড়ি ও-বাড়ি ঘুরিয়া বেড়ায়। বুধবারের হাটের দিন বিকালবেলা দাদির বাড়িতে যাইয়া উপস্থিত হই। “ও দাদি। মনে আছে নি? গান হুনাইবার দালয়াত দিয়াছিলে।”

চাচি বস্তুর মাথায় একরাশ চুল খুলিয়া চিরুনি দিয়া আঁচড়াইতেছিল। দাদি আবার চাচির মাথায় চুল খুলিয়াছে। প্রত্যেকেই দুই হাঁটু সামনে ভাঙিয়া বসিয়াছে। যেন কত কালের গাছটি।

হেলিয়া পড়িয়াছে। দাদি তার গোড়ালি, চাচি গাছের শাখা-আর বস্তু সেই গাছের ফুল হইয়া হাসি ঝলমল করিতেছে।

পাশের পিঁড়িখানা দেখাইয়া দাদি বলেন, “বস ভাই-বস।”

পিঁড়ি পাতিয়া বসি। দাদি গান আরম্ভ করে। রামসাধুর গান। কত শত শত বিবাহ-উৎসবে দাদি এই গান গাহিয়াছে। সেইসব বিবাহ-উৎসবের বিগত স্মৃতি দাদির কণ্ঠে ভরা। সেইসঙ্গে চাচি আর বস্তুও গানে সুর মিলায়। অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ-তিন সুর যেন একত্রে আসিয়া মেলে। তিন নদী যেন এক নদীতে আসিয়া ঢেউ খেলায়। গানের কলি দল মেলিতে থাকে-

“শাশুড়ি তো বলিল, গুণের শাউড়ি বলিল, ও হারে তোমার পূত রইল কোন বা দ্যাশেরে।”

“আমার না পুত লো, ও বউলো পঞ্চফুলের ভোমরা লো, ও হারে একফুলে রইল মন মজিয়া নারে।”

ঘরে ত আছে লো, ও বউ লো পেটরা ভরা জেওর লো, তুমি উহাই দেইখা পাশইরো রামসাধুরে।”

‘ও পেটরার জেওলা লো, শাউড়ি আমি লুটেরে বিলাব লো, আমি তেও না যাব রামসাধুর তালাশেরে।”

চলবে…..

জনপ্রিয় সংবাদ

দক্ষিণ চীন সাগরে মালয়েশিয়ার নতুন নজরদারি শক্তি, আকাশে যুক্ত হলো ‘অবিরাম চোখ’ আনকা-এস

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-১৭৩)

১১:০০:৩৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ এপ্রিল ২০২৫

বড়ু

কোনো কোনোদিন আসিয়া দেখিতাম, সে উঠানের এক কোণে রান্না করিতেছে। আমি অদূরে পিঁড়ি পাতিয়া বসিতাম। উনানে দাউদাউ করিয়া আগুন জ্বলিতেছে। সেই আগুনের তাপে তার মুখে ফোঁটায় ফোঁটায় মুক্তাবিন্দুর মতো ঘাম শোভা পাইতেছে। ডালের ঘুঁটনি দুই হাতে ঘুরাইয়া সে যখন ভাল খুঁটিত তার হাতের কাচের চুড়িগুলি টুন টুন করিয়া বাজিত। উনানের আগুন কমিয়া গেলে সে তাহাতে আরও লাকড়ি পুরিয়া দিত। আগুন দাউদাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিত। সেই আগুন যেন আমার ভিতরেও জ্বলিয়া উঠিত। শাক রাঁধিবার সময় সেই শাকপাতার গন্ধে সারা বাড়ি আমোদিত হইয়া উঠিত। সেই শাকে ফোড়ং দেওয়ার সময় সে উত্তপ্ত তৈলের মধ্যে আধসিদ্ধ শাকগুলি ছাড়িয়া দিয়া সেই বনের পাতাগুলিকে সুস্বাদু খাদ্যে পরিণত করিত। কিইবা তাহার সংসার। একখানা মাত্র ছোট ঘর। বাপ তাহাকে উঠানের ও-ধারের ঘরে থাকিতে দিয়াছে।

সেখানে কয়েকটি মাটির হাঁড়ি-পাতিল। কতই না যত্নে সেই ঘরখানিকে সে লেপিয়া-পুঁছিয়া পরিষ্কার করিয়া রাখে। সেই হাঁড়ি-পাতিলগুলিকে সে ধুইয়া মুছিয়া কত যত্ন করিয়া যেটা যেখানে শোভা পায় সেখানে সাজায়। মাটির শানকিখানি, তার উপরেও তার যত্নের পরিসীমা নাই। মনে বলে, আমি যদি ওর ঘরের কোনো একটা জিনিসে পরিণত হইতে পারিতাম-ও আমাকে এমনি করিয়া যত্ন করিত। শুধুই মনে মনে ভাবি। মনের কথা প্রকাশ করিয়া বলিবার সুযোগ পাই না। আমি আসিলে দাদি আসিয়া সামনে বসেন। চাচি আসিয়া সামনে বসেন। কতরকমের কথা হয়। কিন্তু যেকথা বলিতে ইচ্ছা করি, সেকথা বলিতে পারি না।

দাদিকে গান গাহিতে বলি। দাদি বলে, “এখন নয় ভাই। সব বাড়িতে লোক। আমি গান গাহিলে লোকে বলিবে, ষাট বছরের বুড়ির ভীমরতি ধরিয়াছে। এই দুপুরবেলা গান ধরিয়াছে। হাটের দিন বিকালে আসিও। তোমাকে প্রাণ ভরিয়া গান শুনাইব।”

হাটের দিন তাঁতিপাড়ার পুরুষেরা শাড়ি-কাপড় লইয়া হাটে যায়। মেয়েরা মাথায় তেল-সিঁদুর পরিয়া এ-বাড়ি ও-বাড়ি ঘুরিয়া বেড়ায়। বুধবারের হাটের দিন বিকালবেলা দাদির বাড়িতে যাইয়া উপস্থিত হই। “ও দাদি। মনে আছে নি? গান হুনাইবার দালয়াত দিয়াছিলে।”

চাচি বস্তুর মাথায় একরাশ চুল খুলিয়া চিরুনি দিয়া আঁচড়াইতেছিল। দাদি আবার চাচির মাথায় চুল খুলিয়াছে। প্রত্যেকেই দুই হাঁটু সামনে ভাঙিয়া বসিয়াছে। যেন কত কালের গাছটি।

হেলিয়া পড়িয়াছে। দাদি তার গোড়ালি, চাচি গাছের শাখা-আর বস্তু সেই গাছের ফুল হইয়া হাসি ঝলমল করিতেছে।

পাশের পিঁড়িখানা দেখাইয়া দাদি বলেন, “বস ভাই-বস।”

পিঁড়ি পাতিয়া বসি। দাদি গান আরম্ভ করে। রামসাধুর গান। কত শত শত বিবাহ-উৎসবে দাদি এই গান গাহিয়াছে। সেইসব বিবাহ-উৎসবের বিগত স্মৃতি দাদির কণ্ঠে ভরা। সেইসঙ্গে চাচি আর বস্তুও গানে সুর মিলায়। অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ-তিন সুর যেন একত্রে আসিয়া মেলে। তিন নদী যেন এক নদীতে আসিয়া ঢেউ খেলায়। গানের কলি দল মেলিতে থাকে-

“শাশুড়ি তো বলিল, গুণের শাউড়ি বলিল, ও হারে তোমার পূত রইল কোন বা দ্যাশেরে।”

“আমার না পুত লো, ও বউলো পঞ্চফুলের ভোমরা লো, ও হারে একফুলে রইল মন মজিয়া নারে।”

ঘরে ত আছে লো, ও বউ লো পেটরা ভরা জেওর লো, তুমি উহাই দেইখা পাশইরো রামসাধুরে।”

‘ও পেটরার জেওলা লো, শাউড়ি আমি লুটেরে বিলাব লো, আমি তেও না যাব রামসাধুর তালাশেরে।”

চলবে…..