০৫:৩৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬
৩৫ বছর পর প্রথম নিজস্ব চিপ বানাল আর্ম, এআই ডেটা সেন্টারের জন্য মেটা-ওপেনএআই প্রথম গ্রাহক মেক্সিকোয় মোনার্ক প্রজাপতির সংখ্যা ৬৪ শতাংশ বেড়েছে, তবু দীর্ঘমেয়াদি হুমকি কাটেনি আইওএস ২৭-এ প্রতিযোগী এআই সেবা যুক্ত করবে সিরি, নেটফ্লিক্সের সাবস্ক্রিপশন মূল্য বাড়ল আজ নেটফ্লিক্সে বিটিএসের ডকুমেন্টারি মুক্তি, কোরিয়ান গোয়েন্দা চলচ্চিত্র ‘হিউমিন্ট’ আসছে ৩১ মার্চ ইরান যুদ্ধের মোড়ে ট্রাম্প: এগোবেন না কি পিছু হটবেন—চাপে আমেরিকা, দোলাচলে বিশ্ব ট্রাম্পের দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ইরান যুদ্ধ: বিভ্রান্ত বার্তা, বিশ্বজুড়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা ইরান যুদ্ধের পরও মধ্যপ্রাচ্যে বদল আসবে না, সতর্ক বিশ্লেষণ মন্দা পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বিশ্ব শিল্পবাজার, নিউইয়র্কের নিলামেই জোয়ার পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেটেই মহাকাশ দৌড়ে বিপ্লব, খরচ কমিয়ে নতুন যুগের সূচনা ইরান সংকটে ট্রাম্পের অপ্রথাগত কূটনীতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন

মানুষ আর মাছের দূরত্ব: এক মাছ বিক্রেতার জীবনের লড়াই

মাছ বিক্রেতা রশিদের সকাল

সকাল সাতটা বাজে। পুরান ঢাকার এক প্রান্তে মাছের বাজারে হট্টগোলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন আবদুর রশিদ। বয়স প্রায় পঁয়ত্রিশ। মাছের দোকানটা তাঁর বাবার আমলে শুরু হয়েছিলএখন নিজেই চালান। হাতে ছুরিসামনে বরফে ঢাকা কিছু রুইকাতলা আর পাঙ্গাস মাছ। একসময় দিনে ২০২৫ কেজি মাছ বিক্রি করতেন তিনি। এখন সেখানে আটকে গেছেন ৭৮ কেজিতে। মাছের দাম যে হারে বেড়েছেতাতে সাধারণ মানুষ দূরে থাকছোট রেস্তোরাঁগুলো পর্যন্ত আগের মতো নিচ্ছে না।

ক্রেতা কমছেকষ্ট বাড়ছে

রশিদ বলছিলেন, “আগে ভোরবেলায় দোকান খুলতেই ভিড় লেগে যেত। এখন ১০টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে হয় একজন ক্রেতার আশায়। যে পরিবার আগে ২ কেজি রুই কিনতোএখন আধা কেজি কিনেই ফিরছে। বলছে ভাইছেলেমেয়েদের স্কুলের খরচবাসাভাড়াচাল-ডালের দামসব মিলে মাছ কেনা এখন বিলাসিতা হয়ে গেছে।’”

রাজধানীর বাজারে দাম বেড়েছে মাছের

বিশেষ করে রুইকাতলাবোয়ালএসব দেশি মাছের দাম গত এক মাসেই কেজিপ্রতি বেড়েছে ১০০১৫০ টাকা। খুচরা বাজারে রুই এখন ৫৫০৬৫০ টাকাকাতলা ৭০০ ছাড়িয়ে গেছে। রশিদের ভাষায়, “এই দামে মানুষ চাইলেও কিনতে পারে না। আমিও কম দামে বিক্রি করতে পারি নাকারণ পাইকারি বাজারেই তো দাম বেশি।

সংসারে টানাপোড়েন

মাছ বিক্রেতা রশিদের সংসারে আছেন স্ত্রীএক মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে ক্লাস ফাইভে পড়েছেলেটা মাত্র স্কুলে ভর্তি হয়েছে। রশিদের চোখে হতাশা: মেয়ের স্কুলের ফি জমেছে দুই মাসের। দোকানের আয় দিয়ে আগে সংসার চালাতামবাচ্চাদের পড়াশোনাও চলতোকিছু সঞ্চয়ও হতো। এখন মাস শেষে হিসাব মিলাতে পারি না।

স্ত্রী আগে বাড়িতে হাতের কাজ করতেন। সেসব বন্ধ হয়ে গেছে খরচের চাপে। রশিদ নিজেও মাঝে মাঝে গ্রাম থেকে ঢাকায় মাছ এনে বিক্রির চেষ্টা করেনযাতে দাম কিছুটা কমে আসে। কিন্তু পরিবহন খরচবরফবাজার ফিসব মিলিয়ে লাভ তো হয়ই নাউল্টো কিছু টাকা পকেট থেকে বেরিয়ে যায়।

ডিম দিয়ে মুসুর ডালের রেসিপি দারুণ হিট গরম ভাত রুটি সবেতেই এক্কেবারে ফিট Dim Diye Musur Dal Recipe - YouTube

ভাঙছে মনতবুও লড়াই

রশিদ বলেন, “অনেক দিন হয় ভাতের সঙ্গে মাছ খাওয়া হয়নি। আমি তো মাছ বিক্রি করিকিন্তু আমার ঘরেই এখন ডিম বা ডালেই দিন চলে যায়। কী আশ্চর্যনামাছ বিক্রেতার ঘরেই মাছ নেই!

বাজারে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে কিছু পাইকারএই অভিযোগও তুললেন তিনি। ওরা দল বেঁধে মাছ কিনে রাখেপরে দাম বাড়িয়ে দেয়। আমি চাইলে ওদের সঙ্গে পারি না। তাই আমার মতো খুচরা বিক্রেতারা সব দিশেহারা।

সরকারের দিকে তাকিয়ে

সরকারি নজরদারির ঘাটতির কথাও বললেন রশিদ। তাঁর মতে, “দাম বেঁধে দিলেই হবে নাকার্যকর মনিটরিং লাগবে। বাজারে যদি ঠিকমতো নজর রাখা হতোতাহলে এত অস্বাভাবিক দাম হতো না। সাধারণ মানুষও মাছ কিনতে পারতোআমাদেরও ব্যবসা চলতো।

রুই-কাতলের দামে মাথায় হাত ক্রেতাদের

আশার আলো কোথায়?

তবে রশিদ হাল ছাড়েননি। প্রতিদিনই দোকান খুলেনআশায় থাকেনআজ হয়তো বিক্রি ভালো হবে। সরকারি সাহায্যের কোনো খোঁজ পাননি তিনি। এনজিও বা মাইক্রোক্রেডিটের পথেও হাঁটেননি। তাঁর কথা, “ঋণ নিয়ে কী করবোবিক্রি না হলে ঋণও শোধ হবে না। আমি চাই বাজারটা একটু স্থিতিশীল হোকমানুষ মাছ কিনুকআবার সেই পুরনো দিনের মতো হোক দোকানের ব্যস্ততা।

ক্লান্ত বাজারের মানুষ

এই প্রতিবেদন এক রশিদের গল্প হলেওঢাকার প্রতিটি বাজারে আছে এমন শত শত মাছ বিক্রেতাযারা এখন জীবনযুদ্ধে হার মানছেন নাকিন্তু ক্লান্ত। মাছ আমাদের জাতীয় খাবারের অংশঅথচ সেটাই আজ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এই সংকট শুধু একটি পেশার নয়বরং বৃহত্তর সমাজ ও নীতিনির্ধারকদের জন্য এক জরুরি সংকেতমানুষ আর মাছের এই দূরত্ব যেন চিরস্থায়ী না হয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

৩৫ বছর পর প্রথম নিজস্ব চিপ বানাল আর্ম, এআই ডেটা সেন্টারের জন্য মেটা-ওপেনএআই প্রথম গ্রাহক

মানুষ আর মাছের দূরত্ব: এক মাছ বিক্রেতার জীবনের লড়াই

১১:৩৭:০৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ জুলাই ২০২৫

মাছ বিক্রেতা রশিদের সকাল

সকাল সাতটা বাজে। পুরান ঢাকার এক প্রান্তে মাছের বাজারে হট্টগোলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন আবদুর রশিদ। বয়স প্রায় পঁয়ত্রিশ। মাছের দোকানটা তাঁর বাবার আমলে শুরু হয়েছিলএখন নিজেই চালান। হাতে ছুরিসামনে বরফে ঢাকা কিছু রুইকাতলা আর পাঙ্গাস মাছ। একসময় দিনে ২০২৫ কেজি মাছ বিক্রি করতেন তিনি। এখন সেখানে আটকে গেছেন ৭৮ কেজিতে। মাছের দাম যে হারে বেড়েছেতাতে সাধারণ মানুষ দূরে থাকছোট রেস্তোরাঁগুলো পর্যন্ত আগের মতো নিচ্ছে না।

ক্রেতা কমছেকষ্ট বাড়ছে

রশিদ বলছিলেন, “আগে ভোরবেলায় দোকান খুলতেই ভিড় লেগে যেত। এখন ১০টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে হয় একজন ক্রেতার আশায়। যে পরিবার আগে ২ কেজি রুই কিনতোএখন আধা কেজি কিনেই ফিরছে। বলছে ভাইছেলেমেয়েদের স্কুলের খরচবাসাভাড়াচাল-ডালের দামসব মিলে মাছ কেনা এখন বিলাসিতা হয়ে গেছে।’”

রাজধানীর বাজারে দাম বেড়েছে মাছের

বিশেষ করে রুইকাতলাবোয়ালএসব দেশি মাছের দাম গত এক মাসেই কেজিপ্রতি বেড়েছে ১০০১৫০ টাকা। খুচরা বাজারে রুই এখন ৫৫০৬৫০ টাকাকাতলা ৭০০ ছাড়িয়ে গেছে। রশিদের ভাষায়, “এই দামে মানুষ চাইলেও কিনতে পারে না। আমিও কম দামে বিক্রি করতে পারি নাকারণ পাইকারি বাজারেই তো দাম বেশি।

সংসারে টানাপোড়েন

মাছ বিক্রেতা রশিদের সংসারে আছেন স্ত্রীএক মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে ক্লাস ফাইভে পড়েছেলেটা মাত্র স্কুলে ভর্তি হয়েছে। রশিদের চোখে হতাশা: মেয়ের স্কুলের ফি জমেছে দুই মাসের। দোকানের আয় দিয়ে আগে সংসার চালাতামবাচ্চাদের পড়াশোনাও চলতোকিছু সঞ্চয়ও হতো। এখন মাস শেষে হিসাব মিলাতে পারি না।

স্ত্রী আগে বাড়িতে হাতের কাজ করতেন। সেসব বন্ধ হয়ে গেছে খরচের চাপে। রশিদ নিজেও মাঝে মাঝে গ্রাম থেকে ঢাকায় মাছ এনে বিক্রির চেষ্টা করেনযাতে দাম কিছুটা কমে আসে। কিন্তু পরিবহন খরচবরফবাজার ফিসব মিলিয়ে লাভ তো হয়ই নাউল্টো কিছু টাকা পকেট থেকে বেরিয়ে যায়।

ডিম দিয়ে মুসুর ডালের রেসিপি দারুণ হিট গরম ভাত রুটি সবেতেই এক্কেবারে ফিট Dim Diye Musur Dal Recipe - YouTube

ভাঙছে মনতবুও লড়াই

রশিদ বলেন, “অনেক দিন হয় ভাতের সঙ্গে মাছ খাওয়া হয়নি। আমি তো মাছ বিক্রি করিকিন্তু আমার ঘরেই এখন ডিম বা ডালেই দিন চলে যায়। কী আশ্চর্যনামাছ বিক্রেতার ঘরেই মাছ নেই!

বাজারে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে কিছু পাইকারএই অভিযোগও তুললেন তিনি। ওরা দল বেঁধে মাছ কিনে রাখেপরে দাম বাড়িয়ে দেয়। আমি চাইলে ওদের সঙ্গে পারি না। তাই আমার মতো খুচরা বিক্রেতারা সব দিশেহারা।

সরকারের দিকে তাকিয়ে

সরকারি নজরদারির ঘাটতির কথাও বললেন রশিদ। তাঁর মতে, “দাম বেঁধে দিলেই হবে নাকার্যকর মনিটরিং লাগবে। বাজারে যদি ঠিকমতো নজর রাখা হতোতাহলে এত অস্বাভাবিক দাম হতো না। সাধারণ মানুষও মাছ কিনতে পারতোআমাদেরও ব্যবসা চলতো।

রুই-কাতলের দামে মাথায় হাত ক্রেতাদের

আশার আলো কোথায়?

তবে রশিদ হাল ছাড়েননি। প্রতিদিনই দোকান খুলেনআশায় থাকেনআজ হয়তো বিক্রি ভালো হবে। সরকারি সাহায্যের কোনো খোঁজ পাননি তিনি। এনজিও বা মাইক্রোক্রেডিটের পথেও হাঁটেননি। তাঁর কথা, “ঋণ নিয়ে কী করবোবিক্রি না হলে ঋণও শোধ হবে না। আমি চাই বাজারটা একটু স্থিতিশীল হোকমানুষ মাছ কিনুকআবার সেই পুরনো দিনের মতো হোক দোকানের ব্যস্ততা।

ক্লান্ত বাজারের মানুষ

এই প্রতিবেদন এক রশিদের গল্প হলেওঢাকার প্রতিটি বাজারে আছে এমন শত শত মাছ বিক্রেতাযারা এখন জীবনযুদ্ধে হার মানছেন নাকিন্তু ক্লান্ত। মাছ আমাদের জাতীয় খাবারের অংশঅথচ সেটাই আজ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এই সংকট শুধু একটি পেশার নয়বরং বৃহত্তর সমাজ ও নীতিনির্ধারকদের জন্য এক জরুরি সংকেতমানুষ আর মাছের এই দূরত্ব যেন চিরস্থায়ী না হয়।